প্রীতম বসু
পরদিন সকালে স্টেশনে অপেক্ষা করছিল গোবিন্দ অধিকারী। পদাবলী ট্রেন থেকে নামতেই গোবিন্দ অধিকারীর মেঘলা মুখটা আলোকিত হয়ে উঠল স্টেশন থেকে সাইকেল রিক্সা নিল গোবিন্দ অধিকারী। বিডিও অফিস মোল্লারহাটে বাস রাস্তার পাশে।।
বিডিও অফিসের সামনে অনেক সাইকেল, স্কুটার, একটা পুরোনো সরকারি জিপ রাস্তার পাশে দাঁড় করানো। পানের দোকানে কিছু লোক দাঁড়িয়ে। সরু সিঁড়ি দিয়ে দু‘জনে দোতলায় উঠে এল।
একটা বড় হল ঘর। দেওয়ালের গায়ে পাশাপাশি অনেকগুলো লোহার আলমারি রাখা। আলমারিগুলোর মাথায় ধুলোয় ঢাকা ঠাসা ফাইল। সারিসারি ডেস্ক, চেয়ার। প্রত্যেক ডেস্কে ফাইল স্তূপীকৃত। এখনো কর্মচারিরা অনেকে আসেনি। হলের শেষে বিডিও সাহেবের ঘর। বিডিও সাহেব এখনো এসে পৌঁছোয় নি। দু‘জনে কামরার বাইরে অপেক্ষা করল। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না। পানমশলা চিবোতে চিবোতে বিডিও সাহেব প্রবেশ করল। জামার ওপর কালো কোট, গলায় মাফলার। গোবিন্দ অধিকারীর দিকে ভুরু নাচিয়ে নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
“আমি গোবিন্দ অধিকারী, স্যার ডেকেছিলেন, গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘আসুন,’ বিডিও ঘড়ি দেখল।
ভিতরে ঢুকে বিডিও নিজের চেয়ারে বসল না। পাশের দেওয়ালে বোর্ড পিন দিয়ে একটা বড় ম্যাপ সাঁটা। বিডিও সেদিকে গিয়ে বলল, ‘একটা গুড নিউজ দিই।’
করতালতলীতে আসার পর থেকে গুড নিউজ পদাবলী কদাচিৎই পেয়েছে। তাই মনে সন্দেহ। বিডিও ম্যাপে একটা জায়গা দেখিয়ে বলল, ‘এই হল আমার অফিস। আমাদের এই বাস-রাস্তা থেকে এই ট্রেন স্টেশন পেরিয়ে আপনাদের করতালতলীর খেয়াঘাট পর্যন্ত সরকার পিচের রাস্তা বানাচ্ছে। এই রাস্তাটা।’
“বাঃ, তাহলে তো খুব ভালই হয়,’ গোবিন্দ অধিকারী অত ম্যাপ-ট্যাপ না দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল।
পদাবলী ম্যাপের দিকে এগিয়ে গিয়ে ভালভাবে দেখে বলল, “কিন্তু এখানে তো নীলমাধবের মন্দির? আপনার রাস্তা মন্দিরের ওপর দিয়ে গেছে?”
‘হ্যাঁ, ওটাই স্ট্রেট লাইন। সরকারি রাস্তা তো আর ভক্তদের মত মন্দিরকে প্রদক্ষিণ করবে না। রাস্তা সোজাই যাবে। আর তাছাড়া পুরনো মন্দির, ষাটপঁয়ষট্টি বছর পুজোও হয় না। শুনেছি সাপ খোপের আড্ডা হয়ে রয়েছে, এসব জায়গাতেই দুষ্কৃতিদের ঠেক হয়। তাই মন্দির ভেঙেই -
‘মন্দির ভেঙে!’ গোবিন্দ অধিকারীর দু‘চোখে আতঙ্ক।
‘অসম্ভব!’
বিডিও এধরণের ঔদ্ধত্যের সঙ্গে পরিচিত না। ওর দু‘চোখে রাগ দপ করে জ্বলে উঠল। নিজের ডেস্কে গিয়ে চেয়ারে বসে নিচু হয়ে থু-থু করে পানমশলাটা বাতিল কাগজের বালতিতে ফেলে বলল, ‘এটা আমার ডিসিশন না। সরকারের সার্ভেয়ার ঠিক করেছে। সরকারের কাজে আপনি বাধা দিতে পারেন না। যেহেতু এটা আপনার জমির এলাকায় তাই আপনার সঙ্গে একটা আলোচনা করার জন্যই আপনাকে ডাকা হয়েছে। সরকারের রেট অনুযায়ী আপনাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’
‘এত বছর আপনাদের রাস্তা বানাবার কোনও হেলদোল ছিল না। আজ হঠাৎ আপনারা করতালতলীতে পিচের রাস্তা বানাবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন! এটা কি রিসর্ট বানাবার জন্য?’ গোবিন্দ অধিকারী চাঁচাছোলা প্রশ্ন করল।
‘আমার যা বলার আপনাকে বলেছি। সরকারের চিঠি আপনার কাছে শিগগিরই পৌঁছে যাবে।’
‘আমি আদালতে যাব।’
‘আপনি কোর্ট কাছারি করতে পারেন। তবে লাভ হবে না। মাঝখান থেকে উকিল আপনার গলা কেটে পয়সা বানাবে। সরকারের বিরুদ্ধে কেসে আপনি জিততে পারবেন না। এখন আপনি উঠুন, আমার অন্য দরকারি কাজ আছে।’
আর কথা বলার মানে হয় না। দু‘জনে দরজা ঠেলে বিডিওর কামরার বাইরে বেরিয়ে এল। দু‘জন দর্শনার্থী দরজার বাইরে অপেক্ষা করছিল। তাদের দেখেই পদাবলীর মাথা রাগে চিড়বিড় করে উঠল।
মনু সেন আর মুনশি। মুনশির মুখে কুটিল চাপা হাসি।
***
রাস্তায় নেমে গোবিন্দ অধিকারী রিক্সা ধরল - খেয়াঘাট।” ‘খেয়াঘাট?’ পদাবলী অবাক। ‘কোথায় যাবেন?”
‘ধুতরোহাট।’
‘ওখানে কেন?’
‘ইমিডিয়েট কীর্তনের দল না তৈরি করতে পারলে মন্দিরকে বাঁচাতে পারব না। গীত বায়েন ছাড়া কারুকে এত তাড়াতাড়ি পাব না।’
রিক্সায় সারাটা পথ গোবিন্দ অধিকারী একটাও কথা বলল না। লোকটার ডান হাতের আঙুলগুলো রিক্সার গায়ে ধীরে ধীরে কম্পমান। লোকটা ভাবছে। ভাবছে গীত গায়েনের কথা। পদাবলী চুপ করে বসে রইল।
খেয়াঘাটে পৌঁছে দেখল একটা খেয়া সবেমাত্র ছেড়ে গেল। ‘যাঃ! বেরিয়ে গেল?’ পদাবলী আক্ষেপ করল।
“আধ ঘন্টায় আরেকটা ছাড়বে,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘তুমি বোস, কথা আছে।’
পদাবলী ঘাটের শান-বাঁধানো বেঞ্চে বসল। পায়ের কাছে বুড়িকোশীর জল ছলাৎ ছলাৎ করে সিঁড়িতে আছড়ে পড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে গোবিন্দ অধিকারী বলল, ‘করতালীর কীর্তনকে বাঁচাতে গীতের অনুকম্পা - গোবিন্দ অধিকারী কথা শেষ করল না। চুপ করে গেল ৷
পদাবলী চুপ থাকাই সমীচীন মনে করল। গোবিন্দ অধিকারী নিজেই বলবে সব কথা।
‘সত্যি বলতে কি ওই মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার মত মনের জোর আমার নেই,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘ওর সঙ্গে আমি যা অন্যায় করেছিলাম তা ক্ষমাহীন।’ গোবিন্দ অধিকারী পদাবলীর চোখের দিকে তাকাল। চোখের দৃষ্টিতে সংকোচ।
“কী হয়েছিল?”
‘ঈর্ষা,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল।
‘ঈর্ষা?”
“হ্যাঁ, প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর ঈর্ষা, হিংসা। রাধা-চন্দ্রাবলীর মত। ‘চন্দ্রাবলী?’
‘বৃন্দাবনে রাধিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিনী। দু‘জনেই শ্রীকৃষ্ণের প্রেমিকা। শ্রীকৃষ্ণ দু‘জনের প্রেমেই মত্ত। মুখশ্রী দর্শন তো দূরের কথা, দু‘জনে দু‘জনের নাম সহ্য করতে পারত না। চন্দ্রাবলী এমনকি অনুরাধা নক্ষত্রেরও নাম নিত না কারণ তাতে রাধা শব্দটা আছে। শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় চলে গেল, রাধার হৃদয় ভেঙে গেল, রাধা শোকে মূর্ছা গেল। সে মূর্ছা কিছুতেই ভাঙে না, সকলে ধরেই নিল যে রাধার শেষ সময় উপস্থিত। সখী এসে চন্দ্রাবলীকে বলল শ্রীরাধার দশমী দশা শিয়রে। সখী ভেবেছিল চন্দ্রাবলী খুশি হয়ে তাকে মুক্তার মালা দেবে, কিন্তু চন্দ্রাবলী কাতর হয়ে বলল – যেভাবেই হোক রাধাকে বাঁচাও।’ -
‘চন্দ্রাবলী প্রতিদ্বন্দ্বিনী রাধাকে বাঁচাতে চাইল কেন?”
‘কেননা চন্দ্রাবলী জানতো শ্রীকৃষ্ণ রাধাকেই বেশি ভালবাসত। শ্রীকৃষ্ণ যদি কক্ষনো বৃন্দাবনে একবারটির জন্যও আসতে চায় তবে তা একমাত্র হবে রাধাকে দেখবার অভিলাষে। তাই রাধা না থাকলে তাকে শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের আশা চিরতরে ত্যাগ করতে হবে। চন্দ্রাবলী তার প্রতিদ্বন্দ্বিনী রাধিকার বাড়ি ছুটে গেছিল। আমিও আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর বাড়ি ছুটে যাচ্ছি করতালতলীর কীর্তনের দলকে বাঁচাবার ক্ষীণ আশায়। ও যদি আমায় গালমন্দ করেও, তুমি যেন সেদিনের মত আমায় বাঁচাতে যেও না।”
‘তারপর কী হল রাধিকার?”
শ্রীকৃষ্ণবিরহ দুই প্রতিদ্বন্দ্বিনীকে কাছাকাছি নিয়ে এল। রাধিকা চেতনাহীন, শয়ান। চন্দ্রাবলী এসে রাধিকার পায়ের কাছে দাঁড়াল। রাধার অলক্তক পদযুগল দেখে চন্দ্রাবলীর মনে পড়ল দেহিপদপল্লবমুদারম - এই পদপল্লব শিরে ধারণ করেছিলেন বৃন্দাবনচন্দ্র, তাহলে এই পদযুগল স্পর্শ করে যদি সে বক্ষে ধারণ করে তবে সে শ্রীকৃষ্ণের স্পর্শ বক্ষে ধারণ করার অনুভূতি পাবে। কিন্তু সখীরা চারপাশে, তাদের সামনে কীভাবে রাধিকার পা নিজের বুকে তুলে নেবে সে? চরম সঙ্কোচ। চন্দ্রাবলী প্রথমে রাধার পাশে বসে রাধার ললাটে হাত রাখল, ভান করল যেন সে দেখছে দেহে এখনো কি উত্তাপ আছে? তারপর রাধার হাত ধরল, হাত উত্তাপহীন, শরীর শীতল, তারপর শ্রীরাধার পদযুগল দু‘হাতে স্পর্শ করল। কতবার আসরে গেয়েছি আমি -
রাই ললাটে কর আপি।
পরীখয়ে দেহক তাপি।।
তুহিন শীতল হেরি গাত।
পদযুগে রাখল হাত।।
তারপর চন্দ্রাবলী রাধার পদযুগল আচম্বিতে নিজের বুকে চেপে ধরল আর তৎক্ষণাৎ তার বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হল। চন্দ্রাবলী চেতনা হারাল।’
- গভীর তত্ত্বকথা, পদাবলী ভাবল এর মানে বুঝবার যোগ্যতা সে অর্জন করেনি ‘এসব কথা আপনি কেন বলছেন গোঁসাই ঠাকুর?” ‘আমার দেখা বাংলার সবচেয়ে সেরা মৃদঙ্গবাদক ছিল গীত। বাবার প্রিয় দুই ছাত্র ছিল দুই ভাই গীত আর হরি।’
‘ছিদাম গোঁসাই ওই হাত নিয়ে আখড়া চালাতেন?”
‘নিজে বাজাতেন না, শুধু মুখে মুখে পাট বোল দিতেন। আমরা বাজাতাম। গীত আর হরির মৃদঙ্গ শুনে করতালিতে ফেটে পড়ত আসর। গীত শিরবাদক, হরিপদ কোলবাদক। গীতের পাশে আমি গোবিন্দ কীর্তনীয়া। লোকে আড়ালে আমাদের দু‘জনকে মিলিয়ে বলত গীতগোবিন্দ। ছিদাম বায়েনের আখড়ার দুই প্রতিভাবান কীর্তনীয়া, যেখানেই যেতাম আসর গিজগিজ করত। হাতে সরস্বতী ভর করত দুই ভাইয়ের। হরিপদ ইচ্ছা করলেই অন্য কীর্তনের দলের শিরবাদক হয়ে যেতে পারত। কিন্তু, দাদাকে কোনওদিন ছেড়ে যাবে না বলে দাদার অনুগামী কোলবাদক হয়েই রয়ে গেছিল। আসরের শুরুতে হরিপদ মঞ্চে একা দাঁড়িয়ে আট মাত্রার ছন্দে হাতুটি বাজাতো।’
“হাতুটি কী?”
‘হাতুটি বাদ্য হল চৈতন্যস্মরণ। বাজাতে বাজাতে এক সময় হরিপদের বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে যেত। শ্রোতারা তন্ময় হয়ে শুনতো হরিপদের মৃদঙ্গ মনোহর বাদ্য আহ্বান করে চলেছে চৈতন্যমহাপ্রভুকে। বৈষ্ণব মহাজনদের আখড়ায় বলা হয় যে তিরোধানের পরও হাতুটির আহ্বান শুনে খেতুরী মহোৎসবে চৈতন্যমহাপ্রভু অলৌকিকভাবে সপরিকর সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। বৈষ্ণব ভক্তদের প্রতীতি এই যে কীর্তনের আসরে যদি হাতুটির আহ্বান মর্ত্যলোক ছাড়িয়ে যায় তবে মহাপ্রভু অন্ততঃ একবার সুক্ষ্ণ শরীরে সেই আহবানে সেই কীর্তনের আসরে আসেন। ভক্তজনে বলত হরি বায়েনের খোল বাজনা শুনতে নাকি কখনো কখনো চৈতন্যদেব স্বয়ং আলৌকিক ভাবে আবির্ভূত হতেন। অনেকে নাকি ঝাপসা চোখের মন্দাকিনীর ধারার মধ্যে দেখেছে মহাপ্রভুকে। চারদিক চন্দনের সুগন্ধে ভরে যেত, হরিপদ কোলবাদক প্রাথমিক ভাবে ছন্দে তুলে দিত আর তার বাজনা শেষ হয়ে গৌরচন্দ্রিকা গাইবার আগেই দর্শকের মনের তটে ভক্তিরসের ঢেউ বার বার আছড়ে পড়ত। বাকিটা সামলাত ওর দাদা শিরবাদক গীত। আমার কাজ অনেক সহজ করে দিত এই দুই ভাই। মধুতলা রাজবাড়িতে প্রোগ্রামের একটু আগে গোপন খবরটা ফিসফিস করে কানে এল।’ গোবিন্দ অধিকারী দম নিল। ‘ইন্দুমতি বাঈ নাকি গীত বায়েনকে তার সঙ্গে বাজাবার জন্য রেডিওতে একটা প্রোগ্রাম ধরিয়ে দিয়েছে, আর ইন্দুমতি বাঈ গীত বায়েনকে পত্র মারফত প্রেম নিবেদন করেছে। খবরটা শুনে আমি হিংসায় জ্বলে পুড়ে যেতে লাগলাম। তখনকার দিনে রেডিওতে ডাক পাওয়া মানে বিরাট ব্যাপার। গীত সেই আমন্ত্রণ পেল, আমি পিছিয়ে গেলাম! কিন্তু তার চেয়েও বড় পরাজয় এই যে আমি ইন্দুমতি বাঈকে মন দিয়ে ফেলেছিলাম। এসব খবরে কিন্তু গীতের চোখের দৃষ্টিতে সেরকম কিছু উচ্ছ্বলতাই চোখে পড়ল না। যথারীতি কানাড়া মিশ্র ঝাঁপতালে গীত মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে – থই দ্রিমি দ্রিমি দ্রিমি দ্রিমিকী দ্রিমিকী দ্রিমি/ তাক তাক গড়ি গড়ি গড়ি গড়ি গড়ি গড়ি/ গড়ি গড়ি তত্তা দ্রিমিতা তাতা থোই তিনিকিটি ঝাঁ। গীতের মনোহর বাদ্য শেষ হওয়া মাত্রই আমার রাসলীলা গাইবার কথা –
না হবে ভূষণের ধ্বনি না নড়িবে চীর -
দ্রুতগতি চরণে না বাজিবে মঞ্জীর -
কিন্তু, আমার মনে দাউ দাউ করে জ্বলছে ঈর্ষার আগুন। গাইব কী, আমার এমন কান্না পাচ্ছে যে বুক ফেটে যাচ্ছে। আমার মাথায় হিংসায় শয়তান ভর করল।’
ঘাটে নৌকা এসে লেগেছে। মাথায় লাল গামছা বাঁধা মাঝি হাঁক পাড়ল ‘গোঁসাই ঠাকুর, যাবে নাকি?”
গোবিন্দ অধিকারী সম্বিত ফিরে পেল। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। ওর পিছনে পিছনে পদাবলী ধাপে ধাপে নামতে লাগল জলের দিকে।
বুড়িকোশীর উজানে কিছু দূরে ধুতরোহাট। সারাটা পথ গোবিন্দ অধিকারী আর একটা কথাও বলে নি। ‘ওই বাড়িটা, দূর থেকে দেখাল গোবিন্দ অধিকারী। ছিমছাম একটা ইটের বাড়ি, টালির ছাতে কুমড়োর ডগা লতিয়ে গেছে, বাড়ির লাগোয়া বাতাবি গাছে লেবু হলুদ হয়ে রয়েছে, ফল পাড়ার সময় হয়ে গেলেও এখনো গাছে। বাড়ির কাছে এসে গোবিন্দ অধিকারী থামল ‘তখন খেয়ালই নেই এবার আমার গাইবার পালা – দ্রুতগতি চরণে না বাজিবে মঞ্জীর – কোল দোহার ধরিয়ে দিতে টনক নড়ল। কিন্তু আজ যেন গলার মিষ্টত্ব ঝুনো নারকেলের খোলের ভিতর থেকে কিছুতেই বেরোচ্ছে না।’ - “তারপর?” - -
‘সেদিনই দুই ভাইয়ের সঙ্গে শেষবারের মত এক আসরে কীর্তন অনুষ্ঠান করেছিলাম। কীর্তনের আসর শুরু হওয়ার আগেই আমার মাথায় শয়তান একটা বুদ্ধির পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছিল। আসর শেষ হওয়ার পর আমরা মধুতলার রাজবাড়িতে রাত্তিরটা কাটালাম। অনেক রাতে রঙ্গনা বাঈ আমাদের ঘরে এসে জানাল তার দু‘হাতের স্বর্ণ-কঙ্কণ পাওয়া যাচ্ছে না। মহারাজের উপহার অনেক দামি কঙ্কণ। কাল সকালে পুলিশে খবর দেবে রঙ্গনা বাঈ। সে আমাদের ব্যাপারটা জানিয়ে গেল। সেই রাতেই খোঁজাখুঁজি শুরু হল। রঙ্গনা বাঈয়ের হাতের কঙ্কণ গীত বায়েনের থলেতে ওর উত্তরীয়ের ভিতর থেকে পাওয়া গেল। গীত বায়েন বিস্মিত! ছিদাম বায়েনের সম্মানের কথা স্মরণ করে রঙ্গনা বাঈ বলল একথা সে পুলিশকে জানাবে না। আমরা করতালতলীতে ফিরে এলাম। বাবা বলল এই চুরির কথা কেউ যেন না জানে, কিন্তু গীত বায়েনকে বাবা দল থেকে বের করে দিল। গীত বাবার পায়ে ধরে অনেক কাকুতি মিনতি করল বলল, নীলমাধবের দিব্যি ও জানে না কীভাবে এই কঙ্কণ ওর উত্তরীয়তে এল। কিন্তু বাবার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। গীতের সঙ্গে ওর ভাই হরিও চলে গেল দল ছেড়ে। দুইভাই আর কখনো আসরে বাজায় নি। গীত করতালতলী থেকে চলে গেছিল। ইন্দুমতি বাঈ তবু গীতকে বিয়ে করল। তারপর আর ওদের সঙ্গে দেখা করিনি। শুনেছিলাম ইন্দুমতি বাঈ আর গীত বাড়িতে কীর্তন শিক্ষার টোল খুলেছে। রেডিও স্টেশনে বাজাতে যায়নি গীত। হরি বায়েন তারপর কলকাতা চলে যায়। চিৎপুরে যাত্রা দলে ঢুকে যায়। জনার্দনের বিচারালয়ে কিন্তু আমার ঠিক বিচার হল। আমার স্বরযন্ত্র এমন ভাবে বিকল হল যে আমি আর আসরে গাইবার উপযুক্ত রইলাম না। ডাক্তার বলল গলায় চাপ পড়লে এবার কথা বন্ধ হয়ে যাবে।’
গীতের বাড়ির দরজার কাছে আসতেই পদাবলীর কানে এল গৃহের অভ্যন্তর থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। বন্ধ দরজায় সন্তর্পণে ধাক্কা মারতে দরজা খুলে গেল। ভিতরে মেঝেতে সাদা চাদরের ওপর একজন বৃদ্ধ শয়িত। তার শিয়রের পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ক্রন্দনরতা একজন প্রৌঢ়া। প্রৌঢ়াকে দেখেই বোঝা যায় অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন এককালে। পদাবলী তাকিয়ে দেখল এই হল গীত বায়েন। এর মৃদঙ্গের বোলে নাকি একদিন গোটা রাঢ়ভূমি কাঁপত তার প্রতিদ্বন্দ্বীর আজ চন্দ্রাবলীর দশা। কীর্তন আজ দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। একজন শয়ান, চেতনাহীন, অপরজন তার পায়ের কাছে দণ্ডায়মান। পদাবলী উপলব্ধি করল গোবিন্দ অধিকারীর আজ চন্দ্রাবলীর মত সঙ্কোচ হচ্ছে। হাতে সময় কম, আর হয়তো পা ধরে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ এ’জীবনে হবে না। চন্দ্রাবলীর পথ অনুসরণ করল গোবিন্দ অধিকারী। প্রথমে বৃদ্ধের ললাটে হাত রেখে শরীরের উত্তাপ দেখল, তারপর হাত ধরল, তারপর বৃদ্ধের পদযুগল দু‘হাতে স্পর্শ করল। এবার মাথা নিচু করে গীত গোঁসাইয়ের দুই পা কপালে চেপে ধরে বিড়বিড় করে গোবিন্দ অধিকারী কাকুতি জানিয়ে বলল – ‘বন্ধু আমায় ক্ষমা কর। আমি ঘোর পাপী।’ গোবিন্দ অধিকারীর সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। গোবিন্দ অধিকারী নীরবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। গীত বায়েনের শীর্ণ হাত গোবিন্দ অধিকারীর মস্তক স্পর্শ করল। ওর মুখে ক্ষীণ হাসি ছড়িয়ে গেল। ক্ষীণকণ্ঠে গীত বায়েন বিড়বিড় করে বলল, ‘মুঞি কোন্ ক্ষুদ্র যেন খদ্যোত প্রকাশ।’ গীত বায়েনের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। গীত বায়েন তৃপ্তির সঙ্গে চোখ বুজল। চোখের কোনা দিয়ে এক বিন্দু জলের ধারা গালে অতি ধীরে নামতে লাগল।
চোখের জল মুছে মহিলা উঠে বৃদ্ধের মুখে গঙ্গাজল দিল। তারপর গঙ্গাজলের ঘটি গোবিন্দ অধিকারীর দিকে এগিয়ে দিল। গীত বায়েনের অধর বেয়ে জল গড়িয়ে ঘাড়ের পাশ দিয়ে চাদরে পড়ল। গোবিন্দ অধিকারী বন্ধুর চিরঘুমন্ত দুচোখের পাতায় তুলসীমঞ্জরী স্থাপন করে তার বুকের ওপর উপুড় হয়ে এবার হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর পদাবলী গোবিন্দ অধিকারীকে সামলে ধরে বাড়ির বাইরে এনে দাঁড় করাল। তখনও ফোঁপাচ্ছে গোবিন্দ অধিকারী - ‘আমার দেখা বাংলার সবচেয়ে সেরা শিরবাদকের মৃত্যু হল। সকলের অগোচরে আমিই খুনি। বাংলার মানুষ জানতেও পারল না। আমিই ঈর্ষার জন্য বাংলার কীর্তনের অপূরণীয় ক্ষতি করেছি। আজ আমাকে সেই শাস্তি পেতে হচ্ছে।’ গোবিন্দ অধিকারীর চোখ দিয়ে দরদর করে নামছে জল। কিছুক্ষণ পর গোবিন্দ অধিকারী একটু শান্ত হল। বড় একটা শ্বাস টেনে বলল, ‘বুকের ভিতর এত বছর একটা পাথর চেপে বসে ছিল, শ্বাস নিতে পারতাম না। আজ মুক্ত হলাম।’
পদাবলী গোবিন্দ অধিকারীকে ধরল। ভয় হল বুড়ো পড়ে না যায়। ‘আমি ঠিক আছি,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘আহা কী বাজনা, অত্যন্ত অবিশ্বাসী শ্রোতাদের মনেও ভক্তিরস এমন ভাবে টেনে আনত যেন খাল কেটে জল এনে বাঁজা জমিতে হরিয়ালি ভরে দিত। গৌরচন্দ্রিকার পর শুরু হত মেল জমাট।’ “মেল জমাট কী?
‘লীলা গান শুরু করার আগে মূল গায়ক দোহারদের সঙ্গে আলাপের ভঙ্গিতে একে অন্যের সঙ্গে গলা মেলায়, একজন ছাড়ে অন্যজন ধরে, সে এক দেখার বস্তু ছিল। এই আলাপচারীর মধ্যে দিয়ে সুরের জমাট করে নেয় ওরা। তারপর শুরু হত লীলাকীর্তন।
‘আর গীত বায়েন?’
‘সেই তো ছিল আসল লোক। শির বাদক, মৃদঙ্গে হাতের চাঁটি যেন রোশন বাঈজীর ঘুঙুর বাঁধা পা – ছম ছম ছম ছম করে অক্লান্ত ভাবে নেচেই চলেছে। আর সকল দর্শক যেন মন্ত্রমুগ্ধ। গীত বায়েন মৃদঙ্গে চাঁটি মারতে মারতে ভাবের ঘোরে গোল হয়ে ঘুরে চলেছে। মৃদঙ্গ হাওয়ায় যেন ভাসত, আমার ভয় হত গলার দড়ি ছিঁড়ে মৃদঙ্গ গিজগিজে ভিড়ে লোকের মাথায় গিয়ে না পড়ে। বাজনার তালে তালে গান চলছে মনে হচ্ছে গীত বায়েন এজগতে নেই, ভাবের জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তার শির যেন সদা সতর্ক প্রহরী।’
‘মানে?’
- ‘ভাবের ঘরে গান হল চাষের মাঠের সরু আল ধরে চলা। একটু আধটু পা পিছলে ইতিউতি হলেই মাঠের কাদায় পা মেখে যাবে। কিন্তু গীত বায়েন তালের গানে একচুল বেতালা দেখলেই ধরে ফেলত, আর ওর বাজনা তৎক্ষণাৎ গায়ককে ঠিক নিজের আলে ফিরিয়ে নিয়ে আসত। দাদার বাজনা অনুসরণ করে ছোট ভাই কোলবাদক হরি খোল বাজিয়ে আবার সেটা মেক আপ করে দিত। সেসব একটা যুগ ছিল,’ গোবিন্দ অধিকারী একটু দম নিল। ‘আগেকার কীর্তনে এমন সব রসজ্ঞ শ্রোতা থাকত – কেউ নিজেরাই আখর দিচ্ছে, সঙ্গে গীত-হরি জোরে জোরে মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে, বাজছে করতাল, আসর ভক্তিস্রোতে ভেসে যাচ্ছে। শ্রোতারা অশ্রুসমাকুল কণ্ঠে ঘনঘন হরিধ্বনি দিচ্ছে, মেয়েরা ঘনঘন উলুধ্বনি দিচ্ছে আর তার সঙ্গে এত জোরে শাঁখের ফুঁ, যেন তার আওয়াজ বুড়িকোশীর জল পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে যাবে। নদীতে রাতের মাছ ধরতে বেরিয়ে পুন্নাল তেলের কুপির আলোতে নৌকার মাঝি সেই আওয়াজ শুনে কপালে হাত ঠেকিয়ে তার দেবতাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে পেন্নাম করছে।’ গোবিন্দ অধিকারী কপালে হাতজোড় করে প্রণাম করল। ‘হরির সঙ্গে একবার দেখা হলে ওর কাছেও ক্ষমা চেয়ে নিতুম।’
‘ইনিই কি ইন্দুমতি বাঈ?”
“হ্যাঁ, এর জন্যই আমি সারা জীবন অবিবাহিত রয়ে গেলাম।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন