অরণ্যের উপকথা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এই গল্পটি আমার ঠাকুমা তাঁর ঠাকুমার কাছ থেকে শুনেছিলেন৷ আমার ঠাকুমা আমার মাকে বলেছিলেন৷ আমার মা বলেছিলেন আমাকে৷

পৃথিবীর তখন সবটাই প্রায় জঙ্গল৷ গাদা গাদা বাঘ৷ সুন্দর সুন্দর কচি কচি হরিণ৷ ধেড়ে ধেড়ে হাতি৷ কম্বল গায়ে ভাল্লুক৷ গোঁয়ারগোবিন্দ বুনো ষাঁড়৷ কথামালার হুক্কাহুয়া শেয়াল৷ গাছে গাছে লেজঝোলা হনুমান৷ অলস পশুরাজ সিংহ৷

একদিন একটা বাঘ নিরীহ অসহায় এক হরিণকে তাড়া করেছে৷ ছুটছে হরিণ, ছুটছে বাঘ৷ বাঘটা বেকায়দায় একটা ডোবায় পড়ে গেল৷ হরিণ প্রাণে বাঁচল৷ একটা টিলার ওপর আয়েশ করে শুয়েছিল এক পশুরাজ৷ দৃশ্যটা সে দেখল৷ বিপর্যস্ত বাঘটাকে ডেকে বললে,

‘বোসো৷ হরিণ ধরার কষ্ট কমাতে চাও?’

‘হ্যাঁ প্রভু! ছুটিয়ে মারে৷ এত পরিশ্রম হয় যে তখন আর একটা হরিণে পেট ভরে না৷’

‘আমার মাথায় একটা মতলব এসেছে৷’

‘কী মতলব মহারাজ?’

‘যদি সেটা করতে পারো তা হলে আমরা বসে বসে খাব৷ আমরা খাব, আমাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনী সবাই খাবে৷’

‘মতলব ব্যক্ত করুন মহারাজ৷’

‘পশুদের গণতন্ত্র৷’

‘সে আবার কী?’

‘তুমি জঙ্গলের পাঁচ মাথায় একটা মিটিং ডাকো৷ সেই মিটিং-এ আমাদের দলীয় প্রতিনিধিরা থাকবে৷ আর থাকবে গণতন্ত্রের পশুগণ৷’

‘স্যার! কথাটা বললেন বটে, তবে বাঘের ডাকা মিটিং-এ তারা আসবে কেন? আমাদের স্বভাব-চরিত্র তো সুবিধের নয়৷’

‘শেয়ালকে ডেকে আনো৷ আমি ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেব৷’

সূর্য অস্ত গেল৷ জঙ্গলে গভীর অন্ধকার৷ হাতিপাড়ায় হাতিরা, গন্ডার পাড়ায় গন্ডাররা, হরিণগ্রামে হরিণরা, কেউ গল্প করছে, কেউ হাই তুলছে৷ শেয়ালদের গলায় ঘড়ি ফিট করা আছে৷ প্রহরে প্রহরে অটোমেটিক ডেকে উঠতে বাধ্য৷ রাত দু’প্রহরের সময় বাঘের সঙ্গে শেয়ালদের যে মোড়ল, সে এল পশুরাজের শয়নকক্ষে৷

সিংহ গম্ভীর গলায় বললে, ‘এসো, বোসো৷ তোমাদের গ্রামের খবর কী?’

‘মোটামুটি চলছে৷ খারাপ নয়৷’

‘খাবারদাবার জুটছে ঠিক মতো?’

‘জুটছে মহারাজ, তবে খুব খাটতে হচ্ছে৷ চুরিচামারি করতে হচ্ছে৷ চরিত্র ঠিক রাখা যাচ্ছে না৷’

‘চরিত্র!’ পশুরাজ হুংকার ছাড়লে, ‘চরিত্র আবার কী? নিশ্চয় পণ্ডিতদের পাল্লায় পড়েছ?’

‘মহারাজ! আপনার তো অজানা কিছুই নেই৷ আমাদের মধ্যে পণ্ডিত আছে বেশ কিছু৷ তাদের সবাই শেয়াল পণ্ডিত বলে৷ তারা সব পাঠশালা খুলেছে৷ আবাসিক৷ সেখানে কুমিরদের ছানারা পড়তে আসে৷ কুমিরদের খুব লেখাপড়ার বাতিক৷’

‘কেউ তো আর ঘরে ফেরে না!’

‘লেখাপড়া শেখার এই দোষ মহারাজ৷ বাপ-মাকে ভুলে যায়৷’

‘তার মানে মানুষ হয়ে যায়!’

‘অ্যায়৷ ধরেছেন ঠিক৷ স্বার্থপর মানুষ৷ মানুষ হয়ে গেলেই স্বার্থপর৷ বিদেশে গিয়ে বিয়েটিয়ে করে, সে বেজায় ব্যাপার৷’

সিংহরাজ গম্ভীর গলায় বলেন, ‘ভাগ্য ফেরাতে চাও? তোমার ভাগ্য, তোমার ছেলেমেয়ে, নাতিপুতির ভাগ্য? চোর-ছ্যাঁচড় হয়েও সম্মান কুড়োতে চাও?’

‘চাই স্যার৷ খুব চাই৷’

‘তা হলে ফিল্ডওয়ার্ক করতে হবে৷’

‘ফিল্ডেই তো থাকি৷ ওয়ার্কটা কী?’

‘বনের সব দুর্বল আর অসহায় পশুদের আমাদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে হবে৷ প্লোগানটা এই হবে, দুনিয়ার দুর্বল পশু এক হও৷ সন্ত্রাসবাদ নিপাত যাক৷ কালো থাবা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও৷ এর জন্যে একটা সংগঠন চাই৷ তোমরা একটা পার্টি করো, নাম দাও ফক্সপার্টি৷’

‘যদি সত্যিই ক্ষেপে যায় তা হলে তো আপনারা মরবেন৷’

‘সে ভাবনা আমাদের৷ তোমাকে যা বলছি তাই করো৷’

শৃগাল শুরু করল সংঘবদ্ধ আন্দোলন৷ হাতি বললে, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না৷ বাঘ, সিংহ আমাদের শক্তির কাছে মশামাছি৷ ভাল্লুক বললে, ‘আমরা বোতল নিয়ে বেশ আছি৷’ গন্ডার বললে, ‘আমাদের নাকটাই খাঁড়া৷ আমাদের ভয় নেই৷ আমাদের ভয়েই সবাই কাঁপে৷’

শেয়ালের প্রচারে প্রভাবিত হল হরিণ, গোরু, ভেড়া, ছাগল, বাঁদর, হনুমান৷ শিম্পাজি হল ‘ফক্সপা.র’ তত্ত্বজ্ঞ ঐতিহাসিক৷ মুখে চুরুট, চোখে চশমা৷ জঙ্গলে রোজ মিছিল বেরোয়৷ ফাটাফাটি স্লোগান৷ ‘নিপাত যাক, নিপাত যাক৷’ মাঝে মাঝেই সভা হয়৷

গভীর রাতে শেয়াল আসে সিংহের কাছে৷ ‘মহারাজ! এইবার?’

‘এইবার আমাদের খেলা৷ তোমরা ঘোষণা করে দাও, এক পশুদরদী, পশুতান্ত্রিক বাঘের আবির্ভাব হয়েছে৷ আমরা দুর্বল, আমাদের একার শক্তিতে অত্যাচারীদের শায়েস্তা করা সম্ভব নয়৷ ‘টাইগার পাওয়ার’ দিয়ে জমানা পালটে ফেলব৷ নিরাপদ বনভূমি৷ গোরু নিশ্চিন্তে ঘাস খাবে, বেপরোয়া বংশবৃদ্ধি করবে৷ হরিণের দল চাঁদের আলোয় ছুটে ছুটে বেড়াবে৷ বোকা পাঁঠার দল বিনাবাধায় বেড়ার গাছ খাবে, সাদা সাদা মেষে মাঠ ছেয়ে যাবে৷ বাঁদরে ব্যান্ড বাজাবে, হনুমান নাচবে ডালে ডালে৷’

প্রবীণ হরিণ সব শুনে শেয়ালকে বললে, ‘পণ্ডিত! বাঘ তো বাঘই৷ কেমন করে বিশ্বাস করা যায়৷’

শেয়াল বললে, ‘শোনো, শক্তিমানই দয়ালু হতে পারে৷ ধনীই দাতা হতে পারে৷ বিদ্বানই জ্ঞান দিতে পারে৷ আরও শোনো, চোরই সবচেয়ে ভালো পুলিশ হতে পারে৷’

সভাস্থ সকলে হাততালি দিতে দিতে বললে, ‘হিয়ার, হিয়ার৷’

এক প্রবীণ গরু বললে, ‘কোথায় আমাদের সেই উদ্ধারকর্তা?’

‘তোমাদের কয়েকজন প্রতিনিধি আমার সঙ্গে চলো৷’

‘হ্যাঁ গো৷ কোনও ভয় নেই তো৷’

‘পাগল কোথাকার! ভয় থাকলে নিয়ে যাই? তোমরা সব সম্মানিত প্রতিনিধি৷

প্রত্যেকে ‘ফক্সপার্টির’ ব্যাজ ধারণ করো৷ হাতে নাও পার্টির ঝান্ডা৷’

‘আমাদের হাত কোথায়? আমরা তো চতুষ্পদ৷’

‘তাও তো বটে! ঠিক আছে৷ বাঁদর খাড়া হয়ে চলতে জানে৷ বাঁদরই ঝান্ডা ধরবে৷ তা হলে চলো৷’

‘আমরা কি কোরাসে গান গাইব?’

‘অবশ্যই, গান ছাড়া আন্দোলন হয়? রামছাগল মূল গায়েন, কেমন!’

গান৷৷ ব্যা ব্যা, হাম্বা হাম্বা, কিচির মিচির, কিচির মিচির৷ দল এসে হাজির হল দয়ালু, সমাজতান্ত্রিক বাঘের নিকেতনে৷ বাইরে ব্যাঘ্রলিপিতে লেখা পোস্টার, ‘সমাজকো বদল ডালো৷’

সবাই অবাক৷ বাঘ একটা রুপোর ডাববা থেকে ঘাস খাচ্ছে৷

প্রবীণ গোরু আচমকা বলে বসল, ‘এ কী রে মাইরি বাঘে ঘাস খাচ্ছে?’ বাঘ বিনীত গলায় বললে, ‘গোরুদা! সংযম আর ত্যাগ ছাড়া মানুষ হওয়া যায় না৷ এই দেখো, ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে সব দাঁত তুলে এসেছি৷ আর এই দেখো থাবা৷ নখ একটাও নেই৷ সেলুনে গিয়ে কাটিয়ে এসেছি৷ পৃথিবীতে ঘাসের চেয়ে সুস্বাদু কিছু নেই৷ জলের চেয়ে উত্তম পানীয় আর কী আছে৷’

শেয়াল বললে, ‘আমরা এলুম৷’

‘হালুম৷ সরি! পুরোনো অভ্যাসে বেরিয়ে গেছে৷ স্বাগতম৷ সুস্বাগতম৷’

‘তাহলে শলা পরামর্শে বসা যাক৷’

‘অবশ্যই৷ অবশ্যই৷ এসো, আমরা একটা মজবুত সরকার তৈরি করি৷’

‘সেটা কী জিনিস?’

‘কঠিন কিছু নয়৷ আজ যারা এসেছো তারা সবাই মন্ত্রী হবে৷ এইবার একটা বিরোধী দল চাই৷ এক্ষুনি একটা বিরোধী দল তৈরি করা যাক৷ কী বলো?’

শেয়াল বললে, ‘তাই যদি নিয়ম হয় তো হয়ে যাক৷’

‘একটা দলে তো হবে না ভাই৷ আরও দল চাই৷ তা না হলে ভোট হবে না৷’

আমি বলে দিচ্ছি, কী কী দল হবে৷ ফক্সপা., গোটপা., বুল পা., ডিয়ার পার্টি, ইঁদুর পার্টি, ছুঁচো পার্টি আর টাইগার পার্টি তো রয়েইছে৷’

‘তারপর?’

‘নির্বাচন হবে৷ এই জঙ্গলটাকে আমরা তিরিশ-চল্লিশটা এলাকায় ভাগ করব৷ প্রত্যেকটা এলাকা থেকে প্রত্যেক দলের একজন করে ক্যান্ডিডেট থাকবে৷ এইবার নির্বাচনের পর ফল বেরোবে৷ যদি দেখা যায় চল্লিশটা শেয়াল জিতেছে তাহলে ফক্সপার্টি জঙ্গল শাসন করবে৷ এইরকম নিয়মে, বাঁদর যদি বেশি হয়, তা হলে বাঁদরের শাসন৷ একে বলে মেজরিটি৷ একটা দল যদি মেজরিটি না হয় তা হলে মোর্চা তৈরি করা যাবে, যেমন শেয়ালে, বাঁদরে, ছাগলে, ইঁদুরে৷ একে বলে মিলি-জুলি সরকার৷’

প্রবীণ গরু বলল, ‘টাইগার পার্টির কী হবে?’

‘তারাও তাদের প্রতিনিধি দেবে৷ তাদের স্লোগান হবে হালুম হুলুম৷ তোমাদের হবে হাম্বা হাম্বা, ওদের হবে ব্যা ব্যা, এদের হবে কিচির মিচির৷’

‘তা হলে তো হালুম হুলুমই জিতবে!’

‘অবশ্যই৷’

‘তা হলে আমাদের লাভ!’

‘ওই শৃগালকে জিগ্যেস করো৷ ওর আর এক নাম মিস্টার ফেউ৷’

মিস্টার ফেউ জিগ্যেস করলে, ‘আপনি হাঁ করে কী পরছেন?’

‘দাঁত৷ ঘাস খাওয়ার সময় খুলে ফেলি৷ মাংস খাওয়ার সময় পরে ফেলি৷’

যারা গিয়েছিল তারা আর ফিরে এল না৷ ফিরে এল বাঁদর আর শেয়াল৷

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%