প্রীতম বসু
করতালতলী স্টেশনের শান বাঁধানো বেঞ্চে বসে পদাবলী কলকাতায় ফেরার ট্রেনের অপেক্ষা করছিল। আজ অনেকটা গল্প শুনে এসেছে। মন ভাল না, গোবিন্দ অধিকারী একা এই অসম লড়াই লড়তে পারবে না। গোপাল ঠাকুর আর অঞ্জন বৈরাগীর মান ভাঙাতে হলে ভজন ডোমকে বিসর্জন দিতে হবে। কী করলে সব কিছু ঠিক হয় ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছিল না পদাবলী। পিছনে নিচু মাঠে বেতবনে কোনও একটা পাখি কোয়াক কোয়াক করে একটানা ডেকেই চলেছে। হঠাৎ পিছন থেকে সুরেলা গলায় ‘হ্যালো,’ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল পদাবলী। মুক্তা। পদাবলীর মনে খুশির ঝিলিক - ‘কেমন আছেন?”
“ভাল,” মুক্তা হেসে পদাবলীর পাশে এসে বসল। এই দিনের শেষেও ওর গায়ে কীভাবে এত সুগন্ধ থাকে? মাঝে মাঝেই বোধহয় সেন্ট-ফেন্ট লাগায়, পদাবলী ভাবল। মুক্তা মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডাহুকটার মন খারাপ।’
“কে ডাহুক?”
“ওই যে মাঠে একটানা ডেকেই চলেছে পাখিটা,’ মুক্তা ঘাড় ঘুরিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য পাখিটাকে দেখার চেষ্টা করল। ‘ডাহুক-ডাহুকী সব সময় একসঙ্গে থাকে। একবার যদি সঙ্গী পাখিটা হারিয়ে যায় তবে ডাহুক পাগলের মত একটানা ডেকেই চলে। দেখছেন না বিরহে কাতর ডাহুক কেমন লম্বা লম্বা পা ফেলে খুঁজে চলেছে ওর প্রেমিকাকে।’
“বাবা, এই অজ জলায়ও এত গভীর প্রেম লুকিয়ে আছে?” পদাবলী বলল। “আমি তো জানতামই না।’ পদাবলী দেখল সেদিনের প্ল্যাটফর্মের সেই বৈরাগী ভিখিরি খঞ্জনি নিয়ে হনহন স্টেশনের দিকে আসছে ট্রেন ধরবে বলে।
‘জীবনানন্দ জানতেন, মুক্তা হাসল। তারপর আবৃত্তি করে বলল, ‘নিদাঘের রৌদ্রতাপে একা সে ডাহুকী :
পদাবলী প্রমাদ গুনল। এই মেয়ে এবার কুইজ শুরু করলেই ওর বিদ্যার গভীরতা ধরা পড়ে যাবে। ও প্রসঙ্গ পালটাল মানিকজোড়?’ - ‘পেলেন আপনার কালাগলা
‘নাঃ,’ মুক্তা বলল। ‘আমার নাম মুক্তা।’
‘আমি পদাবলী,’ পদাবলী মুক্তার সঙ্গে হাত মেলাল।
‘আমি আপনি-আজ্ঞে বেশি করতে পারিনা। তুমি বলা যাক?’ মুক্তা বলল।
‘আমিও,’ পদাবলী হাসল।
ভয় লাগে, লোকাল শিকারীরা দেখতে পেলে হয়তো ছররা মেরে আগুনে পুড়িয়ে খেয়ে নেবে,’ মুক্তার দু‘চোখে অস্থিরতা।
“তা সম্ভব না।’
“কেন?”
*আমি এখানকার একজন কীর্তনীয়ার সঙ্গে কথা বলছিলাম। ও বলল যে একজন অস্ট্রেলিয়ান নাকি অনেক বছর আগে এই গ্রামে এসেছিল পাখির ছবি তুলতে। ও নাকি বলেছিল যে ওদের দেশে নাকি কিছু লোক বিশ্বাস করে যে কোনও মেয়ে যদি এই পাখির মাংস খায় তবে তার বাচ্চা মরে যায়। একথা শুনে করতালতলীতেও কেউ এই পাখি মারে না।’
“গুড, মুক্তাকে নিশ্চিন্ত দেখাল। মুক্তা ক্যামেরার লেন্সের ঢাকনা খুলে আবার বন্ধ করল। ‘লাকটাই খারাপ আমার। এত করেও পাখি দেখতে পেলাম না।’
লাক যে মুক্তার একার খারাপ না, সেটা পদাবলী শীগগিরই টের পেল। দু‘জন মস্তান টাইপের ছেলে এসে উপস্থিত হল। একজনের হাতে হকি স্টিক, জামার উপরের তিনটে বোতাম খোলা, বুকের কালো চুলের ওপর একটা সোনার চেন দুলছে। ছেলেটা হকি স্টিক দোলাতে দোলাতে এসে পদাবলীকে বলল, “এ্যাই, তোকে সেদিন সোনাগাছিতে প্রস কোয়ার্টারের সামনে দেখলাম, তাই না?’ পদাবলী কোনও উত্তর দিল না। ছেলেটা বলল, ‘তোর নাম তো পদাবলী, তাই না?” পদাবলী নীরবে মাথা নাড়ল। তখন সেই মস্তান তার সঙ্গীকে বলল, “পিন্টে, পদাবলী মানে জানিস? পিন্টে বলল, “পদ মানে পা আর বলী মানে ঠাকুরের সামনে বলি দেওয়া, যেমন পাঁঠা বলি।’ সেই মস্তান হেসে বলল, *বাংলায় লেটার পেয়েছিলি নাকি রে?’ তারপর হকি স্টিকটা পদাবলীর পায়ে ছুইয়ে দাঁতে দাঁত চিপে একটা অশ্লীল গালি দিয়ে বলল, ‘আর যদি কক্ষনো তোকে এই করতালতলীতে দেখি, তবে মা কসম, তোর দুটো পা সত্যি সত্যি বলি চড়িয়ে দেব। বগলে ক্রাচ নিয়ে খঞ্জনি বাজিয়ে কেত্তন গাস তখন। বুঝলি?” পিন্টে এবার ভিলেনের মত হেসে বলল, ‘নাঃ, রিস্ক নেবার দরকার কী?
হুলো, নিদেনপক্ষে একটা ঠ্যাং ভেঙে বউনিটা এখনই করে দে। কেত্তনে কী যেন বলে, গৌরচন্দিকা না কী যেন?”
পদাবলীর নজর পড়ল মস্তানটার কোমরে গোঁজা ভোজালির দিকে। “খবরদার!” মুক্তা ধমকে উঠল।
আচমকা মুক্তার হুংকার শুনে মস্তানটা থমকে গেল। একটা মেয়ে ওকে ধমকাচ্ছে এটা বিশ্বাস করতে এক মুহূর্ত লাগল। তারপর ও মুক্তাকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলল, ‘এক থাবড়া মারব, লাইনে গিয়ে পড়বি। কালকের খবরের কাগজে খবর বেরাবে, কলেজ ছাত্রী লাইনে কাটা পড়েছে। ফোট এখান থেকে!’
বৈরাগী ভিখিরি কখন নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা পদাবলী নজর করেনি। বৈরাগী খঞ্জনি গলায় ঝুলিয়ে শান্ত গলায় মস্তানটাকে বলল, ‘লালবাজারের ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ এই মেয়ের বাবা। এর গায়ে একটা আঁচড় যদি লাগে, তোর এই হকির ধ্যানচাঁদের কসম, তোদের বডির এমন জায়গায় পেনাল্টি শট মারব যে আর জীবনে কোনওদিন প্যান্ট পরতে পারবি না।’ পদাবলী দেখল বৈরাগীর হাতে একটা লালবাজার পুলিশের ফটো আইডেন্টিটি কার্ড, মাথায় পুলিশের টুপি পরা ওর ছবি।
ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। দুই মস্তান ভিজে বেড়ালের মত গুটিয়ে গিয়ে চুপচাপ প্ল্যাটফর্মের অন্যদিকে চলে গেল। পদাবলী বিশ্বাসই করতে পারছে না এই লোকটাই খঞ্জনি বাজিয়ে অত প্রেম ঢালা গলায় অরুণিত চরণে রণিত মণিমঞ্জির গাইছিল। ট্রেন থামল, বৈরাগী, মুক্তা আর পদাবলী তাড়াতাড়ি ট্রেনে ঢুকে গেল। ট্রেনের কামরা খালি। মুক্তা টেনশনে হাঁফাচ্ছে, রাগে ওর মুখ লাল কারা?’ - *এরা
পদাবলী বুঝল ওকে জমিদার চন্দ্রকান্তের কুকীর্তিকলাপ বলাটা বিচক্ষণতার কাজ হবে। ওর বাবার হেল্প অনেক কাজে লাগতে পারে। পদাবলী ধীরে ধীরে সমস্ত ঘটনা বলল।
“আমার বড় মামার ডালহৌসীতে অনেক পুরোনো ল’ ফার্ম। ওরা জমিজমা সংক্রান্ত ব্যাপারে খুবই বিখ্যাত। খৈতান অ্যাণ্ড চ্যাটার্জী অ্যাসোসিয়েটস অ্যাট ল’ ফার্মের পার্টনার আমার বড় মামা। নিজে অনেক চ্যারিটেবল কাজ করেন। মামার সঙ্গে কথা বলে দেখি ওদের ফার্ম এই মন্দিরের জমিজমা রক্ষা করতে এই গরিব মানুষগুলোকে হেল্প করতে পারে কিনা।’ তারপর মুক্তার রাগ আবার মুখে ফিরে এল। ‘আর বাপিকে বলে এই মস্তানগুলোকে ঠাণ্ডা করতে হবে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন