সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
পাহাড়ি অন্ধকার ঝপ করে নেমে এল৷ আমরা বুঝতে পারিনি৷ পশ্চিমে সূর্য নেমে যাওয়ার পরও আকাশে সোনার আলো ভাসছিল৷ আমরা চূড়ার ওপর সমতল শিলাখণ্ডে বসে বসে সূর্যাস্ত দেখছিলুম৷ পাখিরা ঘরে ফিরছে৷ ডানার শব্দ! আরও, আরও পাহাড়৷ পাথরের ঢেউ খেলতে খেলতে উত্তর দিকে চলে গেছে৷ সেদিকে আরও দুর্গম সব শিখর৷ আমরা যে-পাহাড়ে প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় উঠেছি, সেটা অতটা দুর্গম নয়৷ অনেক খাড়াই থাকলেও কসরত করে ওঠা গেছে৷
এগুলো সব পাথুরে পাহাড়৷ এতটুকু মাটি নেই কোথাও! আমরা যে পাথরটায় বসেছি তার ফাটলে ফাটলে এক ধরনের ঘাস গজিয়েছে, তুলোর মতো, সাদা ফুরফুরে৷ বাবা বললেন, এই ঘাস থেকে ভালো কাগজ তৈরি করা যেতে পারে৷ যেমন প্রাচীনকালের মানুষ প্যাপাইরাস থেকে কাগজ তৈরি করত!
এধারে-ওধারে অনেক টুকরো পাথর ছড়িয়ে আছে৷ কোনওটা হালকা হলুদ৷ কোনওটা সুন্দর সবুজ৷ কোনওটায় একইসঙ্গে অনেক রঙের খেলা৷ বাবা বললেন, দেখ, মানুষের অগোচরে প্রকৃতির খেলা দেখ৷ মনে হচ্ছে, ঝুলি ভরে সব পাথর নিয়ে যাই৷
আমার বাবা ভীষণ সাহসী৷ তিনি সমুদ্রের চেয়ে পাহাড় ভালোবাসেন৷ পাহাড়ের ডাকে কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন, বছরে একবার, দুবার৷ আমি তাঁর সঙ্গী৷ আমরা দুজন৷ আমার মা হঠাৎ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন৷ তা প্রায় চার, পাঁচ বছর হল৷ আমি তখন খুব ছোট৷ যখন বুঝতে শিখলুম, তখন দেখি সকলেরই মা আছে, আমার নেই৷ বাবা বললেন, ধুর, দুঃখু করিসনি৷ সকলের কি সব কিছু থাকে? আমি তো আছি৷ কত গাছ, ফুল, পাহাড়, নদী, সমুদ্র, আকাশ, তারা৷
বাবা আমার প্রিয় বন্ধু৷ একদিন নদীতে নিয়ে গিয়ে সাঁতার শেখালেন৷ এই পাহাড় চূড়ায় বসে নদীটাকে দেখতে পাচ্ছি, অনেক নীচে পড়ে আছে সাদা ফিতের মতো৷ এঁকেবেঁকে চলে গেছে অনেক দূরে৷ অনেক উঁচুতে উঠেছি বলেই অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি৷
দূর আকাশ থেকে অন্ধকার গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে৷ মাথার খুব কাছে আকাশের চাঁদোয়ায় পটপট করে তারা ফুটে উঠছে৷ দূরের দেহাতি গ্রামে পুট পুট করে লণ্ঠনের আলো জ্বলে উঠছে৷ কোনও মা তার ছেলেকে ডাকছে৷ সেই ডাক চরাচরে ছড়িয়ে যাচ্ছে৷ আমাদের চারপাশে অন্ধকার ঘিরে আসছে৷ শুনেছি, এই পাহাড়ি এলাকায় ছোট ছোট বাঘ বেরোয়, নেকড়ে বাঘ৷
বাবাকে ভয়ে ভয়ে বললুম, এইবার কী হবে? আমরা কেমন করে নামব?
বাবা বললেন, ভয় করছে? ভয় পাওয়া ভালো৷ ভয়কে জয় করতে পারলেই সাহস আসে৷ পৃথিবীটা ভিতুর জন্যে নয়, সাহসীর৷
বললুম, কীভাবে আমরা নামব? অনেক খাড়াই৷
বাবা বললেন, নামতে হবে বলেই নেমে যাব৷ দ্বিতীয় কোনও উপায় নেই বলেই নামার শক্তি আসবে৷ নিজেই নিজের হাত ধরব৷
বললুম, রাতটা তো এখানেই কাটানো যায়৷ একফালি চাঁদও উঠেছে৷
বাবা বললেন, প্রথমে আসবে বাঘ, তারপরে ভাল্লুক৷ তারপরে কী হবে নিজেই বুঝতে পারছ৷ নাও ওঠো! নামার চেষ্টা করি৷ একটা কথা মনে রেখো, কেউ কারওকে ধরার চেষ্টা করব না৷ পেছন ফিরে তাকাব না৷ যার প্রাণ তার প্রাণ৷ নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে৷
ধারে গিয়ে দাঁড়ালুম৷ পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে নীচের দিকে৷ কোথাও ভীষণ খাড়া৷ কোথাও আবার সহজ৷ দাঁড়ানো মাত্রই মাথাটা ঘুরে গেল৷
বাবা এরই মধ্যে দু’ধাপ নেমে গেছেন৷ অন্ধকার থেকে তাঁর গলা ভেসে এল—অত ভেব না৷ পা বাড়াও! বিপদে পা রাখো, তা না হলে বিপদই তোমার মাথায় পা রাখবে৷ নিজেকেই নিজে চালাও৷ বিপদকে শত্রু ভেব না, বন্ধু ভাব৷
কিছুটা বসে বসে, হড়কে হড়কে, কিছুটা চলে চলে এক সময় নেমে এলুম৷ পাহাড়ের তলায় বাবা দাঁড়িয়ে আছেন৷ অন্ধকারে তাঁর সাদা পোশাক সাদা হাঁসের মতো দেখাচ্ছে৷ দু’হাতে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, শাবাশ! তুমি পেরেছ৷ জেনে রাখো, জীবন হল চড়াই আর উতরাই৷ আর পথিক তুমি একা৷ তোমার কেউ নেই, তোমার শুধু তুমি আছ৷ অন্ধকারের আলো হল সাহস৷
অনেক দিন হয়ে গেল, বাবা-মায়ের কাছে চলে গেছেন৷ আমি এখন প্রায় বৃদ্ধ৷ সেদিন ওই পাহাড়টার কাছে গিয়েছিলুম৷ আজও সেই একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে আকাশে মাথা তুলে৷ সেই একই সময়—সূর্যাস্ত৷ আকাশ সোনালি লাল৷ চারপাশে নির্জনতা সাঁই সাঁই করছে৷
পাহাড়টাকে মনে হল—আমার পিতা৷ তাঁরই কণ্ঠস্বর সন্ধ্যার আকাশে—আমি আছি রে৷ তোর মধ্যে আছি৷ এই পাহাড়ের গায়ে শিশিরের মতো লেগে আছি৷ মানুষ মরে না৷ সব মানুষই স্মরণের স্মৃতি৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন