সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
কলেজ জীবনে আমাদের চারজনের একটা দল ছিল৷ সেই দলের আবার একটা নামও ছিল ‘ঘুরঘুরে’৷ ছুটি-ছাটা থাকলে আমরা বেরিয়ে পড়তুম৷ সেই সময়টা ভারতবর্ষের খুব একটা সুন্দর সময়৷ কয়েক বছর আগে দেশ স্বাধীন হয়েছে৷ ওদিকে নেহরু ছুটছেন, এদিকে বিধান রায়৷ আমরা সব স্বপ্নে ভাসছি৷ নতুন ভারত জাগছে৷ সারাদেশে একটা দলেরই শাসন৷ গুচ্ছের দলের গদি ধরে টানাটানি খেলা নেই৷ পকেটে পকেটে আগ্নেয়াস্ত্র ঘোরে না৷ আর ডি এক্স জড়ানো ‘মানব-বোমা’ তৈরি হয়নি৷ একটি মাত্র উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক হত্যা—মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যু৷ নানারকম অসুখেই মানুষ মরত৷ যে মৃত্যুর নাম ছিল ‘ন্যাচারাল ডেথ’৷ চারপাশে অনেক হাসি-খুশি ডাক্তার ছিলেন৷ যাঁদের সঙ্গে রুগিরা প্রাণ খুলে দু’চারটে রোগের কথা কইতে পারত সাহস করে৷ ফিজ—মাত্র পাঁচ টাকা, কি দশ টাকা৷ বাড়িতে এলে৷ চেম্বারে—আড়াই টাকা৷ পেটেন্ট ড্রাগস তেমন ছিল না বললেই চলে৷ ডিসপেনসারি থেকেই ওষুধ দিতেন কম্পাউন্ডার৷ মিকশ্চার আর পুরিয়া৷ কম্পাউন্ডার জিগ্যেস করতেন, ‘শিশি এনেছ?’ বিরাট দুটো কাচের জারে লাল, নীল তরল৷ শিশির গায়ে আঠা দিয়ে সেঁটে দিতেন কিরি-কিরি করে কাটা কাগজ৷ মাত্রার নির্দেশ৷ এই রকম বলতেন, সকালে এক দাগ, রাতে এক দাগ৷ আর এই চোদ্দোটা পুরিয়া৷ এ-বেলা একটা, ও-বেলা একটা৷ পয়সার যা-কিছু লেনদেন এই কম্পাউন্ডারের সঙ্গে৷ দ্বিতীয়বার আর যাওয়ার প্রয়োজন হত না৷ সেকালের রোগ-বালাই একালের মতো খ্যাঁচড়া ছিল না৷ কাশতে কাশতে কাশি একদিন সরে পড়ল, কাঁপতে কাঁপতে জ্বর একদিন ছেড়ে গেল৷ একটাই ঘিনঘিনে ব্যাধি ছিল টিবি৷ ধরেছে কি মরেছে৷ প্রত্যেককেই বসন্তের টিকে নিতে হত৷ পক্স হবে না, হবে চিকেন পক্স৷ তার আবার মিষ্টি দিশি নাম মায়ের দয়া৷ এই দয়ায় দিন-পনেরো মশারি-বাস৷ কাছে কেউ আসবে না৷ দূর থেকে বাক্যালাপ৷ দুরন্ত সাহস ছিল মানুষের৷ মানসিক প্রস্তুতিও ছিল৷ মায়ের দয়ায় একজন কাত হলে বাড়িসুদ্ধ সকলেরই হওয়ার সম্ভাবনা৷ তবে ছাড় আছে৷ আগেই যে দয়া পেয়েছে, সে এই মায়ের দয়া দ্বিতীয়বার আর নাও পেতে পারে৷
চারিদিকে সব বড় বড় সংসার৷ ভাই-বোনদের ছড়াছড়ি৷ ঝগড়া আছে, ভাব-ভালোবাসা আছে৷ প্রাচুর্য আছে, দারিদ্র্য আছে তবু সময়টা তখন এইভাবে ভেঙে পড়েনি৷ প্রচার মাধ্যম এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠেনি৷ আর সকলেরই পায়ের তলায় মাটি ছিল৷ ভবিষ্যতে কী হবে ভেবে বর্তমানটাকে কেউ ‘ম্যাসাকার’ করে ফেলত না৷ দুজন মানুষ এক জায়গায় হলে ফাটাফাটি হাসি শোনা যেত৷ বড়লোকরা অবশ্য চিরকালই ‘গ্লূমি’৷ ছড়ি হাতে বেড়াতে বেরোলে বোঝা যেত না, ছড়ি বেড়াচ্ছে, না বাবু বেড়াচ্ছে৷ দুটোই সমান স্টিফ৷ ওই সময়টায় জমিদারদের খুব দুর্দিন চলছিল৷ বাড়িও ফাটছে, সম্পর্কেও চিড় ধরছে৷ মামলা-মকদ্দমা, পার্টিশন৷ পুজোর দালানে দুর্গাপুজোর ঢাক বাজছে কেঁদে কেঁদে৷ ফরসা, ফরসা মহিলারা পূজাস্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঠিকই, তবে পা-ফেলার ভাষায় অনিশ্চয়তা৷ অ্যালসেশিয়ান কুকুর ছাড়া-কুকুর হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে মনে যেমন আঘাত লাগে, বড়লোকরা গরিব হয়ে গেলে সহ্য করা যায় না৷ খুব দুঃখ হয়৷ আমাদের ‘ঘুরঘুরে’ দলে সুন্দর চেহারার এক জমিদারপুত্র ছিল৷ বিশাল বাড়ি ভেঙে পড়ছে৷ বাবা-কাকারা মামলা লড়ছে৷ ছাদের গম্বুজে গোলা পায়রার ঝাঁক৷ চারিদিকে আগাছা৷ সুসময়ে এই বাড়ির বিয়েতে জোড়া সানাই ভৈরবীতে তান তুলত৷ সন্ধ্যার পর ইমনে কাঁদত৷ দিস্তে দিস্তে বড়লোক চারপাশে থইথই৷ আমাদের এই বন্ধুর সুন্দরী বোনকে এক ঝলক দেখে আমাদের দলের এক বন্ধুর ‘মেন্টাল হসপিট্যালে’ যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল৷ পর পর ক’দিন ত্রিফলার জল খাইয়ে মেরামত করা হল৷ মাঝখান থেকে তার আর বিয়ে করাই হল না৷ যে মেয়েই দেখানো হয়, বলে, ‘ওর মতো নয়৷’ সেই মেয়েটি হঠাৎ একদিন অদৃশ্য হয়ে গেল৷ খুঁজে পাওয়া গেল না৷ তখন মনে হয়েছিল, কী আর এমন ব্যাপার৷ এখন এই বৃদ্ধ বয়েসে আকাশের দিকে হাঁ-করে তাকিয়ে বসে থাকতে থাকতে ভাবি, কোথায় সে গেল! এখন সে কোথায় আছে! ভালো আছে তো!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন