প্রীতম বসু
পরদিন ভোররাতে খড়ুটি ঘরের দরজা খুলে দিতে মন্দিরা এল না। ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রাণনাথ প্রাতঃকৃত্য সেরে নিজের একচালায় ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আধো ঘুমের মধ্যেই ও টের পেল কুমুদরঞ্জন, মন্দিরা আর ছিদামকে নিয়ে মন্দিরে রওনা হলেন। একটু বেলায় প্রাণনাথ উঠল। উঠে আবার সনাতন-কীর্তনের রহস্যভেদে লেগে গেল।
বেলায় যখন মন্দিরা ফল-প্রসাদ নিয়ে তালা খুলে খড়টি ঘরে ঢুকল তখন ওর মুখ থেকে বিরক্তি-ক্রোধ অন্তর্হিত হয়ে গেছে। ‘আমায় ছিদাম সব বলল। তুমি না থাকলে কাল রাতে ভুবনকাকাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা এত সহজ হত না। ও বেচারা খুব লজ্জিত, ও তোমাকে কাল রাতে যাচ্ছেতাই কথা শুনিয়েছে। আসলে ভুবনকাকার জন্য চিন্তায় –’
‘বাবার জন্য ওর চিন্তা ছিল কিনা জানিনা, তবে তোমার জন্য ওর খুবই চিন্তা ছিল। তুমি কষ্ট পেয়েছ বলে আমার ওপর অত রাতে হম্বিতম্বি করে গেল।’ প্রাণনাথ বই থেকে চোখ না সরিয়ে বলল।
- মন্দিরা হাসল – ‘ছিদাম আমায় প্রাণের চেয়েও ভালবাসে। দাদা বলত ছিদাম হল তোর মঞ্জরী। তুই কারোর সঙ্গে প্রেম করতে গেলেও ও তোকে আগলে আগলে নিয়ে যাবে।’
প্রাণনাথ মঞ্জরী ব্যাপারটা বুঝল না। বই থেকে মুখ তুলে অবাক চোখে তাকাল – ‘মঞ্জরী কী?” -
মন্দিরা মোড়ায় বসে হাসিমুখে বলল, ‘এই মঞ্জরীরা শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করলেও কৃষ্ণের প্রেয়সী রাধার ওপর তাদের চূড়ান্ত আনুগত্য।’
‘তার মানে রাধার সখী, তাইতো?”
‘না, মঞ্জরী আর সখী আলাদা। রাধার কোনও সখীর সঙ্গে কৃষ্ণের কেলিবিলাস সম্ভব। কিন্তু মঞ্জরী কখনোই রাধার থেকে আনুগত্য সরাবে না। রাধার সুখেই তার সুখ। সখী আর মঞ্জরী দু‘জনেই রাধাকৃষ্ণের মধ্যে দূতির কাজ করে, মিল ঘটিয়ে দেয়, রাধার বেশভূষা, কেশবিন্যাস সব করে দেয়, কিন্তু মঞ্জরী তার রাধার যাতে লেশমাত্র ক্লেশ না হয় তার খেয়াল রাখে। কবি গোবিন্দদাস মঞ্জরীভাবে পদাবলী লিখতেন। রাধা ঘোর বর্ষার মধ্যে একা একা জঙ্গলপথে অভিসারে চলেছে, মঞ্জরী সাধক উদ্বিগ্ন গোবিন্দদাস রাধাকে এতটুকুও জানতে না দিয়ে রাধার সঙ্গে চলেছেন -
গোবিন্দদাস সঙ্গে চলু গোয়।
অন্ধকারে বনের মধ্যে যাতে রাধা পথ না হারিয়ে ফেলে, কিংবা শ্রীরাধার পায়ে যাতে বনপথে কাটা না ফোটে সেজন্য গোবিন্দদাস রাধাকে বলছেন
তিমির পন্থ যব হত সন্দেহ
গোবিন্দদাসক সঙ্গে করি লেহ।’ -
“তাহলে গোবিন্দদাস রাধাকে মনে মনে প্রেমিকা হিসাবে ভালবাসতেন?” ‘না না প্রেমিকা হিসাবে না। এই হল মঞ্জরী। রাধার দুঃখ যেন নিজের বুকে বাজছে। কৃষ্ণের সঙ্গে রাধিকার মিলনের পর গোবিন্দদাস শ্রীরাধাকে অন্ধকারে পথ দেখিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনছেন, কিন্তু রাধা-কৃষ্ণের ছাড়াছাড়ি হয়েছে তার দুঃখে তিনি নিজেই এত কাতর যে গলদশ্রুলোচনে পথ দেখতে পাচ্ছেন না
গোবিন্দদাস চলু কান্দিতে কান্দিতে খোজে
লোরে পথ দেখিতে না পায়
তারপর রাধিকা সংকেত কুঞ্জে কষ্ট করে গিয়েও যখন শ্রীকৃষ্ণের দেখা পায় না তখন বিপ্রলব্ধা রাধার দুঃখে দুঃখিত হয়ে গোবিন্দদাস শ্রীকৃষ্ণকেও ধিক্কার দিতে কুণ্ঠিত হন না – বলছেন এই কি প্রেমের রীতি? –
গোবিন্দদাস ভন ও নন্দ-নন্দন
ইহ কি পিরিতিক রীত।।
কীর্তনের কোনও শ্রোতা যদি এই মঞ্জরীভাবের কথা না জানে, সে ভাবতে পারে এ কী ধরণের কীর্তন যেখানে কৃষ্ণের প্রশংসা না করে কৃষ্ণকে গালাগালি করছে? তারপর অন্য নারীর সঙ্গে রাত কাটিয়ে সকালে কৃষ্ণ যখন রাধার কাছে এসেছেন তখন গোবিন্দদাস কৃষ্ণকে ধিক্কার দিয়ে বলছেন তোমাকে স্পর্শ করা যায় না, তোমাকে স্পর্শ করলে আনন্দ সুধা পাওয়া যায় না গোবিন্দদাস -
কহ পরশ তুল নহ
পরশনে রস নাহি হোই।।
‘এই মঞ্জরীভাবের সাধনা কি গোবিন্দদাসের সৃষ্টি?”
“না, রূপ-সনাতন গোস্বামীর, মন্দিরা বলল।
“ছিদাম কি মঞ্জরীভাবের কথা জানে?”
‘জানি না,’ মন্দিরা হাসল। তবে ওকে পাঠাচ্ছি, ও তোমার কাছে ক্ষমা-টমা চেয়ে নেবে। ও মনোকষ্টে আছে।
বাইরে থেকে ছিদাম গলা খাঁকারি দিল। মন্দিরা গলা তুলে বলল, “ছিদাম, তুই এবার ভিতরে আসতে পারিস।’
ছিদামের চাপা গলার আওয়াজ ভেসে এল, ‘সাবধান, পুলিশ আসছে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন