এক

প্রীতম বসু

১৯৯৬ সাল

প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার অন্তর্ধানের গল্পটা শেষ করে নাইট্রোজেন স্যার ক্লাসের এমাথা থেকে ওমাথা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন। কোনও কোনও ছাত্রের কপালে অবিশ্বাসের ভাঁজ। কারোর চাহনিতে বিস্ময়। আবার কেউ বা রহস্যের আভাস পেয়ে কৌতূহলী। নাইট্রোজেন জানেন এবার একঝাঁক প্রশ্ন ছুটে আসবে

তারপর কী হল, স্যার?

সনাতন কীর্তন কি সত্যিই ছিল?

কে ঐ প্রাণনাথ কীর্তনীয়া, স্যার? ইংরেজরা

এই মন্দির কি এখনো আছে, স্যার?

কেন ওকে ধরতে চাইছিল?

প্রশ্নগুলো নতুন কিছু নয়। প্রতিবছর এটা হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার এম-এ ক্লাসের গেস্ট লেকচারার প্রবীণ ঐতিহাসিক ডঃ নীতিশ নাগ, ওরফে নাইট্রোজেন তাঁর বৈষ্ণব পদাবলীর লেকচার প্রতিবছর এই গল্পের চমক দিয়েই শুরু করেন। নাইট্রোজেনের কাঁচা-পাকা গোঁফের নিচে রহস্যময় হাসি। এই হাসিটাও অভিনয়। নাটকের পেশাদার অভিনেতার মত মুখস্থ। ছাত্রদের মধ্যে অবিশ্বাসের গুঞ্জন। উনি কিছুক্ষণ সময় নিলেন তারপর বললেন তারপর আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।’

“আর গোটা ক্লাসের গুঞ্জন এক মুহূর্তে চুপ।

‘ধুলটের সময় ভক্তরা যাতে না ক্ষেপে যায় সেজন্য ড্যানিয়েল সাহেব মন্দিরে ভাঙাভাঙি করার অভিপ্রায় থেকে নিজেকে সাময়িক নিবৃত্ত করল বটে, কিন্তু মন্দিরের চারপাশে সারারাত কড়া পুলিশ-পাহারা মজুত রইল। পুলিশ সুপার ড্যানিয়েল সারারাত ধরে চৈতন্যপুখুরীর পাড়ের জল-কাদায় প্রতিটি ঝোপঝাড় নিজে মশাল হাতে নিয়ে খুঁজল। লতাগুল্মে সন্দেহ হলেই বেয়নেটের খোঁচা। কিন্তু লাভ কিছু হল না। পরদিন সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে ধুলডাঙার প্রান্তে আদাড়ে ডাঁই করা ছেঁড়া কলাপাতায় মুখ ডুবিয়ে উচ্ছিষ্ট খিচুড়ি টেনে আনা ব্যস্ত নেড়ি- কুকুরদের দলের দিকে অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাতজাগা ড্যানিয়েল বলল আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।’ নাইট্রোজেন থামলেন। গোটা ক্লাস নিস্তব্ধ। কে বলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সাবজেক্টটা নীরস?

‘করতালতলীটা কোথায়, স্যার?’ লাস্ট বেঞ্চ থেকে একটা বেমক্কা প্রশ্ন উড়ে এল।

‘জায়গাটার নাম তো কখনো শুনিনি।’

নাইট্রোজেন ভ্রূ কুঁচকালেন। ছাত্রদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রতি একটা অবজ্ঞার ভাব তিনি প্রতিবছর লক্ষ্য করেন। উত্তর না দিয়ে শেষের সঙ্গে উনি বললেন “ঘরের কাছের শিশিরবিন্দুটি এখনো দেখা হয় নি? যাক, এ প্রসঙ্গে পরে আসছি, আগে ঘটনাটা শেষ করি।’ নাইট্রোজেন আবার শুরু করলেন ‘ধুলট শেষ হওয়ার আগে ড্যানিয়েল সাহেব বেশ কয়েকজন কীর্তনীয়াকে ডেকে পাঠাল। উদ্দেশ্য সনাতন কীর্তনের ব্যাপারটা জানা। সাহেব দেখল সবাই জানে এই সনাতন কীর্তনের গল্প, কিন্তু একেক জনের গল্প একেক রকম। কেউ বলে সনাতন কীর্তন আসলে লিখেছিলেন হোসেন শাহের আমলে সনাতন গোস্বামী, কেউ বলে কোনও এক সনাতন চোর বাল্মীকির মত একরাতে সাধু হয়ে গেছিল, সেই লিখে গেছিল এই সনাতন কীর্তন, আবার কেউ বড় বড় চোখ করে ভূতের গপ্পো বলার মত বলল সনাতন চোরকে নাকি অজগরের মত মন্দিরে গ্রাস করেছিল এই কীর্তন, তাই এটা সনাতন কীর্তন। বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যায় সাহেব অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। তারপর ধুলটের নগর-সংকীর্তন, দধিমঙ্গল, মহান্ত বিদায় শেষ হলে কীর্তনের সব দল একে একে হারমোনিয়াম-খোলকরতাল-বাঁশি-খমোক-খঞ্জনি নিয়ে করতালতলী ছেড়ে চলে গেল। তাদের কাঁথাকম্বলে মুড়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে গেল সদ্যোজাত প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার উপকথা। এবার নাছোড় ড্যানিয়েল সাহেব বলল - ডিগ দ্য ফ্লোর। মন্দির খুঁড়ে ফেল। মন্দিরের রহস্য খুঁজে বের করতেই হবে।

কিন্তু গ্রামবাসীরা সত্যিই বেঁকে বসল। যে মন্দিরের এত মাহাত্ম্য, এক ম্লেছ সেই মন্দির খুঁড়তে বলছে? নীলমাধব জাগ্রত দেবতা, ক্রুদ্ধ হয়ে কালীয়দমন করেছিল। দেবরোষে অঘটন নিশ্চিত। কিছু হলে এই লালমুখো ড্যানিয়েল তাদের বাঁচাতে আসবে? অসম্ভব। সাহেব তখন ভাবল যে ঠিক আছে, যে-রোগের-যে-পথ্য। বাংলার পাঁকের নিচে কোথায় কী গা-ঢাকা দিয়ে আছে তা ব্রিটিশ সিংহের পক্ষে খুঁজে বের করা দুষ্কর। এ জন্য চাই পাঁকাল মাছ। আর বাঙালিদের মধ্যে পাঁকাল মাছের অভাব নেই। এরাই লোভের বশে নিজেদের ভাই-বন্ধু বিপ্লবীদের ধরিয়ে দেয়। এরা ক্যারট অ্যাণ্ড স্টিকের ভক্ত। সন্ধ্যাবেলা ড্যানিয়েল সাহেব জমিদার অখিলরঞ্জন সেনকে কুঠিতে ডেকে পাঠাল।

বেতের ঝুড়িতে একটা স্কচের বোতল আর কলকাতার অভিজাত হগ মার্কেটের জনসনের দোকান থেকে অর্ডার দিয়ে আনানো স্পেশাল কালিম্পঙের চিজ নিয়ে সাহেবের বাংলোতে ঢুকলেন জমিদার অখিলরঞ্জন। ভেবেছিলেন শুভ সংবাদটা বোধহয় কলকাতা থেকে এসেছে। তাই হয়তো সাহেবের এই অসময়ে তলব। কিন্তু স্বল্পভাষী ড্যানিয়েল সাহেবের মুখ থেকে যে দুঃসংবাদটা শুনলেন তাতে তাঁর মনে হল হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে। স্ত্রীর মৃত্যুতেও এত বড় আঘাত তিনি পাননি। ‘সরি জমিদারবাবু, আপনাকে রায়বাহাদুর অ্যাওয়ার্ডটা আমরা দিতে পারছি না।’

জমিদারের মাথায় বজ্রপাত। রায়বাহাদুর খেতাব তাঁর যে করায়ত্ত এটা ধরে নিয়ে তিনি অনেক কিছু করে ফেলেছিলেন। গোপনে কলকাতা থেকে “রায় অখিলরঞ্জন সেন বাহাদুর, বি-এ” লেখা লেটার প্যাডও ছাপিয়ে এনেছেন। গেটের দেওয়ালের জন্য রায়বাহাদুর পদবী খোদাই করা গ্র্যানাইট পাথরের ফলক রেডি। শুধু শুভ ঘোষণার অপেক্ষা। এ পরিস্থিতিতে একি দুৰ্যোগ! উনি কাকুতি মিনতি করে বললেন, হুজুর, এ কেমন বিচার আপনাদের? আমি আপনাদের মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট। এত সাহায্য করলাম আপনাদের-

‘ব্যাপারটা কমপ্লিকেটেড হয়ে গেছে, সেন, ড্যানিয়েল সাহেব গ্লাসে দুটো বরফের টুকরো ফেলল। ‘ইংরেজ সরকার সন্দেহ করছে যে প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সে আপনার হাত আছে।’

‘আমার হাত!’ জমিদার হতভম্ব। ‘আমিই আপনাদের খবরটা দিয়েছিলাম যে প্রাণনাথ এখানে আসবে। আমি ওর অন্তর্ধানের সঙ্গে জড়িত নই, হুজুর!” “বেশ, প্রুভ দ্যাট। প্রমাণ করুন। আমাকে প্রাণনাথ কীর্তনীয়া এনে দিন, আমি আপনাকে রায়বাহাদুর উপাধি উপহার দেব।’

‘আর যদি না পাই?” অখিলরঞ্জন উৎকণ্ঠিত।

“না পেলে রায়বাহাদুর উপাধি ভুলে যান। সরকার আপনার রায়সাহেব পদবীটাও বাতিল করে দেবে।’

‘এমন কাজ কক্ষনো করবেন না, স্যার।’ অখিলরঞ্জন জোড়-হাত করে অনুরোধ করলেন।

‘দেন ফাইণ্ড প্রাণনাথ। আমার প্রাণনাথ চাই-ই। ডেড অর অ্যালাইভ।’

পরদিন সকালে ড্যানিয়েল সাহেব সদলবলে করতালতলী ত্যাগ করল। জমিদার অখিলরঞ্জন ভীষণ মুষড়ে পড়লেন। এতদিন তাঁর শয়নে, স্বপনে, জাগরণে শুধু রায়বাহাদুর খেতাব ঘুরে বেড়াত। তাঁর সদ্য সমাপ্ত প্রকাণ্ড অতিথিশালায় বেলোয়ারি ঝাড়বাতির নিচে সন্ধ্যায় রাত্রিভোজের জন্য মদিরার-রৌপ্যপাত্র হাতে উপবিষ্ট সন্ত্রীক শ্বেতাঙ্গ জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, সিভিল সার্জেনরা তাঁর আপ্যায়নে তৃপ্ত হয়ে তাঁর সঙ্গে হেসে খাতির করে কথা বলছে এসব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার? স্বখাত সলিলে ডোবা একেই বলে। কী দরকার ছিল এসব ঝামেলার? এখন তিনি কী করবেন? কীভাবে প্রাণনাথকে হাজির করবেন? কোথায় গেল প্রাণনাথ? দলবল নিয়ে বারবার তিনি মন্দিরে খোঁজ-খবর করতে লাগলেন। জমিদারের মনে হল একটা উপায় আছে। ছিদাম বায়েন! ব্যাটা সব জানে! ছিদামকে অ্যারেস্ট করিয়ে কোতোয়ালিতে উত্তম মধ্যম দিলেই সব কথা বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু ছিদামকে গ্রেফতার করে লোভ, ভয়, কাকুতি মিনতি ইত্যাদি সকল অস্ত্র তূণ থেকে বের করে ব্যবহার করেও কোনও কাজ হল না। ছিদাম অনড়। জমিদার বুঝেই উঠতে পারলেন না প্রাণনাথ কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল। চিন্তায় রাতে ঘুম ভেঙে যেত। আতঙ্কে বিছানায় উঠে বসতেন। হাতের তালু ঘামছে। ভয় হত হার্টফেল করবে না তো? উঠে ঘরে পায়চারি করতেন। কখনো মাঝরাতে অস্থির হয়ে তাঁর বিশ্বস্ত বিহারী যমদূত চেহারার লেঠেল হুকুমচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে চলে যেতেন নীলমাধবের মন্দিরে। তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখতেন পাথরের মেঝে। কিন্তু মেঝেতে একচুলও ফাঁক পাওয়া গেল না। জমিদারের শরীর ভেঙে গেল। বার্ধ্যক্য যেন শরীরে শীতের কুয়াশার মত জাঁকিয়ে বসল,’ নাইট্রোজেন থামলেন। গোটা ক্লাস অদ্ভুত ঘটনাটার শেষ পরিণতি জানার জন্য উন্মুখ। ‘তারপর একদিন নাকি এক বুড়ি কীর্তনীয়া জমিদারকে শিখিয়ে দিল সনাতন কীর্তনের গৃহ্যতত্ত্বকথা। এই কীর্তন গাইবার নিয়ম। মন্দিরের ভিতর সম্পূর্ণ একা থাকতে হবে। কীর্তন গাইতে হবে নীলমাধবের সামনে মন্দিরের দরজা বন্ধ করে একা। প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার অন্তর্ধানের পর থেকে মন্দির বন্ধ, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাইরে সারাদিন ভক্তে ভরা থাকে, দিনের বেলা সম্ভবই না। জমিদার অখিলরঞ্জন গভীর রাতে গোপনে গেলেন নীলমাধবের মন্দিরে। এবার একাই চুপিসাড়ে। এক হাতে রিভলভার, অন্য হাতে টর্চলাইট।’

“উনি ভেদ করলেন সনাতন কীর্তনের রহস্য?”

‘তা জানা যায় নি। কারণ এবার জমিদার নিজেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।’ ‘তাহলে কীভাবে জানা গেল মন্দিরেই গেছিলেন জমিদার?’

“শেষরাতে হুকুমচাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। পাছদুয়ারের তালা খোলা! ও বুঝল জমিদারবাবু নিশ্চয়ই একা চলে গেছেন নীলমাধবের মন্দিরে। হুকুমচাঁদ ছুটল করতালতলীর জলার দিকে। চৈতন্যপুখুরীর পাশ দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে পৌঁছাল নীলমাধবের মন্দিরের সামনে। মন্দিরের দরজা বন্ধ। দরজার নিচ থেকে টিপবাতির আলোর রেখা আসছে। লেঠেলের মনে হল যে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে ভিতরে। ও ভয়ে ভয়ে অ-ল্-পো করে দরজা ফাঁক করল। আর দরজার ফাঁকে চোখ রেখে দেখল – নাইট্রোজেন চুপ। ক্লিফহ্যাঙ্গার।

‘কী দেখল, স্যার?” একসঙ্গে অনেকের অধৈর্য প্রশ্ন, উত্তেজনা চাপা কঠিন। ‘মন্দির খালি।’

‘জমিদার?’

‘জমিদার অখিলরঞ্জন মন্দিরে নেই। কিন্তু জমিদারের জ্বলন্ত টর্চ মন্দিরের মেঝেতে পড়ে আছে।’

“তারপর?”

‘উদ্বিগ্ন হুকুমচাঁদ মন্দিরের চারপাশ খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু জমিদার বেমালুম বেপাত্তা। বেচারা খুব ঘাবড়ে গেল। থানা-পুলিশ হলে ইংরেজ পুলিশ ওকেই সন্দেহ করে জেলে ঢুকিয়ে দেবে, এমনকি জমিদারবাবুকে না পাওয়া গেলে খুনের সন্দেহে ওর ফাঁসি হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। ও চুপিচুপি খিড়কি পথে নিজের বিছানায় ফিরে এল। সকাল হল। জমিদার নিখোঁজ। খোঁজাখুঁজি শুরু হল। খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে গেল। জমিদারকে যখন পাওয়া গেল না তখন খবরটা করতালতলী পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছাল। কলকাতা থেকে ইংরেজ পুলিশ-গোয়েন্দা করতালতলীতে এল, কিন্তু কোনও সুরাহা করতে পারল না এই রহস্যময় অন্তর্ধানের।

‘স্যার, কোথায় গেল জমিদার ?”

‘সে রহস্য আজও অধরা,’ নাইট্রোজেন রহস্যময় হাসি হাসলেন। ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হুকুমচাঁদ শেষবারের মত একবার ছিদাম বায়েনের কাছে গেছিল। জানতে চেয়েছিল যে ছিদাম কিছু জানে কিনা। প্রাণনাথ কীর্তনীয়া আর জমিদার অখিলরঞ্জন কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল? ছিদাম বলেছে সে জানে না।’

ফার্স্ট বেঞ্চে বসে পদাবলী মনোযোগ দিয়ে গল্পটা শুনছিল। এবার ও প্রশ্ন করল - ‘স্যার, প্রাণনাথ কীর্তনীয়া যে কীর্তনটা গেয়েছিল সেই সনাতন-কীর্তনটা কি কারোর কাছে আছে?”

‘সনাতন-কীর্তন চিরতরে অতীতের অন্ধকার-গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে,’ নাইট্রোজেন বিষণ্ণ হাসি হাসলেন। ‘কেউ জানেনা সেই কীর্তনে কী লেখা ছিল। তবে বাউল-ফকির-কীর্তনীয়াদের লোককথা বলে যে রহস্যময় সেই সনাতনকীর্তন বুঝতে পারার একটা ছোড়ানকাঠি ছিল।

‘কী কাঠি, স্যার?’

‘চাবি।’

নাইট্রোজেন চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলেন -

বদসি যদি কিঞ্চিদপি দন্তরুচিকৌমুদী হরতি দরতিমিরমতিঘোরম্

‘এটা তো সংস্কৃত?” একজন ছাত্র বলল।

‘হ্যাঁ,’ অধ্যাপকের মুখে হাসি। ‘জয়দেবের গীতগোবিন্দ। মধুরকোমলকান্তপদাবলীর দশম সর্গে শ্রীকৃষ্ণ কলহান্তরিতা রাধিকার মানভঞ্জন করতে গিয়ে বলছেন - শ্রীরাধে, একবার যদি একটু কথা বল, তবে তোমার চারুহাস্যরূপ জ্যোৎস্নায় ক্রোধজনিত অন্ধকার বিদূরিত হয়ে যাবে। আর এর মধ্যেই নাকি লুকানো আছে সনাতন-কীর্তন বুঝবার পাসওয়ার্ড।’

“বাপরে, এতো ইম্পসিবল!’ একজন ছাত্র বলল।

“হ্যাঁ, চাৰিটাই এত জটিল যে এ দিয়ে তালা খোলা সত্যি ইম্পসিবল। জানিনা সনাতন-কীর্তনের গভীর অর্থ প্রাণনাথ গোঁসাই কীভাবে আত্মস্থ করল,’ প্রফেসর বললেন। “তবে যাদের কীর্তন জগতের সঙ্গে পরিচয় আছে তা… সকলেই জানে জয়দেবের এই লাইনটা একটা বিচিত্র লাইন।’

‘বিচিত্র কেন, স্যার?”

‘এটা পৃথিবীতে একমাত্র সঙ্গীতের লাইন যেখানে একটা লাইন

গাইতে গেলে

আট রকম তাল ব্যবহার করতে হয়। ‘

আট রকম তাল দিয়ে গাইতে হয় ছোট্ট এই একটা লাইন?’ “হ্যাঁ।”

- ছাত্রদের চোখে মুখে বিস্ময়। কিন্তু আবার একটা বেমক্কা উড়ো প্রশ্ন “স্যার, এটা এত বড় একটা ব্যাপার, অথচ আমরা এতদিন জানি না কেন?”

‘এটা যদি একজন বাঙালি না রচনা করে একজন আমেরিকান ার্মান বা ইংরেজ রচনা করতেন তবে তোমরা নিশ্চয়ই জানতে, বাবা। বেঠোফেন মোৎসার্টের সৌভাগ্য যে ওরা বাংলার মাটিতে জন্মায় নি। বিলেত-টিলেতের দিকেই তো তোমাদের ঝোঁক, দেশের সঙ্গীতের ক’জন খেয়াল রাখে? ঝাঁতি, দুঠুকী, লোফা, দাসপ্যারী এসবের নাম শুনেছ?’ -

‘না,’ ছাত্রটি পালটা আক্রমণ সামলাতে না পেরে চুপ করল।

“তোমাকে দোষ দেব না,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘দোষ আমাদের। আমরাই তোমাদের সব সময় দেশ টপকে বিদেশের সম্পদ তারিফ করতে শিখিয়েছি। জয়দেব এক অনবদ্য বাকশিল্পী ছিলেন। পেট্রার্কের লেখা লরার প্রতি প্রেমের কবিতা যেমন ইতালির নবজাগরণের সূচনা করেছিল, জয়দেব তেমনি গোটা বাঙালি জাতির বুকের ভিতর জমে থাকা ভক্তিভাবকে ভাষা দিয়ে বাঙালির সারস্বত কুঞ্জকে মুখরিত করে তুলেছিল। বাঙালির জীবনে এক নবজাগরণ এনেছিল। সংস্কৃতে লেখা হলেও বাংলা সাহিত্য জয়দেবের গীতগোবিন্দ থেকে রস আহরণ করে পুষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমরা কতজন জয়দেব পড়েছি? জয়দেবের গীতগোবিন্দে বারোটা সর্গ। তাদের নাম তোমাদের মধ্যে কেউ কি বলতে পারবে?’

গোটা ক্লাস চুপ।

‘যাক, সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যা বলছিলাম, আটটা তাল এক লাইনে। এই আটটা তাল হল আড়, দোজ, যতি, শশীশেখর, গঞ্জন, পঞ্চম, রূপক আর সম। এই আটটি তালের মধ্যে লুকিয়ে আছে এই রহস্যের চাবিকাঠি।’ প্রফেসর আর গভীরে গেলেন না। আজকের মত এতটুকুই যথেষ্ট।

ক্লাস শেষ হল। পদাবলী উত্তেজিত। স্যার বললেন সনাতন কীর্তন হারিয়ে গেছে। কিন্তু ওর ঠাম্মার নোটবইতে তো সনাতন কীর্তন লেখা আছে! হ্যাঁ, ওটা সনাতন কীর্তনই ছিল। ওর স্পষ্ট মনে আছে। তবে পৃষ্ঠাটা অদ্ভুত। পৃষ্ঠার নিচের অংশ ছেঁড়া। আর সেখানে একজনের ফটো আলপিন দিয়ে আটকানো। মেসে ফিরে গিয়ে এক্ষুনি ওটা বের করে দেখতে হবে। প্রফেসরের এই গল্পের সঙ্গে ঠাম্মার কোনও যোগাযোগ আছে কি?

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%