সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
খাচ্ছে দাচ্ছে আর বড়-বড় বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছে৷ কেবল কথা আর কথা৷ কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা৷’ ‘কাদের কথা বলছেন স্যার?’
অধ্যাপক বটকৃষ্ণ বসু খুব বেজার মুখে চেয়ারে বসে আছেন৷ চারপাশে কাগজপত্র ছড়ানো৷ অধ্যাপক বসু একজন গবেষক৷ আমরা তাঁর ছাত্র৷ সহকারীও বলা যেতে পারে৷ আমরা নিজেরা কিছু করি না৷ করার স্বাধীনতাও নেই৷ যা করতে বলা হয় তাই করি৷ যখন কিছু করার থাকে না তখন অধ্যাপক বসুর সামনে বসে তাঁর আক্ষেপ শুনি৷ পৃথিবীর তাবৎ বৈজ্ঞানিকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার৷ যেমন এই এখন হচ্ছে৷ বিকেলের চা পর্ব শেষ হয়েছে৷ একটু আগে পর্যন্ত আমরা আমাদের ল্যাবরেটারি সংলগ্ন জমিতে কাজে ব্যস্ত ছিলুম৷ এখনও হাতে পায়ে কাদা লেগে আছে৷ মাথার চুলে গাছের পাতা আটকে আছে৷ হাত-পা পরিষ্কার করা হয়নি৷ চা শেষ করে আবার জমিতে নামতে হবে৷ যতক্ষণ না সূর্য ডুবছে, ততক্ষণ আমাদের কাজ চলবে৷ গবেষণায় আমরা সফল হতে পারব কি না জানি না৷ যদি সফল হতে পারি, তা হলে কৃষিবিজ্ঞানের ইতিহাসে সেই সাফল্য সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে৷
অধ্যাপক বসু একটা ছুরি হাতে উঠে দাঁড়ালেন, ‘কাদের কথা বলছি? সেই সব অপদার্থ বিজ্ঞানীদের কথা, যারা শুধু পৃথিবীতে সেমিনার আর বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছে৷ কাজের কাজ কিছুই করছে না৷ ক’টা বাজল?’
‘আজ্ঞে, চারটে৷’
‘ফাইন৷ এখনও ফুল টু আওয়ার্স কাজ করার সময় আছে৷’
আমাদের দুই সহকারীকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক বসু আবার জমিতে এসে নামলেন৷ বিঘে খানেক জায়গার ওপর আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে সবজি নিয়ে৷ প্রথম যেদিন আমরা কাজে যোগ দিতে এলুম সেদিন অধ্যাপক বসু আমাদের যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার সারমর্ম ছিল এই রকম, হাজার-হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে নানা পরিবর্তন এসেছে৷ বনমানুষ মানুষ হয়েছে৷ অসভ্য মানুষ ক্রমশ সভ্য হয়েছে৷ মোমবাতি থেকে ইলেকট্রিক লাইট হয়েছে৷ লেসার বিম আবিষ্কৃত হয়েছে৷ ঘোড়ায় টানা ট্রামের জায়গায় ঠ্যাং উঁচু ইলেকট্রিক ট্রাম এসেছে৷ স্টিম ইঞ্জিনের জায়গায় ইলেকটিক লোকো এসেছে৷ দু-চাকার ফোর্ডের আমলের মোটর গাড়ির জায়গায় আধুনিক আমলের হাওয়া গাড়ি এসেছে৷ মানুষ বেলুন ছেড়ে জেট বিমানে উঠেছে৷ রকেট ছুটছে গ্রহান্তরে৷ টোটকা আর ভূতুরে ওষুধের জায়গায় পেনিসিলিন এসেছে৷ গাদা বন্দুকের জায়গায় স্টেনগান, ব্রেনগান, মেশিনগান এসেছে৷ গাইডেড মিসাইল এসেছে৷ বিজ্ঞানের সব রাস্তা ধরেই মানুষ গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলেছে৷ কিন্তু দুঃখের বিষয়, একটা দিকে বিজ্ঞানের কোনও দৃষ্টিই নেই৷ বিবর্তনের ধারাও সেখানে মিইয়ে গেছে৷ যে বিবর্তনে বাঁদর মানুষ হয়েছে, পৃথিবীতে জেব্রা, জিরাফ এসেছে, সেই বিবর্তনে ডায়নোসর, টেরোড্যাকটিল পৃথিবীতে এসে চলে গেছে৷ সেই বিবর্তন, শাকসবজির জগৎকে ভুলে বসে আছে৷ হাজার-হাজার বছর ধরে আলু আলুই আছে, ঢেঁড়স ঢেঁড়সই থেকে গেছে, ঝিঙে ঝিঙে হয়ে গ্যাঁট মেরে বসে আছে কতকাল! লাউ, কুমড়ো, উচ্ছে, করলা, চিচিঙ্গা, পেঁপে, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওল কপি, গাজর, বিট, শালগম, যেমন ছিল তেমনি আছে৷ সবজির জগতে কোনও পরিবর্তন আসেনি, কোনও পরিবর্তন আনার চেষ্টাও হয়নি৷ সেই একঘেয়ে সবজি বছরের-পর-বছর আমরা খেয়ে চলেছি৷ খেতে বাধ্য হচ্ছি৷ ক্যাটকেটে ছোলা দিয়ে কুমড়োর ছক্কা৷ পাতে দেখলেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে ওঠে৷ ভেন্ডির তরকারি৷ দেখলেই পরিবেশনকারীকে ঠেঙাতে ইচ্ছে করে৷ ঝিঙে! যেমন তার চেহারা, তেমনি তার স্বাদ৷ পোস্তর সঙ্গে পড়লে তবে মুখে তোলা যায়৷ অন্য আর কিছু জোটে না বলে আমরা খেতে বাধ্য হই৷ সবজি না খেলে ভিটামিনের অভাবে মারা পড়ার ভয়ে খেতে হয়৷ তা না হলে সাধ করে কেউ পেঁপের ঝোল, কুমড়োর ঘ্যাঁট, বিট গাজর মুলো খেত না৷ কাবাব, কিমাকারি, ফিশফ্রাই, প্রনকাটলেট, রেজালা, রেগনজুস, রেশমিকাবাব খেয়ে মনের আনন্দে থাকত৷ মাছ, মাংস, ডিম খান না এমন লোকের সংখ্যা পৃথিবীতে কম নয়৷ তাঁদের মুখের আর মনের কী অবস্থা! মানুষের গো-যন্ত্রণা৷
বৈজ্ঞানিক বসুর বক্তৃতা শুনে সেদিন আমাদের চোখ খুলে গেল৷ সত্যিই তো! সবজির জগতে কোনও পরিবর্তনই আসেনি৷ সেই আলু, সেই পটল, সেই ঢেঁড়স, সেই বেগুন৷ আমাদের তা হলে কী করতে হবে! নতুন-নতুন সবজি তৈরি করতে হবে৷ একটার সঙ্গে আর একটা মিলিয়ে নতুন-নতুন আনাজ আনতে হবে৷ যা পৃথিবীর মানুষ আগে কখনও দেখেনি৷
নানা ধরনের গাছে আমাদের বাগান ভরে গেছে৷ খোন্তাখুন্তি, কোদাল-গাঁইতি, সার, ওষুধ এই নিয়ে সকাল থেকে সন্ধে আমাদের হিমসিম অবস্থা৷ এ-সব কাজে সবার আগে যা থাকা চাই তা হল ধৈর্য আর কল্পনা৷
বৈজ্ঞানিক বসু, আমাদের স্যারের কল্পনার খুব জোর৷ আগামী পাঁচ বছরে আমরা যেসব নতুন ফসল উৎপাদন করব তার একটা তালিকা সবসময় চোখের সামনে ঝুলছে৷ উচ্ছে আর পটল এক করে একটা নতুন আনাজ হবে, নাম উপটল৷ স্বাদ কেমন হবে জানা নেই তবে অনুমান করা গেছে৷ সামান্য তিক্ত৷ উচ্ছের মতো অতটা নয়৷ কুমড়োর তরকারিতে আলু দিতেই হয়৷ কুমড়োও মাটিতে ফলে আলুও তাই৷ দুটোকে এক করে নতুন একটা আনাজ--কুমড়ালু৷ ঝিঙের সঙ্গে চিচিঙ্গে মিলিয়ে ঝিচিং৷ সিমের সঙ্গে কড়াই শুঁটি এক করে সিশুঁটি৷ পালং আর পুঁই দুটোই ভিটামিনে ভরপুর শাক৷ দুটোকে এক করে পাপুঁই৷ শশা আর করলা এক করে হবে শরলা৷ মাংসে পেঁয়াজ আর রশুন আলাদা-আলাদা দিতে হয়৷ না দিলে চলে না৷ দুটোকে এক করে আমরা উৎপাদন করব পেঁশুন৷ লাউ আর পেঁপে এক করে হবে লাপেঁ৷ নাম শুনেই মনে হচ্ছে ফরাসি কোনও আনাজ৷ খেতে নিশ্চয়ই বিলিতি-বিলিতি হবে৷ প্রফেসারের ধারণা, গাছটা নিশ্চয়ই লতানে হবে৷ গাজর আর বিট এক করে হবে গাবিট৷ বাঁধা আর ফুল এক করে বাঁফুল কপি৷ উঃ, কী কাণ্ড যে হবে, ভাবা যায় না!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন