প্রীতম বসু
চন্দননগর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে উলুডাঙা গ্রাম। পাশ দিয়ে চলে গেছে সরকারি সড়ক। বাস থেকে নেমে খোল কাঁধে গ্রামের মেঠো আলপথে হাঁটা লাগাল ছিদাম। মেঠো-কুমড়োয় ভরে আছে ক্ষেত। কাকতাড়ুয়ার মাথায় একটা ছোট কুমড়ো, শরীরটা পোক্ত বাঁশের না হওয়ায় হেলে গেছে। মনে হচ্ছে ভারী হাওয়া এলেই উলটে যাবে। অনেকটা দূরে একটা বাঁশের সাঁকো, তার নিচে খাল, সাঁকো থেকে খালের জলে লাফিয়ে পড়ে মাতামাতি করছে কয়েকটি অর্ধনগ্ন রুগ্ন বাচ্চা ছেলে। ছিদাম একজনকে জিজ্ঞাসা করল – ‘বিভাবরী দাসীর বাড়ি কোনটা?”
‘এ গাঁয়ে ঝাঁকে না,’ ছেলেটা জলে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হল।
“থুথুরে বুড়ি বোষ্টমি, খঞ্জনি বাজিয়ে কীর্তন গায়, ছিদাম বর্ণনা দিল। ‘ওর বাড়িতে খোল বানানো হয়।’
“তা আগে বলবে তো, খোল-বুড়ি। এই খাল ধরে চলে যাও। খাটালের পাশে।’ ছেলেটা জলে ঝাঁপ দিল।
আশেপাশে জলাগুলোতে শীতের আগেই জল অনেক নিচে নেমে গেছে। গ্রামের মেয়েরা জলা থেকে কাদামাখা গেঁড়ি-গুগলি তুলে তুলে পাশের ঝুড়িতে জমা করছে। লোভী কাকগুলো সেই ঝুড়ির কাছাকাছি ওড়াউড়ি করছে। মেয়েগুলো সেই কাদা থেকে পাথর তুলে কাকের দিকে ছুঁড়ে কাক তাড়াচ্ছে। কাদাখোঁচা, কাস্তেবকগুলো দূরে লম্বা লম্বা ঠোঁট দিয়ে জোঁক, কেঁচো, ব্যাং এসব কাদা থেকে মনোযোগ দিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করছে। ছিদাম আলপথে এগিয়ে চলল।
খাটালের মাটির দেওয়ালে, খেজুর গাছের গুঁড়িতে, কুঁড়েঘরের মান্দারের বেড়ায় - চারদিকে চাপড়ি শুকোচ্ছে। গোবরের দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। এই গন্ধের মধ্যেও যে কেউ বসে থাকতে পারে তা ছিদামের কাছে কল্পনাতীত। কাঁচাগাঁথুনির মেটেবাড়ির উঠোনে কম করে তিরিশ-পঁয়ত্রিশটা কাঁচামাটির নরম খোলের চাড়া শুকোচ্ছে। পাশে একটা বুড়ি রোদ্দুরে মোড়ায় বসে ছেঁদা ঝিনুকে পান ছেঁচে ছেঁচে মুখে ঢুকিয়ে চুষছে। ছিদাম গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘বিভাবরী দাসীর বাড়ি এটা?’
‘তুই কেরে মিনসে, আমায় নাম ধরে ডাকিস?’
‘আমায় প্রাণনাথদাদা পাঠিয়েছে।’
‘আমি কোনও প্রাণনাথদাদাকে চিনি না।’
ছিদাম বুক পকেট থেকে সিকিটা বের করে বুড়িকে দিল। বুড়ি সিকিটা চোখের সামনে ধরল তারপর ছিদামের দিকে মুখ তুলে বলল, “আমার সিকি প্রাণনাথ ফিরিয়ে দিল। বেশ করেছে।’ তারপর বুড়ি খ্যানখ্যানে গলা চড়িয়ে ডাকল, ‘ইন্দিরা। একটা জলচৌকি দিয়ে যা তো, নোক এয়েচে।’
ভিতর থেকে ঘোমটায় মুখ ঢেকে একজন ময়লা সাদাটে শাড়ী পরা বিধবা একটা জলচৌকি দিয়ে চলে গেল।
‘বোস। পান খাবি?’
ছিদাম হাত বাড়ালো। বুড়ি আঁচল থেকে সুপারির টুকরো বের করল। ছেঁচা পান আর সুপারির টুকরো ছিদামের হাতে দিয়ে বলল - ‘দাঁতগুলো গ্যাছে, তাই সুপারি চুষি আর এই পান ছেঁচা রস। পুরোনো অভ্যেস, মরলে তবে যাবে।’ পান-সুপারি গালে ঠেলে ছিদাম বলল, ‘বাপরে এত খোল?”
‘এ তো কিছুই না,’ বুড়ি পানের রস গিলল। ‘আমার ভাইপো যখন বেঁচে ছিল তখন গরুর গাড়ি করে মাটি আসত। সব কুমোর তো আর এই খোল বানাতে পারেনা। খোল তো আর কলসি না যে যে-কেউ বানিয়ে দেবে! বাঁয়ার মাপ বারো আঙুল আর ডাইনার সাড়ে ছয় এ সকলের কম্মো নয়। মাটিতে বালি মেশাবার আন্দাজে ভুলচুক হলেই খোল ফেটে যাবে। ভাইপোটা তবলার বাঁয়াও বানাতো। ভোর থেকে কত রাত অবধি কাজ করত। তারপর ভাটির আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা। ওর বেধবা কি আর অত পারে? তাও বাঁজা মেয়েছেলে বলে গতরের জোর হারায় নি। তাই যতটুকু পারে ততটুকুই, আর সঙ্গে এই ঘুঁটে বিক্রি করেই সংসার চলে। তুই এই ফাটা খোল নিয়ে এয়েছিস কেন?”
‘বাঁয়ার আলাতলা খুলে গেছে। প্রাণনাথদাদা বলল তোমার কাছে এসে গেঁথে নিতে। তাছাড়া দেখনা খোলের সিক আলগা হয়ে খুলে খুলে গেছে, চাকের গাঁথুনিও ঢিলে হয়ে গেছে। অনেকদিনের খোল তো।’
‘এটা তো আমাদের এখানকার খোল না! সাত আঙুলের ডাইনা, এ তো মণিপুর, আসামের দিকের খোল। এসব খোলে সুর চড়া হয় না।’
‘ঠিক বলেছ,’ ছিদাম চমৎকৃত। ‘এটা আমার মৃদঙ্গমদাদার মা‘র খোল। মণিপুর থেকে আনা।’
‘একটা নতুন খোলই কিনে নে না বাপু। প্রাণনাথের চেনা যখন, দাম কম করে দেব।’
‘ওরে বাবা! গোঁসাইজ্যাঠা আমায় মেরে ফেলবে।’
এবার বুড়ি সামনে ঝুঁকে বলল, ‘হ্যাঁরে, প্রাণনাথ ভাল আছে তো?’ ‘আছে গো ঠাকুমা। ভাল আছে।’
মুখটা ছিদামের কাছে নিয়ে এল বুড়ি। ফিসফিস করে বলল, ‘এটার ভিতরে রিভলভার ঢুকিয়ে চামড়া বাঁধাতে হবে?’
বুড়ির মুখের দুর্গন্ধ পানের গন্ধে মিশে গেছে। ছিদাম শ্বাস বন্ধ করে ফেলল। “না না, বললাম তো এটা গোঁসাইজ্যাঠার খোল। ভাল করে চামড়া বেঁধে দাও যাতে মিষ্টি আওয়াজ আসে।’
‘ইন্দিরা,’ বুড়ি চেঁচিয়ে ডাকল।
ছিদামের মনে হল বুড়ির না চেঁচালেও চলত। সেই বিধবা ঘরের ভিতর থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে সবই দেখছিল। ঘোমটা টেনে বেরিয়ে এসে খোলটা নিয়ে আবার ঘরের ভিতরে চলে গেল।
ছিদাম বুড়ির পাশে বসে গল্প জুড়ে দিল, ‘বুড়ি মা, ঘরে আর কেউ থাকেনা?” “না রে, ভাইপোটাকে তো যম অকালেই খেয়ে নিল। ওর বেধবা বৌটাই আমার দেখভাল করে।’
“তোমার নিজের ছেলেপিলে?”
বুড়ি ফোকলা দাঁতে এক অসহায়ের হাসি হাসল। ‘আমরা উদাসীন বৈষ্ণব রে। আমাদের আবার ছেলেপুলে কীসের?’
ছিদাম উদাসীন বৈষ্ণব ব্যাপারটা বুঝল না। ও মাথা চুলকে বলল, ‘ঠিক বুঝলাম না বুড়ি মা।’
‘গৌড়ের রূপ-সয়ার বিলের পাড়ের প্রেমতলা মেলা জানিস তো?” ‘না, ছিদাম দু-দিকে মাথা নাড়াল।
‘ওখানে বোষ্টমি কেনা-বেচা হয়। যে উড়িধানের মত পোড়ামুখীদের আত্মীয়স্বজন নেই, বেধবা, কিংবা যে সব বেশ্যাদের আর গতরের জোর নেই, সব জড়ো হয় বাংলার দূর দূর গ্রাম থেকে। সারি সারি মেয়েছেলে ঘোমটায় মুখ ঢেকে বসে থাকে। আমার সোয়ামি ভেদবমি করে মরার পর আমারে আর বেশিদিন রাখল না আমার ভাসুর। বসিয়ে দিল এই সারির সাথে। এক বৈরাগীর পছন্দ হল, আমায় সঙ্গে নিয়ে চলল কেষ্টপুর।
‘পুলিশ কিছু বলে না?’ ছিদাম অবাক।
‘ফৌজদারের কাছে এক আনা জমা দিয়ে তবেই বোষ্টমি পছন্দ করতে পারে। খুব কড়াকড়ি নিয়ম রে বাছা। একবার গ্রহণ করলে এক বছরের আগে তুমি তাকে ত্যাগ দিতে পারবে না। একবছর পর জষ্ঠিমাসে মেলায় এসে তবে তাকে ত্যাগ দিতে পারবে। এটাই উদাসীন বৈষ্ণব সমাজের নিয়ম।’
‘কেষ্টপুরে কতদিন ছিলে?’
“ওদের আখড়াতে তিন বছর ছিলাম। ভালই ছিলাম। ভাই-বোনের মত বোষ্টম-বোষ্টমি থাকে, মাধুকরী করে আখড়ায় আনতাম, বাসন মাজা, ফাই ফরমাস খাটা। কিন্তু গাঁজার অভ্যাসটাই কাল হল। আখড়ায় আগুন ধরে গেছিল। গোঁসাই রেগে বসিয়ে দিয়ে গেল আবার এই প্রেমতলার মেলায়। তখন শরীরে সবে যৌবন এসেছে। মেলা থেকে তুলে নিয়ে গেল একজন কিশোরী ভজনীয়া সম্প্রদায়ের বোষ্টম তার গুরুকে উপহার দেবে বলে।’
“তারপর?”
‘এই সম্প্রদায় বড্ড জটিল ছিল। এদের মতে শ্রীকৃষ্ণ হল জগৎপতি আর বাকি সকল জীব হল তার শক্তি শ্রীরাধিকা। গুরু হল কৃষ্ণ আর তার সকল শিষ্য হল রাধিকা। রাসলীলার সময় এদের রাসমণ্ডল বসল। মাছ-ভাত সকলে খেলাম। মদ-মাংস একদম মানা। তারপর আমার মত আরও অনেক মেয়ে গুরুর সামনে রাধাকৃষ্ণ লীলার গান-টান করল। সকলের মধ্যে থেকে শুরু আমাকেই রাধিকা বলে মনোনীত করল। আমাকে ফুল-চন্দন দিয়ে সাজিয়ে গুরুর ঘরে একলা পাঠিয়ে দিল। তারপর শুরু হল গুরু-শিষ্যার একান্তে রাসলীলা। পেট হয়ে গেল। গোঁসাই পেট খালাস করে আবার বসিয়ে দিয়ে গেল এই মেলায়। হয়তো আরেকটা রাধিকা নিয়ে গেছে এখান থেকে। তার মধ্যে কত হাত যে ঘুরলাম। কত যে বোষ্টম সম্প্রদায়। জগৎমোহিনী, স্পষ্টদায়ক, কেউ গাঁজা খাওয়া ন্যাড়ানেড়ী, আউল, বাউল। কেউ মেয়েছেলের রান্না করা অন্ন ভোজন করেন না তো কেউ অন্ত্যজ বা বেশ্যার ভিক্ষা বা দান নেয় না। এখন বয়স হয়েছে, গতরে জোর নেই, আমড়া কাঠের ঢেঁকি হয়ে গেছি। আর কেউ আমায় রাখতে চায় না। একমাত্র এই ভাইপোটাই আমায় খুঁজে-পেতে এখানে নিয়ে এসে রাখল। তারপর ওর মাথায় স্বদেশী ভূত চাপল। মরল বোমা বানাতে গিয়ে বোমা ফেটে। বৌটা বাঁজা হলেও ভাল। খেতে পরতে দেয়। আমার আর হারাবার কী আছে? এখন দেশের জন্য কাজ করি, ভালই লাগে।’
ঘরের ভিতর থেকে চটাং চটাং করে তালে তালে খোল বাজানোর আওয়াজ ভেসে এল। আওয়াজ শুনে ছিদাম খুশি - তোমার ভাইপোর বৌ তো বেশ ভাল খোল বাজাতে জানে গো।’
- বুড়ি হেসে বলল, “বোষ্টম বাড়ির মেয়ে তালজ্ঞান থাকাটাই স্বাভাবিক। আরেকটু সময় লাগবে।’ তারপর গলা তুলে বলল, ‘ইন্দিরা একটা ভাল কাঁধদোয়াল লাগিয়ে দিস।’ বুড়ি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ‘প্রাণনাথ তোকে এজন্য পাঠিয়েছে এত দূর থেকে আমার কাছে?’
ছিদাম চারদিক দেখে নিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘এবারের কাজটা খুব কঠিন বুড়িমা! প্রাণ সংশয় হতে পারে। তবে প্রাণনাথদাদার খুব বিপদ।’
বুড়ির চোখ গোল গোল হয়ে গেল। নিচু গলায় বলল, ‘প্রাণনাথ বিপদে! ষাট ষাট! অমন কথা বলিস নে। ভাবিস নে, এই বিভাবরী যমের দুয়ারে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে, কার বাপের সাধ্য আছে দেখি। প্রাণনাথের কেশ কারুকে স্পর্শ করতে দেব না।’
ঘরের ভিতর থেকে টিকটিকি ডেকে উঠল। বৃদ্ধার মুখ হাসিতে ভরে গেল, বৃদ্ধা মোড়ার গায়ে টোকা দিয়ে বলল, ‘সত্যি সত্যি সত্যি!’ তারপর বৃদ্ধা বলল ‘কী করতে হবে বল?”
“তোমার কাছে প্রাণনাথদাদার নাকি একটা ফটো আছে?’
‘হ্যাঁ, আমার জিম্মায় একটা বাক্স দিয়ে গেছে। সেখানে ওর সাট্টিপিকেট ফটো এসব আছে।’
“ওই ফটোটা সঙ্গে নাও। তারপর তৈরি হয়ে চল। তোমার নাকি ধুতরো হাটের কাছে কয়ঘর গুরুভাই থাকে?”
“হ্যাঁ, থাকে তো।”
‘আজ রাতে তোমায় ধুতরোহাটে থাকতে হবে।
“কেন?”
“কাল খুব সক্কালের খেয়া ধরে আমাদের জমিদার বাড়ি যেতে হবে যে তোমায়।’
“কেন রে? ওখানে গিয়ে আমি কী করব?”
‘সব কথা তোমায় যেতে যেতে বলছি। তুমি তৈরি হয়ে নাও। অনেকটা পথ ফিরতে হবে। আর হ্যাঁ - ছিদাম তার আরেক দায়িত্ব পালন করল। ‘বুড়িমা, তুমি রঘু পটুয়াকে চেন?”
“ক্যান রে?”
‘প্রাণনাথদাদা বলেছে ওদের একবার গোঁসাইজ্যাঠার বাড়িতে পট দেখিয়ে গান শুনিয়ে আসতে। রঘু পটুয়াকে কী যেন দেবার আছে।’
“ওরা তো বাপ-ছ্যালে-নাতি আসাম গ্যাছে। ফিরলে বলবোখন।’
“তোমার মনে থাকবে?’
‘সেটা মন্দ বলিস নি,” বুড়ি বলল। ‘আজকাল সব ভুলে যাই। দাঁড়া বউরে কয়ে দিই। ও আমায় মনে করিয়ে দেবে। আমিও তৈরি হয়ে আসি।’ বুড়ি খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরের ভিতর ঢুকল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন