প্রীতম বসু
ছিদাম বায়েনের বাড়ির গ্রিলের দরজায় ঝাঁ চকচকে একটা সাদা অ্যাম্বাস্যাডার দাঁড়িয়ে!
‘এখানে গাড়ি?’ পদাবলী উৎসুক। সকালের ট্রেন ধরে করতালতলীতে এসে দূর থেকে এই চমক দেখল পদাবলী। গোবিন্দ অধিকারী উদ্বিগ্ন মুখে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে।
‘হলটা কী?’ পদাবলী হাঁটার গতি বাড়াল।
পদাবলীকে দেখে গোবিন্দ অধিকারীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘জমিদারবাবু গাড়ি পাঠিয়েছেন!’ গোবিন্দ অধিকারী বলল।
“কেন?”
“তা জানিনা, গোবিন্দ অধিকারী বেশ চিন্তায় পড়ে গেছে। উনি কলকাতা থেকে আজ এসেছেন, উনি ডেকেছেন।’
এবার ড্রাইভার মুখে পানমশলা ঢেলে মুরুব্বীর মত বলল, ‘বেশ ভালই বাওয়াল হতে চলেছে মনে হচ্ছে।’
‘কী হতে পারে ভাই?’ গোবিন্দ অধিকারী চিন্তিত। ‘গাড়ি পাঠালেন মানে ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস।’ এবার গোবিন্দ অধিকারী পদাবলীর দিকে তাকাল। ‘তুমি একদম ঠিক সময়ে এসেছ। তুমি আমার সাক্ষী। তুমি তো নিজের চোখে সব দেখেছ। তোমাকেও মেরেছে। নাকটা পদাবলীর মনে হল যে তার নাকের অবস্থার উন্নতি না হলেই বোধহয় গোবিন্দ অধিকারী খুশি হত। ‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে?” -
সেদিন জমিদার-বাড়িতে লোকটা হেনস্থা হয়েছে, তারপর কাল জমিদারের শয়তান ছেলেটা ওকে আবার শাসিয়েছে। আজ মাথায় কী প্ল্যান কে জানে? লোকটাকে একা যেতে দিতে অস্বস্তি হল পদাবলীর। ‘ঠিক আছে, চলুন।’ গোবিন্দ অধিকারী অনেক নিশ্চিন্ত বোধ করল। পদাবলীর হাত চেপে ধরে নীরব কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গোবিন্দ অধিকারী জমিদারের গাড়িতে ঢুকে বসল।
***
জমিদারবাবুর কোনো এক পূর্বপুরুষের নাকি তামাকের এত নেশা ছিল যে তিনি যখন ভ্রমণে বের হতেন তখন তাঁর সঙ্গে একজন হুঁকাবরদার বড় কলকেতে তামাক সেজে গুড়গুড়ি হাতে প্রভুর পশ্চাদানুগমন করত। জমিদার হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে নলটি মুখে টেনে নিয়ে হুঁকো টানতেন, আর তখন আলবোলার গোলাপজলের ভিতর দিয়ে আসা মিঠেকড়া অম্বুরীর সুগন্ধ নাকি দশহাত দূরেও ভুরভুর করত। দেওয়ালের এক কোনায় পেল্লায় একটা বিশাল তামাকের গড়গড়া শোভা পাচ্ছে, মুখটা রূপো দিয়ে বাঁধানো। একই গড়গড়ার ছবি দেওয়ালে জমিদারবাবুর পিতৃপুরুষের অয়েলপেইন্টিংয়ে। সাহেবদের সংসর্গে এসে জমিদারবাবুর পিতামহ অখিলরঞ্জন গড়গড়া ছেড়ে বিলিতি পাইপ ধরেছিলেন। সেই উত্তরাধিকার বর্তমান পুরুষের রক্তে প্রবহমান। পদাবলী তাকিয়ে ছিল জমিদারের মুখের দিকে। সোফায় একটা স্থূলোদর তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে পাইপে তামাক ঠুকতে ঠুকতে অন্যমনস্কভাবে জমিদার কিছু ভাবছে। বোধহয় যা বলবে তা মনে মনে সাজিয়ে নিচ্ছে। দেওয়ালের অন্য কোনায় একটা বড় ঘড়ির পেণ্ডুলাম কাঁচের ভিতরে অক্লান্ত ভাবে টক-টক শব্দ করে দুলে চলেছে। পিছনের দেওয়ালে বাঘের মাথা, কিছু ডালপালা শিংওয়ালা হরিণের মাথা লটকে আছে। বোঝাই যায় এদের রক্তে শিকারের নিষ্ঠুরতা বিদ্যমান। জমিদারী প্রথা লোপ পেয়েছে কিন্তু তাদের গৌরবের চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেওয়ালের ছবিতে, ট্রফিতে, শো-কেসের ভিতরের ইংরেজ সরকারের মেডেল-সার্টিফিকেটে। গ্রামের লোকেরা এখনও এদের জমিদারবাবুই বলে।
পাইপের তামাকে বিলিতি লাইটার দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে কয়েকটা টানে ভুসভুস করে ধোঁয়া ছেড়ে জমিদার কথা শুরু করল - ‘গোবিন্দ, পরশু তোমার সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করা হয়েছে।’
গোবিন্দ অধিকারী কী বলবে বুঝে পেল না। সে খুব আঘাত পেয়েছে এটা সত্যি। এখনো সামলে উঠতে পারে নি। কিন্তু জমিদারের এই সহানুভূতি এতটাই অপ্রত্যাশিত যে গোবিন্দ অধিকারী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দু‘হাতের তালু কচলাতে লাগল।
“আমি ক্ষমাপ্রার্থী আমার ছেলের ব্যবহারের জন্য, পাইপ ঠোঁটে ঝুলিয়ে জমিদার দু-হাত জোড় করলেন।
“আরে না না জমিদারবাবু, এ আপনি কী বলছেন,’ অপ্রস্তুত গোবিন্দ অধিকারী ব্যস্ত হয়ে বলল।
‘আমি তোমার ক্ষতিপূরণ করে দেব।’ জমিদার চেকবই খুলে কলম হাতে নিয়ে তাকাল গোবিন্দ অধিকারীর দিকে। ‘তবে ফার্স্ট থিং ফার্স্ট। আমি জানি টাকা দিয়ে সব কিছু শোধ করা যাবে না। তবে যতটা পারি - মুনশিমশাই!’ জমিদার মুনশির দিকে থুতনি উঁচু করে তাকাল।
মুনশি হাতজোড় করে বলল, ‘অধিকারী মশাই, সব দোষ আমার। আমারই উচিত ছিল ছোটকর্তাকে সামলানো। আমি ছোটকর্তার হয়েও ক্ষমা চাইছি।’
‘নো!” আদেশ করলেন জমিদারবাবু। ‘ছোটকর্তার হয়ে ক্ষমা চাইতে আপনাকে কে বলেছে?’
ধমক খেয়ে মুনশি চুপ করে গেল।
‘যান, ভিতর থেকে মনুকে ডেকে আনুন।’
মুনশি ভিতরে চলে গেল। গোবিন্দ অধিকারী কুণ্ঠার স্বরে বলল, “ঠিক আছে জমিদারবাবু, ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই। আপনারা –
‘নো!’ জমিদার তর্জনী নাড়াল। খবরটা শুনে আমার খুব খারাপ লেগেছে। এদের রক্ত গরম, তাই বলে যা খুশি তাই করবে? অন্য কেউ হলে থানায় রিপোর্ট করে দিত।
ঢোলা হাফ-প্যান্ট আর একটা টি-শার্ট পরে ঘুম চোখে বিরক্ত মুখে ছোটকর্তা ঢুকল। ওর মুখটা দেখে মনে অস্বস্তি হল পদাবলীর। বোঝাই যায় বেলা করে ওঠার অভ্যেস। ঘুম ভাঙানোয় বেশ রেগে আছে। এ ছেলে রাগলে যে কংস তার প্রমাণ দু‘দিন আগেই সে দিয়েছে। ধুপ ধুপ করে ঘরে ঢুকে বলল, ‘অ্যাপোলোজি কি লিখে দিতে হবে? দাও কোথায় সাইন করতে হবে। ডিসগাস্টিং –’
“মুখে বল, তাহলেই হবে।’ পাইপ মুখে জমিদার চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। ‘কম্পেনসেশন তো দিয়েই দিচ্ছ, তাহলে?” জেদী ছেলে ভাঙবে তো মচকাবে
না।
‘মনু,’ জমিদারমশাই গলা চড়িয়ে বলল।
“ওককে, ওককে - আমি সরি, ছোটকর্তা বলল।
‘আপনি মায়ের প্যাণ্ডেলে প্রতিজ্ঞা করলেন যে করতালতলী থেকে কীর্তন চিরকালের জন্য মুছে দেবেন, কথাটা শুনে খুব খারাপ লেগেছে ছোটকর্তা,’ গোবিন্দ অধিকারী দু‘হাতের তালু কচলাতে কচলাতে বলল।
‘আরে ওসব রাগের কথা,’ জমিদার চন্দ্রকান্ত ওকথা ধর্তব্যের মধ্যেই আনল না। ‘এত পুরোনো ঐতিহ্য –
‘ঐতিহ্য! হুঁঃ! ওই কেত্তন শুনলে মাথায় খুন চেপে যায়।’ ছোটকর্তা দুমদুম করে ভিতরের ঘরে চলে গেল।
‘আজকালকার ছেলেরা – গোবিন্দ ছোটকর্তার দোষটা লাঘব করার চেষ্টা করল।
‘চা খাবে তো, এক কাপ?’ জমিদার পাইপে এবার টান লাগিয়ে খসখস করে চেক কেটে বলল, ‘এই নাও। কুড়ি হাজার। মুনশিজী রানাপুরের একটা বডিশপের সঙ্গে কথা বলে রিপেয়ারের দাম টাম জেনে এসেছে। মুনশিজীর সঙ্গে কথা বলে টেম্পোভ্যানটা গ্যারেজে পাঠিয়ে কাচ-টাচ ঠিক করে নিও।’ জমিদার চেক কেটে গোবিন্দ অধিকারীর হাতে দিল।
‘আপনার অশেষ দয়া।’ চেক হাতে নিয়ে হাত জোড় করে গোবিন্দ অধিকারী উঠে দাঁড়াল। ‘অনুমতি করেন, আমি তাহলে আসি জমিদারবাবু?”
“আরে, বসো বসো।’ জমিদার ঠুকে ঠুকে পাইপে তামাক ঠিক করল। ‘আসল কথাটাই বাকি রয়ে গেছে।’
‘আসল কথা?’ গোবিন্দ অধিকারী ধীরে ধীরে সোফায় আবার বসল।
“তোমার কীর্তন কোম্পানি কেমন চলছে?”
“ভাল না। আজকাল কেউ কীর্তন শুনতে চায় না।”
‘হুম,’ জমিদার চিন্তাকীর্ণ দৃষ্টিতে বলল। ‘কী করবে ভাবছ?”
“জানি না, গোবিন্দ অধিকারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘সব নীলমাধবের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’
“দেখ, আজকাল গ্ল্যামারের দিকে নজর সকলের। তোমার এই ঝরঝরে টেম্পোভ্যান, পুরোনো পুরোনো সব ঢাক-ঢোল, তোমাদের বিবর্ণ পোশাক এসব দেখলেই পাবলিক পিছিয়ে যায়। বিনোদিনী দাসী যাত্রাপালা দেখেছো? ওদের ঝাঁ চকচকে বাস নিয়ে যখন গ্রাম-গঞ্জে যায়, তাই দেখেই লোকের মনে সম্ভ্রম জেগে ওঠে। তারপর স্টেজে দারুণ লাইট, দামি পোশাক এসব অর্ধেক কাজ করে দেয়।”
“কিন্তু ওসব কি আর কীর্তনে মানায়? আর তাছাড়া ওতো অনেক টাকার ব্যাপার। আমি কোথায় পাব অত টাকা?’
“আছে, তোমার আছে টাকা, একটু ভাব,’ জমিদারমশাই মিটিমিটি হাসলেন। তারপর আর ভাবার অবকাশ না দিয়ে বললেন, ‘চৈতন্যজলার জন্য একটা শাঁসালো খদ্দের ঠিক করেছি। ভাল টাকা ফেলবে।’
‘কিন্তু ওটা তো দেবোত্তর সম্পত্তি, জমিদারবাবু।’
“মন্দিরই যখন ভেঙ্গেচুরে পড়ছে, তখন ওই দেবোত্তর সম্পত্তি বেচে দিলে ক্ষতিটা কোথায়। ওখানে একটা ঝাঁ চকচকে রিসর্ট হবে। সুমিং পুল, স্পা, টেনিস কোর্ট, একটা নাইন হোল গলফ কোর্স ও থাকবে। কলকাতার এত কাছে, কর্পোরেট এক্সিকিউটিভরা রিল্যাক্স করতে এখানে এসে দু-দিন কাটিয়ে যাবে।’
‘আমি নিষ্কিঞ্চন বৈষ্ণব, গোবিন্দ অধিকারী দু‘হাত জোড় করে বলল। ‘আপনি কী বলছেন তার অতশত বুঝি না। এ দেবোত্তর সম্পত্তির মালিক জমিদারগোঁসাইয়ের বংশধরেরা। আমার বাবা তো নিজেকে মনে করে অছি মাত্র। আমরা কীভাবে এই জমি বেচে দেব?”
‘দেখ গোবিন্দ, জমিদারগোঁসাইয়ের ছেলে-মেয়ে সব কবে মরে হেজে গেছে। কে আসবে তোমায় চ্যালেঞ্জ করতে? এই পড়ে থাকা অনাবাদী জলাজমির জন্য আমি তোমায় শালিজমির দামই দেব। আর এই মন্দির - জমিদার একটা খাম থেকে নীলমাধবের মন্দিরের কয়েকটা ব্ল্যাক অ্যাণ্ড হোয়াইট ছবি বের করল ‘এই মন্দিরের ভ্যালুয়েশন করাতেও ইজ্জতে লাগে। তবে এর জন্যেও কিছু একটা মূল্য ধরে দেব।”
ফটোগুলো দেখে পদাবলীর কাছে এবার অঙ্কটা ক্লিয়ার হল। সব নাটক!
গোবিন্দ অধিকারী আবার হাত জোড় করল। ‘আমায় লোভ দেখাবেন না, জমিদারবাবু। আমার মায়ের যখন মুখের রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না, তখন আমি বাবাকে বলেছিলাম ওই কচুরিপানা ভরা জলাজমির কিছুটা বেচে দিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাই। মা শুনতে পেয়ে আমার হাত তার নিজের মাথায় চেপে ধরে বলল প্রতিজ্ঞা কর গোবিন্দ, ওই জমি বিক্রি করার কথা কক্ষনো মনে স্থান দিবি না। আমি কীভাবে ?” -
“দেখ গোবিন্দ, তোমার মা-বাবা, আমার বাবা এরা সব ব্যাকডেটেড আইডিওলজি আঁকড়ে ধরেছিলেন। কিন্তু কী লাভটা হল তাতে? তোমার মা নিজে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। কলকাতায় নার্সিং হোমে রেখে ট্রিটমেন্ট করালে দিব্যি বেঁচে থাকতেন। আহা কী সুমধুর কীর্তনের গলা ছিল ওঁর।
গোবিন্দ নিরুত্তর। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জমিদারমশাই নিজেকেই যেন ধিক্কার দিয়ে বলল, ‘আর তোমার পরিবারের খুঁত ধরে কী লাভ? দোষ তো আমাদের পূর্বপুরুষের। ওই কুমুদরঞ্জন ছিল জমিদারবংশের কলঙ্ক। কথায় বলে জিদ-জমিন-জেনানা যার রক্তে নেই সে জমিদার হওয়ার যোগ্যই নয়। আরে অত বড় জলাজমি মন্দির সব ছিদাম বায়েনের নামে দানছত্র করে দিল?”
‘জমিদারগোঁসাই যখন চৈতন্যপুখুরী, ধুলট-ডাঙা আর নীলমাধবের মন্দির বাবার নামে লিখে দেবার কথা বাবাকে বলেছিলেন, তখন বাবা জোড়হাত করে বলেছিল এত সম্পত্তি তার চাই না। জমিদারগোঁসাই বলেছিলেন, এটা তোকে ঋণ হিসাবে দিলাম শ্রীদাম। আমাদের পূর্ব্বাচার্য্যরা বলে গেছেন তিনটে ঋণ অবশ্যই পরিশোধ্য। ঋষি ঋণ, পিতৃ-ঋণ এবং দেব-ঋণ। এই দেবোত্তর সম্পত্তির ঋণের দায় তোর মাথায় চাপিয়ে দিয়ে গেলাম। এই ঋণ তোকে শোধ করতে হবে। বাবা বললে, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এ ঋণ আমি কীভাবে চোকাবো? জমিদারগোঁসাই বললেন, এই ধুলডাঙায় আবার ধুলট ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতি বৎসর মাঘী সপ্তমীতে যেন গৌরচন্দ্রিকার মধুময় সঙ্গীত আবার এই করতালতলীর বাতাসের রেণুতে রেণুতে ছড়িয়ে যায়। জমিদার-গোঁসাই আমার বাবার কাছে ঋষি-পিতা-দেবতা সব একদেহে। তার ঋণ আমার বাবা এখনো শোধ করতে পারে নি। করতালতলীতে ধুলট আনার মত সামর্থ্য তার ছিল না। আমার কাছে সেটাই পিতৃঋণ। আমি করতালতলীতে কীর্তনকে বাঁচিয়ে রেখেছি শুধু আমার বাবাকে ঋণমুক্ত করার জন্য। জমিদারগোঁসাইয়ের ঋণ পরিশোধ করার জন্য। এই জমিতে যেদিন আবার ধুলট মেলা ফিরিয়ে আনত পারব সেদিন আমার বাবার আর আমার ঋণমুক্তি।’
‘কুমুদদাদুর উচিত ছিল এসব দায়িত্ব আমার বাবার ওপর দিয়ে যাওয়া। আমরা সাড়ম্বরে ধুলটমেলার আয়োজন করতাম।’ জমিদার পাইপের ধোঁওয়া ছাতের দিকে ছুঁড়লেন। ‘জ্ঞাতিগুষ্টির বাইরে কারুকে এতবড় প্রপার্টি কেউ দান করে যায়?” জমিদারের চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে জমিদারের ক্রোধের পারা চড়চড় করে চড়ছে। যে কোনও মুহূর্তে ফেটে পড়বে।
-জমিদারগোঁসাই আমার বাবাকে খুব বিশ্বাস করতেন। আর তাছাড়া তেনার সমুদ্দুরের মত বিশাল মন ছিল-‘
“থামো তো!’ জমিদার তিতিবিরক্ত। আর উপমা দিতে এসো না। সমুদ্দুর! একটা এঁদো জলা বিক্রি করতে এত নাটক করতে হচ্ছে সকাল থেকে জমিদার দু‘হাতের তালু ঘষল। ‘দেখ গোবিন্দ, আমি পেটে কথা চেপে রাখা পছন্দ করি না। খোলাখুলিই বলি। আমি এবার ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছি। সত্যি কথা বলতে গেলে ইলেকশনের টিকিট পেতে হলে মালকড়ি ছাড়তে হয়। আমার জমিদারির আয় এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। ইলেকশনে দাঁড়াবার মত মালকড়ি আমার নেই। তুমিও জানো, আমিও জানি যে ওই চৈতন্যজলার আসল মালিক আমার পূর্বপুরুষ। তোমার পরিবার পিকচারেই ছিল না, তবু এখন তোমার কাছে হাত পাততে হচ্ছে – যাই হোক ওসব ছাড়ো। আবার বলছি এসো ভাই, আমরা হাতে হাত মিলিয়ে জমিটা বিক্রি করে দিই। যা লাভ হবে তাতে তোমার আমার ফিফটি ফিফটি। ওখানে না হয় একটা মন্দির-ফন্দির বানিয়ে দেব, তোমরা যাতে কীর্তন করতে পার। আর ইলেকশনে জিতে গেলে তো - -
“আমায় মাফ করবেন, জমিদার মশাই, গোবিন্দ অধিকারী চেকটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল। ‘এটা আপনাকে দিতে হবে না।’
‘দেখ গোবিন্দ,’ জমিদার এবার পাইপ ঠোঁটে গুঁজে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ, ঝামেলা চাইনা। তাই তোমার সঙ্গে আপোসে আসতে চাই। কিন্তু তুমি বিক্রি করতে রাজি না হলে আমি বাধ্য হয়ে কোর্টে যাব। কুমুদরঞ্জনের নিজের কোনও উত্তরাধিকারী না থাকায় এ জমির মালিকানা আইনতঃ আমার। সে ক্ষেত্রে তুমি এক পয়সাও পাবে না। আমি তোমার ভাল চাই। তাই - “
‘মাফ করবেন জমিদারমশাই। আপনি যদি কোর্ট কাছারি করতে চান সেটা আপনার ইচ্ছা। তবে জমিদারগোঁসাই আমাদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়ে গেছিলেন, তা বজায় রাখার আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আমরা এ জমি বেচব না।’
পদাবলী একটা কথাও বলে নি। ও শুধু ভাবছিল। চৈতন্যপুখুরী, ধুলডাঙা, নীলমাধবের মন্দির হস্তগত করার জন্য জমিদার এত চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে যদি জমিদার জানে যে পদাবলী এই সম্পত্তির সম্ভাব্য মালিক তাহলে জমিদার তাকেও বিপদে ফেলবে। পরশু গোবিন্দ অধিকারী সেই বিপদের কথাই বলেছিল। এখানে চুপচাপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন