প্রীতম বসু
বিদেশী দ্রব্য বর্জনের ডাকে সাড়া দিয়ে কুমুদরঞ্জন ছাতা আর জুতো ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছিলেন। খড়ম পরে পথে হাঁটাচলা করতেন, এখন ছেলে-মেয়ের বকাঝকায় মৃদঙ্গমের এনে দেওয়া তালতলার চটি পায়ে গলিয়ে বেরোন, কিন্তু এখনও ছাতা ব্যবহার করেন না। রোদ্দুরে বাইরে যেতে হলে বাঁশের কঞ্চির মাথাল মাথায় দিয়ে বেরোন।
পরদিন বেলার দিকে কুমুদরঞ্জন কোতোয়ালিতে গেলেন পুলিশের অনুমতি আনতে। ফিরে আসলেন মুখ নিচু করে।
‘কী হল?” মন্দিরা বাবার নিম্নমুখী চিবুক দেখে বুঝতে পারল বাবা সফল হয় নি। ‘অনুমতি দিল না?”
‘না,’ কুমুদরঞ্জন মাথালটা মাথা থেকে খুলে দাওয়ার পেরেকে টানিয়ে রেখে কুয়োর পাড়ে গেলেন। হাঁটু পর্যন্ত ধুলোয় ধূসর। কুয়োর জলে পা, মুখ, মাথা ধুয়ে গামছা দিয়ে মুছলেন। তারপর দাওয়ায় বসে বললেন, ‘অনুমতি দিল তো নাই, বরং আমাকে প্রশ্ন করতে লাগল ছেলে কবে থেকে স্বদেশী করে, প্রাণনাথকে আমরা কত বছর হল জানি, ছেলেকে আমরা কোথাও লুকিয়ে রেখেছি কিনা এসব।’
‘বদমাশের দল,’ মন্দিরা রেগে গেল। “তাহলে? ধুলট হবে না এবছর?”
‘নীলমাধবের ইচ্ছা, বৃদ্ধ দাওয়ায় বসল। ‘সবচেয়ে লজ্জার কথা হল আমাদের বংশের কুলাঙ্গার আমার সহোদর ভ্রাতাও ওখানে উপস্থিত ছিল।’ ‘কাকা কিছু বলল না?’ মন্দিরার কণ্ঠস্বরে উষ্মা। 1
‘বলল। সে বলল যে দাদা, আমাদের সকলের উচিত সরকারের নিয়ম কানুন সমর্থন করা। সরকার যখন সমস্ত জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে, তখন কেন আমরা এই ধুলটের আয়োজনের কথা চিন্তা করছি? আমি বললাম, কী বলছিস তুই অখিল! আজ পর্যন্ত আমাদের বংশে এরকম ঘটনা ঘটেছে? এই কথা শুনে অখিল বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, আজ পর্যন্ত আমাদের বংশের কেউ পিকেটিং করে ইংরেজদের ওপর বোমা ছুঁড়েছে? ছিঃ ছিঃ লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে।’
“তারপর?”
‘মৃদঙ্গমের প্রসঙ্গ আমার সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। আমি আর মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলাম না। আমি চেঁচিয়ে বললাম, এরা ভাবছে আমি কিছু জানি না। আমি সব জানি, এরা প্রেসিডেন্সী জেলে মৃদঙ্গমকে ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য অত্যাচার করে ওকে খুন করে। আর এখন সবাই মিলে নাটক করছে।’ বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন হাঁফাতে লাগল।
মন্দিরা ঘরের ভিতর ছুটে গেল, বেরিয়ে এল একগ্লাস জল নিয়ে। কুমুদরঞ্জন ঢকঢক করে জল খেলেন, তারপর গ্লাস নামিয়ে রেখে বললেন, ‘অখিল বোধহয় এতসব জানত না। কিন্তু পুলিশদের কাছে খবর ছিল। ওরা আর আমাকে ঘাঁটালো না। বলল আপনি বাড়ি যান। আমরা যা বলার বলে দিয়েছি। এ বছর ধুলট হবে না।’ কুমুদরঞ্জন দু‘হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন। মন্দিরা বাবার পিঠে হাত রাখল। মন্দিরা শান্তস্বরে বলল, ‘বাবা, ঘরে চল। ঠাকুর ঠিক একটা ব্যবস্থা করবেন।’ কুমুদরঞ্জন মেয়ের দিকে তাকালেন, তাঁর চোখ ভেজা। উনি কাঁদছেন। কুমুদরঞ্জন এবার উঠোনে নেমে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কান্না মেশানো গলায় চিৎকার করে বললেন, “হে নীলমাধব, আর কত শাস্তি দেবে? শুধু তোমার নামকীর্তন করার জন্য নিজের ঘর-বাড়ি সব ত্যাগ করে এই জলাজমিতে পড়ে থাকি। স্বাদ আহ্লাদ বলতে বছরে ওই একমাত্র ধুলট। তাও কেড়ে নেবে? আমি কি এতই পাপ করেছি?”
মন্দিরা বাবাকে ধরে বাড়ির ভিতরে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। বৃদ্ধ এবার আকাশের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘ঠাকুর, তুমিও শুনে রাখ। ধুলট যদি না হয়, তবে আমি আত্মহত্যা করব। এই আমার প্রতিজ্ঞা।”
অশুভ সংকেতে প্রাণনাথের বুক কেঁপে উঠল। মন্দিরা, বাবার হাত ছেড়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বাড়ির ভিতরে চলে গেল। প্রাণনাথ বিড়বিড় করে বলল, ‘ধুলট হবেই।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন