ষাট

প্রীতম বসু

ধুলটের বিজ্ঞাপন।

প্রফেসরের বৈঠকখানার কফি টেবিলের ওপর হলদে কাগজগুলো ডাঁই করে রাখা। কাল বিকেলে গোবিন্দ অধিকারী চলে যাওয়ার পর পদাবলী সোজা চলে গেছিল কলেজ স্ট্রীটে। প্রিন্টারকে কিছু এক্সট্রা পয়সা দিতে হল, কিন্তু রাত আটটায় একশ’ কপি পোস্টার পদাবলীর হাতে। তারপর পদাবলী আঠা আর ব্রাশ নিয়ে গেছিল শিয়ালদা স্টেশনে। প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে যতগুলো খালি লোকাল ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসেছে, পদাবলী উঠে উঠে ট্রেনের কামরায় গুপ্ত রোগ, দাদের মলমের পাশে এই ধুলটের পোস্টার আঁঠা দিয়ে সেঁটেছে। ট্রেন দূর দূরান্তে ছুটে যাবে আর সঙ্গে নিয়ে যাবে এই ধুলটের খবর। শিয়ালদায় পোস্টার সাঁটিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছিল।

ঘুম থেকে উঠতে বেলা হয়ে গেছিল। রতির কীর্তন কিছুতেই মিস করা যায় না। ধড়মড় করে উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে ছুটল নাইট্রোজেনের বাড়ি। কিন্তু এসে দেখল রতি আসেনি।

“সকালে রতির ফোন এসেছিল - ওর আসতে দেরি হবে। পরাশরের ছবি আঁকার মাঝপথে রতি উঠে আসতে পারছে না। দুপুর নাগাদ পরাশর ওকে নিজে নামিয়ে দিয়ে যাবে,’ নাইট্রোজেন বললেন।

আজ প্রফেসর সকাল সকাল স্নান সেরে ধবধবে পাটভাঙা পাঞ্জাবী পায়জামা পরে আছেন। পাঞ্জাবীর গলায় কালো লতা আঁকা। পদাবলীকে বললেন ‘তুমি তাহলে গোবিন্দ অধিকারীর আপত্তি শুনলে না। আমার নামটা দিয়েই দিলে। ও রাগারাগি করলে?”

“সে দায়িত্ব আমার। আমি মিথ্যা কথা বলতে পারি না। মন্দির সারাবার টাকা আপনিই দিচ্ছেন তাও বলেছি। জানি না আপনাদের মধ্যে কী হয়েছে। তবে ‘

বাইরের দরজায় কলিং বেল বাজল। প্রফেসরের মুখে বিরক্তি আবার কে এল?’ প্রফেসর উঠে দরজা খুলে বললেন-কাকে চাই?” ‘ডঃ নীতিশ নাগ?’ ‘আমি। ‘ - ‘এখন

“নমস্কার, আমি চন্দ্রকান্ত সেন। রাস্তা থেকে গলার আওয়াজ ভেসে এল। পদাবলীর চেনা গলা।

“আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।’

‘আমি সামান্য দেশসেবক। কিছু কথা ছিল। বেশি সময় নেব না। আমি কি ভিতরে আসতে পারি?’

নাইট্রোজেন দরজা খুলে বললেন, ‘আসুন।’

চন্দ্রকান্ত সেন ভিতরে এসেই পদাবলীকে দেখে হকচকিয়ে গেল। তারপর দৃষ্টি স্বাভাবিক করে বলল, ‘তুমিই তো গোবিন্দের পদাবলী তাই না? তুমিই তো করতালতলীতে জমিদারবাড়িতে এসেছিলে?”

‘হ্যাঁ,’ পদাবলী মাথা নাড়ল, বিরক্ত। চন্দ্রকান্ত সেন তাচ্ছিল্য করল তাকে। চন্দ্ৰকান্ত সেন টেবিলের ওপর ডাঁই করে রাখা পোস্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে সোফায় বসতে বসতে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, ‘আমার কাছে তাহলে সঠিক খবরই গেছে। গোবিন্দদাসের পদাবলী তাহলে এখানে লেখা হচ্ছে?”

নাইট্রোজেন হাসলেন, ‘গোবিন্দদাসের পদাবলী লেখা হচ্ছে! ওই বই পড়ারই যোগ্যতা হল না আমার, লেখার কথা তো ভাবাই যায় না।’

‘পড়েন নি? তা ভাল!’ চন্দ্রকান্ত সেন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। ‘সেই কোন মান্ধাতা আমলের লেখা পদ্য এখন পড়ে সময় নষ্ট না করাই ভাল।’

“আপনি নিশ্চয়ই, স্যার, অনেক পড়াশোনা করা মানুষ,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘শেক্সপিয়ার নিশ্চয়ই পড়েন?”

‘তা পড়ি – হ্যামলেট, ম্যাকবেথ, এটসেটরা – চন্দ্রকান্ত সেন গদগদ হয়ে বলল।

“আসলে শেক্সপিয়ার আর গোবিন্দদাস কবিরাজ কাছাকাছি সময়ের লোক। শেক্সপিয়ার ফিফটিন সিক্সটি ফোর আর গোবিন্দদাস ফিফটিন থার্টি ফাইভ। মাত্র ঊনত্রিশ বছরের বড়। কই শেক্সপিয়ারকে তো ইংরেজরা মান্ধাতা আমলের লেখক বলে না। ইংরেজ শেক্সপিয়ারকে মাথায় নিয়ে এখনো নাচানাচি করে, এমন কি আমাদের দেশের লোকেরাও করে। অথচ আমরা গোবিন্দদাসকে ভুলেই গেছি? আমরা তাকে বলি মান্ধাতা আমলের কবি।’

‘সেটা অবশ্য মন্দ বলেন নি,’ চন্দ্ৰকান্ত সেন তর্ক এড়িয়ে গেল। ‘এখানেই ইংরেজদের সঙ্গে আমাদের তফাত। ব্রিটিশদের সঙ্গে ইণ্ডিয়ানদের তুলনা?”

‘ইণ্ডিয়ানদের দোষ দেবেন না, স্যার, প্রফেসর হাতের তালু দু‘দিকে নাড়িয়ে প্রতিবাদ করলেন। ‘বাঙালি বলুন। নর্থ ইণ্ডিয়া, বিহার, হিন্দি ভাষাভাষী মানুষ তো তুলসীদাসকে এখনো বেশ বাঁচিয়ে রেখেছে। তুলসীদাসের জন্ম ফিফটিন থার্টি টু তে। আমাদের গোবিন্দদাসের থেকে তুলসীদাস তিন বছরের বড় ছিলেন। তুলসীদাস হিন্দীভাষী সাধারণ মানুষের মধ্যে টিঁকে গেলেন, কিন্তু আমরা বাঙালিরা চৈতন্যোত্তর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ পদকর্তা গোবিন্দদাসকে ভুলে গেলাম? বাংলার কেলাসে দু‘চার লাইনের অভিসারেই গোবিন্দদাস আটকে রইলেন। কিন্তু আমি মনে করি গোবিন্দদাসের সাহিত্য প্রতিভা তুলসীদাসের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।’

‘ডঃ নাগ, আমি আপনার সেন্টিমেন্ট হার্ট করতে চাই নি, চন্দ্ৰকান্ত সেন সমঝোতার চেষ্টায় হেসে বলল। ‘আমি ক্যাজুয়্যালি বলেছি।’

‘অ্যাকচুয়ালি এই সময়কালের ওপর বাঙালির নজর টানতে পারলে আমরা আমাদের জাতির সম্বন্ধে অনেক গৌরবোজ্জ্বল কিছু জানতে পারব। যাক, ছাড়ুন এসব। বলুন, এই গরীবের কুটিরে কেন পায়ের ধুলো দিলেন।’

‘এটা আজ সকালে আমার হাতে এসেছে। এটা দেখে অবধি আমি বেশ অশান্তিতে আছি ডঃ নাগ, চন্দ্রকান্ত সেন পকেট থেকে হলুদ ইস্তাহারটা বের করল। ‘করতালতলীতে আপনারা এটা কেন করছেন?”

‘এতে অবাক হওয়ার কী আছে, মিঃ সেন?’ নাইট্রোজেন কাগজটার দিকে তাকিয়ে বললেন। ‘আপনার থেকে আর ভাল কে জানে যে করতালতলীতে নীলমাধবের মন্দিরে ধুলট উৎসব একসময় খুব ধুমধাম করে হত। ধরে নিন আমরা ওটা রিভাইভ করছি।’

‘কিছু মনে করবেন না, আমার মনে হয় এর মধ্যে কোনও গভীর উদ্দেশ্য রয়েছে,’ চন্দ্রকান্ত সেন গম্ভীর মুখে বলল। ‘আমি সেই অঙ্কের উত্তরটা মেলাতেই এখানে এসেছি।’

‘কীসের অঙ্ক?”

‘রাজনীতি করি ডঃ নাগ, তাই এটাও জানি যে আপনি জানেন যে কীসের অঙ্ক। আপনাকে তরফদার এ ব্যাপারে ইনভলভ করেছে?” ‘কোন তরফদার?” নাইট্রোজেনের ভ্রুযুগলে

কুঞ্চন।

‘সামনের ইলেকশনে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। আমার স্পনসর মেহেতাদের এই রিসর্ট করতে না দিলে তরফদারের স্পনসর কোনও তুলানি বা চেলানি বা অন্য কোনও ইণ্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এসে সেখানে রিসর্ট বানাবে। আমার ক্ষতি করে আপনার কী লাভ হবে, ডঃ নাগ?”

‘আপনি ভুল করছেন মিঃ সেন, আমি আপনার কেন ক্ষতি করতে যাব? আমি এটাও আপনাকে কথা দিচ্ছি আমি কোনও তুলানি বা চেলানিকে করতালতলীতে রিসর্ট বানাতে সাহায্য করব না। আমরা করতালতলীর কীর্তনের বাঁচা মরার লড়াইতে নেমেছি। আমাদের সামনে বিশাল প্রশ্ন ঝুলছে আমরা কীর্তনকে বাঁচাতে পারব কি পারব না। যতক্ষণ না পারি আমরা ততক্ষণ লড়ে যাব।’

জমিদার চন্দ্রকান্ত কাগজটা অন্যমনস্কভাবে ভাঁজ করতে করতে বলল, “আপনার এই প্রচেষ্টাকে আমি রেসপেক্ট করি, অ্যাকচুয়ালি আমিও চাই বাঙালির কীর্তন যেন হারিয়ে না যায়। তাই বলছি লেটস ডু ইট ইন এ গ্ল্যামারাস ওয়ে।’ ‘ঠিক বুঝলাম না।’

‘আপনি ভেনিউ পালটে দিন। হাওড়া ময়দানে হোক অখিল বঙ্গ কীৰ্ত্তনমেলা, কিংবা গড়ের মাঠে বুক ফেয়ারের ঠিক পরেই “বঙ্গ কীর্তন সংস্কৃতি” - আমি আপনার সব বন্দোবস্ত করে দেব। কাগজে কাগজে অ্যাড দেব, প্রচুর লোক হবে। দিকপাল সব বাউল, ফোকসিঙ্গার - সব থাকবে। ওই করতালতলীর অজ পাড়াগাঁয়ে কে যাবে? এখানে প্রচুর পাবলিসিটি হবে। সেই একঘেয়ে বোরিং নিমাইসংকীর্তন লোকে আর কতদিন ধরে দেখবে? আউট অব দ্য বক্স ভাবতে হবে। একটা চ্যালেঞ্জিং লিরিকস চাই, একদম অরিজিন্যাল, যেটা কেউ আগে করে নি। দর্শককে শেষ পর্যন্ত টেনে বসিয়ে রাখবে।’

“অনেক ধন্যবাদ, স্যার। ইউ আর ভেরি কাইও,’ হাতজোড় করে বললেন নাইট্রোজেন। ‘দেখাই যাক না কে যায় করতালতলীতে। ভিড় না হলে নেক্সট ইয়ার আপনার কথামতই কাজ করব।’

চন্দ্ৰকান্ত সেন চোখ কুঁচকে মুখ দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা পুচ আওয়াজ করে বলল, ‘করতালতলীর ওই পাথারি জলা কবে থেকে পড়ে আছে। ওখানে রিসর্ট হলে কত লোকের জীবিকার সংস্থান হবে। গভর্ণমেন্টের রেভিনিউ বাড়বে।’

“পৃথিবীর কোনও উন্নত দেশ হলে এটা করতে দিত?”

‘কেন দিত না?”

“ওরা হলে ওটাকে একটা হিস্টোরিক্যাল সাইট বানিয়ে দিত। যেখানে চারপাঁচশ’ বছরের ইতিহাস চাপা পড়ে আছে ওরা সেই জায়গাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বানাবার জন্য অ্যাপ্লাই করত। বিজনেস ওরাও করত, ওরা ট্যুরিজমের লিস্টে করতালতলীকে ঢুকিয়ে ট্যুরিস্ট আনত। কারোর ভেস্টেড ইন্টারেস্ট চরিতার্থ করার জন্য নিজেদের ইতিহাসকে চোরাবালিতে ডুবিয়ে দিত না। আমরা ওদের পথেই যাওয়ার চেষ্টা করছি। হাওড়া ময়দানে কীর্তনমেলা করে সেটা সম্ভব না।’

চন্দ্রকান্ত সেন কিছুক্ষণ মৌন রইল। তারপর হাতের পাইপটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখন আমাদের পক্ষে পিছিয়ে আসা সম্ভব না। মেহেতারা এর মধ্যে অনেক ইনভেস্টমেন্ট করে ফেলেছে। জমি দখলের জন্য জানেনই তো ল্যাণ্ড মাফিয়ারা ইনভলভড থাকে। অনেকে অ্যাডভান্স নিয়ে বসে আছে। ওদের হাত অনেক লম্বা, ডঃ নাগ। আপনার ভালর জন্যই বলছি, প্লীজ এর মধ্যে থাকবেন না।’

মেহেতা কি আপনাকেও অ্যাডভান্স দিয়েছে, মিঃ সেন?’

চন্দ্রকান্ত সেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ডঃ নাগ, পরে বলবেন না যে আমি আপনাকে সাবধান করে দিই নি। আমার বাবা গোটা করতালতলীর জমিদার ছিলেন। ওই প্রপার্টির ন্যায়তঃ মালিক আমি। ওখানে ধুলট হবে না।’

‘এই ছেলেটাকে আপনার দলের ছেলেরা শাসিয়েছে করতালতলীতে পা দিলে ওর পা ভেঙে ক্রাচ ধরিয়ে দেবে হাতে। আপনি আমাকে আমার বাড়িতে এসে শাসিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা কী পেয়েছেন বলুন তো?”

চন্দ্রকান্ত সেন উঠে দাঁড়াল, ‘আপনার এখানে কথা বলা মানে আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করা। আমি চলি। এই আমার কার্ড রইল। যদি মত বদলান তবে আমাকে একটা ফোন করবেন। আর তা নাহলে আপনি আপনার কাজ করুন, আমার যা করার আমি তাই করব।’ তারপর পদাবলীর দিকে আপাদমস্তক অগ্নিদৃষ্টি ছুঁড়ে চন্দ্ৰকান্ত সেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%