প্রীতম বসু
একটা সাদামাটা জৌলুসহীন স্টেশন।
মেলট্রেনগুলো যেসব অজ-গ্রামের কৌলিন্যবিহীন স্টেশনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এতটুকু স্পিড না কমিয়ে ঝমঝম করতে করতে বেরিয়ে যায়, এ সেরকম এক স্টেশন। একাদশীর দিন ভোরের প্যাসেঞ্জার ট্রেন একটু বেলার দিকে পদাবলীকে নামিয়ে দিল। সিমেন্ট চটা, ইট বের হওয়া প্ল্যাটফর্ম। পুব দিকে দিগন্তবিস্তৃত চাষের মাঠ। তারই মাঝে দূরে এক জনপদ। পিচের এবড়োখেবড়ো রাস্তা স্টেশন থেকে জনপদের দিকে চলে গেছে। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের পশ্চিমদিকের প্রকৃতির রূপ সম্পূর্ণ বিপরীত।
পশ্চিমে যেদিকে তাকাও শুধু জলা আর কাদাচর। যেন মানবসভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক জগৎ। অনেক দূরে জলার মধ্যে কচ্ছপের পিঠের মত দুটো স্থলভাগ জেগে আছে। তার একটাতে দেখা যাচ্ছে এক জরাজীর্ণ মন্দির। অন্য স্থলভাগে দু-একটা চালাঘর। জলার গা ঘেঁসে মাটি ফেলে উঁচু করে একটা ঘেঁস ঢালা রাস্তা চলে গেছে দুই স্থলভাগের দিকে। তারপর তাদের মধ্যে দিয়ে দূরে নদীর পাড় পর্যন্ত। বিংশ শতাব্দীর পৃথিবী বদলাতে বদলাতে কোথায় চলে গেছে, কিন্তু এই করতালতলীর কচ্ছপদ্বয় যেন অতীতেই আটকে গেছে। এতটুকু পরিবর্তন হয় নি।
খুব ভোরে উঠতে হয়েছিল, পদাবলী ট্রেনে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। এখন খিদে পাচ্ছে। এই ঠাণ্ডা শীত শীত সকালে মন চাইছে এক কাপ গরম চা।
প্ল্যাটফর্মে নামল ওরই বয়সী একটা মেয়ে, পোশাকে বিত্তের ছাপ, গলায় ঝুলছে বাইনোকুলারস, দামি ক্যামেরা, মাথায় টুপি। আর তার পিছনে নামল খঞ্জনি হাতে একজন বৈরাগী।
এত আধুনিকা এই অজ গাঁয়ে? পদাবলী অবাক। বৈরাগী খঞ্জনি বাজিয়ে গান ধরল। অরুণিত চরণে রণিত মণিমঞ্জির আধ আধ পদচলনি রসাল। গানটা অনেক বছর পর পদাবলী শুনল। শব্দগুলো ভুলেই গেছিল। ঠাম্মা খুব গাইত ঠাকুরঘরে কৃষ্ণঠাকুরের সামনে। ঠাম্মা বলত অরুণিত চরণ মানে কৃষ্ণের পায়ের পাতা ভোরের সূর্যের মত লাল, সেই চরণে মণিময় নূপুর ঝংকৃত হচ্ছে। বৈরাগী খুব তৃপ্তি করে গানটা গাইতে গাইতে প্ল্যাটফর্মে বিশাল ছাতিম গাছের নিচের লাল শান বাঁধানো বেঞ্চে বসল আর একমনে গাইতে লাগল।
পিচ ওঠা স্টেশন রোডের ধারে একটা সাইকেল রিক্সা দাঁড়িয়ে। রিক্সাওয়ালা বিড়ি ফুঁকছিল, ওদের দেখে বিড়ি ফেলে গামছা দিয়ে সিট মুছে নিল। পাশে একটা চায়ের দোকান। তার গায়ে টিনের চালার নিচে সাইকেল স্ট্যাণ্ড। ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা এখানে সাইকেল রেখে তারপর ট্রেন ধরে। এখন পুজোর ছুটি তাই বোধহয় স্ট্যাণ্ড খালি। মেয়েটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে চা অর্ডার করল। এই মেয়েটাকে এই পরিবেশে একদম মানাচ্ছে না। বিড়ির কড়া গন্ধের মধ্যে পদাবলী একটু দূরত্ব বজায় রেখে ওর পাশের বেঞ্চে বসল। মেসে অত ভোরে চা-জলখাবার পাওয়া যায় না। একটা কোয়ার্টার পাউণ্ড পাঁউরুটি, এক বাটি ঘুগনি, এক কাপ চা অর্ডার দিল পদাবলী।
‘হাই,’ এসএলআর ক্যামেরাটা ফাটা কাঠের টেবিলে সাবধানে নামিয়ে রেখে আধুনিকা পাশের বেঞ্চ থেকে বলল। ‘বার্ড-ওয়াচার?”
“না, এখানকার একটা পুরোনো মন্দির দেখতে এসেছি।’ পদাবলী সতর্কভাবে উত্তর দিল। ‘এখানে বুঝি লোকে পাখি দেখতে আসে?”
‘হ্যাঁ। আমি তো প্রত্যেক শীতে এখানে আসি। সেন্ট্রাল এশিয়ান ফ্লাইওয়ের প্রচুর ট্রান্স-হিমালয়ান মাইগ্রেটরি বার্ড এখানে নেমে আসে। হলদে খঞ্জন, ডাইখোল, কালাজাং, ফাউল, ভূতিহাঁস। পাখপাখালির মেলা বসে যায়।”
পদাবলী চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিল। অখাদ্য চা, মেসের চেয়েও খারাপ।
‘এখানকার জলায় শীতকালে কখনো সখনো কালাগলা মানিকজোড় আসে। বাংলাদেশের একটা পাখির ম্যাগাজিনের এডিটর আমার বাপির খুব বন্ধু। তিনি খুব রিকোয়েস্ট করেছেন। তাই চেষ্টা করছি যদি এর কয়েকটা ফটো আর একটা আর্টিকেল পাঠাতে পারি।’
‘এই পাখি বাংলাদেশে খুব বিরল বুঝি?”
‘বিরল!’ মেয়েটা পদাবলীর দিকে এমন ভাবে তাকাল যে নিজের অজ্ঞতার জন্য পদাবলীর লজ্জা হল। ‘ওই এডিটর বলেন, বাংলাদেশে খুঁজলে রূপকথার ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু ওদের ওখানে কালাগলা মানিকজোড় দুষ্প্রাপ্য। গত পঞ্চাশ বছরে এই পাখি ওদেশে দেখা যায় নি। মাইগ্রেটরি বার্ড, তবে দল বেঁধে উড়ে আসেনা। সাধারণতঃ এক জোড়ার বেশি কোথাও এদের দেখা যায় না। ‘
পাখির ব্যাপারে অতটা আকৃষ্ট না হলেও, মেয়েটা ঝলমলে। পদাবলী প্রশ্ন করল – ‘এরা জলে থাকে বুঝি?”
‘ঘুগনিটা ভাল?” মেয়েটা নিচু গলায় বলল।
‘নাঃ তেমন কিছু না, মনে হচ্ছে বাসি ঘুগনি ফুটিয়ে দিয়েছে।’
‘এরা হাঁটু জলে কাদার ভিতর থেকে ব্যাঙ, ছোট মাছ এসব ধরে বেড়ায় সারাদিন। কিংবা এক হাঁটু মুড়ে জলের ধারে বিশ্রাম নেয়। আর রাতে গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালে রাত কাটায়। এতক্ষণে হয়তো শামুকখোল পাখিগুলোর সঙ্গে শিকারে জলে নেমে পড়েছে।
‘পাখিটার কোনও ছবি আছে আপনার কাছে?”
‘হ্যাঁ, এই তো,’ মেয়েটা কাঁধের লেন্সের ব্যাগ খুলে সালিম আলি বের করল। পদাবলী বেঞ্চ ছেড়ে মেয়েটার কাছে এগিয়ে গেল। হালকা পারফিউমের সুগন্ধ। বইতে সবুজ কালিতে লেখা মুক্তার জন্মদিনে বাবা’। মেয়েটার নাম তাহলে মুক্তা। মেয়েটা পেজ-মার্ক করা একটা পৃষ্ঠা খুলল। পদাবলী দেখল কালাগলা মানিকজোড়, ইংরেজি নাম: ‘ব্ল্যাক নেকড স্টর্ক’। ছবিতে একজোড়া লম্বা কালো গলার সারস গাছের ওপর বসে, ঠোঁটও কালো, কালো পিঠ, বুক সাদা।
‘এরা আইইউসিএন এর রেড লিস্টে,’ মেয়েটা বলল।
‘আইইউসিএন?” কথাটা বলতে গিয়েও গিলে ফেলল পদাবলী, হয়তো মেয়েটা অবজ্ঞায় কথা বলাই বন্ধ করে দেবে।
“চলি,” বাকি চা না শেষ করে, সালিম আলিকে সাইড ব্যাগে ঢুকিয়ে, মেয়েটা ক্যামেরা বুকে দুলিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেশ ডাকাবুকো মেয়ে। পদাবলী নিজের আসনে ফিরে চায়ের কাপে চুমুক লাগাল। ওরা দু‘জনেই করতালতলীতে এসেছে দুর্লভ রত্নের খোঁজে।
চায়ের দোকানিকে পয়সা মেটাল পদাবলী – ‘এই দিকে অত বাড়ি-ঘর আর ওদিকটা শুধু জলা?”
‘এদিকটা তো উদয়নপল্লী। লোকবসতি যা কিছু এদিকেই। চারটে পাড়া আছে। বাজার, থানা, হাসপাতাল, ডাকঘর, একটা হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল সব এদিকেই। আর ওদিকটা হল করতালতলী। জনমনিষ্যি থাকেনা।
‘গোবিন্দ কীর্তনীয়ার বাড়ি ওদিকে?”
“হ্যাঁ, নদীর কাছেই। ওদিকে ওই একটাই তো বাড়ি।’ রাস্তা জেনে যখন নদীর দিকে হাঁটা লাগাল তখন পদাবলী স্বপ্নেও ভাবেনি আজকের দিনটা এমন দুর্ঘটনাবহুল হবে।
ঘেঁস ঢালা পথ সোজা চলে গেছে নদীর দিকে। হাঁটতে হাঁটতে পদাবলী অনুভব করল জায়গাটার বাতাসে কেমন একটা গা-শিরশিরানি স্পর্শ। অতীতে এক সময় এই স্থান খবরের শিরোনামে ছিল। কাতারে কাতারে ভক্ত মানুষেরা হেঁটে গেছে এই পথে। হরে কৃষ্ণ নাম ছড়িয়ে দিয়ে গেছে এর বাতাসের রেণুতে রেণুতে।
আধ মাইল মত হাঁটার পর তিনমাথার মোড়। মোড়ের বাঁদিকের রাস্তায় ঘেঁস নেই। ডান হাতে জলাকে রেখে মেঠো পথ রেললাইনের সমান্তরাল হয়ে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। পক্ষীপ্রেমী মুক্তা বাঁদিকের মেঠোপথ ধরে অনেকটা এগিয়ে গেছে।
পদাবলী চলল সোজা রাস্তা ধরে নদীর দিকে। বাঁ-পাশে জলা। জলার ধারে দাঁড়িয়ে আছে কোথাও কালচে হয়ে আসা কাশের ঝাঁক, কোথাও হেলান দিয়ে কেয়া ঝোপ। হাঁটতে ভালই লাগছিল। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া সকালের। পথের ধারে সারি সারি তালগাছ। তালগাছে বাবুই পাখির বাসা উত্তুরে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। পদাবলী শুনেছে পুরুষ বাবুই বাসা বাঁধে, বাসা অর্ধেক বোনা হলে মেয়ে বাবুই গিয়ে বাসা পরখ করে, পছন্দ হলে তবে ঘর বাঁধে। সত্যি কিনা জানেনা পদাবলী। তবে ভাবতে বেশ লাগে পুরুষ পাখির অর্ধসমাপ্ত বাসায় মেয়ে পাখি ইনসপেকশন করতে ঢুকেছে আর পুরুষ পাখি দুরুদুরু বুকে বাইরে অপেক্ষা করছে মেয়ে পাখির বাসা পছন্দ হল কিনা সেই ডিসিশনের।
আরও কিছুদূর হাঁটার পর এল জলের ভিতর জেগে থাকা দু‘দিকে স্থল। বাঁদিকে জলার ধারে ঝোপ-জঙ্গল-আগাছার ভিতরে ঢাকা ভগ্নমন্দিরটা। জলাটা মন্দিরকে দোপাট্টার মত ঘিরে রেখেছে। মন্দিরের মাথায়ও লতানে আগাছার ছাতা।
এই সেই নীলমাধবের মন্দির!
মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল পদাবলী। মন্দির ঘিরে বাবলা, বাজবরণ, বৈঁচির এত ঘন কাঁটাঝোপের জঙ্গল যে ঝোপ ডিঙিয়ে মন্দিরের ভাঙা দালানে ওঠা মোটেই সহজ না। একশ’ বছরের বেশি পুরোনো দেউল এখন ভগ্নদশায়, যে কোনও মুহূর্তে ধসে পড়বে মনে হয়। আর গোটা জায়গাটা দেখে মনে হয় এখন সাপ-খোপের আড্ডা। মন্দিরের পিছনে যাওয়া মুশকিল। মন্দিরের ডান পাশে প্রকাণ্ড উইঢিপি মাটি থেকে দালানে উঠে এসেছে, বাঁ পাশে নদীর দিকে জলাভূমির পলিমাটিতে বনতুলসী, শিয়ালকাঁটা, কালকাসুন্দির জঙ্গল, ওদিকে যাওয়া যায় না। শান বাঁধানো ঘাটের জায়গায় জায়গায় ফেটে ভিতর থেকে উঁকি মারছে আগাছা। পদাবলী কাঁটাঝোপের মধ্যে দিয়ে মন্দিরের দিকে এগোল।
‘মন্দিরের বেশি কাছে যেও না,’ দূরে জলার মধ্যে থেকে ভাঙা গলায় কেউ চেঁচিয়ে বলল। ‘ওখানে একজোড়া পদ্মগোখরোর বাসা।’
পদাবলী চমকে গিয়ে পাশে তাকাল। ডিঙিটা এতক্ষণ পিছনে জলায় মন্দিরের আড়ালে থাকায় সে দেখতে পায় নি। একজন প্রৌঢ় মানুষ বসে, একজন যুবক গলুইতে দাঁড়িয়ে লগি ঠেলে ঠেলে ডিঙিকে ওর দিকেই নিয়ে আসছে। পদাবলী ঘাবড়ে তাড়াতাড়ি মন্দির থেকে পিছনে সরে এল।
ডিঙিটা ঘাটের কাছে এল। ডিঙি বোঝাই শাপলা। যে লগি ঠেলছিল সে জলের ধারের খোঁটায় ডিঙি বাঁধল। প্রৌঢ় মানুষটা এবার বলল, ‘খুব বিষাক্ত সাপ।’ মানুষটার পাকানো ন্যুব্জ শরীর, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, গলায় কণ্ঠিমালা, নাকে রসকলি। খেজুর গাছের কাণ্ডের থাক-কাটা সিঁড়ি দিয়ে পাড়ে উঠে এল। যুবকটি শাপলাগুলো নৌকো থেকে তুলে তুলে পুকুর পাড়ে এনে জড়ো করতে লাগল।
‘কোথা থেকে আসা হয়েছে?’ ন্যুব্জ লোকটার গলার স্বরে মাতব্বরি ভাব। ‘কলকাতা, পদাবলী বলল। ‘ট্যুরিস্ট?”
“তা একরকম বলতে পারেন, পদাবলী বলল – ‘আপনি?”
লোকটা নিজের কাজেই ব্যস্ত। শাপলার ডাঁটা থেকে টপটপ করে জল ঝরছে, লোকটা ডাঁটাগুলো একটা বাঁশের ওপর জড়িয়ে জড়িয়ে রাখতে রাখতে বলল ‘আমার নাম গোবিন্দ অধিকারী : ‘
‘আপনিই গোবিন্দ অধিকারী!’ পদাবলী উৎফুল্ল হয়ে ঢিপ করে প্রণাম করল। ‘আরে থাক থাক,’ মানুষটা জলে ভেজা পা সরিয়ে নিল। ‘তুমি আমায় চেন?? “আমাদের কলেজে একজন অধ্যাপক আপনার নাম বলেছেন।’
‘তোমাদের কলেজের মাস্টার আমার নাম বলেছে?’ মানুষটা কাজ থামিয়ে অবাক চোখে চাইল। ‘বল কী? তা, কী নাম তোমাদের মাস্টারমশাইয়ের?”
পদাবলী সাবধান হল। সত্যি মিথ্যে মিশিয়ে বলল – ‘নাইট্রোজেন স্যার‘অ, এমন অদ্ভুত নাম জীবনে শুনিনি। বাঙালি?’ লোকটা আবার শাপলা বাঁশে জড়াতে লাগল। -
পদাবলী কথা ঘোরালো ‘আপনাদের প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার গল্পের টানেই এসে পড়লাম এই করতালতলীতে। আচ্ছা এই মন্দির থেকেই প্রাণনাথ কীর্তনীয়া ভ্যানিশ হয়ে গেছিলেন?”
‘ভ্যানিশ!’প্রৌঢ়ের দৃষ্টিতে বিরক্তি। প্রৌঢ় এবার কপালে দু‘হাত ঠেকিয়ে বলল, ‘নীলমাধবে বিলীন হয়ে গেছিলেন।
‘মন্দিরটা একদম জঙ্গলে ঢেকে গেছে,’ পদাবলী বলল।
‘হ্যাঁ, আগাছা। ভেটিতে ছেয়ে গেছে। এর পাতা এত তেতো যে গরু ছাগলেও মুখে নেয় না।’ গোবিন্দ অধিকারী এবার সঙ্গীকে তাড়া দিল “বিশে, হাত চালা। দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ -
‘মন্দিরের ভিতরটা একবার দেখা যাবে?’ পদাবলী প্রশ্ন করল। ‘পাগল!’ মন্দিরের দিকে তাকিয়ে প্রৌঢ় বলল, ‘কতকাল বন্ধ জান ওই মন্দির? এখন সাপ-খোপের বাসা। পরশু আমি মন্দিরের সিঁড়িতে পদ্মগোখরোটাকে দেখেছি। বাস্তুসাপ তাই তাড়াই না, কিন্তু ভয়ানক বিষ।’
‘এদিকে কেউ আসেনা?”
‘অবরে সবরে আসে কেউ কেউ।’
‘মন্দিরে পুজো দিতে কেউ আসে না?”
‘নাঃ, পঁয়ষট্টি বছর পার হয়ে গেল বন্ধ। আমি চলি ভাই, এটা বাড়িতে রেখে বেরোতে হবে। অনেক কাজ আজ।’ এবার প্রৌঢ় আর তার সঙ্গী বাঁশের দুপ্রান্তে কাঁধ লাগাল। শাপলার থেকে টপটপ করে জল ঝরতে লাগল। দু‘জনে ঘেঁসের রাস্তার দিকে এগোল। আগে আগে চলেছে কৃশতনু ন্যুব্জ প্রৌঢ় গোবিন্দ অধিকারী। কাঁধের বাঁশের দণ্ডের ভারে আরও ঝুঁকে পড়েছে। কাঁধে জোয়ালের ভার চাপান বুড়ো গরুর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। পিছনের সঙ্গী বেশ শক্ত সমর্থ। সে বুড়োর গতিতে তাল রেখে ধীরেই চলেছে।
মন্দিরটাকে আলখাল্লার মত ঢেকে বটগাছটা বেড়ে উঠেছে। তার চাপে মন্দিরটার পলস্তরা খসে ইট-কাঠ কবে বেরিয়ে গেছে, এখানে একা একা ঢোকার চেষ্টা করে লাভ হবে না। এই গোবিন্দ কীর্তনীয়ার সাহায্য ওর আবশ্যক। লোকটা তো হাঁটা দিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে পদাবলী বলল, ‘সনাতন কীর্তনটা মন্দিরের দেওয়ালে কি প্রাণনাথ কীর্তনীয়া লিখেছিল?”
‘না প্রাণনাথ কীর্তনীয়া এই কীর্তন মন্দিরে লেখেন নি। সনাতন কীর্তন প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার অনেক আগেই রচিত হয়েছিল।’ গোবিন্দ অধিকারী দূর থেকে ঘাড় না ঘুরিয়ে বলল।
‘জমিদার অখিলরঞ্জন কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলেন?”
কথাটা কানে যেতেই গোবিন্দ কীর্তনীয়া থেমে গেল। তারপর আবার এগোতে লাগল।
‘মন্দিরের ভিতরে কি সুড়ঙ্গ-টুড়ঙ্গ ছিল?’
‘বিশে, থাম তো,’ গোবিন্দ অধিকারী এবার কাঁধ থেকে বাঁশ মাটিতে নামিয়ে রেখে পিছন ফিরে ধীর পায়ে পদাবলীর দিকে এগিয়ে এল। ওর দু-চোখে বিরক্তি ঝরে পড়ছে – ‘নাস্তিকরা এসব কুকথা রটায়। নাস্তিকদের সঙ্গে কুতর্কে আমি সময় নষ্ট করি না। যারা এসব বলে তারা হল কলির মল। যার বিশ্বাস তার কাছে।’ -
লোকটার মেজাজ দ্রুত তিরিক্ষে হয়ে গেল। পদাবলী বুঝল মারাত্মক ভুল কথা বলে ফেলেছে। সুড়ঙ্গ-টুড়ঙ্গ বলে লোকটার বিশ্বাসে দুরমুশ পেটা করেছে। পরোক্ষভাবে লোকটা ওকেই গালি দিল। লোকটার কথার এখন যা ঝাঁঝ তাতে ওর থেকে আর কোনও উপকার পাওয়ার আশা নেই। পদাবলী তবু ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করে বলল - ‘তবে একটা কথা ঠিক যে অত বড় কীর্তনীয়া তাঁর সঠিক সমাদর পেলেন না। আমাদের প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা তাঁর নামই জানল না।’
‘তুমি তো মনে হচ্ছে বাকি কীর্তনীয়াদের সম্বন্ধে বেশ খোঁজ-খবর রাখ,’ গোবিন্দ অধিকারীর গলার ঝাঁঝ এখনও কমেনি। ‘তা তোমার মতে গত দু‘শ বছরের মধ্যে বাংলার সেরা দশ জন কীর্তনীয়া কে কে?’
পদাবলী হোঁচট খেল। সেরা দশ কীর্তনীয়া? তা তো ওর জানা নেই। পদাবলী অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল।
‘আচ্ছা, দশ জন থাক। তিন জন বিখ্যাত কীর্তনীয়ার নাম বল তো দেখি। গায়েন বায়েন সব চলবে।’
পদাবলী এবার আরও অপ্রস্তুত। ওর বিদ্যা ধরা পড়ে গেছে। ও ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়াল – “জানি না।’ -
“কেমন বাঙালি তুমি হে? কলেজে পড়ছ অথচ নিজের জাতির তিনজন বিখ্যাত কীর্তনীয়ার নাম পর্যন্ত জানো না?’ গোবিন্দ অধিকারী এবার চোখ সঙ্কুচিত করে কুটিল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল – ‘কী ধান্দায় এ’পাড়ায় এসেছ, একটু ঝেড়ে কাশ তো।”
“আজ্ঞে, মনের ইচ্ছে ছিদাম বায়েন মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করে ওঁর কাছ থেকে পুরোনো দিনের রোমহর্ষক সনাতন কীর্তনের কাহিনী শুনব।’
‘সেটা আন্দাজ করেছিলাম,’ গোবিন্দ অধিকারী ধুতিতে আটকে থাকা নাছোড় চোরকাঁটা ছাড়াতে লাগল। ‘বাবা আজকাল কারোর সঙ্গে দেখা করেন না।’
“আমাকে একটিবার দেখা করতে দিন না প্লীজ।’
“বললাম তো সেটা সম্ভব নয়।’
“স্যার, আমি সময় নেব না। একটিবার যদি ‘
‘একবার যখন না বলে দিয়েছি তখন না,’ গোবিন্দ অধিকারীর মাথার দু‘দিকের রগ ফুলে গেল। তারপর শান্তভাবে বলল, ‘বাবার শরীর এখন খুব খারাপ যাচ্ছে। ডাক্তার বাবাকে বেশি কথা বলতে বারণ করেছে।’
পদাবলী দীর্ঘশ্বাস ফেলল - ‘এতদূর থেকে এলাম –
‘ছিদাম বায়েনের সঙ্গে দেখা করবে, জীবনে কখনো কীর্তনের আসরে গেছ?”
পদাবলীর মনে হচ্ছে ধরণী দ্বিধা হও। এই বুড়ো ওর চরম বেইজ্জতি করতে এতটুকু ত্রুটি করছে না। আমতা আমতা করে বলল, “আজ্ঞে না, এবার কেঁদুলিতে জয়দেবের মেলাতে বাউল গান শুনতে যাব ভেবেছিলাম -
‘বাউল! বাউল আর কীর্তন এক হল? আর জয়দেবের নামে মেলা বাউল গানের জন্যই বিখ্যাত হয়ে গেল? জয়দেব কখনো বাউল গান লিখেছে?” ‘আজ্ঞে না, জয়দেব লিখেছেন পদাবলী কীর্তন। গীতগোবিন্দম।’
‘তাহলে?” গোবিন্দ অধিকারী পদাবলীকে থামিয়ে দিল। ‘জয়দেবের জন্মভূমি কেঁদুলিতে লোকে ছোটে বাউল শুনতে। আর গীতগোবিন্দের পদাবলী কীর্তন রইল ব্রাত্য হয়ে। যাক সে কথা, জীবনে কখনো কীর্তনের আসরে যখন যাও নি, তখন একটা সুযোগ আছে তোমার যাতে ভবিষ্যতে কেউ জিজ্ঞেস করলে এরকম অপ্রস্তুতে না পড়তে হয়। যদি কীর্তন শুনতে চাও তবে আমার সঙ্গে আসতে পার।’
“কোথায়?”
‘জমিদারবাড়িতে।’
“জমিদারবাড়িতে কীৰ্তন হয়?”
‘পরম্পরা বজায় রেখে দুর্গাপুজোয় দশমীর রাতে প্রতিমা বিসর্জনের পর অষ্টকালীয় নিত্যলীলা হয়।’
‘আটজন কালী ঠাকুরের কীর্তন?”
“আটজন কালী ঠাকুর হতে যাবে কেন?’ পদাবলীর বিদ্যের দৌড়ে গোবিন্দ অধিকারীর মুখে অসন্তোষের ছাপ। ‘অষ্টকাল। নিশান্ত, প্রাতঃ, পূর্বাহ্ন, মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ন, সায়ং, প্রদোষ ও নক্ত এই হল অষ্টকাল।’
‘খুব ভিড় হয় বুঝি?”
‘কীর্তনে আজকাল কারও মন আছে নাকি? নেহাৎ পরম্পরা তাই। জমিদারদের শরিকরা শহরে থাকে। কেউ কেউ আসে দেশের বাড়ির পুজোতে, লোকজন বিশেষ হয় না বললেই চলে।’
‘আপনি কীর্তন শুনতে যাবেন বুঝি?”
‘আমার আখড়ার কীর্তনীয়ারাই গেছে ওখানে কীর্তন করতে। আমাদের কীর্তন কোম্পানির ভ্যান নিয়ে আমি ওখানে যাব। মাইক, সাউণ্ড বক্স, ব্যাটারি, খোল, হারমোনিয়াম আর কীর্তনীয়াদের নিয়ে ফিরতে হবে। বিকেল-বিকেল ফিরে আসব। যেতে চাইলে আমার সঙ্গে আসতে পার। যতক্ষণ ভাল লাগে শুনো, ভাল না লাগলে উঠে যেও।’
‘কখন যাবেন?’
‘এই শাপলাগুলো শুকোতে দিয়েই যাব।’
পদাবলীর মনে পড়ল নাইট্রোজেনের উপদেশ - জমিদারবাড়িটাকে এড়িয়ে থেক। কিন্তু এই লোকটার সঙ্গে ছিনে জোঁকের মত লেগে থাকতে হবে। এই লোকটাকে সন্তুষ্ট করতে পারলে তবেই ছিদাম বায়েনের দেখা পাবে। পদাবলী রাজি হয়ে গেল। গোবিন্দ অধিকারীর পাশে পাশে চলতে চলতে বলল, ‘এত শাপলা ফুল দিয়ে কী করেন?”
‘কীর্তন গেয়ে যা উপার্জন তাতে পেট চলে না। সেসব দিন গেছে। তাই এই শাপলা বেচি মহাজনের কাছে।’
ঘেঁসের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল একটা গতযৌবনা টেম্পোভ্যান। গায়ে লেখা “করতালতলী কীৰ্ত্তন কোম্পানী”, অক্ষরগুলো ভ্যানের গা থেকে অনেকদিনই ঝরতে শুরু করেছে।
‘তুমি ভিতরে বস, এগুলোকে পদাবলী ভ্যানের দিকে এগোল। ভ্যানের ভিতরে দুই ঝাঁকা ভর্তি শুকনো শাপলা ফুল ডাঁটা। কোনও রকমে বকের মত পা উঁচু করে করে দুই ঝাঁকার মধ্যে দিয়ে একটা সিটে গিয়ে বসল পদাবলী। লোকটা বড্ড খিটখিটে, খুব সাবধানে মেপে মেপে কথা বলতে হবে। এন্ট্রিতেই যেন এক্সিট না হয়ে যায়।
শুকোতে দিয়ে আসছি।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন