সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দাদু সকালবেলাই ঘুম থেকে উঠে ঘোষণা করলেন, ‘আজ আমি দেশের বাড়িতে যাব৷’ অর্থাৎ বলাগড়ে৷ আমি একবার মাত্র গিয়েছিলুম৷ অনেক ছেলেবেলায়৷ ভালো মনে নেই৷ এইটুকু মনে আছে, একটা ছোট্ট রেলগাড়িতে চেপেছিলুম, অনেকটা টয়টেনের মতো৷ ছোট-ছোট কামরা যেন দেশলাইয়ের বাক্স৷ ইঞ্জিনের সে কী শব্দ ভট, ভট৷ এর বাড়ির উঠোন দিয়ে, তার বাড়ির পুকুরপাড় দিয়ে ট্রেন চলত পোষা কুমিরের মতো৷ সেই ট্রেনটা ছিল গ্রামের মানুষের বড় আদরের৷ ঘরের ছেলের মতো৷ ট্রেনটা তেমন জোর কদমে ছুটতেও পারত না৷ সেবার এক বুড়িকে দেখেছিলুম ট্রেনের গায়ে ঘুঁটে দিতে-দিতে এগিয়ে চলেছে৷ ট্রেনটার এক-এক কম্পার্টমেন্টের গায়ে এক-এক গ্রামের ঘুঁটে৷ কে একজন নেমে গিয়ে গ্রামের এক বাড়ি থেকে এক গেলাস জল খেয়ে একটু ছুটে এসে ঠিক-ঠিক নিজের কামরায় উঠে পড়লেন৷ সে ছিল এক মজার ট্রেন৷ সে ট্রেন এখন আর নেই৷
দাদু বললেন, ‘কোর্ট এখন বন্ধ৷ বহুদিন যাওয়া হয়নি৷ একবার ঘুরে আসি৷ আম-কাঁঠালের সময়, দেখি কী পাওয়া যায়৷ অত বড় বাগান৷ পাঁচ ভূতে লুটেপুটে শেষ করে দিলে৷’
মায়ের অবশ্য মত ছিল না৷ এই গরমে যাওয়া-আসার কষ্ট৷ তা ছাড়া আম-কাঁঠাল পেলে কে বয়ে আনবে৷ কষ্টই হবে৷ কাজের কাজ কিছুই হবে না৷ দাদুর মন টেনেছে৷ মন যেখানে--শরীর সেখানে এই নীতিতে দাদুর ভীষণ বিশ্বাস৷ আর একটা কথা তিনি প্রায়ই বলেন, আত্মাকে কখনও কষ্ট দেবে না৷
আমাকে ছাড়া দাদুর কোনও কাজ হয় না৷ প্রায়ই বলেন, দুটো জায়গায় তুই আমার সঙ্গে যেতে পারবি না৷ এক এখানে, সেটা হল কোর্ট, দুই ওখানে, সেটা হল স্বর্গ৷ আমিও তো কম যাই না৷ আমি বলি, দেখা যাবে, আমিও তো একদিন স্বর্গে যাব, তখন আবার দেখা হয়ে যাবে৷ সেখানে আমার দাদাও আছে৷ দাদাকে আমার মনেই পড়ে না৷ দাদার কথা উঠলে মা এখনও কেঁদে ফেলে৷ তার ফেলে-যাওয়া যত-সব জিনিস, জামা, জুতো, পুতুল, সোনার আংটি, সব মা একটা লাল বাক্সে জমা করে রেখেছে৷ মাঝে-মাঝে দুপুরবেলা নির্জনে বের করে দেখে আর কাঁদে৷ সেই দাদার সঙ্গে মায়েরও নিশ্চয়ও দেখা হবে৷ একটা জিনিস বুঝেছি, এখানে মৃত্যু আছে৷ ওখানে নেই৷
আমরা যখন বলাগড়ে পৌঁছলুম তখন একটা বেজে গেছে৷ বুক পকেট থেকে ঘড়ি বের করে দাদু দেখলেন৷ ট্রেনটা উঠে গিয়ে আমার খুব কষ্ট হয়েছে৷ তিনবার বাস পালটাতে হল৷ তেমনি ভিড়৷ বাসের ছাদে বসে লোক চলেছে৷ দাদুর ফরসা টকটকে মুখ গোলাপি হয়ে উঠেছে৷ পাঞ্জাবির পিঠ ঘামে ভিজে৷ তবু দাদুর কী আনন্দ৷ একটা বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে-খেতে বললেন, ‘আহা, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী৷ এই আমার সেই ছেলেবেলার বটতলা৷ এখনও তুমি ঠিক আছ৷ কতদিন হয়ে গেল৷ কত লোক চলে গেল, কত লোক এল, তুমি এখনও ঠিক আছ৷’ বটগাছের সঙ্গে কিছুক্ষণ মনের কথা বলে, দাদু আমার হাত ধরে গ্রামের পথ ধরলেন৷
পথে দাদুর একটিও চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হল না৷ ‘কী হল বল তো? পুরোনো মানুষেরা সব গেল কোথায়? সব অচেনা মুখ৷ হারাণ, নিবারণ, মানিক, মুস্তাফি৷ এখনও তাদের মরবার বয়েস হয়নি৷ সব আমার সমবয়সি৷ আমি বেঁচে আছি যখন, তারা মরবে কেন?’
‘দাদু আমার মনে হয়, এখন দুপুর তো তাই তাঁরা খেয়েদেয়ে ঘুমোচ্ছেন৷’
‘ধুর ব্যাটা৷ তিন-তিনটে আমবাগান পার হয়ে এলুম৷ গাছে-গাছে কীরকম আম হয়েছে দেখছিস৷ এই আমপাকা দুপুরে কেউ ঘরে শুয়ে ঘুমোয় না৷ বাগানে মাচায় বসে হুঁকো হাতে আম পাহারা দেয়৷ দেখলি মাচায় অন্য লোক বসে আছে৷ ওদের ছেলেটেলে হবে৷ তোর আমবাগান নেই, তুই দুপুরে আমবাগানে বসে থাকার নেশা বুঝবি না৷’
‘তাই যদি হয়, তা হলে ওদের ডেকে কেন জিগ্যেস করলেন না?’
‘সাহস হল না৷ যদি সত্যিই বলে মারা গেছে, মনে বড় লাগবে রে! মনটা এখন স্মৃতিতে, ছবিতে, বেশ ভরে আছে৷ খালি করতে চাই না৷ চল, চল, পা চালিয়ে চল৷’
দাদু জোরে-জোরে হাঁটতে লাগলেন, পিছনে যেন কেউ তাড়া করেছে৷ হনহন করে হাঁটতে-হাঁটতে দাদু একটা ভাঙা আটচালার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘যাঃ৷’
‘কী হল দাদু?’
‘পাঁচুসুন্দরী নেই৷’
‘সে, কে দাদু৷’
‘আরে, এইখানে তার মুড়ি-তেলেভাজার দোকান ছিল৷ চোখের সামনে ভাসছে৷ এইখানটায় ছিল তার উনুন৷ ইয়া বড়বড় বেগুনি, আলুর চপ, ফুলুরি আর লাল-লাল, ফুলো-ফুলো, মোটা মুড়ি৷ সে তোরা জীবনে খাসনি, খেতেও পাবি না৷’
একপাশে উঁচুমতো একটা ঢিবি৷ মনে হয় ওইটাই ছিল সেই পাঁচুসুন্দরীর উনুন৷ দাদু ডাকলেন ‘পাঁচুসুন্দরী৷’ সঙ্গে-সঙ্গে ওপাশ থেকে একটা ছাগল ভ্যা-ভ্যা করে ডেকে উঠল৷ আমি হেসে ফেলেছি৷ দাদু বললেন, ‘বোকার মতো হেসো না৷ এখন এখানে পাঁচুসুন্দরীর আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সে থান কাপড় পরে পিঁড়েতে উবু হয়ে বসে কড়ার কালো বালি থেকে খুঁচি দিয়ে সাদা-সাদা মুড়ি ছেঁকে ছেঁকে তুলছে৷’ ছাগলটা আবার ব্যা করে উঠল৷ কার ছাগল কে জানে? হয়তো পাঁচুসুন্দরীরই হবে৷ দাদু দু-হাত কপালে তুলে নমস্কার করলেন৷
আবার আমরা হাঁটতে শুরু করলুম, গ্রামটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে আছে৷ গ্রামের নেশা লেগেছে৷ আমরা বাঁশঝাড়, এঁদো পুকুর পেরিয়ে দাদুর ভিটেয় এসে উঠলুম৷ সামনেই চণ্ডীমণ্ডপ৷ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা৷ একগাদা পায়রা বকবকম করছে৷ দাদু চণ্ডীমণ্ডপের ধুলো নিয়ে কপালে ঠেকালেন৷ আমিও তাই করলুম৷ দাদু বললেন, ‘একসময় কত পুজো হয়েছে এইখানে৷ আজ সব অন্ধকার৷ এক-একটা মানুষ চলে গেলে আর কিছুই থাকে না৷ কত বোলবোলা ছিল এই বাড়ির৷ দোল, দুর্গোৎসব৷ শহর! শহরই আমাদের জীবনের শনি৷ মুখুজ্যে-বংশের সন্তান কলকাতায় পেটের দায়ে মক্কেল চরাচ্ছে৷ এদিকে পৈতৃক ভিটেয় ঘুঘু চরছে৷ গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করে৷’ দাদু নিজের ওপরেই নিজে খুব রেগে উঠলেন৷ সত্যিই হয়তো নিজের হাতে নিজের গালেই এক চড় কষাতেন৷ তা আর হল না৷ কোথা থেকে একটা পায়রা পাঞ্জাবির পিঠের দিকটা নষ্ট করে দিলে৷ দাদু ওপর দিকে মুখ তুলে ক্ষোভের গলায় বললেন, ‘তোরা অতীত বুঝিস না রে৷ কেউ অতীতে গেলেও সহ্য করতে পারিস না৷ জামা নষ্ট করে কান ধরে তাকে বর্তমানে টেনে আনবি৷ আর কদিন, চণ্ডীমণ্ডপ ভেঙে পড়ল বলে৷ চালিয়ে যা, চালিয়ে যা৷’
চণ্ডীমণ্ডপের পাশ দিয়ে ইট-বাঁধানো ক্ষয়া-ক্ষয়া একটা পথ ভেতরবাড়িতে চলে গেছে৷ দোতলা বাড়ি৷ ওপর তলার অবস্থা শোচনীয়৷ খড়খড়ি বসানো জানলা ভেঙে একপাশে ঝুলছে৷ কার্নিশে বটগাছ, নিমগাছ৷ শিকড় নেমেছে নিচের দিকে৷ এক তলাটায় মানুষ থাকে বলে মনে হল৷ তারে কাপড় শুকোচ্ছে৷ ঘাসের ওপর চারটে খরগোশ ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ দাদু হাঁকলেন, ‘সরোজ, সরোজ৷’
খরগোশ চারটে ডাক শুনে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে ভেতরে চলে গেল৷ সঙ্গে-সঙ্গে বেরিয়ে এলেন ঘোমটা টানা এক মহিলা৷
‘সরোজ নেই?’
মহিলা দাদুকে ঘোমটার আড়াল থেকে এক নজর দেখে নিয়ে মৃদু গলায় বললেন, ‘ভেতরে আসুন৷ তিনি শুয়ে আছেন৷’
‘হ্যাঁ, এই তো শুয়ে থাকার সময়৷ তিনি না শুলে বাড়িটা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে কী করে? দাদু গজগজ করতে-করতে দাওয়ায় উঠলেন৷
‘অন্যদিন শুয়ে থাকে না৷ আজ তিনদিন হল জ্বর হয়েছে৷’
‘জ্বর? জ্বর হল কেন? খুব কাঁচা আম খেয়েছিল বুঝি?’
‘আজ্ঞে না, ম্যালেরিয়া৷’
‘ম্যালেরিয়া? সে তো পঞ্চাশ বছর দেশছাড়া৷’
ভেতর থেকে কাঁপা-কাঁপা গলায় একজন পুরুষ বললেন, ‘আবার ফিরে এসেছে৷’
ঘরে ঢোকার চৌকাঠ এত উঁচু যে, বেড়া টপকে ঢোকার মতো করে ঢুকতে হল৷ গোড়ালির ঢিপ-ঢিপ শব্দ হল৷ নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠলুম৷ চারপাশে গাছগাছালি থাকায় ঘরে আলো তেমন আসে না৷ অন্ধকার-অন্ধকার৷ দেওয়ালের পলস্তারা খসে গিয়ে বিভিন্ন দেশের ম্যাপ তৈরি হয়েছে৷ জানলার দিকে বিশাল উঁচু একটা বাঘথাবা খাট৷ সেই খাটে কাঁথা কম্বল আর লেপের স্তূপ৷ মাথার দিকে দাড়িগোঁফলা একটা মুখ বেরিয়ে আছে৷ মাঝে-মাঝে সারা খাট কেঁপে উঠছে, সঙ্গে হুঁ-হুঁ শব্দ৷
দাদু সামনে ঝুঁকে পড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ব্যাপারটা কিছুক্ষণ লক্ষ করে বললেন, ‘ওরকম করছ কেন?’
‘ম্যালেরিয়া করাচ্ছে মুকুজ্যেমশাই, আমি কি আর ইচ্ছে করে করছি? সবে আসছে৷’
‘কখন যাবে?’
‘আজ্ঞে, কাঁটায়-কাঁটায় বারোটায় আসে, চারটের সময় ছাড়ে৷’
‘বাবা! এ যে দেখছি সূর্যগ্রহণ৷ যাক, শুনে বড় আনন্দ হল৷’
‘কেউ অসুস্থ হলে আনন্দ করতে নেই মুকুজ্যেমশাই৷ কবি বলেছেন, দু-ফোঁটা চোখের জল রেখো মোর তরে৷’
‘আনন্দ হবে না পলটু? তুমি বলছ কী? এত বড় একটা সংবাদ৷ অতীত ফিরে আসছে৷ ম্যালেরিয়া, শেয়ালের ডাক, সন্ধের অন্ধকার, ঝিঁঝির ঝিঁঝিট রাগিণী, সাপের কামড়, গোরুর-গাড়ি, ঠ্যাঙাড়ে, বর্গির হাঙ্গামা, জলদস্যু৷ আহা, সেই মধুর অতীত, সেই রোমান্টিক পাস্ট আবার ফিরে আসছে৷ এক পয়সায় ইয়া বড় তালশাঁস সন্দেশ, খাঁটি গাওয়া ঘি, কাটারিভোগ চাল, বালি-বালি নৈনিতাল আলু৷ সেই সোনার অতীত আবার ফিরে আসছে৷’
‘ও-সব আর ফিরবে না মুকুজ্যেমশাই৷ শুধু ম্যালেরিয়াটাই ফিরে আসবে৷’
দাদু ভাবে গদগদ হয়ে খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসলেন৷ আমি অত উঁচুতে উঠতে পারব না৷ একটা মোড়া ছিল, টেনে নিয়ে বসে পড়লুম৷ যা হাঁটা হেঁটেছি, আর দাঁড়াতে পারছি না৷
দাদু বললেন, ‘আমি অত সহজে তোমার মতো হতাশ হই না৷ আশাবাদী মানুষ আমি৷ একটা বড় জিনিস যখন এসেছে তখন একে-একে আবার সবই ফিরে আসবে৷ ঘাড়ের পিছন দিকে একটা মশা বসেছে মনে হচ্ছে৷ খোকা, দ্যাখ তো?’
আমি ঠিক শিকারি বেড়ালের মতো চুপি-চুপি, কোনও শব্দ না করে উঁচু হয়ে দেখলুম৷ হ্যাঁ, ইয়া বড় কালো মতো একটা মশা প্রাণপণে চেষ্টা করছে দাদুর ধবধবে ঘাড়ে হুল ফোটাতে৷ মুগুরভাঁজা ঘাড়৷ মশাটাকে বেশ চেষ্টা করতে হচ্ছে৷ মাঝে-মাঝে পিছনের পা-দুটো উঠে পড়ছে৷ ফিসফিস করে বললুম, ‘মারব?’
দাদুও ফিসফিস করে বললেন, ‘ফটাস করে মার, দেখিস উড়ে পালায় না যেন৷’
চড়টা বেশ কায়দা করেই তুলেছিলুম, লাগামাত্তর মরত, হঠাৎ আমার পায়ে এমন মশা কামড়াল, একটু টলে গিয়ে বেসামাল হয়ে গেলুম, আর অমনি মশাটা জানলার দিকে চলে গেল৷ দাদু বললেন, ‘অপদার্থ৷’
‘কী করব? আমার পায়ে এমন কামড় দিলে৷’
‘আমার ঘাড়ের মশা তোর পায়ে গেল কী করে?’
লেপের তলা থেকে মুখ বলে উঠল, ‘মশা কি একটা মুকুজ্যেমশাই৷ লক্ষ-লক্ষ! ওরে বাবা রে, হুঁ-হুঁ রে, লক্ষ-লক্ষ!’ সারা শরীর কেঁপে উঠল৷
দাদু সেই কাঁপুনির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আহা, তোমার কী ভাগ্য পলটু, এই গরমেও তুমি কেমন শীতে কাঁপছ হুঁ-হুঁ করে৷ যেন দার্জিলিঙে চলে গেছ৷’
‘এখানে দুদিন থাকুন, আপনারও সেই ভাগ্য হবে৷’
‘আমি কি সে বরাত করেছি পলটু! মক্কেল চরিয়ে খেতে হয়৷ আমি বিছানায় পড়লে মক্কেলরা মরবে৷ যা একটা কেস পেয়েছি পলটু৷ পুরঞ্জয় ভার্সাস ধনঞ্জয়৷ মামা-ভাগনেতে লেগে গেছে৷ আমি লড়ছি ভাগনের দিকে, সিদ্ধেশ্বর লড়ছে মামার দিকে৷’
‘কেসটা কী?’ পলটুমামা বিছানায় আধশোয়া হয়ে উঠে বসলেন৷
দাদু যত কেসের কথা বলেন পলটুমামা ততই বিছানায় সোজা হয়ে উঠে বসেন৷ শেষে লেপকম্বল ফেলে একেবারে খাড়া৷ দাদু বললেন, ‘কী হল? তোমার ম্যালেরিয়া? সেরে গেল না কি?’
‘আজ্ঞে, তাই তো মনে হচ্ছে৷ আর তো এমন শীত করছে না!’
‘তা হলে কী বুঝলে? ম্যালেরিয়ার বেস্ট ওষুধ হচ্ছে মক্কেল, মামলা৷ হোমিওপ্যাথি৷ বুঝলে পলটু৷ একে বলে হোমিওপ্যাথি৷ ম্যালেরিয়াতেও ম, মামলাতেও ম৷ দুটোই ধরলে ছাড়ে না৷ সিমিলি সিমিলিবাস৷ বিষে-বিষে বিষক্ষয়৷ এত করে বললুম মোক্তারিটা পাশ করে নাও৷ শুনলে না, প্রাইমারি টিচার হতে গেলে৷ এইবার লিভার-পিলে কোলে নিয়ে দাওয়ায় বসে দিন কাটাও৷’
‘আর মুকুজ্যেমশাই কপালে যা লেখা আছে তা তো কেউ আর খণ্ডাতে পারবে না৷’
দাদু নিজের গালে ঠাস করে এক চড় মেরে বললেন, ‘অসম্ভব৷ বসা যায় না হে তোমার ঘরে৷ কামড়ে ছিঁড়ে দিলে৷ যাই বাগানটা একবার ঘুরে আসি৷ খুব আম হয়েছে এবার৷’
পলটুমামা আবার শুয়ে পড়লেন৷ শুয়ে-শুয়ে বললেন, ‘থাকবে না একটাও৷ সব পেড়ে নিয়ে যাবে৷’
‘মামার বাড়ি আর কি! পেড়ে নিয়ে যাবে৷ পাড়তে দেবে কেন! মেরে ঠান্ডা করে দেবে৷’
‘এখানে মাসখানেক থেকে চেষ্টা করে দেখুন না৷ হাওয়া ঘুরে গেছে৷’
কথাটা দাদুর তেমন পছন্দ হল না৷ বিশাল বাগানে ঘুরতে-ঘুরতে বললেন, ‘কাউকেই আর বিশ্বাস করা চলে না৷ পাছে আম-কাঁঠালে ভাগ বসাই তাই পলটু গান গেয়ে রাখলে৷ তুই ইট ছুঁড়তে পারিস?’
‘খুব পারি দাদু৷’
‘তাহলে লাগা ওই জোড়া হিমসাগরে৷’
দুজনে মিলে ইট ছোঁড়াছুঁড়ি করে অনেক কষ্টে আম দুটো পাড়া গেল৷ আমের বোঁটা কী ভীষণ শক্ত! দাদুর পকেটে একটা ছুরি ছিল৷ ছায়ায় বসে গাছপাকা আম খেয়ে আমরা মোহিত হয়ে গেলুম৷ দাদু বললেন, ‘আহা, আমরা যদি হনুমান হতুম রে তাহলে কী সুন্দর ডালে বসে পেট ভরে আম খেতে পারতুম!’
‘পলটুমামা আম পাড়াবেন না দাদু?’
‘পাড়াবে ঠিকই, তবে আমাদের জন্যে নয়৷ ওকে আমি হাড়ে-হাড়ে চিনি৷ দেখলি না কেমন ম্যালেরিয়ার ছুতো করে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে৷ তুই একটা কাজ করতে পারবি?’
‘কী কাজ দাদু?’
‘স্পাইং৷ ওই বাড়ির কোনও একটা ঘরে আম কাঁঠাল আছে৷ নিশ্চয়ই আছে৷ তুই তো ছোট, তুই করবি কী, এ-ঘর ও-ঘর করতে-করতে সেই ঘরটা চট করে দেখে নিবি৷ তারপর আমি পলটুকে চেপে ধরব৷’
‘কিন্তু আমাকে যদি ধরে ফেলে?’
‘ফেললে ফেলবে৷ তুই তো শিশু৷ শিশুতে আর ছাগলে কোনও তফাত নেই৷’
‘ছাগল বললে দাদু!’
‘আহা, ওটা হল উপমা রে হনুমান৷’
প্ল্যানমতো আমরা বাড়ি ফিরে এলুম৷ পলটুমামার তখন জ্বর বেড়েছে৷ সত্যিই বেড়েছে৷ পলটুমামার বিধবা বোন লেপকম্বল সমেত তাঁকে বিছানায় চেপে ধরে রেখেছেন৷ পলটুমামার আর কেউ নেই৷ দাদু বাইরের রকে একটা বেতের চেয়ারে বসলেন৷ সূর্য পশ্চিমে সরে গিয়ে বারান্দায় ছায়া পড়েছে৷ আমার নিজেরই কেমন বিশ্রী লাগছে৷ তখন কেউ এক গেলাস জল পর্যন্ত খেতে বলেনি৷ বলবে বলেও মনে হচ্ছে না৷ মুখ দেখে মনে হচ্ছে দাদুর খুব খিদে পেয়েছে৷
গোয়েন্দাগিরিতে বেরিয়ে পড়লুম৷ এই হল সবচেয়ে ভালো সুযোগ! পাশাপাশি সারি-সারি ঘর৷ প্রথম ঘরে একটা চৌকি৷ ময়লা চাদর ঢাকা বিছানা৷ ভাঙা টেবিল, হাতভাঙা চেয়ার৷ চৌকির তলায় একগাদা মালপত্তর৷ নাকটা ফোঁস-ফোঁস করে গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করলুম৷ পাকা আমের গন্ধ চাপা থাকে না, তেমন কোনও সন্দেহজনক গন্ধ নাকে এল না৷ তবু একবার চৌকির তলায় উঁকি মারলুম৷ ভাঙা বাকস, থলেভর্তি তুলো, কাঠকুটো এক চুবড়িটিক, ছোট্ট একটা বেতের ঝুড়িতে হাত-পা ভাঙা কয়েকটা পুতুল, কাঠের গুঁড়ো ভরতি একটা লাল ন্যাকড়ার হাতি৷ পুতুলগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছি এমন সময় পিছনে পায়ের শব্দে চমকে উঠলুম৷ ধরা পড়ে গেছি৷ সামনে আয়না থাকলে চোরের মুখের ছায়া পড়ত৷ ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে৷ মাসিমা পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, ‘কী দেখছ তুমি?’
দুবার ঢোঁক গিলে বললুম, ‘কার পুতুল মাসিমা?’
‘আমার ছেলের৷ সে তো চলে গেছে৷ আমি মাঝরাতে এইগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করি৷ সে এখন কোথায় কার ঘরে কার কোল আলো করে বসে আছে কে জানে! ওই দ্যাখো তার ছবি৷’
উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে টাঙানো একটা শিশুর ছবি দেখতে পেলুম৷ এক মাথা কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল৷ কালো মার্বেলের মতো ঝকঝকে চোখ৷ ফোকলা মুখে খলখলে হাসি৷ মাসিমা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, ‘আমরা বড় গরিব৷ আমাদের দিন চলে না৷ ও চলে গিয়ে ভালোই করেছে৷ রাজপুত্তুর ঘুঁটে কুড়ুনির ঘরে থাকবে কেন বাবা৷’
আবার চোখ মুছলেন৷ আমার চোখেও জল এসে গেছে৷ আমার মাকেও আমার দাদার জন্যে কাঁদতে দেখেছি এইভাবে৷
মাসিমা বললেন, ‘তুমি বাড়িটা দেখবে খোকা? চলো তোমাকে দেখাই৷’
আমরা আর একটা ঘরে ঢুকলুম৷ সে-ঘরে একটা সেলাইকল৷ কলে একটা কাপড় ঝুলছে৷ মনে হয় কারুর ফ্রক তৈরি হচ্ছে৷
‘এই ঘরে বসে আমি দিনরাত সেলাই করি৷ যা দু-চার পয়সা রোজগার হয় তাইতেই দিনকতক সংসার চলে৷ শীতে সোয়েটার বোনার কাজ পাই৷ পুজোয় জামার অর্ডার৷ সেলাই করে করে ঘাড় বেঁকে গেল, চোখে চালশে ধরল৷ ভাইটা মাস্টারি করে ক’টাকাই বা পায়৷ পূর্বপুরুষের দেনা শোধ করতেই সব চলে যায়৷’
‘মাসিমা আপনাদের বাগানে এত ফল, সেই ফল বেচে...’
হেসে উঠলেন মাসিমা, ‘তিন পুরুষের বুড়ো গাছ৷ ফলের চেয়ে পাতাই বেশি বাবা৷ তার ওপর চুরি৷ দেখতেই বাগান৷ আমরা জানি, তোমরা ভাবো সব মেরে দিচ্ছি৷ মারব কী বাবা, সব মরে এসেছে৷ একই গাছ বছর-বছর আর কত ফল দেবে৷ এক চুবড়ি, সুপুরি, গোটাকতক আম, বরাতে থাকলে এক কাঁদি কলা৷ এই হল তোমার বাগানের ফল৷ তোমার দাদু হয়তো বিশ্বাস করবেন না৷ মাঝে-মধ্যে চিঠি লিখে হিসেব চান৷ সেবার লিখলেন, রক্ষকই ভক্ষক৷ বড় মনে লেগেছে বাবা৷’
মাসিমা আবার চোখ মুছলেন৷ মুখটা কেমন যেন ভারী-ভারী হয়ে উঠেছে৷ এক সময় মনে হয় খুব ফরসা রং ছিল৷ এখন যেন কেমন পোড়া-পোড়া হয়ে গেছে৷ মাসিমা হঠাৎ হেসে ফেললেন, ‘তোমাকে কত দুঃখের কথা বলে ফেললুম, তাই না? দুঃখী মানুষের এই বড় দোষ৷ যাকেই সামনে পাবে তার কাছেই কাঁদুনি গাইবে৷ যাও তুমি, দাদুর কাছে বোসো৷ আমি চায়ের জল বসাই৷ মুকুজ্যেমশাই অনেকক্ষণ এসেছেন৷ ভাবছেন এরা কীরকম ছোটলোক৷’
দাদু বেতের চেয়ারে হাতলে তবলা বাজাচ্ছিলেন৷ আমাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী বুঝলে?’
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘সঙ্গে কত টাকা এনেছেন?’
অবাক হলেন, ‘কেন বলো তো?’
‘সে আমি বলতে পারব না দাদু৷ এঁদের ভীষণ খারাপ দিন পড়েছে৷ কোথাও কিছু নেই৷ এমনকী দু-বেলা খাওয়ার মতোও কিছু নেই৷ হাঁড়ি চড়ে না৷ সেলাই করে-করে মাসিমার ঘাড় বেঁকে গেছে৷ এত অভাব, না দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন না৷’
‘রাসকেল পলটু৷’ দাদু চিৎকার করে উঠলেন৷
পলটুমামা বিছানা থেকে উত্তর দিলেন, ‘আজ্ঞে, মুকুজ্যেমশাই৷’
দাদু ধমকে উঠলেন, ‘তোমার লজ্জা করে না! জোয়ান মানুষ ম্যালেরিয়ার ছুতো করে বিছানায় পড়ে আছে রাসকেল৷ বেরিয়ে এসো! মাত্র দুটো পেট চালাবার ক্ষমতা নেই, তুমি গোঁফদাড়ি রেখে ম্যালেরিয়া-বাবাজি সেজেছ! এটা হিমালয় নয়, বলাগড়৷’
মাসিমা সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ হাতে একথালা আম৷ দাদু বললেন, ‘গেট আউট৷’
‘গাছের আম৷ গোটাকতক কুড়িয়ে রেখেছিলুম৷ খেয়ে দেখুন মুকুজ্যেমশাই৷’
‘গেট আউট৷’
মাসিমা অবাক হয়ে গেছেন, ‘হঠাৎ কী হল মুকুজ্যেমশাই?’
‘তোমাদের অহঙ্কার৷ দারিদ্রের অহঙ্কার৷ তখনও দেখেছি, আজও দেখলুম৷ তোমার ছেলের অসুখ, একবার জানালে না পর্যন্ত, বিনা চিকিৎসায় মারা গেল৷ খুব...খুব অহঙ্কার বাড়ল৷ গেট আউট৷ তোমাদের মুখর্দশন করাও পাপ৷’ বেতের চেয়ার ছেড়ে দাদু উঠে পড়লেন৷ সাংঘাতিক রেগে গেছেন, ‘তোমার লজ্জা করে না, আইডল-ম্যালেরিয়ালিস্ট৷ এক পয়সা রোজগার করতে পারো না, তোমরা আমাকে আম দেখাতে এসেছ৷’
দাদু বাঘের মতো পায়চারি করছেন৷ মাসিমা থালা হাতে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ চোখ দুটো আবার ছলছল হয়ে উঠেছে৷ দাদু বললেন, ‘ও-সব চালাকি চলবে না উমা৷ চালাকির দ্বারা কোনও মহৎ কর্ম হয় না৷ কর্ম করতে হবে৷ খেটে খেতে হবে৷ ম্যালেরিয়া গায়ে দিয়ে বোনের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া চলবে না৷ এই হল আমার রায়৷’ দরজার দিকে মুখ এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই হল আমার রায়, বুঝলে ম্যালেরিয়াবাবু?’ মাসিমার দিকে ফিরে বললেন, ‘পাওয়ার কত?’
মাসিমা বুঝতে পারেননি৷
‘চোখের পাওয়ার কত?’
‘দেখাইনি৷’
‘ও, অন্ধ হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে৷ ভেবেছ অন্ধ হলে অবস্থা ফিরে যাবে শ্যামাসংগীত গেয়ে৷ তাই না?’
‘আমি তো গান জানি না৷’
‘অন্ধ হলেই গলা দিয়ে সুরে বেসুরে গান বেরোবে৷ পতিত পাবন মুকুজ্যের মেয়ে হাটতলায় বসে প্যাঁ-পোঁ করে সিঙ্গল রিডের হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইবে, দোষ কারো নয় গো মা, আমি স্বখ্যাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা৷ পড়বে, পড়বে, দু-চার পয়সা ভিক্ষে পড়বে৷’
দাদু জলস্পর্শ করলেন না৷ একটা একশো টাকার নোট পলটুমামার বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি তিনদিনের মধ্যে ম্যালেরিয়া ছাড়িয়ে আমার কাছে আসবে, তারপর তোমার একদিন কি আমার একদিন৷ হাত-পা-অলা মানুষ খেতে পায় না, আরে ছি-ছি, লজ্জার কথা৷’
আমরা ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত৷ মাসিমা কোথা থেকে ইয়া বড় একটা কাঁঠাল নিয়ে এলেন৷ দাদু আম-কাঁঠালের ভীষণ ভক্ত৷ পাঁচ পোয়া দুধে আধ সের কাঁঠালের রস দিয়ে ক্ষীর করে প্রায়ই খেয়ে থাকেন৷ বলেন, সাগর মন্থন করে যে অমৃত উঠেছিল তার ফর্মূলাও ছিল এইরকমই৷ খেলে যৌবন ফিরে আসে৷ কাঁঠালের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে খুব বিরক্তির গলায় বললেন, ‘এটা আবার কী?’
‘আজ্ঞে, কাঁঠাল৷’
‘কাঁঠাল কী হবে?’
‘নিয়ে যাবেন৷’
পলটুমামা ভেতর থেকে চিঁ-চিঁ গলায় বললেন, ‘উনি কি নিয়ে যেতে পারবেন?’
ব্যস, আর যায় কোথায়৷ দাদুর রোখ চেপে গেল৷ চ্যালেঞ্জ৷
‘নিয়ে যেতে পারব না! বলো কী পলটু? বুড়ো হয়ে গেছি নাকি? আমি তোমাকে কাঁধে করে কলকাতায় নিয়ে যেতে পারি৷ দেখবে, পারি কি না?’
দাদু কাঁঠালটা কাঁধে ফেলে হনহন করে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন৷ আমি পিছন-পিছন চলেছি প্রায় ছুটে-ছুটে৷ মাসিমা হেঁকে বললেন, ‘আবার আসবেন৷’
সামনে পাক্কা তিন মাইল পথ, তারপর বাস৷ দাদু গলগল করে ঘামছেন৷ অতবড় একটা কাঁঠাল কাঁধে, এই রোদে হাঁটা যায় নাকি! বেলা পড়ে এলেও বেজায় গরম৷ মেটে পথে ধুলো উড়ছে৷
‘দাদু, আমাকে দিন৷ কিছুক্ষণ আমি বই৷’
‘পাগল হয়েছিস! এটার ওজন জানিস? কাঁঠালের সব ভালো রে, কেবল এর যদি গায়ে গিরগিটির মতো কাঁটা না থাকত! দোষেগুণে মানুষের মতো, দোষেগুণে ফল৷ কী আর করা যাবে বল৷ গোলাপের কাঁটা, আর মৌমাছির হুল৷’
একটা গাছের ছায়ায় এসে দাদু দাঁড়ালেন৷ মুখ-চোখ লাল টকটকে৷ সামনে ধু-ধু মাঠ৷ দূরে-দূরে ছাড়া-ছাড়া গ্রাম৷ কাঁঠালটা পায়ের কাছে নামিয়ে দাদু পকেট থেকে ঝাড়নের মতো একটা রুমাল বের করে মুখ মুছলেন৷ হাতের তালুতে বিঁধ-বিঁধ কাঁঠাল-কাঁটার ছাপ পড়েছে৷
‘এটাকে এইখানেই রেখে যান দাদু৷ আপনার কষ্ট হচ্ছে৷ মা ভীষণ রাগ করবে৷’
দাদু হা-হা করে অট্টহেসে বললেন, ‘কাওয়ার্ড, কাওয়ার্ড৷ মহাত্মাজি বলেছিলেন, ডু অর ডাই৷ করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে৷ জানিস এর মধ্যে কম সে-কম আড়াইশো কোয়া আছে৷ তার মানে আড়াইশো বিচি৷ মেয়ে আমার কত খুশি হবে জানিস? ডালে দেবে, পুড়িয়ে খাবে৷ নে চল৷’
জয় মা বলে দাদু কাঁঠালটা আবার কাঁধে তুললেন৷ যেতে-যেতে বললেন, ‘বাঁক কাঁধে লোকে কলকাতা থেকে তারকেশ্বর যায়৷ মনে কর আমরাও যাচ্ছি৷ বল, কাঁঠালবাবা পার করেগা৷’
বেশ কিছু দূরে এসে দাদু বসে পড়লেন৷ কাঁঠাল তো আর তারকনাথ শিব নন যে তিন মাইল পথ পার করে দেবেন৷ সাহস করে বললুম, ‘দাদু, মনে হচ্ছে হবে না৷ একটা কাঁঠালের জন্যে মরেঙ্গে হয়ে লাভ কী? আমাদের বাজারে অনেক পাওয়া যাবে৷’
‘কী বলিস গবেটের মতো, গাছের কাঁঠাল আর বাজারের কাঁঠাল, চাঁদ আর চাঁদমালা এক হল?’ দাদু আবার উঠলেন৷ মাটির রাস্তা শেষ হয়ে পাকা রাস্তা শুরু হয়েছে৷ দাদুর হাঁটায় আর তেমন গতি নেই৷ দূরে কিছু দোকানপাট দেখা যাচ্ছে৷ আমরা নেচে-নেচে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে এসে হাজির হলুম৷ দাদু বললেন, ‘আয়, এখানে বসে লাড্ডু আর জল খাই৷ তেষ্টা পেয়েছে৷’
খাওয়াটা মন্দ হল না; কিন্তু যেই ভাবলুম আবার হাঁটতে হবে, হাত-পা অবশ হয়ে এল৷ দাদু হঠাৎ বললেন, ‘কাঁঠালের একজন উত্তরাধিকারী ঠিক কর তো খোকা৷ এটাকে আর কলকাতা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই৷ জানিস তো, সব মানুষই চায় যে-মাটিতে জন্মেছে সেই মাটিতেই মরতে৷ কাঁঠাল বলে কি মানুষ নয়?’
যাক বাবা, দাদুর সুমতি হয়েছে৷ সামনের পথ দিয়ে একজন মানুষ চলেছেন আপনমনে৷ চোখে তারের চশমা৷ কানের কাছে সুতো জড়ানো৷ গায়ে পাঞ্জাবি৷ ঘাড়ের কাছে অর্ধচন্দ্র তাপ্পি!
‘ওই যে দাদু উত্তরাধিকারী৷’
দাদু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে তাঁর সামনে গিয়ে বললেন, ‘নমস্কার৷’
লোকটি হকচকিয়ে গেলেন৷ বললেন, ‘নমস্কার৷’
‘আপনি একটি কাঁঠাল গ্রহণ করলে বাধিত হব৷’ দাদু বিশুদ্ধ বাংলায় বললেন৷
‘তার মানে?’
দাদু একটু থতমত হয়ে গেলেন৷ দেখতে নিরীহ হলেও মেজাজটা তেমন সুবিধের নয়! দাদু আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আপনাকে একটি গাছপাকা কাঁঠাল দান করে ধন্য হতে চাই৷’
‘আপনি ধন্য হতে চাইলেও আমি ধন্য হওয়ার জন্যে কেন সাহায্য করব?’
দাদু বেশ বিব্রত৷ কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না৷ তবু সাহস করে বললেন, ‘গ্রহণ করলে কৃতার্থ হব৷’
‘গ্রহণও করব না, কৃতার্থও হতে হবে না৷ আমি অপরিগ্রাহী৷ আমার তালিমারা পাঞ্জাবি আর ছেঁড়া পাদুকা দেখে আপনি ভেবেছেন আমি ভিক্ষুক ৷ ভুল করেছেন মশাই৷ জানেন, আমার বড় ছেলে ভিলাইতে কাজ করে, আমার মেজো ছেলে দুর্গাপুরে, ছোট হলদিয়াতে, আপনি এসেছেন আমার মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে? ভেবেছেন কলকাতার বাবুদের আমি চিনি না?’
দাদু কথা শুনে পালিয়ে এলেন৷ আমার পাশে বসে বললেন, ‘অত্যন্ত অযোগ্য উত্তরাধিকারী৷ চল, আমাদের কাঁঠাল আমাদেরই থাক৷ ওই যেমন বলে নিজের জীবন নিজেকেই বইতে হবে, সেইরকম নিজের কাঁঠাল নিজেকেই বইতে হবে৷’
আবার হণ্টন৷ পথ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে৷ ওই যে বাসরাস্তা দেখা যাচ্ছে৷ এখন সেই গানটা গাইতে ইচ্ছে করছে, ‘পথের ক্লান্তি ভুলে, স্নেহ ভরা কোলে তুলে মা গো, কতদূর আর কতদূর৷’
বাস আসছে৷ চারপাশে বাদুড়ঝোলা মানুষ৷ কার ক্ষমতা ওঠে৷ তবু দাদু একবার চেষ্টা করলেন৷ কনডাকটার বললে, ‘একসঙ্গে দুটো হবে না৷ হয় কাঁঠাল আসুক আপনি থাকুন, নয় আপনি আসুন কাঁঠাল থাকুক৷ কিংবা বাসের চালে উঠে কাঁঠাল কোলে বসুন৷’
বাস চলে গেল৷ জানা গেল পরের বাস আসবে এক ঘণ্টা পরে৷ এইবার মনে হল দাদু ভীষণ রেগে গেছেন৷ কাঁঠালটা পায়ের কাছে পড়ে আছে৷ দাদু বললেন, ‘সারাটা জীবন পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে এখন আমার মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে এসেছে৷’
‘কে দাদু?’
‘ওই ম্যালেরিয়ালিস্ট পলটু৷’
‘আপনি বরং কাঁঠালটা এবার বেচে দিন দাদু৷ দান করলে কেউ যখন নিতে চাইছে না৷’
‘খদ্দের দ্যাখ৷’
‘আবার আমার ওপর ভার দিচ্ছেন দাদু! উত্তরাধিকারী ঠিক করতে গিয়ে ফেল করলুম৷’
‘তাতে কী হয়েছে? রবার্ট ব্রুস বলেছেন, টাই অ্যান্ড টাই, নেপোলিয়ান, রোমেল, নেলসন, সকলেই জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, পারব না বলে কিছু নেই, হারব না কখনই৷’
‘তা হলে দাদু, ওই যে এক ভদ্রলোক আসছেন, মনে হয় শহরের মানুষ, ওই যে নীল শার্ট, কালো প্যান্ট৷’
দাদু যথারীতি সবিনয়ে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল৷’
‘বলুন৷’
‘একটা গাছপাকা কাঁঠাল কিনবেন?’
ভদ্রলোক হকচকিয়ে গেলেন৷ কাঁঠাল কিনব কেন? আপনি কি পাগল?’
‘আজ্ঞে না, সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ, কলকাতার কোর্টে ওকালতি করি৷’
‘তাই বলুন৷ আহা, আইন-ব্যবসার এই হাল হয়েছে৷ কলকাতার উকিল বলাগড়ে এসে কাঁঠাল বেচছেন? মাথায় কাঁঠাল ভাঙার মক্কেল জুটল না বলে এখান তেড়ে এলেন কাঁঠাল বেচতে?’
দাদু প্রতিবাদ করে বললেন, ‘আপনি ভুল করছেন৷ আমি প্রতিষ্ঠিত উকিল৷ কাঁঠাল বেচতে আসিনি৷’
‘বুঝেছি, বুঝেছি৷ উকিলদের শেষকালটায় এইরকম স্মৃতিভ্রংশ রোগ হয়৷ এই বলছেন, এই ভুলছেন৷ আমার মেসোমশাইয়ের হয়েছিল৷ এ ওকালতি জীবনে ছ’টা না সাতটা এফিডেবিটের কেস করেছিলেন৷ বাস আর মক্কেল জোটেনি৷ বটতলায় বসে মাছি তাড়াতেন৷ শেষে হাতে আর এক উকিলের কামড় খেয়ে জলাতঙ্ক রোগে মারা গেলেন৷ একই মক্কেল ধরে ছ-সাতজনে টানাটানি করছিলেন৷ হঠাৎ একজন ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিলে৷’
‘ননসেনস!’
‘আপনি একটা লুন্যাটিক৷ ক্যারিইং কোল টু নিউক্যাসল৷ কাঁঠালের দেশে কাঁঠাল বেচতে এয়েছেন৷ আমার নিজেরই কাঁঠালবাগান৷ শুনুন, ভালো কথা বলছি, জীবনে একবার ভুল পথে গিয়ে পস্তাচ্ছেন৷ উকিল হয়ে মরেছেন৷ আবার একটা ভুল পথ ধরেছেন, কাঁঠালের ব্যবসা৷ তার চেয়ে এখান থেকে কলা কিনে কলকাতার অফিসপাড়ায় বসুন, শেষ বয়েসে অন্তত দুটো পয়সার মুখ দেখতে পারবেন৷’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইওর অ্যাডভাইস৷ আপনি যেতে পারেন৷’
‘বললেও যাব, না বললেও যাব৷ তবে শুনে রাখুন, বিপদে পড়লে মানুষের মতিভ্রম হয়৷ তখন ভালো কথাও খারাপ লাগে৷ খেঁকি স্বভাব হয়ে যায়৷’
ভদ্রলোক মুচকি হেসে চলে গেলেন৷ দাদু বললেন, ‘পাজি৷’
হনহন করে ফিরে এসে কাঁঠালটা কাঁধে তুলে নিলেন, ‘আয়, চলে আয়৷’
বাসস্টপ ছেড়ে দাদু আবার কোথায় চললেন? মাঠের পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন৷ হাঁটতে-হাঁটতে আমরা একটা নির্জন জায়গায় এসে পড়লুম৷ বহুদূরে বাসরাস্তা৷ গ্রাম৷ লোকজন নেই৷ একটা পুকুর৷ জলে লাল আকাশ ভাসছে৷
‘নে, এখানটায় বোস৷’
বসে পড়লুম৷ দাদু বেশ জুতসই হয়ে বসে কাঁঠালটা ভেঙে ফেললেন৷
‘শোন, এতক্ষণে বুদ্ধিটা এল৷ কাঁধে করে না নিয়ে যেতে পারি, পেটে করে তো সহজে নিয়ে যেতে পারব৷ আঃ, কোয়া দেখেছিস? আয় শুরু করা যাক৷ চালা-চালা৷ এই নে, রুমালে বিচিগুলো জমা৷ বাড়ি নিয়ে যেতে হবে৷’
কাঁঠাল খেতে-খেতে সন্ধে হয়ে গেল৷ শেয়াল ডাকল--হুক্কাহুয়া৷ দাদু বললেন, ‘পালাই চ, ব্যাটারা গন্ধ পেয়েছে৷ আধখানা ওদের জন্যে রইল৷’
রাত দশটার সময়, কাঁঠালবিচি হাতে আমরা বলাগড় জয় করে বাড়ি ফিরে এলুম৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন