প্রীতম বসু
পুলিশ আসছে!
প্রাণনাথ তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বন্ধ জানলার পাল্লার ফাঁকে চোখ রাখল।
একটা ব্ল্যাক মারিয়া আসছে।
লুকিয়ে? প্রাণনাথ তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতর চোখ বুলিয়ে নিল। সব মোটামুটি ঠিকই আছে। মন্দিরা তাড়াতাড়ি খড়ুটি ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে তালা আটকে দ্রুতপায়ে উঠোন টপকে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
+ তবে কি পুলিশ টের পেয়ে গেছে ও এখানে
মেঝের পাটাতন তুলে নিচে নেমে গিয়ে মাথার ওপর পাটাতন টেনে দিল প্রাণনাথ। পুলিশের গাড়ি প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে। ছিদাম একমনে বাড়ির সামনে খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। ভ্যান থামল। চারজন লাল পাগড়ি পুলিশ ভ্যান থেকে নেমে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। এত পুলিশ ! ছিদাম আড়চোখে তাকিয়ে ফুলের চারা লাগাতে লাগল।
“এ্যাই, তুই ভুবন জমাদারের ছেলে না?’ একজন সিপাই গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল।
‘হ্যাঁ,’ ছিদাম খুরপি মাটিতে রেখে উঠে দাঁড়াল।
‘তোর বাবা জেলের চাকরি থেকে না বলে পালিয়েছে, তোর বাবার নামে কলকাতা থেকে দুটো চিঠি পাঠানো হয়েছিল তার কোনও উত্তর নেই। তোর বাবাকে থানায় ধরে নিয়ে যেতে বলছে।’
‘বাবার কাল রাত থেকে খুব জ্বর।’
‘কিছু করার নেই, থানায় যেতে হবেই। দারোগাবাবুর হুকুম।’ পুলিশের দল ধপ ধপ করে ভুবন জমাদারের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ছিদাম ওদের পিছন পিছন গেল। কিছুক্ষণ পর ভুবন জমাদার পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে ভ্যানে উঠল। পুলিশ চলে গেলে ছিদাম বলল, ‘গোঁসাইজ্যাঠাকে গিয়ে খবরটা দিই।’
***
ভুবন জমাদার থানা থেকে ফিরল দুপুরে। দারোগার কাছে কানাঘুষোয় খবর ছিল ভুবন জমাদারের মানসিক অসুস্থতার। থানায় ভুবন জমাদারের অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনে দারোগা আর ডাক্তার দু‘জনে মিলে আলোচনা করে নিশ্চিত হল যে ভুবনের চিকিৎসার প্রয়োজন। ভুবন জমাদারকে এই থানার অনেকেই চেনে। মানুষটা হাসিমুখে ইংরেজদের গোলামী করে এসেছে। এর রেকর্ড খুবই ভাল। ডাক্তারের পরামর্শে দয়াপরবশ হল দারোগা। ভুবন জমাদারের হয়ে “সিকলিভ” এর জন্য দরখাস্ত টাইপ করিয়ে ভুবন জমাদারকে বলল – এখানে একটা সই করতে হবে।’
ভুবন জমাদার সই করল।
ডাক্তার বলল, ‘আমি কিছু ওষুধ দিচ্ছি। এগুলো রোজ খাবে, উপকার পাবে।’ ভুবন জমাদার বলল, ‘দারোগাবাবু, আমরা হলাম চোদ্দপুরুষের ডোম। ঘরে বসে থাকলে শরীরে জং ধরে যায়। আমি কি পুরোনো শ্মশানে মড়া পোড়াবার কাজ শুরু করতে পারি?’
‘পুরোনো শ্মশান?’ দারোগা বলল। ‘ও জায়গা তো জঙ্গল হয়ে গেছে।’ ‘আমি আর আমার ছেলে মিলে সাফসুতরো করে নেব,’ ভুবন জোড়হাত করে আরজি জানাল।
দারোগা একটু চিন্তা করল। লোকটা পাগলামি করে কোথায় কোথায় পালাবে, আর ওকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। তার চেয়ে শ্মশানে থিতু হয়ে থাকুক। দরকারে ডেকে নেওয়া যাবে। ‘ঠিক আছে। তবে করতালতলী ছেড়ে বাইরে গেলে থানার অনুমতি নিয়ে যেতে হবে।’
ভুবন জমাদার একগাল হেসে বলল, ‘যম ডাকলে কিন্তু ওকে বসিয়ে রেখে আপনার অনুমতি নিতে আসতে পারব না।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন