সেই রাত

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমাদের স্কুলের পাশেই গঙ্গা এই অংশটায় বেশ চওড়া৷ দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে আসছেন৷ যাচ্ছেন কলকাতায়৷ শঙ্কর আমার সহপাঠী৷ সব সময়ের বন্ধু৷ শুধু বন্ধু নয়৷ আমার গুরু৷ কেন গুরু, সে আমি এখুনি বুঝিয়ে বলছি৷ আমার দুজনেই সাত ক্লাসে পড়ছি৷ সাত ক্লাস বললুম কেন? সেই কালের মায়েরা এইরকমই বলতেন৷ বাড়িতে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁরাও এইরকম বলতেন৷ আরো একটা মজার ব্যাপার ছিল৷ আমাদের বাড়িতে যিনি কাজ করতেন, তাঁর পরিচয় ছিল—দুর্গার মা৷ তাঁর নিজের নাম কী ছিল, কেউ জানার চেষ্টা করত না৷ আমার কত কত বয়েস হয়ে গেল, আজও জানি না কিন্তু এই দুর্গার মাকে আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না৷ কত হিল্লি-দিল্লি করল এই জীবন৷ পৃথিবীর ও-প্রান্ত পর্যন্ত চলে গেল, মেরি, অ্যালিস, সোফিয়া, দুর্গার মাকে ভুলতে পারলুম না৷ সে যদি সময় পাই বলব৷ এখন তো আমি অন্য কথা বলতে বসেছি৷ কেউ জিগ্যেস করেনি, তাও বলছি৷

আমার আর শঙ্করের একই বয়েস৷ প্রায় একই রকম দেখতে, তবে শঙ্কর আমার চেয়েও ঋদ্ধিবান৷ একটু বেশি ফর্সা৷ কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল, খাড়া নাক৷ ভয়-ডর নেই৷ একটা জায়গায় ভীষণ মিল৷ ওরও মা নেই, আমারও মা নেই৷ দুজনেই মধ্যবিত্ত পরিবারের৷ খুব বড়লোকি করার উপায় নেই, ইচ্ছেও ছিল না৷ সে শঙ্কর বেশ বলত, ‘বড়লোক হওয়া মানেই একঘোরে হয়ে যাওয়া৷’ শব্দটা একঘোরে নয়, একঘরে, মানে তুমি তোমার মতো থাকো, কেউ তোমার কাছে, তোমার হম্বিতম্বি শুনতে আসবে না৷ আরো ক’টা বড়লোক খুঁজে নিয়ে মেলামেশা করো৷

শঙ্কর বলত, ‘সবসময় মনে রাখবি, আমাদের জীবনটা সলিড জীবন৷ পড়ে গেলে নরম গদিতে পড়ব না, পড়ব পাথরে৷ মাথা ঠুকে যাবে৷ হাড়ও ভাঙতে পারে৷ কেউ এসে তুলবে না৷ নিজেকেই উঠে দাঁড়াতে হবে৷ কেউ জিগ্যেসও করবে না, কিরে তোর লেগেছে? যদি লেগেও থাকে, হাসতে হাসতে বলতে হবে, না তো, না তো৷ তোর নোটখাতার একপাশে লিখে রাখ—আমাদের জীবন হল ‘‘মুখে হাসি চোখে জল’’৷’ শঙ্করের সঙ্গে এই একটা জায়গায় আমার অমিল ছিল৷ ও ছিল লাঠির মতো খাড়া, আর শক্ত৷ আর ও কোথা থেকে, কোথা থেকে কী যে সব শিখে আসত! পরে বুঝেছিলাম—ওকে শিখতে হত না৷ ওর ভেতরেই সব ছিল৷ আর সেই কারণেই আমি মনে করি, আজও করি শঙ্কর আমার গুরু৷ শঙ্কর না থাকলে আমি কবে মরে যেতুম৷

স্কুল ছুটির পর সবাই হেরে রেরে করে বাড়িমুখো হত৷ আমি আর শঙ্কর গিয়ে বসতুম গঙ্গার ঘাটে৷ দুটো ঘাট ছিল৷ একটা খুব নির্জন৷ পাশ থেকেই উঠে গেছে প্রাচীন এক জমিদার বাড়ির পোস্তা৷ অনেকটা দুর্গের মতো৷ খুব উঁচু৷ সেখানে সাদা রেলিং দিয়ে ঘেরা, সুন্দর সবুজ লন আছে, সুন্দর একটা মন্দির৷ তলা দিয়ে মাটি ছঁুয়ে বহে যাচ্ছে গঙ্গা৷ কলকাতা হয়ে সাগরে৷ আমরা ঘাটের বাঁ-দিকের খানায় বসতুম৷ শেষ সীমা৷ পাশের জায়গাটা বেশ গভীর৷ ভরা জোয়ারে ডুব জল৷ ওই জায়গাটায় বেশ বড় একটা পিটুলি গাছ ছিল৷ জোয়ারের সময় গাছের অর্ধেকটা চলে যেত জলতলে৷ মস্ত বড় একটা পাথর ছিল ওইখানে৷ শঙ্কর বলত—আমাদের শিবঠাকুর৷ এই আমাদের বারাণসী, আমাদের দশাশ্বমেধ ঘাট৷ ওই জায়গায় বসে আমরা সূর্যাস্ত দেখতুম৷ বেলুড় মঠের পেছন দিকের আকাশটা লাল হয়ে যেত৷ সারাদিন আলো আর উত্তাপ দিয়ে সূর্যদেব বাড়ি যাচ্ছেন৷ আমাদের মতোই এক স্কুল ফেরতা বালক৷ শঙ্কর বলত, সব জায়গায় সকাল তৈরি করাই ওঁর কাজ৷ ঘুম ভাঙানো৷ শঙ্কর লেখাপড়ায় আমার চেয়ে অনেক ভালো ছিল৷ মাঝে মাঝে আমাকে বলত, ‘কী মুশকিল বল তো—আমি কোনো কিছু কিছুতেই ভুলতে পারি না৷ দোষই বল গুণই বল, এইটা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি৷ পুরো রামায়ণটা তাঁর মুখস্থ ছিল৷ যত বড় কবিতাই হোক, একবার পড়লে বা শুনলেই মুখস্থ৷ কোনো মানে হয়, মৃত্যু এসে কত তাড়াতাড়ি ওই মাথাটা নিয়ে চলে গেল!’

আমি আবার এইরকম বলতুম, ‘আমার সঙ্গে তোর মেশা উচিত নয়৷’

কেন বলব না! শঙ্করের মতো মেধাবী ভালো ছেলেরা এইরকম একটা স্কুল থেকে বেরিয়ে সেরা কলেজে যাবে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়৷ তারপর বিলেত, তারপর অন্যজীবন৷ কে মনে রাখবে এই গঙ্গা, ঘাট, পিটুলি গাছ, দুর্গের মতো জমিদার বাড়ির পোস্তা, বেলুড় মঠের আড়ালে সূর্যের লুকিয়ে পড়া৷

‘আমার তো কিছু হবে না৷’

এই কথা শুনে শঙ্কর বিদ্যুৎ চমকের মতো এত জোরে একটা চড় মেরেছিল গালে—আমি আজও ভুলিনি৷ ‘তোকে নিয়ে আমি জলে ডুবে মরব৷ আর কোনোদিন তুই ‘‘না’’ যুক্ত কথা বলবি না৷’

সেই দিন আমি সারা রাত ঘুমোতে পারিনি৷ বাড়ির দোতলার দক্ষিণের ঘরে একা বিছানায়৷ বাঁ-পাশে বিরাট জানলা৷ আকাশে বিষম ব্যস্ত পূর্ণিমার চাঁদ৷ তরতর করে কোথায় চলেছে কে জানে, কোন কাজে৷ অশথ গাছের পাতায় পাতায় চাঁদের আলোর মাখামাখি৷ ধবধবে সাদা শিবমন্দিরের চূড়ার ত্রিশূলটা ঝকঝক করছে৷ বালিশে মাথা রেখে বিরাট আকাশের এই টুকরোটা রোজই আমি এই সময় দেখি৷ কখনো আলো, কখনো মিশ-কালো, একটা-দুটো তারা, যারা রাতের পর রাত জেগে থাকে৷ কী শান্তি! তাই না! আমাদের রান্নাঘরে পাশাপাশি দুটো উনুন৷ একসময় সারাদিনই রান্না হত৷ এখন শীতল৷ কিন্তু উনুন মানেই আগুন৷ আগুনই তার জীবন৷ কোনো কোনো দিন স্কুল ছুটির দুপুরে আমি ওই উনুনের ভেতর অতীতের ছাই খুঁজি৷ সেই সব সুখের দিন৷ ছাই হয়ে গেছে৷ দুজন সুন্দরী—মা, জ্যাঠাইমা, হাসি, গান, গল্প৷

শঙ্কর বলেছে, পুরোনো দিনের কথা ভাববি না৷ নদী পেছনের কথা ভাবে না৷ গাছ ঝরাপাতার কথা ভাবে না৷ পা দুটো ফেলে আসা পথকে লাথি মেরে সামনে এগোয়৷ চোখ দুটো সামনেটাই দেখে—পেছনটা ভাব না৷ আকাশের গায়ে ছবি আঁকবি, কবিতা লিখবি৷ বালিশে মাথা মানেই ঘুম৷ গভীর ঘুম৷ ঘুম হল গুহা, একটা কুম্ভ৷ আমার নোটবুক-এ শঙ্কর ভালো ভালো সব কোটেশান লিখে দিয়েছে, ‘মুখস্থ করবি৷ মনে মনে বলবি, আর দেখবি, তোর নিজস্ব একটা ঘর আছে, বাগান আছে, পাহাড়, ঝরনা আছে৷ দেখবি, সেই ঘরে তোর বন্ধু অভিভাবকরা বসে আছেন৷’ আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের এই প্যাসেজটা আমাকে ও মন্ত্রের মতো মুখস্থ করিয়েছে৷

The woods are lovely, dark and deep.

But I have promisses to keep.

An miles to go before I sleep.

ও আবার এও বলে দিয়েছে—এই ক’টা লাইন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর চলার পথের মন্ত্র৷

সুন্দর সবুজ বন৷ গভীর, অন্ধকার৷ অনেকের জন্যে অনেক কিছু করতে হবে, অনেক অনেক প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার৷ যেতে হবে বহুদূর, তার পরে নিদ্রা৷

বাবার ঘুম এমনিই খুব কম৷ মা চলে যাওয়ার পর আরো কমে গেছে৷ বিজ্ঞানী মানুষ৷ রাতটা লেখা পড়াতেই কাটে৷ আর আছে এসরাজ৷ সুর, সঙ্গীত, তাল, লয়৷ অসাধারণ হাত৷ একটু, একটু করে সুর ছড়িয়ে দেন বাতাসে৷ চাঁদের আলোর রাত যেন কাঁদছে! এইরকম রাতে আমারও যে কী হয় বলতে পারব না৷ মনে হয় বাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে বেরিয়ে পড়ি৷ অন্ধকার অন্ধকার মেটে পথ দিয়ে ছায়ামূর্তির মতো, ভূতের মতো হাঁটতে হাঁটতে, ফুলবাগানের মধ্যে দিয়ে চলে যাই গঙ্গার ধারে৷ কেউ কোথাও নেই৷ ঘাটের সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে জলের দিকে৷ পিটুলির গাছের পাশে গিয়ে বসি৷ জমিদার বাড়ির শ্যাওলাধরা, পাথর দিয়ে গাঁথা পোস্তাটা ওপর দিকে উঠে গেছে৷ সাদা রেলিং৷ চাঁদের আলোর মতো আলো, যেন এইমাত্র জন্মালুম৷ শুনেছি, মাঝরাতে সরু সরু ছিপ নৌকো সাঁই সাঁই করে কলকাতার দিকে চলে যায়৷ ডাকাত৷

শঙ্কর আমাকে এমন একটা কথা বলেছে, যা বিশ্বাস করা যায় কি যায় না, বলতে পারব না৷ শঙ্কর বলেছে, গভীর রাতে সাহস করে গঙ্গার ধারের ওই পিটুলিতলায় যেতে পারলে আমরা আমাদের মাকে দেখতে পাব৷ দেখব, চুপ করে বসে আছেন৷ কোনো কথা কিন্তু বলবেন না৷ একেবারে স্থির৷ ওই জায়গাটায় কেন আসবেন! শঙ্কর বললে, ওই জায়গাটায় আমরা বসি, তাঁদের কথা ভাবি৷ একটাও বাজে কথা বলি না—তাই!

দুই

তিনি আসবেন, তিনি আসবেন৷ আমাদের বিখ্যাত স্কুলে আসছেন বিখ্যাত প্রধান শিক্ষক৷ কতবার যে কত বিষয়ে এম.এ. পাশ করেছেন, তিনি নিজেই বলতে পারবেন না৷ পরীক্ষা পাশ করাটা তাঁর কাছে কিছুই নয়৷ একটা হবি৷ টানা সাত বছর বিলেতে ছিলেন৷ তাঁকে দেখলে বোঝা যাবে না৷ একবারে সাধারণ৷ যাহোক-তাহোক একটা ধুতি, আর একটা জামা৷ পায়ে একজোড়া চটি৷ সেটা কত সালে পায়ে নিয়েছিলেন—মনে নেই৷ ‘সোলটাই’ নষ্ট হয়ে গেছে৷ মাঝে মাঝে পা থেকে খুলে যায়৷ ছিটকে যায়৷

আজ আসবেন৷ আমরা সব লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ আমাদের সেই রকমই বলা হয়েছে৷ সব শিক্ষকমশাইরা ধবধবে পাটভাঙা পোশাক পরে একদিকে দাঁড়িয়ে আছেন৷ সহ প্রধান শিক্ষকের হাতে মালা৷ পণ্ডিতমশাই স্তোত্র পাঠ করবেন৷ খুবই উদ্বিগ্ন৷ বারে বারে বলছেন, ‘বিশ্বাসঘাতক কণ্ঠ, সহযোহিতায় পরাঙ্মুখ, সৎমাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ৷ কাল কন্যার শ্বশুরালয়ে গিয়েছিলুম৷ একাধিক ধোঁকা খাওয়ার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য৷ ওঙ্কার চিড় খেয়ে যাচ্ছে৷ সর্প জিহ্বার মতো৷’

ইংরেজির স্যার বললেন, ‘ওঙ্কার বর্জিত স্তোত্র করুন না৷’

পণ্ডিতমশাই ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠলেন, ‘কী কথাটাই বললেন! অর্বাচীন৷ বীজ ছাড়া বৃক্ষ হয়? এই ব্যাপারে যত কম কথা বলেন ততই ভালো৷ ইংরেজের পক্ষে ওঙ্কার তত্ত্ব বোঝা সম্ভব নয়৷’

পণ্ডিতমশায়ের প্রিয় ছাত্র ফ্লাস্কে গরম জল এনেছে৷ আধ গেলাস ধোঁয়া ওঠা গরম জল এগিয়ে দিল৷

পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘আর কত গরম জল খাওয়াবি বাবা! এ গলা সে গলা নয়৷ মাঝে মাঝে মনে হয় গলা টিপে নিজেকে মেরে ফেলি!’

বাংলার স্যার বললেন, ‘সে মন্দ নয়, এত বড় একটা স্কুল বাড়ি, থাকার অসুবিধে হবে না৷’

‘মানে? এখানে থাকার কথা আসছে কী করে?’

‘তা, ভূত হয়ে থাকবেন কোথায়? শ্যাওড়া গাছে?’

‘ভূত হতে যাব কোন দুঃখে? বেদ-বেদান্ত আমার কণ্ঠস্থ৷ উদ্‌গারে যার ওঙ্কার! আকাশের অন্তরালে যে নিত্য দেবতাদের দর্শন করে, জন্মদিনে যার ওপর পুষ্পবৃষ্টি হয়, সে স্বর্ণরথে আরোহণ করে স্বর্গে গমন করবে৷ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে পাশা খেলবে, আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে ভগবানের চিকিৎসা করবে৷ না, ভোগাচ্ছে, গলা শত্রুতা করছে৷ আমার এখন মৌনাবলম্বন করা উচিত৷’

‘স্বর্গে গমনকালে আপনার বেত্রদণ্ডটি অবশ্যই নিয়ে যাবেন৷ সামান্য জিনিস কিন্তু ছাত্রসমাজের কাছে আতঙ্ক৷’

ইংরিজির স্যার বললেন, ‘আই রেজিস্টার মাই প্রটেস্ট৷ বেত্রদণ্ডই জাতির ভবিষ্যৎ৷ পরিষ্কার বলা আছে—

‘He that Spareth his rod hateth his son.’

ইতিহাসের স্যার বললেন, ‘কি থ, থ করছেন—থ্যাস্‌থাসে সহজ কথা Spare the rod, Spoil the child.’

ওদিকে গেম-টিচার মহা সমস্যায় পড়েছেন৷ বাছাবাছা বারোজনকে নিয়ে একটা দল করেছেন৷ সাদা প্যান্ট-শার্ট৷ কুচকাওয়াজ করবে৷ সঙ্গে ব্যান্ড বাজবে৷ ছেলেদের পা মিলছে না৷ এর ডান পা পড়ছে তো ওর বাম পা৷ স্যার চিৎকার করছেন, ‘হচ্ছে না, হচ্ছে না৷ কিস্যু হচ্ছে না৷ ভগবান তোদের কী ডান, বাঁ জ্ঞানটুকুও দেননি৷ এটা কি চিংড়ি মাছের মালাইকারি হচ্ছে! সব পায়ের ছিরি দ্যাখো! লিকলিকে, মুরগির ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং৷ অ্যায় গদাই৷ আভি নিকালো! এক্ষুনি বেরিয়ে যা!’

‘কেন স্যার?’

‘আমাদের মিলিটারি লাইনে, তুই একটা লজ্জা, দেশমাতৃকা অগৌরব৷’

‘কেন স্যার!’

‘ঠাস করে এক চড় মারব৷ এই বয়েসেই ভুঁড়িটা করেছে দ্যাখো৷ একবার নাচলে স্থির হতে সময় লাগছে তিন মিনিট৷’

অঙ্কের স্যার বললেন, ‘তিন মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ড৷’

বিল্ডিং-এর পেছন দিকে আমাদের দারোয়ান রামাধরদার ডেরা৷ অসাধারণ এক মানুষ৷ কুস্তিগির৷ এই তো একমাস আগে ট্রাম কোম্পানির পালোয়ানকে হারিয়ে এক মন ছোলা উপহার পেয়েছে, আর পেয়েছে একটা তামার তাবিজ৷ আর একটা ছবি মহাবীরের কাঁধে গন্ধমাদন, আকাশপথে উড়ে আসছেন৷

রামাধরদার এলাকায় খড়ের আগুনে বিগড্রাম, ক্রেড্ল সেঁকা হচ্ছিল৷ ঠান্ডা লেগে ঢ্যাবঢ্যাবে হয়ে গেছে৷ ব্যাগপাইপের ব্যাগ ফুটো করে ইঁদুর বাসা করেছিল৷ অনেক কষ্টে তাদের বের করা গেছে৷ গদাইদা ফোর্ট উইলিয়াম থেকে এই বিদঘুটে যন্ত্রটা বাজাবার ট্রেনিং নিয়েছেন৷ একটু অহংকার তো হবেই৷ সেটা আমরা মেনেও নিয়েছি৷ কয়েক মাস পরেই স্কটল্যান্ডে যাবেন আরো ভালো করে শেখার জন্যে৷ এই বিদঘুটে হাত-পা-অলা যন্ত্রটা বাজাতে হলে চেক-চেক কাপড়ের স্কার্ট পরে বাজাতে হয়৷ বিলিতি মেমসায়েবদের মতো দেখালেও লজ্জা করা চলবে না৷ গান-বাজনা লাইনে পোশাক একটা ব্যাপার৷ প্যান্ট-কোট পরে কীর্তন করা যায় না৷ কেউ শুনবে না৷ ঢিল মেরে মাথা কানা করে দেবে৷

ইঁদুরের কেরামতিতে যন্ত্রের পেট থেকে সব হাওয়া বেরিয়ে গেছে৷ গদাইদা অনেকক্ষণ ধরে ফু-ফু করে হাওয়া ভরছেন৷ বুকের কাছে যে সব হাত-পা ঝুলছে, সেগুলো সব পর্দা, সা-রে-গা৷ বাচ্চা ছেলে কাঁদলে যেমন শব্দ হয়—প্যাঁ, সেইরকম একটা শব্দ মাঝে মাঝে বেরোচ্ছে—তার পরেই ভস্৷ এদিকে গরমাগরম বিগড্রাম৷ প্যাড লাগানো ডান্ডাটা মারা মাত্রই অ্যায়সা এক শব্দ হল, কার্নিসে বসে থাকা যত পায়রা ফটফট করে উড়ে গেল৷ গঙ্গার ধারে একদল কুকুর থাকে তারা সমস্বরে ডেকে উঠল৷ ইতিহাসের স্যার বললে, ‘মনে হচ্ছে, সিরাজ কলকাতা আক্রমণে এসেছেন৷’

শান্ত-শিষ্ট-নিরীহ এক ভদ্রলোক একপাশে একটা চেয়ারে অনেকক্ষণ বসে আছেন, আমরা সবাই দেখেছি৷ পরে আছেন সাধারণ একটা ধুতি, সাদা একটা শার্ট, এলোমেলো চুল৷ পায়ে চটি৷ কোনো অভিভাবক হবেন৷ তিনি এইবার ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে অ্যাসিসটেন্ট হেডস্যারকে নীচু গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘হেড মাস্টারের ঘরটা কোথায়?’

‘দোতলায়৷ কেন, কী হবে? ছেলে ভর্তি?’

‘না, না, আমাকে ওই ঘরেই তো বসতে হবে৷’

‘কেন? ওই ঘরে বসতে হবে কেন? কোথাকার পাগল?’

ভদ্রলোক আরো নীচু গলায় বললেন, ‘হেড মাস্টারকে তো হেড মাস্টারের ঘরেই বসতে হবে৷’

‘মানে?’

‘আমি ডক্টর এন. এন. রায়, এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক৷’

‘সে কী, আপনি কোথা থেকে এলেন? কীভাবে এলেন?’

‘ওই তো ওই গেটটা দিয়ে, ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে৷’

‘না, না, আপনার ওইভাবে আসা চলবে না, অসম্ভব৷ তা ছাড়া এই ড্রেস! যেন বাজার সরকার হরিয়া!’

‘পোশাকের নিয়মটা কী? ড্রেস কোড?’

‘ধুতি আপনি পরতে পারেন, তবে অতটা উঁচু করে নয়৷ আপনি পরে এসেছেন একটা খেঁটে ধুতি৷ পায়ে আবার চটি৷ চটি চলবে না৷ একটা কোট আপনাকে পরতেই হবে৷ মাস্ট৷ আপনাকে আমরা ব্যান্ড বাজিয়ে গেটের বাইরে থেকে নিয়ে এসে মঞ্চে তুলব৷ মালা দিয়ে বরণ করব৷ গান হবে৷ ছেলেরা একটা গার্ড অফ অনার দেবে৷ পণ্ডিতমশাই ব্যাগপাইপের সঙ্গে বেদমন্ত্র পাঠ করবেন৷ ব্যান্ডের সঙ্গে সারা স্কুল পরিভ্রমণ করে দোতলায় সদ্য রং করা, নিজের ঘরে প্রবেশ করবেন৷ যে-সে ঘর নয়৷ ঠাসা ইতিহাসে৷ বড় বড় মানুষ এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন৷ তাঁদের সাজ-পোশাক দেখলে ভয় আর শ্রদ্ধা দুটোই একসঙ্গে হত৷ এই ঐতিহ্যটা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছি৷ আপনার সম্মানে আমরা আলোকিত হব৷ আপনাকে ধুতি-পাঞ্জাবি, উত্তরীয় আনিয়ে দিচ্ছি, আর একজোড়া জুতো৷ অনুগ্রহ করে পোশাকটা পালটান৷ তারপর আমাদের এই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান৷ সকলে আশা করে আছে৷’

ওদিকে ব্যাগপাইপ বেজে উঠল৷ ধাম ধাম ব্যান্ডের শব্দ৷ দলটা মার্চ করে এগিয়ে আসছে৷ ইংরিজির স্যার বললেন, ‘এই টেম্পোটা নষ্ট করা ঠিক হবে না৷ একই ব্যাপার—আগে ব্যান্ড পেছনে স্যার, এখানে আগে স্যার পেছনে ব্যান্ড৷ দুই -ই হয়৷ আইদার অর৷ পণ্ডিতমশাই! কোথায় তিনি?’

কে যেন কানে কানে বললে, ‘নস্য গ্রহণে অন্তরালে গেছেন৷’

‘ওই আসছেন৷ শুরু করে দিন৷ Start, Start.’

পণ্ডিতমশাই বললে, ‘অত তাড়া কিসের? সব কিছুর একটা নিয়ম আছে৷ আমি মহাদেবের মন্দির থেকে ঘণ্টাটা চেয়ে এনেছি৷’

ভূগোলের স্যারকে আমরা বলি ‘ল্যাটিচিউড-লঙ্গিচিউড’, সংক্ষেপে ‘এল. এল’৷ তিনি বললেন, ‘ধুতি-প্যান্ট যাই হোক স্যারকে স্যারের মর্যাদায় যথোচিত আসনে যথাযোগ্যভাবে আসীন করাটাই বিধেয়৷ একটি কথা আমি এই ভদ্রমণ্ডলীর সমক্ষে সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই—মানুষই বড় কথা—প্যান্ট, কোট, পাজামা নয়৷ যেমন আমি! কাপড় পরলেও আমি, গামছা পরলেও আমি৷ আমাদের মধ্যে কেউ একজন আজকের এই সুন্দর প্রভাতি অনুষ্ঠানে জল ঢেলে দিয়েছেন৷’

‘সেই একজন কে? কী বলতে চাইছেন আপনি? মনে রাখবেন, আপনার মাত্র পঞ্চাশ নম্বর৷’

ভূগোলে সেই সময় পঞ্চাশ নম্বরের পরীক্ষা হত৷ আর স্বাস্থ্য পঞ্চাশ৷ সেই খোঁচাটাই দিলেন কুমুদ স্যার৷

আমাদের পণ্ডিতমশাইয়ের একটা গুণ—সোজা-সাপ্টা মানুষ—সাতেও নেই পাঁচেও নেই৷ আলোচালের ভাত, উত্তম গব্যঘৃত, আলু-ভাতে, ডাল-ভাতে, সৈন্ধব লবণ, পাঁচ পোয়া খাঁটি গো-দুদ্ধ৷ খাটো ধুতি, একটি চাদর, সুন্দর ভুঁড়িটির ওপর লম্বমান পৈতা৷ ছোট্ট একটি টিকি৷ পায়ে কাষ্ঠ পাদুকা৷ আর সংস্কৃত কাব্য ও ব্যাকরণ, আর যখন-তখন, যত্র-তত্র ঘুমিয়ে পড়া৷ সব কথা কানে নেন না৷ সরল রেখার মতো জীবন৷

পণ্ডিতমশাই উঁচু গলায় বললেন, ‘শঙ্কর, আমার শঙ্কর কোথায় গেলি রে! আয় এদিকে আয়৷ থেকে থেকে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যাস? নে, ঘণ্টাটা ধর৷ মৃদু, মধুর, ঝঙ্কৃত সুরে বাজা৷ কেটে যেন না যায়৷ একটানা৷’ পণ্ডিতমশাই গম্ভীর গলায় বেদমন্ত্র শুরু করলেন৷

ওঁ বাঙ্ মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা, মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতম্

আবিরাবীর্মে এধি,...

আমাদের নতুন হেডস্যার, পণ্ডিতমশাইয়ের পাশে চলে গেছেন৷ হাতজোড় করে দাঁড়িয়েছেন৷ সে এক দৃশ্য৷ তিনি প্রতিটি লাইনের বাংলা অনুবাদ করছেন, ‘আমার বাক্য মনে প্রতিষ্ঠিত হোক, আমার মন বাক্যে প্রতিষ্ঠিত হোক৷ হে স্বপ্রকাশ ব্রহ্ম, আমার নিকট প্রকাশিত হও৷’ পণ্ডিতমশাই বলছেন, ‘ঋতিং বদিষ্যমি, সত্য বদিষ্যমি, তম্মামবতু, তদ্বক্তারমবতু, অবতু মাম্, অবতু বক্তারম...’

হেডস্যার বলছেন, ‘আমি মানসিক সত্য বলিব, বাচনিক সত্য বলিব৷ ব্রহ্ম আমাকে রক্ষা করুন, ব্রহ্ম আচার্যকে রক্ষা করুন৷’

পণ্ডিতমশাই বলছেন,

ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণম্‌দচ্যতে৷

পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে৷৷

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ৷৷

আমরা ছাত্ররা আর চুপ করে থাকতে পারলুম না৷ একসঙ্গে বলে উঠলুম—শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ৷

পণ্ডিতমশাই অভিভূত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘অন্যরকম, একেবারে অন্যরকম৷’

নিজের উত্তরীয়টা হেডস্যারকে পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মালা, মালা৷’ মালা পরালেন৷ ‘একটু চন্দন!’ শঙ্করকে বললেন, ‘দৌড়ে শিবমন্দিরে যা৷’

ইংরিজির স্যার ভূগোলের স্যারকে বললেন, ‘এল. এল. এঁর কোনো জিওগ্রাফি নেই, পুরোটাই হিস্ট্রি৷ আধুনিক নয়, এনসিয়েন্ট৷ কী হবে, কে জানে!’

তিন

নতুন হেডস্যার দোতলায় উঠছেন৷ একতলার সব ক্লাসেই গিয়েছিলেন৷ এমনকী রামাধরদার ঘরেও৷ মহাবীরের ছবি দেখে খুব খুশি৷ কুস্তির জায়গাটাও দেখলেন৷ বললেন, ‘একদিন হবে৷’ একটা ডাব্বায় ছোলা ভিজছে৷ ‘এত ছোলা?’ রামাধর হাতজোড় করে, মাথা যতটা সম্ভব হেঁট করে বললে, ‘কুস্তিতে জিতে এক মন ছোলা পেয়েছি৷ টিফিনে ছেলেদের খাওয়াই, আদাকুচি, পেঁয়াজকুচি, আর একটু লেবু আর নুন৷ ওরা খুব ভালোবাসে৷’

‘পয়সা?’

‘না, না, রামজী! ওরা ভগবান!’

‘আমাকেও লিস্টে রাখো৷’

‘জয় রামজী, জয় রামজী৷’

ইংরিজির স্যার অহংকারী৷ কোন দেশের, কোন রাজবাড়ির ছেলে৷ আড়ালে গিয়ে নিজের মনেই বলছেন, ‘ম্যাড, ম্যাড৷’

পণ্ডিতমশাই আমাদের দুজনের সঙ্গেই সেই থেকে আছেন৷ আমাদের বললেন, ‘প্রকৃত বিদ্বান৷ বুঝলে, বিদ্যা বিনয়ং দদাতি৷ সংস্কৃত কী সুন্দর বাংলা করলেন, অক্ষরে অক্ষরে৷ দেখে শেখো৷ অহংকার হল ছিন্নমস্তা—কাটা মুণ্ডু নিজেই নিজের রক্তপান করছে৷’

পণ্ডিতমশাইয়ের শরীরটা একটু ভারী৷ তাড়াতাড়ি হাঁটা-চলা করতে অসুবিধে হয়৷ উঁচু-নিচু থাকলে টলে যান৷ তাই আমি আর শঙ্কর দুজনে দু-দিকে আছি৷ হেডস্যার দোতলায় উঠছেন৷ আমরা পেছনে৷ কয়েক ধাপ ওঠার পর তাঁর ডান চটিটা পা থেকে খুলে কয়েক ধাপ নীচে নেমে এল৷ তিনি গ্রাহ্য করলেন না৷ এক পায়ে জুতো আর এক পা খালি৷ সেই অবস্থাতেই দোতলায় উঠলেন৷

শঙ্করের হাতে একপাটি জুতো৷ সে স্যারের পায়ের কাছে রাখল৷

স্যার বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ৷ জুতোটা আমার পায়ের মাপের চেয়ে এক সাইজ বড়৷’

ইংরিজির স্যার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আপনার পায়ের কি এখনো ফুল গ্রোথ হয়নি?’

স্যার বললেন, ‘আমি তো এখনো পদাঘাতে অভ্যস্ত হইনি, তাই আটে আটকে আছে৷ তবে স্কটল্যান্ডের জাতীয় দলে যখন ফুটবল খেলতুম তখন এই পা অনেক গোল করেছে৷’

কিন্তু পরে চটি রহস্য প্রকাশ পেল৷ স্যার খুব ভোরে এসে গঙ্গার ধারে বসেছিলেন৷ তারপর মনে হল স্নান করবেন৷ সাঁতার কাটবেন৷ একটা চটের ব্যাগে গামছা, হাফপ্যান্ট এনেছিলেন৷ জলে নেমে এত ভালো লাগল যে সাঁতার কেটে মাঝ গঙ্গায়৷ সেই সময় শিবমন্দিরের বিহারী সেবকের সঙ্গে খুব দোস্তি হয়ে গেল৷ তিনিও ভালো সাঁতারু৷ দুজনের কম্পিটিশান৷ স্নান সেরে এসে স্যার দেখলেন, তাঁর সব চুরি হয়ে গেছে৷ যা পরে আছে সবই ওই শিব সেবকের৷

পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘আমি তুমি বলছি—দ্যাখো, আমি মানুষ পড়তে পারি৷ বাবা, তুমি ক্ষণজন্মা৷ আচ্ছা, এইবার একটা প্রস্তাব রাখছি৷ আমার পায়ের মাপও আট৷ বাড়িতে একজোড়া নতুন পাদুকা আছে৷ বাড়ি কাছেই৷ আনিয়ে দোবো!’

‘ধন্যবাদ, ধন্যবাদ৷ নতুন জুতো পরলে এই জুতোজোড়াকে অপমান করা হবে৷ তাই না?’

‘শাবাশ, শাবাশ! কত বড় মনের মানুষ৷ কত বড় মন!’

শুনতে পেলুম, ইংরিজির স্যার চাপা গলায় বলছেন, ‘তৈল মর্দন চলছে৷’

আমাদের স্কুলের সেই শিক্ষকরা এক-একজন এক-একরকম ছিলেন৷ টিচার্স রুমে মস্ত বড় একটা কাঠের টেবিল৷ দু-পাশে ভারী ভারী চেয়ার৷ পাশাপাশি কাচের পাল্লা লাগানো আলমারি৷ আলমারিতে শুধু বই আর বই৷ একটা কাঠের পাল্লা লাগানো আলমারিতে যত দরকারি জিনিসপত্র৷ বাক্স ভর্তি চক, ব্ল্যাকবোর্ড মোছার ডাস্টার, কালির বোতল, কাগজ, খাতা৷

এই ঘর ছাত্রদের জন্যে নয়৷ পশ্চিমে দুটো বড় জানলা৷ গঙ্গার দৃশ্য, বেলুড় মঠ, পারঘাট, নৌকো, পারাপারের যাত্রী৷ অসাধারণ দৃশ্য৷ কেউ দেখেন না৷ নিজেদের কথাতেই সব ব্যস্ত৷ নিজেদের মধ্যে আকচা-আকচি৷ হেডস্যার তাঁর চেয়ারে বসেছেন৷ কী মনে হল, পণ্ডিতমশাই জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি থাকেন কোথায়?’

‘বেশ তো ‘‘তুমি’’ বলছিলেন, ‘‘আপনি’’ শুরু করলেন কেন?’

‘এই চেয়ারে যতক্ষণ, ততক্ষণ ‘‘আপনি’’৷ এইটেই নিয়ম৷’

‘আজ আমি থাকব শিবমন্দিরে৷’

‘সে কী!’

‘জায়গাটা ভীষণ ভালো লেগেছে৷ উঁচু দাওয়া৷ পশ্চিমে ফুলে ভরা টগর গাছ৷ তার পরেই গঙ্গা৷ ঘাটটাও খুব সুন্দর৷ আজ আমাদের অনেক প্রোগ্রাম৷ ওই সেবককে নিয়ে বাজারে যাব৷ যার জামা, কাপড়, জুতো পরে বসে আছি, তার একটা বিছানা নেই, মশারি নেই, থালা, বাটি, গেলাস নেই, তার কিছুই নেই৷ আজ রাতে আমরা রাম-নাম করব৷ তারপর আমি থাকব ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চৌধুরী জমিদারদের গেস্ট হাউসের তিনতলায়৷ আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন, একমাত্র বংশধরটিকে পড়াতে হবে৷ প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করাতে হবে৷ এইসব সাধারণ স্কুলে ছেলেটিকে ভর্তি করা যাবে না৷ ওই পরিবারের অনেক সমস্যা৷ প্রচুর শত্রু৷ সে-সব কথা না শোনাই ভালো৷ বলতে নেই, শুনতে নেই, বড়লোক হতে নেই৷ ওই শিবমন্দিরের পাশের ছোট্ট ঘরটা, ওই জমিদার বাড়ির তিনতলার চেয়েও সুন্দর৷ দু-একটা সাপ আছে৷ সে থাক৷’

‘আজকের আহার?’

‘কেন? রামাধরের ছোলা, সঙ্গে মুড়ি৷ রাত্তিরে হবে খিচুড়ি ভোগ৷’

‘ওই জমিদার বাড়ির মতোই আপনি রহস্যময়৷ সেই রহস্যে আর এক রহস্য যুক্ত হল৷ বেশি জানার চেষ্টা করাটা অভদ্রতা৷ তবে এমন জীবন লোভনীয়৷ আমার বয়েস হয়ে গেছে৷ তবে হ্যাঁ, আমার কাছে একটা রহস্য আছে৷’

‘বলুন, বলুন৷’

‘আমার মা মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আমাকে একতাল জট পাকানো সুতো দিয়ে বললেন, ‘‘জট ছাড়াবার চেষ্টা করিস, যদি খুলতে পারিস, তাহলে এই জন্মটাই জানবি তোর শেষ জন্ম, আর তোকে এই পৃথিবীতে আসতে হবে না৷’’ আমি রোজ চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না৷’

‘আমাকে একবার দেবেন? যদি আপত্তি না থাকে?’

আবার ইংরিজির স্যার৷ টিচার্স রুম থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমরা কি অনন্তকাল বসেই থাকব?’

‘কেন, বসে থাকবেন কেন? আপনাদের যার যা কাজ আছে রুটিন অনুযায়ী করুন৷’

‘বাঃ, আপনি আমাদের অ্যাড্রেস করবেন না? পরিচিত হবেন না?’

‘অবশ্যই হব৷ তবে ওভাবে নয়, এক এক করে এই ঘরে৷ তবে সবার আগে পরিচিত হব ছাত্রদের সঙ্গে৷ সেই ব্যবস্থাটা করুন৷’

পণ্ডিতমশাইকে নিয়ে আমরা নীচে নেমে এলুম৷ নামতে নামতে বললেন, ‘মানুষের ভেতরটা খুব অপরিষ্কার৷ এক-একজন মানুষ এই রকম থাকে৷ এরা পৃথিবীতে খুব একা৷ শোন, শিবমন্দিরের চাতালে রাম নাম শুরু হলে আমাকে নিয়ে যাবি৷ আমি করতাল বাজাব৷ তোরা ছুটে গিয়ে বিহারীকে বলে আয়—বিকেল চারটে, সাড়ে চারটে নাগাদ আমার বাড়ি থেকে দুধ পাঠিয়ে দেবো—বাবার পায়েস হবে৷’

চার

সন্ধ্যা হল, প্রায় সাতটা৷ স্কুল থেকে বেরিয়ে আমরা শিবমন্দিরের চাতালে চলে এসেছি৷ সুন্দর, সিমেন্ট বাঁধানো৷ আমরা আসার একটু পরেই হেডস্যার এলেন, আর সবচেয়ে আশ্চর্য, সঙ্গে রয়েছেন ইংরিজির স্যার! দুজনে যেন কতদিনের বন্ধু—ম্যাজিক! এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কী হয়ে গেল কে জানে! এই শিবমন্দিরের ঘাটে আসতে অনেকেই ভয় পায়৷ একপাশে বিরাট একটা বটগাছ, আর একপাশে অশ্বত্থ৷ বটের ঝুরি নেমেছে এদিকে-ওদিকে৷ সন্ধেবেলা দেখলে ভয় করে৷ জায়গাটা সব সময় কেমন যেন অন্ধকার, অন্ধকার৷ আর কী জানি কেন, মাঝে মাঝেই মানুষের মৃতদেহ এই ঘাটে এসেই আটকায়৷ কয়েকদিন আগে এক সুন্দরী মহিলার মৃতদেহ এসে আটকেছিল৷ বড় বড় চুল জলে ছড়িয়ে আছে৷ ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে৷ ভেসে ভেসে যাচ্ছে৷ দুর্গার মা এসে খবরটা দিলে৷ নিশ্চয়ই কোনো বড় ঘরের মেয়ে৷ এই ঘাটটায় একটা কিছু আছে৷ শঙ্করও স্বীকার করেছিল, সত্য কি মিথ্যা বলতে পারব না, তবে অনেকেই বলেন এই ঘাটের তলায় বিশাল একটা গহ্বর আছে সেই গহ্বরে কুল কুল করে গঙ্গার জল ঢোকে৷ আর মাঝে মাঝে ঘাটের তলা থেকে ধবধবে সাদা একটা অনেক গয়না পরা হাত বেরিয়ে আসে৷ যেমন হঠাৎ বেরিয়ে আসে সেই রকম হঠাৎই অদৃশ্য হয়ে যায়৷ আর যে এটা দেখে সে তিনদিনের মধ্যে আত্মহত্যা করে৷ করবেই করবে৷

স্যার একটা ঝ্যাঁটা হাতে নেমে পড়েছেন৷ মালকোঁচা মারা ধুতি৷ গায়ে একটা গেঞ্জি৷ ফর্সা রং৷ একমাথা কালো চুল৷ খাড়া নাক৷ আর চোখ দুটোর মধ্যে কী যেন কী আছে৷ তাকালেই শরীরটা কেমন যেন অবশ হয়ে যায়৷

আলো, মালা, ফুল, মন্দিরের আজ খুব সাজ৷ খবর খুব ছড়িয়েছে৷ ‘বিরজা উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে’ এমন এক প্রধান শিক্ষক এসেছেন, যে শিক্ষক গঙ্গার ধারের শিবমন্দিরের রাম-নাম সঙ্কীর্তন করবেন৷ বিহারীবাবার মন্দিরে বিহারীদেরই আধিপত্য৷ মহাবীরের পুজো হয়৷ মল্লযুদ্ধ হয় মাঝে মাঝে৷ যত গণ্যমান্য মানুষ এসেছেন আজ৷ মেয়েরাও এসেছেন৷ উঁচু চাতালে আসর৷ পণ্ডিতমশাই আমাদের দুজনের কাঁধে দুটো হাত রেখে আসরের দিকে এগোচ্ছেন৷ কাঁধের ঝোলায় করতাল৷ মাঝে মাঝে সামান্য শব্দ করছে৷ পণ্ডিতমশাইয়ের শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা৷ অদ্ভুত সুন্দর দেবালয়, দেবালয় গন্ধ৷ শঙ্কর তো কেঁদেই ফেলল, ‘এমন পবিত্র মানুষ কি আমরা কোনোদিন হতে পারব! কী করে হওয়া যায় তাও তো জানি না৷ চল, আমরা হিমালয়ে চলে যাই৷’ আবার বলে, ‘হিমালয়ে গেলেই হবে? হবে না! গুরু চাই, তপস্যা চাই৷ মা চলে যাবেন৷ কোনো আশা নেই৷ মাঝে মাঝে একটু ভালো, পরক্ষণেই খারাপ৷ এরই মাঝে একদিন দুপুরে হঠাৎ বললেন, তুই এখনো খুব ছোটো৷ সব কথা বুঝতে পারবি না, শুধু একটা কথা মনে রাখিস—কান্নাকে কাজে লাগাতে হবে, বৃষ্টির জলে ডাল ভালো সেদ্ধ হয়, স্বাতী নক্ষত্রের জলে ঝিনুকের পেটে মুক্তো হয়৷ দুঃখের সন্ধানে আনন্দ পাবি, আনন্দের সন্ধানে দুঃখ৷’

‘এই সেরেছে!’

শঙ্কর বললে, ‘কী হল?’

‘ওই দেখ, পল্টু পাগলা এসেছে৷’

‘আসুক না, যে যেখানে আছে সবাই আসুক৷’

‘সব লণ্ডভণ্ড করে দেবে৷ মনে আছে দুর্গাপুজোর পর বারোয়ারি তলায় যাত্রা হচ্ছিল, পল্টু একটা ষাঁড় ঢুকিয়ে দিয়েছিল৷’

‘এখানে কিচ্ছু করতে পারবে না৷ হেডস্যারের চোখ দুটো দেখেছিস?’

বিহারীবাবার গুরু একটা ‘রাম সিঙ্গা’ রেখে গিয়েছিলেন, সেইটা আজ বেরিয়েছে৷ খোল, ঢোল, হারমোনিয়াম৷ স্যার প্রথমে মা গঙ্গার আরতি করলেন বড় একটা ঘণ্টা বাজিয়ে৷ পাঠ করলেন, গঙ্গা স্তোত্র৷ সুরে৷ অনেকেই গলা দিলেন৷ ধূপ আর ধুনোর ধোঁয়া পাক মেরে মেরে আকাশের দিকে উঠছে৷ বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে৷ আলো পড়ায় মনে হচ্ছে মহাদেবের জটাজাল৷ হঠাৎ সবাই চমকে উঠলেন, যেন মেঘের গম্ভীর গুড়ুগুড়ু৷ পণ্ডিতমশাইয়ের নাভিদেশ থেকে বেরিয়ে আসছে একটানা শব্দ ওঁ৷ আকাশ, বাতাস, ভূমি কাঁপছে৷ ঝরঝর করে ঝরে পড়ল অনেক বটফল৷ এমন ঘটনা এই ঘাটে আগে কখনো হয়নি৷ পর পর চারটে ঘাট৷ তিনটে ঘাটের ইতিহাস মোটামুটি জানা যায়৷ এই ঘাটের ইতিহাস অজানা৷ অনেক টাকা খরচ করে কেউ একজন করেছিলেন৷ তিনি কে?

জটাজূটধারী এক সন্ন্যাসী নৌকা থেকে নামছেন৷ ত্রিশূল হাতে৷ নৌকাটা এল উত্তর দিক থেকে৷ বিরাট তাঁর চেহারা৷ তিনি থমথম করে উঠে আসছেন৷ কোনো দিকে তাকাচ্ছেন না৷ মুখে কোনো কথা নেই৷ সভায় এসে শিঙাটা তুলে নিয়ে ফুঁ দিলেন৷ সে এক অদ্ভুত শব্দ৷ এমন শব্দ হঠাৎ শোনা যায় না৷ শুরু হল হনুমান চালিশা পাঠ৷ শঙ্কর আমার কানে কানে বললে, ‘এই মহাপুরুষ কোথা থেকে এলেন?’

শিবমন্দিরের উল্টো দিকে রাস্তার ওপারে একটা চালা৷ সেখানে ভোগ রান্না হচ্ছে৷ দুটো হ্যাজাক লাইট চচ্চড় করে জ্বলছে৷ খুব আলো৷ মানুষগুলোকে সব কালো কালো দেখাছে৷ দেখি কী—দুর্গার মা বাটনা বাটছে৷ সত্যি! এই এক মহিলা, যে-কোনো পূজাপার্বণে হাজির৷ জান-প্রাণ দিয়ে খাটে৷ তবু যে কেন ভাগ্য ফেরে না?

শঙ্কর শুনে বলেছিল, ‘ভাগ্য বলতে তুই কী বুঝিস?’

শিঙা বাজতেই চালিসা শুরু হয়েছিল, এইবার শুরু হল রাম-নাম৷ বটগাছের একটা মোটা ডাল ভীষণভাবে নড়ে উঠল৷

শঙ্কর বলে, ‘ভয় পাস না৷ আমি তুলসীদাসজীর জীবনীতে পড়েছি, যেখানে ভক্তিভরে ঠিক ঠিক রাম-নাম হয় সেখানে মহাবীর শুনতে আসেন৷ আমার মনে হচ্ছে মহাবীর এলেন৷’ শঙ্কর এইসব কথা এমনভাবে বলে অবিশ্বাস করা যায় না৷ সেই জটাজূটধারী মহাপুরুষ কিছুক্ষণের মধ্যেই কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷ শঙ্করকে জিগ্যেস করলুম, ‘কী ব্যাপার বল তো৷’

শঙ্কর বললে, ‘দেখে যা, শুনে যা৷ প্রশ্ন করিস না৷’

হঠাৎ দেখছি একেবারে ওপাশের উঁচু ধাপে এক বয়স্ক মহিলা বসে আছেন৷ সাদা সিল্কের থান, আলোয় চিকচিক করছে৷ সাদা চুলের ঢেউ৷ দুধের মতো ফর্সা৷ মুখটা যেন পাথর কোঁদা৷ কোনো ভাস্করের তৈরি৷ স্থিরভাবে বসে আছেন, যেন পাথরের মূর্তি! শঙ্করকে ফিসফিস করে বললুম, ‘দেখেছিস?’

‘দেখেছি, দেখছি৷ চুপ কর৷’

এমন মহিলাকে এই পাড়ায় আগে কখনো দেখিনি৷ সঙ্কীর্তন খুব জমেছে৷ গঙ্গার ওপর দিয়ে সুর ভাসতে ভাসতে কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছে৷ রাত বাড়ছে৷ আমি জানি, একটু পরে এই মায়ের মূর্তিও অদৃশ্য হবেন৷

গান শেষ হল৷ জয়ধ্বনি উঠল৷ আর তার পরেই একটি যুবক কোথা থেকে এসে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল, আর বলতে লাল, ‘স্যার! আমি চোর, আমি চোর৷ আপনার ব্যাগ আমি চুরি করেছিলুম৷ তখন, আমি বুঝিনি, তখন আমি বুঝিনি৷ এই সেই ব্যাগ৷ দশ হাজার টাকা৷ আমি একশোটা টাকা খরচ করেছি৷ আমার মায়ের খুব অসুখ৷ আমি আগে কখনো চুরি করিনি৷ এই প্রথম৷’

স্যার নেমে এলেন৷ সেই ছেলেটির পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘তোমার মায়ের কী হয়েছে?’

‘না খেয়ে, না খেয়ে টিবি৷’

‘বাবা?’

‘নেই, নিরুদেশ৷’

‘আজ আর কোনো কথা নয়৷ কাল স্কুলের পর আমি তোমার বাড়ি যাব৷ আর এই ব্যাগ থেকে দু-হাজার টাকা বের করে নাও৷’

‘আমি চোর৷’

স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ‘যে নিজেকে চিনতে পারে সে মহামানব হয়ে যায়৷ এখানে প্রসাদ গ্রহণ করো, বাড়ির জন্যে নিয়ে যাও৷’

ব্যাগটা শঙ্করের হাতে দিয়ে স্যার বললেন, ‘ওকে দু-হাজার টাকা দিয়ে দাও৷ ব্যাগটা তোমার কাছে রাখো৷’

স্যার মন্দিরে উঠে গেলেন৷ তাকিয়ে দেখলুম, সেই অসাধারণ মহিলা সেই একই জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছেন৷ অদৃশ্য হয়ে যাননি৷ স্যার মন্দিরের রকে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বললেন, ‘দেখতে পাচ্ছি পল্লির সমস্ত বিশিষ্টজনেরা এসেছেন৷ আমার সশ্রদ্ধ নমস্কার৷ আমি এখানকার ইতিহাস বিখ্যাত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়ে আপনাদের কাছে এসেছি৷ শুধু আমি আসিনি, আমার মাতৃদেবীও এসেছেন৷ আমার এই জীবন তাঁরই দান৷ আমার শিক্ষা-দীক্ষা-বড় হওয়া, আমার বুদ্ধি-সুদ্ধি-মেধা-ধৃতী-পুষ্টি সব মায়ের দান, সকলের জীবনই মা, মা ছাড়া জগতে কিছু নেই, ত্বং স্বাহা, ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্‌কার স্বরাত্মিকা, মা, মা—’

এমন একটা ভাব ধূপের ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ল যে সবাই একসঙ্গে মা, মা বলে উঠলেন৷ পণ্ডিতমশাই ছটফট করছেন৷ বেশ বুঝতে পারছি তাঁর ভেতরে মন্ত্রের ঢেউ উঠেছে৷ গম্ভীর সুরে একটুখানি উপচে পড়ল, ‘সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যে ত্রিধা মাত্রাত্মিকা স্থিতা ওঁ—দেবী, আপনিই এই জগৎ ধারণ করে আছেন, এই সৃষ্টি আপনার, আপনি মা’—গলা বুজে আসছে, চোখে জল৷

কে মা! কোথায় মা! সব চোখই সেই মাকে খঁুজছে৷ সেই জননীকে৷ ধীরে ধীরে তিনি উঠে দাঁড়ালেন৷ সেই মহিলা, শ্বেতপাথরের মূর্তি৷ যাঁকে মনে হয়েছিল কিছুক্ষণের মধ্যে বাতাসে মিলিয়ে যাবেন৷ সবাই অবাক হয়ে দেখছেন৷ তিনি ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ সবাই উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেন৷ পণ্ডিতমশাই প্রণাম করলেন৷ স্যার বললেন, ‘আমার মায়ের অনেক কথা৷ সে সব কথা আজ আর নয়৷ আমার মা সুগায়িকা৷ যদি অনুমতি করেন আপনারা তাহলে আমরা মা গঙ্গাকে, মহেশ্বরকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত নিবেদন করব৷ আমাদের গুরুদেব আচার্য পরমানন্দস্বামী হঠাৎ এসে পড়েছেন৷ সারা ভারতের মানুষ তাঁর ভজনে মুগ্ধ৷’

আমার বাবা আর শঙ্করের বাবা দুজনেই এসেছেন৷ খুব কাছেই আমাদের বাড়ি৷ বাবা বললেন, ‘দৌড়ে গিয়ে আমার এসরাজটা আনবি!’ শঙ্করকে বললুম, ‘পণ্ডিতমশাইকে দেখিস, আমি আসছি৷’ বাড়িতে তালা খুলে ঢুকলুম৷ দোতলার বারান্দায় একটি মাত্র আলো জ্বলছে৷ পশ্চিমে তাকালেই গঙ্গা৷ ডানদিকে, অর্থাৎ পূর্বদিকে পাশাপাশি চারটে ঘর৷ একটা ঘর বেশ বড়৷ বসার ঘর৷ গানের ঘর৷ পূর্বপুরুষদের ছবি দেয়ালে৷ আলোটা জ্বালতেই মনে হল, কারা যেন চলে গেলেন৷ জানি, আমি ভীতু৷ সাহসী হওয়ার চেষ্টা করি, ভয় তবু জয় করতে পারি না৷ ঘরে ঢুকতে গিয়েই থমকে দাঁড়াতে হল৷ কার্পেটের মাঝখানে সেই অপূর্ব সাপটা৷ নীচের দিকটা কুণ্ডলী পাকিয়ে ফণা তুলে আছে৷ চোখ দুটো আলো পড়ে ‘রুবির’ মতো জ্বলজ্বল করছে. আমার এত ভয় কিন্তু একে আমি ভয় পাই না৷ এ আছে, কী নেই তাও জানি না৷ আমার ভেতরটা আমাকে বলে দিয়েছে—এই তোর জীবন, এই তোর মরণ৷ এই সুন্দরকে আমি ভালোবাসি৷ আমি জানি আমার শেষদিনে এর একটি চুমুতেই আমি চলে যেতে পারব সেইখানে, যেখানে আমার প্রিয়জনেরা আছেন৷ সেই সব নিষ্ঠুররা! ছবি হয়ে দেয়ালে ঝুলছেন৷ মালা পরছেন৷

দু-পা এগোতেই যা হয়, তাই হল—সাপ অদৃশ্য৷ মাটি ফুঁড়ে উঠেছিল, মাটিতেই ঢুকে গেল৷ মখমলের কোলে বাবার এসরাজ৷ আসরে এসে দেখি আসর তৈরি৷ মন্দিরে সবই ছিল৷ যে যুবকটি স্যারের ব্যাগ সরিয়েছিল, সে স্যারকে বলছে, ‘আমাকে তবলা বাজাতে দেবেন! আমি পারি৷ আমার দাদুর কাছে শিখেছি৷ না পারলে নামিয়ে দেবেন৷’

স্যার বললেন, ‘অবশ্যই বাজাবে৷’

‘আমি যে চোর!’

‘সেই চুরি তো এখন দক্ষিণা৷’

‘আমার মায়ের গান, যে শুনেছে...’ আর বলতে পারল না৷

স্যার বললেন, ‘কান্নাকে ভেতরে চেপে রাখতে শেখো, তাহলেই তুমি শিল্পী হতে পারবে, ভেতরের বাগানে ফুল ফুটবে৷’

স্যার আসরে উঠে গেলেন৷ বাবাকে আপ্যায়ন করে প্রণাম করে বসালনে৷ ঘোষণা করলেন, ‘আজ বাগেশ্রীর রাত’৷ একটা নয় দু-দিকে দুটো তানপুরা৷ শঙ্করের বাবা বসেছে হারমোনিয়ামে৷ অনেকেই ভাবছেন কী হয়, কী হয়৷ মাঝখানে বসেছেন বিরাট চেহারার সাধক৷ তাঁর একপাশে স্যার, আর একপাশে তাঁর মা৷ কার কী মনে হচ্ছে জানি না৷ স্বর্গের অনেক গল্প শুনেছি, এ যেন সেই স্বর্গ৷

পেছন দিক থেকে আমার মাথায় কে যেন টোকা মারল৷ চমকে তাকিয়ে দেখি দুর্গার মা৷ ইশারায় ডাকল৷ একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে৷ চওড়া পাড়, সাদা শাড়ি, ব্লাউজ৷ বেশ লম্বা৷ ফর্সা৷ পাতলা, খাড়া নাক৷ নাকে পাথর বসানো নাকছাবি৷ চোখ দুটো কী সুন্দর! চেরা চোখ৷ বেশ ধারালো৷ এমন করে কোনোদিন দেখিনি৷ যেখানে রান্না হচ্ছে আমাকে সেইখানে নিয়ে গেল৷ চাপা গলায় বললে, ‘সেই কখন খেয়েছিস৷ ছেলেটাকে কেউ দেখে না, সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত৷ দেখেছিস, নাকে কী পরেছি৷ তোর মা আমাকে দিয়েছিল৷ দুর্গা, দুর্গা, দুর্গা কোথায় গেলি?’

ওপাশের চালা থেকে দুর্গা বেরিয়ে এল৷ সত্যিই দুর্গা৷ মায়ের মতো নাক, চেরা চোখ, কত চুল, ফর্সা৷ একসময় মায়ের মতোই লম্বা হবে৷ আমার মতোই বয়েস, কি একটু কম৷ আমি দেখছি, আবার দেখছি না৷ চাঁদের আলোর রাতে, নদীর ধারে, বাগানে মেয়েদের দেখতে নেই৷ শঙ্কর আমাকে সাবধান করে দিয়েছে৷ মেয়েরা এই সময় রাধা হয়ে যায়৷ শঙ্কর আমাকে বলে দিয়েছে দামি কাচের গেলাসের মতো নিজেকে খুব সাবধানে রাখবি৷

দুর্গার মা বললে, ‘গরম বেগুনি নেমেছে, আড়ালে নিয়ে গিয়ে দাদাকে দুটো খাইয়ে দে৷’

দুর্গা আমার ডান হাতের কবজিটা ধরেছে৷ আঙুলগুলো কী লম্বা, লম্বা! হাতটা কী নরম৷ জমিটা সমতল নয় উঁচু-নীচু৷ চাঁদের আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই৷ দূরের রাস্তায় একটা ল্যাম্পপোস্ট৷ ঝাঁকড়া একটা জামরুল গাছ৷ দুর্গা খুব কাছে৷ বলছে, ‘ভয় নেই আমি আছি৷’ বাতাসে বাগেশ্রী ‘কোলকাতা ভাই!’ স্যারের ব্যাগ সরিয়েছিল সহদেব৷ কী সুন্দর বাজাচ্ছে৷ এসরাজ থেকে থেকে কেঁদে উঠছে৷ দুর্গা বলছে, ‘এই জায়গাটা খুব উঁচু-নীচু—আমার কাঁধটা ধরো৷ ভয় নেই আমি আছি৷’ আমি আজ ফণা তোলা সাপ দেখেছি৷ ফণায় খুব কারুকার্য৷ ছোবলে মারাত্মক বিষ৷

১৯৫০ সালের এই ঘটনা৷ অবিশ্বাস্য এক রাত৷ আমি লিখে রেখেছিলুম৷ শঙ্করকে দেখাইনি৷ সে ভীষণ পুরুষ৷ ভীষণ শাসন৷ ষোলো বছর বয়সে একটা ছেলের ভেতরে কী সব হয়, হতে পারে সে জানে না৷ মানুষের চোখ কেন জলে ভরে যায় শঙ্কর বলতে পারবে না৷ গরম বেগুনি কি শুধু উনুনের আগুনে গরম খাতাটা মায়ের বেনারসির ভাঁজে আলমারিতে রাখা ছিল৷ আতরের গন্ধ৷ সেই সময়ে আমাদের পাড়ায় ছিলেন বিখ্যাত ইংরিজি কাগজের নামকরা সাংবাদিক৷ ওই রাতের আসরে তিনি ছিলেন, বলেছিলেন, ‘অনেক আসরে আমি গেছি, লিখেছি—এমন হয়নি, হবে না কখনো৷’

সময় এক অশ্বারোহী৷ ধুলো উড়িয়ে ছুটছে৷ সে-রাতের সাক্ষী আমি আর ওই মহাদেব ছাড়া কেউ নেই৷ শঙ্কর হঠাৎ একদিন কোথায় চলে গেল৷ ফেলে রেখে গেল একটি লাইন, ‘নাঃ, এই সংসারে আর থাকা গেল না৷’ বাবা, এসরাজটা আমার কোলে রেখে বলে গেলেন, ‘ছড় টানলেই সাড়া পাবে৷’ তখনই সন্দেহ হয়েছিল, স্যারের মা ছিলেন বিদেশিনী৷ আইরিশ৷ দুজনেই চলে গেছেন আয়ার্ল্যান্ডে৷ সঙ্গে নিয়ে গেছেন সহদেব ও তার মাকে৷ সেখানে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিক্ষার কেন্দ্র হয়েছে৷

আর আমি?

আমি নৃতত্ত্ববিদ৷ হাড়গোড়ই আমার দুনিয়া৷ খুঁজছি, আজও খুঁজছি—দুর্গার কঙ্কাল৷

অধ্যায় ১ / ৮৩
সকল অধ্যায়
১.
সেই রাত
২.
হেডস্যারের মায়াজাল
৩.
রেখা
৪.
নিরঞ্জন স্যার
৫.
নবেন্দুর দলবল
৬.
জনার্দনের জরদার কৌটো
৭.
হাসি কান্না চুনি পান্না
৮.
রাবণবধ
৯.
হেডস্যারের সমাজসেবা
১০.
এক রাজার গল্প
১১.
রসবড়া
১২.
বাঘের সার্কাস
১৩.
সাইকেল বিভ্রাট
১৪.
দেশি সাহেব,বিলিতি নেড়ি
১৫.
বেত আর বাত
১৬.
এই সেই বাড়ি
১৭.
কাঁঠাল
১৮.
আমি অন্তহীন
১৯.
আনারকলির উপহার
২০.
আছে কোথাও
২১.
ঘুরঘুরে
২২.
অঞ্জলি
২৩.
অঙ্কই ভগবান
২৪.
দিদি
২৫.
সিঁড়ি
২৬.
পেয়ারা গাছ
২৭.
কণ্ঠস্বর
২৮.
সাটিন-ভেলভেট
২৯.
বন্ধু
৩০.
অরণ্যের উপকথা
৩১.
শেষ গোলাপ
৩২.
অনুসন্ধান
৩৩.
শান্তি
৩৪.
অংশীদার
৩৫.
টপ সিক্রেট
৩৬.
প্ল্যাটফর্ম
৩৭.
সাগর
৩৮.
রামুদা
৩৯.
হেডস্যার
৪০.
হেডস্যারের জুতো
৪১.
আলোর নিচেই অন্ধকার
৪২.
সে এক কাণ্ড
৪৩.
দাদুর কাঁঠাল
৪৪.
দাদুর ইঁদুর
৪৫.
দাদুর দ্বিতীয় ইঁদুর
৪৬.
দাদুর দাঁদানো বাঁত
৪৭.
দাদুর বেড়াল
৪৮.
দাদুর বাগান
৪৯.
অহিদার চোরধরা
৫০.
আমি ও টম
৫১.
টম আর দুলী
৫২.
বাবার বাবা
৫৩.
গোল
৫৪.
উদ্ধার
৫৫.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
৫৬.
দুখপাইয়ে তো সুখ লাগাইয়ে
৫৭.
জ্ঞানী
৫৮.
দিদি আর পিকলু
৫৯.
শেষ খাওয়া
৬০.
নির্জন বনপথ
৬১.
ঋণ শোধ
৬২.
নতুন ফসল
৬৩.
অরূপ যাত্রা
৬৪.
পয়সার ফয়সালা
৬৫.
ফানুস
৬৬.
বালির ওপর পোল
৬৭.
বাঘমারি
৬৮.
কুশলের সাইকেল
৬৯.
আমিই গোয়েন্দা
৭০.
ফেরা
৭১.
গোলকিপার
৭২.
সন্ধান
৭৩.
ফুল হয়ে ফোটার কালে
৭৪.
কৃপা
৭৫.
বড় বিল
৭৬.
রকেট
৭৭.
দুটো বেজে পাঁচ
৭৮.
সোনার হরিণ
৭৯.
বিচার
৮০.
অনাথ
৮১.
ভোলা
৮২.
আগুন
৮৩.
ডানাকাটা পাখি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%