সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
সনান করে ঠাকুরঘরে ঢুকেই প্রভাত অবাক হয়ে গেল৷ গত পাঁচ বছরে এরকম ব্যতিক্রম তার কখনও চোখে পড়েনি৷ পুজোর সব আয়োজন ঠিক রয়েছে কিন্তু পুজোর ফুল কোথায়? ফুলের থালা গঙ্গাজলের ঘটির উপরে বসানো, কিন্তু থালা শূন্য৷ এক থালা ভরতি লাল আর সাদা ফুল, সেই পরিচিত পবিত্র দৃশ্য আজ অনুপস্থিত৷ এই সময়টা তার খুব তাড়া থাকে৷ আটটা পঞ্চান্ন-র ট্রেন ধরে তাকে কলকাতায় ছুটতে হবে৷ দশটায় অফিস৷ এক মিনিট এদিক-ওদিক হওয়ার উপায় নেই৷ অথচ অফিস বেরোবার আগে কুল-দেবতার পুজো করতেই হবে৷ ঠাকুর-ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে প্রভাত চিৎকার করতে লাগল—কল্যাণী, আমার পুজোর ফুল কই? কী যে করো বুঝি না৷ একে দেরি হয়ে যাচ্ছে! কল্যাণী আঁচলে রান্নার হাত মুছতে-মুছতে দৌড়ে এল৷—কী হয়েছে কী, চেঁচাচ্ছো কেন? ফুল নেই?
—থাকলে চেঁচাই, নেই বলেই তো চেঁচাচ্ছি৷
—সে কী, পুতুল সেই সাতসকালেই ফুল তুলতে গেল! এখন বাজে ক’টা?
—ক’টা আর সাড়ে সাতটা হবে, রেডিওয় খবর হচ্ছে৷
—সে কী গো, মেয়ে তো সেই ছয়টায় বাগানে গেল ফুল তুলতে৷ কোনওদিন তো এত দেরি করে না! দাঁড়াও দেখছি কী হল!
—দেখতে দেখতেই বাজিমাত৷ বিনা ফুলেই পুজো করি৷ প্রভাত খুঁতখুঁত করতে করতে পুজোর আসনে বসল৷ কল্যাণী তাড়াতাড়ি মেয়েকে খুঁজতে গেল৷ উনুনে ভাত ফুটছে৷ একটু পরেই প্রভাত খেতে বসবে৷ তার আবার সব সাত্ত্বিক ব্যাপার৷ নিরামিষ ভাতে-ভাত খাওয়াই তার অভ্যাস৷ কোনওদিন একটু ঘি থাকে, কোনওদিন থাকে না৷ খাওয়ার ব্যাপারে প্রভাতের কোনও দৃকপাত নেই৷ কিন্তু পুজোর আয়োজনে সামান্য ত্রুটিও তার সহ্য হয় না৷
আজ দশ বছর হল কি তারও বেশি হবে, পনেরো বছরও হতে পারে কল্যাণীর ঠিক মনে পড়ছে না তাদের বিয়ে হয়েছে৷ সুখের সংসারই বলা চলে৷ কোনও ঝামেলা নেই, নির্ঝঞ্ঝাট৷ একটি মাত্র মেয়ে বারো-তেরো বছর বয়স৷ ফুটফুটে সুন্দর৷ প্রভাতের বিয়ে করার কোনও ইচ্ছেই ছিল না৷ জোর করে ধরে তার বিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ বড় দু’ভাই সন্ন্যাসী৷ পরিবারে অন্তত এই ভাইও যদি বিয়ে না করে বংশ রক্ষা হয় কী করে?
এঘর-ওঘর পড়ার ঘর, সব ঘর খুঁজে দেখল কল্যাণী৷ না, সারা ঘরবাড়ির কোথাও পুতুল নেই৷ কী হল মেয়েটার? সেই সাতসকালে বাড়ির পিছনের বাগানে ফুল তুলতে গিয়েছিল৷ রোজই সে যায়৷ ফুল তোলা এমন কিছু শক্ত কাজ নয়৷ ফুল তোলার মতো বয়স তার হয়েছে৷ সকাল থেকে কল্যাণীকে এত ব্যস্ত থাকতে হয়—চা, জলখাবার, খাবার! পুতুল তাই ইদানীং, মা’কে ফুল তোলার কাজ থেকে ছুটি দিয়ে নিজেই সেকাজ করে৷ তার ভালো লাগে৷ ভোরের পাখি গাছে গাছে৷ ফুলে ফুলে চারিদিক সাদা হয়ে থাকে৷ গ্রীষ্মের সকাল, যেন এক অসাধারণ কিছু৷ ঠিক রোদ ওঠার আগের মুহূর্তে, পৃথিবী আর আকাশের মাঝখানে একটা হালকা কুয়াশার চাদর কাঁপতে থাকে৷ ফুল তোলার ফাঁকে ফাঁকে সে একটু আকাশ দেখে নেয়, কখনও নাম-না-জানা কোনও পাখির দিকে তাকিয়ে থাকে অবাক হয়ে৷
বাড়িতে যখন কোথাও মেয়েকে পাওয়া গেল না, তখন কল্যাণী পিছনের দিকে দরজা খুলে বাগানে চলে গেল৷ একবার মনে হল উনুনে ভাত ফুটছে, বোধহয় বেশি সিদ্ধ হয়ে গেল৷ প্রভাত আবার গলা-ভাত খেতে পারে না৷ তারপর ভাবল একদিন না হয় খাবে, আগে দেখি মেয়েটা কোথায় গেল৷ কল্যাণী ভেবেছিল বাগানের কোথাও হয়তো দেখবে গাছের তলায় কি পুকুরঘাটে বসে আছে চুপ করে, কি ঘুমিয়েই পড়েছে হয়তো কিংবা কোনও বন্ধুর সঙ্গে গল্পে মত্ত৷
খুব একটা বড় বাগান নয়৷ এ-কোণ, ও-কোণ ঘুরে দেখতে বেশি সময় লাগল না৷ না, কেউ কোথাও নেই৷ পুকুরঘাটেও কেউ নেই৷ টলটলে জলের উপর গাছের ছায়া দুলছে৷ পোষা মাছটা ঘাটের ধারে এসেছে খাবার আশায়৷ এসব দেখার সময় কল্যাণীর নেই৷ এইবার সে খুব ভাবনায় পড়ল৷ কোথায় গেল মেয়েটা? কখনও না বলে বাড়ির বাইরে যায় না৷ তাড়াতাড়ি ফিরে এসে উনুন থেকে ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে রাখল—ফ্যান গালার কথা তার মনেই রইল না৷ হাত-দুটো কোনওরকমে আঁচলে মুছেই ঠাকুরঘরে দৌড়োল৷ দরজার বাইরে থেকে দেখল প্রভাত আসনে স্থির হয়ে বসে আছে, দু’চোখের কোল বেয়ে জলের বিন্দু নেমেছে৷ খুব পরিচিত দৃশ্য৷ ওই দৃশ্য কল্যাণীর মনে কেমন একটা নির্ভরতার ভাব আনে৷ তার মনে হয় যার স্বামী এত ভক্ত, যে বাড়িতে এত পুজো-আচ্চা, সে বাড়িতে কোনও অমঙ্গল আসতে পারে না৷ কল্যাণীর মন থেকে কিছুক্ষণের জন্যে পুতুলের চিন্তা চলে গেল৷
প্রভাত আসন ছেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণী তাকে খবরটা জানাল৷ বাড়ির কোথাও পুতুলকে পাওয়া যাচ্ছে না৷ ধ্যানের পর প্রভাতকে কেমন প্রশান্ত সুন্দর দেখাচ্ছিল! প্রভাতের মুখে কোনও বিকৃতি দেখা গেল না৷ শুধু জিগ্যেস করল, ক’টা বেজেছে৷ কল্যাণী বলল, ঘড়ি দেখিনি৷ প্রভাত অনুমানের উপর সময় ঠিক করে নিল৷ বলল, ঠিক আছে, আমি দেখছি, কোথায় আর যাবে, হয়তো আশেপাশে কোনও বাড়িতে গেছে৷
—কিন্তু এমন তো কোনওদিন করে না৷
—আহা ছেলেমানুষের খেয়াল৷ কী ভেবেছে, কোথায় কার বাড়িতে গিয়ে বসে আছে৷
—বলে যাবে তো?
—ঠিক আছে, তুমি রান্নার কাজে যাও, আমি দেখছি৷
কল্যাণী রান্নাঘরে গেল৷ প্রভাত পুজোর চেলি ছেড়ে বাড়ির বাইরে বেরোল মেয়েকে খুঁজতে৷
দূরে রেলের লাইন পাতা৷ সিগন্যাল পড়েছে৷ ডাউনের দিকে কোনও ট্রেন আসছে৷ প্রভাত বাড়ির বাইরে এসে একবার ভেবে নিল, এখন সে কী করবে! প্রথমে সে বিনোদবাবুর বাড়ি গিয়ে খোঁজ করল৷ সকালে প্রভাতকে দেখে সকলেই আশ্চর্য হলেন৷ বিনোদবাবুর মেয়ে ফুলা বলল—না, পুতুল তো আসেনি৷ আজ কেন, সে গত দু’দিন আসেনি৷ বিনোদবাবু প্রভাতকে বসতে বললেন৷
—না, এখন আর বসব না৷ বেরোতে হবে৷ তার আগে মেয়েটাকে খুঁজে দেখি!
—কোথায় আর যাবে? কাছাকাছি কোথাও আছে৷
প্রভাত একে একে পাড়া প্রতিবেশী সকলের বাড়ি দেখল! না, কোথাও পুতুল নেই এবং আসেওনি৷ সকাল থেকে তারা কেউ দেখেনি৷
প্রভাতের মুখে বেশ ভাবনার রেখা পড়ল৷ মোক্ষদা পিসি বললেন—সে কী বাবা, দিনকাল বড় খারাপ৷ শুনছি, একটা করে ফুল শুঁকতে দিচ্ছে, তারপর ছেলে আর মেয়েগুলো সুড়সুড় করে ছেলেধরার পিছু পিছু গ্রামের বাইরে চলে যাচ্ছে৷
প্রভাত এসব বিশ্বাস করে না৷ ‘পিসি কেমন আছ?’—বলে পাশ কাটিয়ে চলে এল৷
—কী হল একবার খবরটা দিয়ো প্রভাত? বড় চিন্তায় রইলুম৷
প্রভাত ‘আচ্ছা’ বলে বাড়িমুখো হল৷
কল্যাণী মুখে একরাশ চিন্তা মেখে দরজার সামনেই দাঁড়িয়েছিল, প্রভাতের খবরের আশায়৷ ভেবেছিল, পুতুলের হাত ধরেই হয়তো সে এসে হাজির হবে আর কল্যাণী পুতুলকে খুব বকবে৷ এতক্ষণের উৎকণ্ঠা বকুনিতে ভেঙে পড়বে৷ স্বামীকে দেখে মাথায় ঘোমটা তুলে দিল৷
—না, পুতুল কোথাও নেই, কোনও বাড়িতেই সে যায়নি৷ সকাল থেকে তাকে কেউই দেখেনি৷
—সে কী?
—এখন কী করা যাবে?
প্রভাতও জানে না, এরপর কী করার আছে৷ শুনেছে, এরপর পুলিশে খবর দিতে হয়৷ খোঁজার পরিধি তখন আরও বেড়ে যায়৷ গ্রাম থেকে গ্রামে, জেলা থেকে জেলা শহরে, কলকাতায়৷ সারা বাংলা কিংবা সারা ভারতবর্ষে থানায় থানায় খোঁজপাত চলে৷ এসব তার শোনা আছে৷ নিজের জীবনে এইরকম একটা সমস্যা নেমে আসবে তার ধারণার অতীত৷
—আজ আর অফিস যেয়ো না৷
—সে তো বটেই৷
এরপর চুপচাপ দুজনে মুখোমুখি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল৷ কোনও কথা মুখে জোগাল না৷ সব কথা যেন হঠাৎ ফুরিয়ে গেছে৷ প্রভাত হঠাৎ বলল—চলো তো আর একবার বাগানটা দেখি৷ কল্যাণী আর প্রভাত বাগানে এল৷ স্থলপদ্মের গাছে বড় বড় ফুল ফুটেছে! টগর গাছ সাদা হয়ে আছে ফুলে৷ ছোট ছোট গোটাকতক প্রজাপতি ছটফট করে উড়ে বেড়াচ্ছে৷ সব জায়গা তারা খুঁজল, আর একবার খুঁজল৷ যেন খুব ছোট একটা জিনিস হারিয়েছে৷ একবারের খোঁজায় হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে৷ হয়তো পুতুল দুষ্টুমি করে ‘চোর চোর’ খেলছে, গাছের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে৷ দু’জনে দু’দিক থেকে খুঁজল৷ না পুতুল নেই৷
প্রভাত এসে ঘাটের বাঁধান রকে একটু বসল৷ জলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতে লাগল—এরপর কী করবে? সত্যি থানায় যেতে হবে? না হঠাৎ পুতুল এসে মা, মা করে ডাকবে৷ জলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ প্রভাত একটা জিনিস লক্ষ্য করল, পশ্চিম পাড়ে যেখানে জবাগাছের একটা ডাল জলের উপর ঝুঁকে এসেছে তার একটু দূরে একরাশ ফুল জলের উপর ভাসছে৷ জবা গাছ থেকে একটা-দুটো ফুল জলে পড়া বিচিত্র নয়, কিন্তু টগর এল কোথা থেকে? টগর গাছ তো জল থেকে অনেক দূরে৷ জলের উপর সাদা আর লাল একরাশ ফুলের অঞ্জলি কে ছড়িয়ে দিল?
স্বামীর পাশে এসে কল্যাণীও বসল৷
প্রভাত শুধু বললে, দেখেছ৷ একটা জায়গাতেই কত লাল আর সাদা ফুল একসঙ্গে ভাসছে! কে যেন অঞ্জলি দিয়ে গেছে৷
কল্যাণী অন্যমনস্ক৷ জিগ্যেস করে বসল, কেন?
প্রভাত বললে, কেন? মনকে শক্ত করো কল্যাণী৷ এই কেন-র উত্তর বড় সাংঘাতিক৷ মাঝপুকুরে ওটা কী ভাসছে দেখেছ? একটা সাজি৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুকুরে জাল নামান হল৷ সামান্য অনুসন্ধানেই জালে জড়িয়ে উঠে এল পুতুলের দেহ৷ ফুল-ছাপ ফ্রক পরা এক সুন্দরী কিশোরী৷ যেন এইমাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে, সে ঘুম আর ভাঙবে না, কোনওদিন৷
প্রভাত শুধু এই বলতে পারল, মা, এই ক’টা বছরের জন্যে মায়ার বাঁধনে কেন বাঁধতে এসেছিলিস! কার পুজো করছিলিস, বিরাটের? সে যে বড় নিষ্ঠুর!
তারপর কত বছর গড়িয়ে গেল রেলগাড়ির মতো জন্ম-মৃত্যুর জোড়া লাইন ধরে৷ প্রভাতের ঠাকুরঘর এখন ওই দিঘির পাড়৷ রোজ সকালে সে নিজে ফুল তোলে, লাল আর সাদা৷ সাজি ভরে৷ প্রভাত আর কল্যাণীর বয়েস বেড়েছে৷ চুলে পাক ধরেছে, কপালে সময়ের রেখা পড়েছে৷ বয়েস বাড়েনি পুতুলের৷ সে এখনও সেই কিশোরী৷ প্রভাত যখন ফুল তোলে, গাছের আড়ালে আড়ালে সে ঘোরে৷ প্রভাত তার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, বাবা! এদিকে এসো, এদিকে৷ দেখো, এই ডালে কত ফুল! সাজি ভরতি ফুল আর ঠাকুরঘরে যায় না৷ প্রভাত প্রণামের ভঙ্গিতে দিঘির পাড়ে বসে সেই সমস্ত ফুল অঞ্জলি দেয় জলে৷ ভাসতে থাকে লাল আর সাদা ফুল৷ এই তো তোমার পূজা! আছ অনল, অনিলে, চির নভোনীলে৷ ভূধর সলিল গহনে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন