প্রীতম বসু
আজ মন্দিরা ভোরে খডুটি ঘরে এল না। নিজেই তালা খুলে বাইরে গিয়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে ফেরার সময় প্রাণনাথ দেখল মন্দিরার ঘরের দরজা বন্ধ।
“মেয়েটার হলোটা কী?’ প্রাণনাথ অবাক। রোজ অন্ধকার থাকতে থাকতে ঘুম থেকে উঠে পড়ে, অথচ আজ - প্রাণনাথ খডুটি ঘরে ফিরে এসে নিজেই তালা লাগিয়ে নিল। ‘জ্বরজারি হয় নি তো?’
সকাল হল। প্রাণনাথের তন্দ্রামত এসেছিল। দরজায় ধাক্কার আওয়াজে প্রাণনাথ সচকিত হয়ে উঠে বসল। বাইরে পুরুষকণ্ঠ। ফিসফিস করে ওর নাম ধরে ডাকছে – “প্রাণনাথদাদা, প্রাণনাথদাদা।’ -
‘কে, ছিদাম?’
“হ্যাঁ গো।’
“কী হয়েছে?”
*তোমার জলখাবার এনেছি। মন্দিরাদিদি বলল তোমার কাছে চাবি আছে?’ “খুলছি।” প্রাণনাথ দরজা খুলে ছিদামের থেকে চিঁড়ের বাটি আর দুধের গ্লাস নিয়ে নিল। মন্দিরার কী হয়েছে?”
‘মন্দিরাদিদির খুব জ্বর, ছিদাম বলল। ‘আজ মন্দিরে যেতে পারবে না। গোঁসাইজ্যাঠা কালমেঘ পাতার রস মধু দিয়ে খাইয়েছে। আমরা মন্দিরে যাচ্ছি। তোমার জলখাবার দিয়ে গেলাম। আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।’
ক’দিন ধরে প্রাণনাথ উজ্জ্বলনীলমণি আর গীতগোবিন্দ পড়ছে তন্ময় হয়ে। ছিদামের কথা শুনে ওর মন খারাপ হয়ে গেল। ছিদাম চলে গেলে প্রাণনাথ বই খুলে বসল বটে, কিন্তু বইতে কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারল না। মন্দিরার জন্য ওর মনে এক অদম্য অভাব অনুভব করল। মন্দিরা ওর প্রাত্যহিক জীবনে এতখানি অভ্যেস হয়ে গেছে যে আজ মন্দিরা না আসায় ওর খুব খালি খালি লাগছে। এই দমবন্ধ করা খড়ুটি ঘরে ওর এই একাকীত্বের গুমোটের মধ্যে মন্দিরা রোজ শীতল বাতাসের প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে যায়। আজ মন্দিরার অনুপস্থিতিতে আবার প্রাণনাথের মনে হল শ্বাস নিতে অস্বস্তি হচ্ছে।
প্রাণনাথ আবার শ্রীরূপ গোস্বামীর উজ্জ্বলনীলমণিতে মন বসাবার চেষ্টা করল। শ্রীরূপ গোস্বামী পূর্বরাগ লিখছেন। রাধাকৃষ্ণের প্রেমজীবনের প্রথম পর্যায় হল পূর্বরাগ। নায়ক-নায়িকা পরষ্পরকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। প্রাণনাথ নিজের অন্তরে উঁকি মারল সে কেন মন্দিরাকে দেখার জন্য এত উদগ্রীব? তার এই মানসিক দশা কি পূর্বরাগ? রূপ গোস্বামী লিখেছেন পূর্বরাগ হলে মনে দশটি দশার কোনও একটি বা একাধিক দশা দেখা যেতে পারে- লালসা, উদ্বেগ, জাগর্বা, তানব, জড়িমা, বৈরাগ্য, ব্যাধি, উন্মাদ, মোহ ও মৃত্যু। মনে মনে নিজের অবুঝপনায় হাসি পেল প্রাণনাথের। নিঃসঙ্গতা ওর মাথা খারাপ করে দিয়েছে। কীসব ভাবছে সে? সে স্বদেশী বিপ্লবী, দেশমাতৃকার জন্য সে তার জীবনে কোনও নারীকে স্থান দেবে না তারপর মনে হল তাহলে কি তার মন নিজের মনের আয়নায় নিজেকে দেখার চেষ্টা করল প্রাণনাথ। সত্যিই কি তাই? তবে কেন মন্দিরার অক্ষিপল্লব, চাহনি, ওষ্ঠাধর, কপালে নেমে আসা কুন্তল চূর্ণ প্রাণনাথের কল্পনায় অবয়ব পাচ্ছে? তার কি দ্বিতীয় দশা হচ্ছে না আজ মন্দিরার জন্য? - 1 নিজের কাছে এই অঙ্গীকারবদ্ধ এই অঙ্গীকারকে অস্বীকার করছে?
বেশ কিছুক্ষণ পর বাইরের উঠোনে ঝাঁট দেওয়ার আওয়াজ। প্রাণনাথের বুক ধক্ করে উঠল। মন্দিরা উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে? প্রাণনাথ তাড়াতাড়ি জানলার দিকে এগিয়ে গিয়েও নিজেকে শাসন করল। একজন বিপ্লবীকে শোভা দেয় না এই দুর্বলতা। কিন্তু নিজের তোষকে ফিরে এসে প্রাণনাথ বুঝল অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার অজান্তে তার মন এ-ক’দিনে শরীরের খিড়কি দিয়ে লুকিয়ে অনেক বার বাইরে যাওয়া আসা করেছে, কিন্তু সে টের পায় নি। বিছানা থেকে উঠে জানলার ফাঁক দিয়ে তাকাল প্রাণনাথ। কিন্তু হতাশ হল সে। আজ ছিদাম মুড়োঝাঁটা দিয়ে উঠোন ঝাঁট দিয়ে দিচ্ছে। হরীতকী পাতাগুলো এক জায়গায় জড়ো করে হাত দিয়ে তুলল ছিদাম। প্রাণনাথ ফিরে এল নিজের তোষকে, মনে তিক্ততা। উজ্জ্বলনীলমণি বইতে মৃদঙ্গমের পেন্সিলের আঁচড় - মৃদঙ্গম লিখেছে চণ্ডীদাস যেভাবে আড়ম্বরবর্জিত সরল প্রাণস্পর্শী ভাষায় রাধার মনের পূর্বরাগ বর্ণনা করে গেছেন আর কোনও বৈষ্ণব-মহাজন এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারেন নি –
ঘরের বাইরে দন্ডে শতবার
তিলে তিলে আইসে যায়
প্রাণনাথ যেন রাধার ব্যাকুলতার কিছুটা নিজের মন দিয়ে অনুভব করতে পারছে। কিছুক্ষণ আবার উঠোনে কোনও শব্দ নেই। প্রাণনাথ অনুভব করছে তার বুকের ভিতর এক অস্থিরতা। এবার পাতকুয়োর পাড়ে বালতির ধাতব আওয়াজ। প্রাণনাথ তাড়াতাড়ি জানলায় গেল - এবার বৃদ্ধ জমিদারগোঁসাই, কুয়ো থেকে ফিরছেন। মন্দিরার অসুস্থতার জন্য মন্দির থেকে ফিরে এসেছেন। চণ্ডীদাস যেন প্রাণনাথের মনের কথা লিখে গেছেন - -
রাধার কি হৈল অন্তরে ব্যথা
বসিয়া বিরলে থাকয়ে একলে
না শুনে কাহার কথা ৷
প্রাণনাথ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চণ্ডীদাসের তুলনা হয় না। কীভাবে একটা মানুষ প্রেমিকার মনের পূর্বরাগ এত নিখুঁত ভাবে বর্ণনা করে? সই কেবা শোনাইল শ্যামনাম কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো
আকূল করিল মোর প্রাণ।। বাইরের কোনও গাছে কুররী পাখি এক নাগাড়ে কাঠ ঠুকে চলেছে। করতালতলী না এলে জীবনের অনেক কিছু শিক্ষা বাকি রয়ে যেত। প্রাণনাথ রূপ গোস্বামীর লেখনীতে ফিরে গেল। অনবদ্য লেখা। রূপ দেখে মনে রতি জন্মে। ওর মনে কি রতি জন্মেছে?
রতি গাঢ় হইলে ধরে প্রেম নাম।
আর প্রেমের পরিণতি মিলনে। পাশে পেন্সিলে লেখা –
রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।
মৃদঙ্গম লিখে রেখেছে জ্ঞানদাসের পদ। কৃষ্ণের রূপ গুণে রাধা এতই আত্মহারা যে তার প্রতিটি অঙ্গ মিলনের জন্য কাতর। মৃদঙ্গমের মনে এত প্রেম ছিল তা কখনো টের পায় নি প্রাণনাথ। আসলে প্রাণনাথের মনের আত্মগরিমা প্রাণনাথকে অন্ধ করে রেখেছিল। বাপের অগাধ সম্পত্তি ত্যাগ করে দেশের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ার গর্ব, দুপ্লে কলেজের প্রতি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার গর্ব, বিপ্লবীরা তাকে ভাবী দেশনেতা হিসাবে সম্মান করে তার গর্ব – প্রাণনাথ অন্য কারোর দিকে সেভাবে সময়ই দেয় নি। প্রাণনাথ ভাবতে লাগল এটা পূর্বরাগ না অনুরাগ তার সংজ্ঞা দেবার মত জ্ঞান তার নেই, কিন্তু সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে এ-ক’দিনে মন্দিরা তার মনের বীজতলায় প্রেমের বীজ বপন করে গেছে।
আর সে নিজে অজান্তে তাতে জলসিঞ্চন করে গেছে। এখন সেই বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে। উৎপাটন করতে হলে আর দেরি করলে চলবে না, যা দ্রুত বেড়ে চলেছে এই সৃষ্টি যে মহীরূহ হতে এ বেশি সময় নেবে না।
বিকালে মন্দিরা একবার এল। মন্দিরাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সৌন্দর্য ঝিমিয়ে গেছে, কিন্তু সৌন্দর্যে ভাটা পড়েনি। অনেকটা প্রখর গ্রীষ্মের বিকালের শশার ফুলের মত, হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টির স্পর্শে খুশিতে সতেজ হয়ে উঠবে। কুঞ্চিত কুন্তল মন্দিরার কানের সামনে এসে ঝুমকোলতার মত পাকিয়ে ঝুলছে। মন্দিরাকে দেখে প্রাণনাথের মনে এক ক্ষণবসন্তের মদির আবেশ জেগে উঠল। ওর মনে হল মন্দিরাকে জড়িয়ে ধরে মন্দিরার শরীরের সমস্ত ক্লান্তিকে নিজের শরীরে শুষে নেয়। বিনিময়ে নিজের শরীরের সমস্ত প্রাণচাঞ্চল্য সে মন্দিরাকে উপহার দেয়। পর মুহূর্তে প্রাণনাথ নিজের শরীরকে কাল্পনিক শিকলে বেঁধে শাসন করল। কিন্তু প্রাণনাথ অবাক হয়ে দেখল তার মন আজ তার ইচ্ছাধীন নয়। সংযমের শিকল-বন্দী দেহকে পিছনে ফেলে তার মন মন্দিরাকে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে গেল। যেন গোবিন্দদাসের রাধার মন তার দেহকে পিছনে ছেড়ে রেখে কৃষ্ণের সঙ্গে মিলনের জন্য ছুটে যাচ্ছে -
শুনত গোপী প্রেম রোপি
মনহি মনহি আপনা সোঁপি
তাঁহি চলত যাঁহি বোলত
মুরলীক কল-লোলন।
প্রাণনাথ নিজের অবাধ্য মনের দিকে ধিক্কারের দৃষ্টিতে তাকাল। ছিঃ! এই তার আদর্শের শিক্ষা? এই লোভী মন নিয়ে সে আত্মত্যাগী হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছে?
এবার প্রাণনাথের মন প্রকৃতিস্থ হল।
মন্দিরার হাতে কিছু কাগজ।
‘তোমার শুনলাম খুব জ্বর?’ প্রাণনাথের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ।
‘ও কিছুনা, ঠিক হয়ে যাবে।’
‘দেখি?” প্রাণনাথ মন্দিরার কপালে হাত রাখল। মন্দিরার কপাল কবোষ্ণ। মন্দিরা দু‘চোখ বন্ধ করল।
‘এখনো জ্বর আছে, তুমি আজকের দিনটা বিশ্রাম নিলে ভাল করতে।’
‘আজ আমি উজ্জ্বলনীলমণিটা নেব,’ মন্দিরা বলল। ‘কাল সকালে আবার ফেরত দিয়ে যাব। ‘
‘তুমি নিয়ে যেতে পার। আমার পড়া হয়ে গেছে,’ প্রাণনাথ লাল খেরুয়ায় মোড়ানো উজ্জ্বলনীলমণি মন্দিরার হাতে তুলে দিল।
‘পড়া হয়ে গেছে! এত তাড়াতাড়ি!’ মন্দিরা বিস্মিত। তারপর দৃষ্টি স্বাভাবিক
করে বলল, “ওঃ, চন্দননগর দুপ্লে কলেজের ফার্স্ট বয়! শ্রুতিধর।’
“বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে পড়া ধর।’
“বাবা প্রথম দিন যে প্রশ্ন করেছিল, তার উত্তর দাও তাহলে। আমাকে বোঝাও বাসকসজ্জা, উৎকণ্ঠিতা, বিপ্রলব্ধা, খণ্ডিতা, কলহান্তরিতা, মান।’
প্রাণনাথ হাসল। ওর মনে গেঁথে আছে। ‘শ্রীকৃষ্ণ রাধিকাকে বলেছে সঙ্কেত কুঞ্জে রাতে আসতে, কৃষ্ণ সেখানে রাধার সঙ্গে এসে মিলিত হবেন। রাধা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মিলনের জন্য অভিসারিকা হয়ে বনের মধ্যে এক নিকুঞ্জে এসে কুঞ্জ সাজিয়ে নিজে সজ্জিতা হয়ে প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করছেন। একে বাসকসজ্জা বলে। গোবিন্দদাসের রাধা -
আজু রাই সাজল বাসক সেজ
মনমথ লাখ, মনোরথে ধাবই
অঙ্গে অঙ্গে নাহি তেজ ৷৷
- কৃষ্ণ রাতে সেই নিকুঞ্জে আসছেন, প্রিয়তমা রাধা দ্বাদশ আভরণে সজ্জিতা চূড়ায় মণীন্দ্র, কর্ণদ্বয়ে স্বর্ণকুণ্ডল, দুই কর্ণোর্দ্ধে স্বর্ণশলাকা, কণ্ঠে শোভিত কণ্ঠাভরণ, গলদেশে নক্ষত্র-নিন্দিহার এবং স্বর্ণপদক, নিতম্বে কাঞ্চী, ভূজে অঙ্গদ, করে বলয়, অঙ্গুলীতে অঙ্গুরীয়ক, চরণে মণিময় মঞ্জরী, পদাঙ্গুলীতে উত্তুঙ্গ অঙ্গুরীয়। কিন্তু এই অঙ্গরাগ বৃথা গেল। পথে চন্দ্রাবলী কৃষ্ণকে ধরে নিজের কুঞ্জে নিয়ে গেল। চন্দ্রাবলীর মধুর মিলনে বিভোর হয়ে গোটা রাত কীভাবে ফুরিয়ে গেল কৃষ্ণ টেরই পেল না। এদিকে কৃষ্ণের আগমনের বিলম্ব দেখে রাধিকা উৎসুকচিত্তা হয়ে বার বার অন্ধকার পথের দিকে তাকাচ্ছে এবং এক বিশেষ বিরহজ্বালা ভোগ করছে। একে রাধিকার উৎকণ্ঠিতা বলে। চণ্ডীদাসের রাধা -
পথপানে চাহি কত না রহিব
কত প্রবোধিব মনে।
রস শিরোমণি আসিব এখনি
দ্বিজ চণ্ডীদাস ভনে ৷৷
উৎকণ্ঠিতা ব্যথিতা রাধিকা চিন্তায় খেদ করছেন। একে বলে বিপ্রলব্ধা। বিপ্রলব্ধার দশা হল নির্বেদ, চিন্তা, খেদ, অশ্রুপাত, মূৰ্চ্ছা, দীর্ঘনিঃশ্বাস -
তেজ সখী কানু আগমন আশ।
যামিনী শেষ ভেল সবহু নৈরাশ।।
অপেক্ষায় রাত প্রভাত হয়ে গেল। পরদিন সকালে অরুণনেত্র কৃষ্ণ আলুথালু বেশে সারা অঙ্গে চন্দ্রাবলীর বিলাস চিহ্ন মেখে রাধিকার কুঞ্জে উপস্থিত হলে রাধিকা সব বুঝতে পারল। একে বলে অপমানিতা রাধিকার খণ্ডিতা অবস্থা। রাধা পরিহাস করে কৃষ্ণকে বলছে - -
ভাল হইল আরে বঁধু আইলা সকালে।
প্রভাতে দেখিলাম মুখ দিন যাবে ভালে।।
রাধিকা দুর্জয় মান করে বসলেন। কৃষ্ণ রাধিকার মানভঞ্জনের সকল রকম প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন এবং তখন রাধিকার কুঞ্জ থেকে প্রস্থান করলেন। কৃষ্ণ চলে যেতেই রাধার মনে কৃষ্ণবিরহ শুরু হল। এই অবস্থার নায়িকাকে বলে কলহান্তরিতা। রাধা তৎক্ষণাৎ যোগীবেশ ধারণ করে আর্তনাদ, বিলাপ করতে থাকলেন।
যো হাম মান, বহুত করি মানলু, কানুক মিনতি উপেখি।
সো অব মনসিজ শরে তেল জরজর তাকর দরশ না পেখি।।
ধৈরজ লাজ, মান সঞে ভাগল, জীবন রহত সন্দেহ।
গোবিন্দ দাস, কহই সতী ভামিনী, কানুক ঐছন লেহ।।
পরে শ্রীকৃষ্ণ কৌশলে ও ছলে রাধিকার মান ভিক্ষা চাইলেন।
প্রিয়া যদি মান করি করয়ে ভৎসন।
বেদ স্তুতি হৈতে তাহা হবে মোর মন।।
অবশ্য মানভঞ্জনের জন্য জয়দেবের গীতগোবিন্দের কোনও জুড়ি নেই। খণ্ডিতা ও মানিনীরূপে রাধাকে কী অপূর্বভাবে চিত্রিত করেছেন
জয়দেব - -
মা কুরু মানিনি মানময়ে
মন্দিরা স্থম্ভিত। মানুষটা নাকি নাস্তিক! কীর্তনের কিছুই জানে না, পদাবলীর সঙ্গে কোনও পরিচয় নেই, তাহলে? এত তাড়াতাড়ি আত্মস্থ করে ফেলল উজ্জ্বলনীলমণি! এ কি নীলমাধবের লীলা? ভগবান কি একে কোনও বড় উদ্দেশ্যে করতালতলীতে পাঠিয়েছেন?
“তোমার হাতে থলেতে ওসব কী?’ প্রাণনাথ জিজ্ঞাসা করল।
‘ধুলটের হিসেব-পরিকল্পনা সব কিছু দাদা এখানে রাখত।’ মন্দিরা থলেটা খুলল। ভিতরে ঠাসা কাগজপত্র, পুস্তিকা। মন্দিরা এক এক করে কাগজগুলো বের করে পড়তে পড়তে আলাদা করে রাখতে লাগল। একটা বড় মোড়ানো কাগজে একটা নক্সা।
‘কোন মহান্তদের আখড়া কোথায় হবে এটা তার নক্সা।”
‘বাপরে,’ প্রাণনাথ বলল। ‘এত আখড়া!’
“বৈষ্ণবদের কাছে করতালতলীর ধুলটে উপস্থিত থাকা হল যেন হিন্দুদের কাছে মাহেশের রথে যাওয়া। খুব পবিত্র কাজ। তাই গিজগিজ করে ভক্তরা ধুলটের দিনগুলোতে।’
কাগজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল প্রাণনাথ। মৃদঙ্গম খুব পাকা কাজের লোক ছিল। সকল মহান্তদলের নাম-ঠিকানা একটা কাগজে লেখা। তাদের কাছে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠাবে আর কাছাকাছি গ্রামগুলোতে কে নিমন্ত্রণ করতে যাবে তাও লেখা। এত বড় ধুলট সামলাতে লোকবল লাগে, কে কোন কাজের দায়িত্বে থাকবে তাও লেখা – রান্না কে করবে, ঠাকুরের ভোগ কে কবে দেবে, কে সামিয়ানা খাটাবে, কে ফুলের জোগাড় করবে, অত মানুষের রান্নার বাজার কোন হাট থেকে হবে, কে বাজার করবে, বাজার দরের হিসেব, সমস্ত লেখা আছে। -
‘ছিদামকে পাঠিয়ে সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।’
“হ্যাঁ, রান্নার ঠাকুরদের সঙ্গে আমি কথা বলব। সামিয়ানা, ফুল এসবের জন্য বায়না দিতে হবে। আমার মন চাইছে না কাকার সাহায্য নিতে। আমার মা আমার বিয়ের জন্য একজোড়া চুড়ি রেখে গেছে। আমি ভাবছি বাবার সঙ্গে কথা বলব।’
‘না না তা কেন? মায়ের স্মৃতি-‘ ‘আমি জানি আমি যা করছি মা হলে তাই করত, মন্দিরা ম্লান হেসে বলল। ‘আমিও কিন্তু কম বড়লোক না,’ প্রাণনাথ রহস্য করে বলল। ‘তুমি? ও হ্যাঁ। তোমার বাবা তো জমিদার।
প্রাণনাথ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘বাবার থেকে টাকা নিতে পারলে তোমার কাকার থেকে টাকা না নেওয়ার কোনও কারণ নেই।’ “তাহলে?”
‘আমার কাছে স্বদেশীদের আনা টাকা রাখা আছে। চন্দননগরে – ‘
* না, স্বদেশীদের টাকা হল লুঠতরাজ করা টাকা। ও টাকা আমি স্পর্শ করি না।’
‘লুঠতরাজ করা টাকা এটা ঠিক। কিন্তু যারা দেশদ্রোহী, ইংরেজ সরকারের গুপ্তচর হয়ে স্বদেশীদের ধরিয়ে দেয়, দুর্বল দরিদ্রের ওপর অত্যাচার করে, যারা জাতি আর দেশকে ঠকিয়ে অর্থ উপার্জন করছে, স্বদেশীরা তাদের বাড়িতেই ডাকাতি করে।”
“তাহলেও ডাকাতি হল নিষ্ঠুরতা, হিংস্র প্রবৃত্তি। বাবা ওই টাকা দিয়ে কিছুতেই ধুলট করবে না। আমি টাকার ব্যাপারটা দেখে নেব, তুমি মাথা ঘামিও না।’
‘মাথা না ঘামাতে দিলে বাকি রইল আমার মাথা, প্রাণনাথ রসিকতা করল। ‘ইংরেজ সরকার আমার মাথার দাম ছ’হাজার টাকা ঘোষণা করেছে।”
ব্যাস, ঘরের ভিতর মন্দিরাকে কেউ যেন এক প্রাণঘাতী অভিশাপ দিল। মন্দিরা মুখ শাড়ির আঁচলে ঢেকে ফেলল। তারপর মন্দিরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। দুর্বল অহিবল্লিকা লতা যেন কালবৈশাখির নিষ্ঠুর ঝঞ্ঝাঘাত সহ্য করতে পারল না। মন্দিরা কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ল। প্রাণনাথ ভাবতেই পারেনি এরকমটা হতে পারে। ও খুব লঘু চালেই কথাটা বলেছিল, কিন্তু এতে মন্দিরা এত আঘাত পাবে সে কল্পনাই করতে পারেনি। মন্দিরা কেঁদেই চলল। অপ্রস্তুত প্রাণনাথ মন্দিরার কাঁধে হাত রাখল – ‘মন্দিরা, আমি ক্ষমা চাইছি। আর কক্ষনো বলব না।’ -
মন্দিরা বাহুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকল। প্রাণনাথ এবার মন্দিরার পাশে বসে চিবুক ধরে ওর মুখ তুলে ধরল। কত মন্দাকিনী নয়নে ঝরে। মন্দিরা এবার এমন একটা কাণ্ড করল যার জন্য প্রাণনাথ মোটেই তৈরি ছিল না। মন্দিরা প্রাণনাথকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘প্রাণনাথদা, তোমার কিছু হলে আমিও বাঁচব না।’
প্রাণনাথের শরীরে এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠল – -
নীরদ নয়নে নীর ঘন সিঞ্চনে পু
লক-মুকুল-অবলম্ব।
স্বেদ-মকরন্দ বিন্দু বিন্দু চুয়ত
বিকশিত ভাব-কদম্ব ৷
কি পেখলু নটবর গৌর কিশোর।।
প্রাণনাথ মন্দিরাকে কোমল স্বরে বলল, ‘আমি কথা দিচ্ছি মন্দিরা, আমার কোনও ক্ষতি হবে না। আমার সত্যি এরকম কথা বলা উচিত হয় নি। আমি ক্ষমা চাইছি।’
মন্দিরা এবার প্রাণনাথের শরীর থেকে ছিটকে সরে বলল, ‘তোমাকে এর জন্য শাস্তি পেতে হবে। তোমার সঙ্গে আমি কথা বলব না।’
প্রাণনাথ এবার হাত জোড় করে বলল, ‘মা কুরু মানিনি
মানময়ে মন্দিরা তিরস্কার করল, ‘আর কক্ষনো –’
প্রাণনাথ মন্দিরার মুখ চেপে ধরে বলল, ‘আর কক্ষনো হবে না।’
মন্দিরা চোখের জল মুছে বলল, ‘এখানে আরেকটা জিনিস আছে, তোমার জন্য এনেছি।’ মন্দিরা অন্যান্য কাগজের মধ্য থেকে টেনে বের করল একটা বাঁধানো নোটবই – ‘এটার কথা বলছিলাম।’ মন্দিরার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘কী এটা?”
“দাদার গ্রাম্য ব্রতগানের সংগ্রহ,’ মন্দিরা প্রাণনাথের হাতে নোটবইটা দিল। প্রাণনাথ কৌতূহলে কয়েকটা পাতা উলটাল- ‘বাবা, এ তো দারুণ দামি কাজ!’
‘এখানেই সব ব্রত রয়েছে। পড়ে দেখ ভাল লাগবে।’
“আমি এসব ঠাকুর দেবতার ব্রতকথায় বিশ্বাস করিনা। আমি খুব একটা ইন্টারেস্ট পাব না।’
‘এমনিতেও এই ব্রতগুলো পড়তে তোমার খারাপ লাগবে না। বাংলার সব ব্রত যে ঠাকুর দেবতার জন্য লেখা তা তোমায় কে বলল? কত ব্ৰত যে পুরোহিতদের মনগড়া তা এ’গুলো পড়লে বুঝতে পারবে। কলাছড়া ব্রত করে ব্রাহ্মণকে কলা দান, গুপ্তধন ব্রতে সন্দেশের ভিতর পয়সা ঢুকিয়ে দিয়ে গুপ্তধন হিসেবে ব্রাহ্মণকে দান, তাছাড়া ঘৃতসংক্রান্তি, দাড়িম্বসংক্রান্তি এসব নৈবেদ্য আর দক্ষিণা পাওয়ার জন্য বানানো হয়েছে।’
প্রাণনাথ কৌতূহলে পাতা উল্টাতে উল্টাতে থেমে বলল, ‘এটা আবার কী? আদরসিংহাসন ব্রত? ‘
‘এটা একটা মেয়েলি ব্রত। এখানে ঠাকুর দেবতার কোনও ব্যাপার নেই। স্বামীর সোহাগ কামনা করে এই ব্রত করা হয়,’ মন্দিরা হেসে বলল। “তাই নাকি? কেমন করে হয় এই ব্রত উদযাপন?’
. “মহাবিষুব সংক্রান্তিতে একজন স্বামীসোহাগিনী সধবা স্ত্রীকে আদর করে নিজের বাড়িতে ডেকে তাকে পিঠালির সিংহাসনে বসিয়ে নানাভাবে আপ্যায়ন করা হয় – নাপিত বৌ তার হাত পায়ের নখ কেটে দেবে, পায়ে আলতা পরিয়ে দেবে, সুগন্ধি তেল মাখিয়ে বেণী বেঁধে সিঁথিতে লাল সিঁদুর পরিয়ে দেবে, গায়ে কস্তূরী বা কপূরের সুগন্ধ মাখিয়ে তাকে ভালভাবে খাইয়ে দাইয়ে বিদায় করবে। এভাবে সারা বৈশাখ মাসে আদর আপ্যায়ন করে চার বছর কাটালে তবে ব্রতের উদযাপন। কি, লোভ হচ্ছে?”
‘না হিংসে হচ্ছে, প্রাণনাথ হেসে বলল। ছেলেদের এসব ব্রত হয় না?” মন্দিরা হাসল। প্রাণনাথ একটু শান্তি পেল। অল্প অল্প হাসির বাতাস দিয়েই মন্দিরার মুখের দুঃখের কালো মেঘ ঠেলে ঠেলে সরাচ্ছে সে।
“তোমাকে যেটা দেখাতে এসেছি তা হল এইটা।’ মন্দিরা প্রাণনাথের খুব কাছে ঝুঁকে পড়ল। মন্দিরার শরীরের নরম স্পর্শ প্রাণনাথের হাতে লাগল। প্রাণনাথের শরীর অবশ হয়ে গেল। প্রাণনাথের ভয় হল, মন্দিরা বুঝতে পারেনি তো? কিন্তু মন্দিরার সেদিকে খেয়াল নেই। পাতা উল্টাতে উল্টাতে প্রায় শেষের দিকে এসে দেখাল। ‘এই যে –’
প্রাণনাথ দেখল লেখা - “সনাতন কীর্তন”
‘এই কীর্তন গেয়ে আমাদের করতালতলীর ধুলটের অধিবাসের শুরু হয়। দাদা প্রতি বছর এই কীর্তনই গায় ধুলট উৎসব শুরু করার জন্য।’ “কেন, শুধু এই কীর্তনই কেন?”
‘এটা আমাদের করতালতলীর নিজস্ব কীর্তন। ব্রত বলতে পার, কীর্তন বলতে পার। এই কীর্তন হারিয়েই গেছিল, দাদা অনেক খুঁজে এই কীর্তন জোগাড় করেছিল। দাদা বলেছিল আমি যদি কখনো না থাকি তবে ধুলটে প্রাণনাথ যেন এই কীর্তন গায়। আমাদের করতালতলীর লোককথা এই যে এই ব্ৰত গান নাকি অগাধ ভক্তি ভরে নীলমাধবের মন্দিরে গাইলে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।’
‘সব কুসংস্কার!’ প্রাণনাথ কপট রাগে বলল। ‘এসব আজকের দিনে কেউ মানে?’
‘না মানার কী আছে? সনাতন চোর তাহলে কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছিল এই মন্দির থেকে? তোমাকে মানতে হবে না। আমরা তো মানি। সকলে তো আর তোমার মত নাস্তিক না,’ মন্দিরা নোটবইটা রেখে মুখ ভার করে উজ্জ্বলনীলমণি
নিয়ে ফিরে গেল। ঘরের আবছায়াতে বসে প্রাণনাথের মনের অবস্থা মহাজনের পদাবলীর ভাষায় -
মধুপ মাতল উড়এ ন পারএ
তইঅও পসারএ পাঁখি
মধু পান করার পর মত্ত ভ্রমর উড়তে পারেনা, তথাপি দু‘দিকে ডানা মেলে ওড়ার জন্য ছটফট করে। প্রাণনাথের নয়ন প্রেমের আকাশে ওড়ার জন্য ছটফট করে উঠল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ প্রাণনাথের মনে চিন্তা নেমে এল কীভাবে সে ধুলটমেলা থেকে এত পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালাবে? -
এক্সিট রুটটা কিছুতেই মাথায় আসছে না প্রাণনাথের। ধুলট শুরু হলে ভিড়ের মধ্যে কীর্তনীয়ার বেশ ধরে পালিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু বুড়ি ঠাকুমার কথা মিথ্যে হলে রাগের চোটে বুড়ির গলায় ম্যানিলা রোপের ফাঁস টানিয়ে এই মন্দিরের সামনেই বুড়ির ফাঁসি দিয়ে দেবে ওই অখিলরঞ্জন আর পুলিশ সুপার ড্যানিয়েল।
হঠাৎ প্রাণনাথের মাথার মধ্যে বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল।
ফাঁসি?
মন্দিরে ফাঁসি?
হ্যাঁ, এক সময় এখানে তো ফাঁসিই দেওয়া হত !
নীলকর সাহেবরা এই মন্দিরে ওদের ফাঁসিঘর বানিয়ে ছিল। ওরা বিদ্রোহী গ্রামবাসীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিত। ফাঁসির দড়ি গলায় পরিয়ে হাতলে টান লাগালে নিচের কাঠের পাটাতন সরে যেত। মৃতদেহটা নিচে ঝুলত। তারপর দড়ি কেটে দিলে মৃতদেহ নিচে গুমঘরে গিয়ে পড়ত। পরে নীলকর সাহেবদের ভাড়াটে ধাঙড়রা এক সুড়ঙ্গ পথে শ্মশান থেকে গুমঘরে এসে লাশ তুলে নিয়ে শ্মশানে গিয়ে জ্বালিয়ে দিত। আর সেই মানুষের কোনও হদিসই কেউ পেত না। প্রাণনাথের মাথায় প্রশ্ন জাগল – তার মানে মন্দির থেকে নিচের গুমঘরে বেরোবার একটা গোপন পথ এখনো আছে? সনাতন চোর কি মন্দির থেকে সেই পথেই অদৃশ্য হয়ে গেছিল? আর সেই পথের সাংকেতিক হদিশই কি লিখে গেছিল এই সনাতন কীর্তনে?
শ্মশান থেকে পাতালের গুমঘরে আসার পথটা খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? কে বলতে পারে? একমাত্র শ্মশানের ধাঙড়রাই হয়তো জানে সেই পথের কথা। মন্দিরাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।
রাতের খাবার দিতে এল ছিদাম। ‘মন্দিরাদিদির আবার জ্বর এসেছে। শীতে কাঁপুনি দিচ্ছে, মন্দিরাদিদি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।’
এই শরীরেও মন্দিরা রান্না করেছে। মেয়েটার মনের জোর অসাধারণ। ছিদাম মোড়ায় বসল। প্রাণনাথ খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করল কেমন আছে?” “ছিদাম, ভুবনকাকা
‘ভাল আছে। যখন গোরা-দানো ভূতের খেয়াল বাবার মাথায় না চাপে তখন কেউ বলতে পারবে না যে বাবার মাথায় ছিট আছে।”
‘ছিদাম, তুমি কি জান পুরোনো শ্মশান থেকে নীলমাধবের মন্দিরে যাওয়ার কোনও গোপন পথ আছে কিনা?”
‘না নেই,” ছিদাম আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলল।
‘তুমি কীভাবে জানলে নেই?”
‘আমি জানব না? করতালতলীর পুরোনো শ্মশানে কতবার গেছি বলতো? শ্মশান, ধুলডাঙা এসব আমার চষে খাওয়া। ওরকম কোনও পথ থাকলে আমি নিশ্চয়ই জানতাম।”
“হয়তো তোমার জন্মের অনেক আগেই পথটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।’
“তাহলে সেটা আমার বাবা জানত।’
‘ভুবনকাকাকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখ তো আজ, ভুবনকাকা এরকম কোনও গল্প শুনেছে কিনা।”
‘জিজ্ঞাসা করব।’
‘কারুকে জানিও না। আমার ওই পথটা পাওয়া খুব দরকার।”
‘বুঝতে পেরেছি,’ ছিদাম বুঝে গেছে প্রাণনাথের দরকারটা কেন। কেউ জানবে না, প্রাণনাথদাদা। তবে আমার মনে হয়না এরকম কোনও গোপন পথ আছে। তবু দেখি বাবা কী বলে।”
প্রাণনাথের খাওয়া হয়ে গেলে ছিদাম এঁটো থালা নিয়ে চলে গেল। প্রাণনাথ ভাবতে লাগল যদি একটা গোপন পথ আবিষ্কার না হয় তাহলে সে কী করবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন