সে এক কাণ্ড

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ভীষণ কাণ্ড, হেডস্যারের বাচ্চা বেড়াল পাতকোয় পড়ে গেছে৷ আমাদের একশো বছরের পুরোনো স্কুলে, একশো বছরের পুরোনো একটা পাতকুয়া আছে৷ খুব গভীর৷ অনেক, অনেক নিচে কালো জল৷ মুখ বাড়িয়ে যেই বলি, ‘এই’, সঙ্গে-সঙ্গে নিচে থেকে কেউ একজন গম্ভীর গলায় বলে ওঠে—‘এই’৷

কে-রে বাবা!

ওই দিকটায় আমাদের দারোয়ান রামুদাদার কোয়ার্টার৷ আমাদের স্কুলে এখন ছ্যাছ্যেড়ে কলের জল এসে গেছে৷ লোহায় ভরতি৷ যে খায় সেই বলে, যাচ্ছেতাই৷ ইংরিজির স্যার একচুমুক খেয়েই তিনবার বলবেন, ‘টেস্টলেস, টেস্টলেস, টেস্টলেস৷’

বাংলার স্যার বললেন, ‘পানসে, পানসে, পানসে’৷

রামুদার বড় মেয়ে রাধাদি ওই একশো বছরের পুরোনো পাতকোর জলে ডাল রাঁধে৷ ডাল খুব সেদ্ধ হয়৷ ভারি মিষ্টি শীতল জল৷ পরিষ্কার ছলছলে৷ ইংলিশ স্যার স্কুলে এসেই বলবেন, ‘রেমো, এ গ্লাস অফ ওয়েল-ওয়াটার৷ ওয়েল-ওয়াটার ইজ ওয়েল৷’ সায়েন্স স্যার সঙ্গে-সঙ্গে বলবেন, ‘ফুল অফ ব্যাকটেরিয়া৷’

‘আমি যদি কুয়োর জল খাই, তাতে আপনার কী?’

‘নাথিং৷ বিজ্ঞানটা জানানো আমার কর্তব্য, জানিয়ে দিলাম৷ ও.কে.!’

স্কুলের শিক্ষকমশাইরা পাতকোর ধারে সমবেত৷ তার বাইরে ছাত্রদের সমাবেশ৷ রাধাদি বালতি নামিয়ে ভীষণ কসরত করছে৷ বাচ্চাটা কোনওরকমে যদি উঠে পড়তে পারে, ‘ম্যাথসস্যার’ বললেন, ‘প্রবলেম ইজ সলভড্৷’

হেডস্যার বললেন, ‘আমি জানতে চাই, পড়ল কী করে? নিজের ইচ্ছেয় পড়েছে, না কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছে? যদি ঠেলে ফেলে দিয়ে থাকে, কে-সে? হু ইজ দ্যাট কালপ্রিট?’

বাংলার স্যার বললেন, ‘আমার মনে হয় কূপের জলে নিজের মুখের প্রতিবিম্বকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে আক্রমণাত্মক ঝম্প প্রদান করেছে৷’

হেডস্যার বললেন, ‘তাই যদি করে থাকে, তাহলে ওটি একটি নির্বোধ পাঁঠা৷’

গেম টিচার বললেন, ‘ইট মে বি এ কেস অফ সুইসাইড৷’

বেড়ালটা ক্রমান্বয়ে মিউমিউ করে চলেছে৷ রাধাদি একমনে বালতিতে তোলার চেষ্টা করছে৷ হচ্ছে না৷

ইতিহাসের স্যার বললেন, ‘আমি আমার বাল্যকালে কথামালার গল্পে পড়েছি৷

নিমজ্জমান ব্যক্তিকে আগে উদ্ধার করে তারপর তিরস্কার করা উচিত৷ এইটাই মানবিকতা৷ আপনারা যা-করছেন সেটা দানবিকতা৷’

হঠাৎ সবাই চিৎকার করে উঠলেন, ‘এ কী, এ কী?’

রাধাদি পাতকোর দড়ি ধরে সড়সড় করে নিচে নেমে যাচ্ছে৷

হেডস্যার বললেন, ‘স্টপ-হিম, স্টপ-হিম৷’

‘হিম নয়, হিম নয়, হার, হার!’

আমাদের সহপাঠী ডাকাবুকো বিধান, সবাইকে ঠেলেঠুলে পাতকোর দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে বললে, ‘স্যার! আপনারা চুপ করুন৷’

বিধান উঁকি মেরে বললে, ‘কতটা জল?’

রাধাদি বললে, ‘অনেক৷ আর একটা কী জন্তু রয়েছে৷ নাকটা উঁচু করে আছে৷ মনে হয় কুমির৷’

ধীরাজ লাফিয়ে উঠল, ‘ওটা আমার হকিস্টিক৷ রাধাদি আমার হকিস্টিকটা তুলে দাও প্লিজ৷’

হেডস্যার বললেন, ‘এ অতি দুঃসাহস৷ এতটা ভালো নয়৷ ও যদি উঠতে না পারে!’

গেম স্যার বললেন, ‘ওইখানেই থাকবে৷ আমরা রিলিফ পাঠাব৷ ফুড ড্রপ করব৷

বন্যার সময় কী হয়! আকাশ থেকে খাবার ফেলব৷ ড্রাইফুড৷’

হেডস্যার বললেন, ‘কে যেন একটু আগে আমাকে কথামালা শোনালেন, আমি এইবার তাঁকে ঈশপস ফেবল শোনাতে চাই—লুক বিফোর ইউ লিপ৷’

বালতির লিফটে চেপে বেড়াল উঠে এল৷ ভিজে বেড়লটাকে দেখে ইঁদুরেরও করুণা হবে৷ বাংলার স্যার বললেন, ‘এখন বোঝা গেল বেড়ালরা লোমসর্বস্ব৷ লোম ছাড়া গৌরব করার মতো শরীরে কিস্যু নেই৷ কীসের অহঙ্কারে ম্যাও-ম্যাও করে!’

হেডস্যার বললেন, ‘বেড়াল তো উঠল, রাধা কী করে উঠবে?’

কুয়োর ভেতর থেকে রাধার গলা পাওয়া গেল, ‘ছেলেদের সামনে মেয়েরা জল থেকে উঠবে কী করে!’

‘ঠিকই তো, ঠিকই তো, এ তো টিভির কমার্সিয়াল অ্যাড নয়৷ অ্যায়, তোমরা সব ওদিকে চলো, ওদিকে চলো৷’

হেডস্যার হেঁকে বললেন, ‘তুই উঠতে পারলি কি না বুঝব কী করে? ঘণ্টা বাজাবি৷’

ধীরাজ চেঁচাচ্ছে, ‘রাধাদি আমার হকিস্টিক৷’

কিছুক্ষণ পরেই ঘণ্টা বাজল৷ হেডস্যার বললেন, ‘টিচারস রুমে আমি এক্ষুনি একটা মিটিং ডাকতে চাই, রাধাকে আমরা সম্বর্ধনা জানাব, ইন এ বিফিটিং ম্যানার৷ আপনারা খোঁজ নিন ব্রেভারি অ্যাওয়ার্ডের জন্যে কোথায় নাম পাঠাতে হবে৷’

‘একটা বেড়ালকে বাঁচাবার কারণে মনে হয় পুরস্কার দেবে না৷ মানুষ হলে হতো৷’

‘কী বলছেন আপনি, বেড়ালও প্রাণী, ওটা আমাদের বিদ্যালয়ের বেড়াল৷ রাধার অনারে আজ স্কুল ছুটি৷’

‘কী বলছেন স্যার আজ থেকে অ্যানুয়াল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে যে৷’

‘পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা!’ ক্ষিপ্ত হেডস্যার বললেন, ‘নিন, তা হলে আবার ঘণ্টা বাজান—ঢ্যাং, ঢ্যাং, ঢ্যাং!’

সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%