প্রীতম বসু
পরদিন সকালে কর্ণফিল্ড রোডের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেল পদাবলীর। নাইট্রোজেন বলেছিলেন সাড়ে আটটা নাগাদ আসবেন, ন’টা বাজতে চলল নাইট্রজেনের দেখা নেই। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ থেকে কর্ণফিল্ড রোডের দিকে যে ক’টা ট্যাক্সি ঢুকছে তাদের সব ক’টার জানলা দিয়ে নাইট্রোজেনকে খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ হয়ে যখন বিরক্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছিল, তখন নাইট্রোজেনকে দেখতে পেল পদাবলী। ট্যাক্সিতে না, দ্রুত হেঁটে ঘাড় ঘুরিয়ে দু‘দিক দেখতে দেখতে রাস্তা পার হয়ে আসছে।
“কতক্ষণ?” নাইট্রোজেন বললেন।
“পঁয়তাল্লিশ মিনিট,’ পদাবলী কষ্ট করে মুখে হাসি টেনে আনল। ‘প্রায় পনেরটা ট্যাক্সির জানলায় আপনাকে খুঁজেছি।’
‘শিয়ালদা থেকে ট্রেনে বালিগঞ্জে নেমে স্টেশন থেকে হেঁটে আসছি। ট্যাক্সিতে পয়সা উড়িয়ে লাক্সারি করার মানে হয় না।’
লোকটা যে কিপটে সেটা আবার প্রমাণ করে দিল। পদাবলী বলল, “স্যার, একদম খালি হাতে যাচ্ছি। একটু ভাল সন্দেশ কিনে নিয়ে গেলে হয় না?”
“সামনে একটা ময়রার দোকানে সকালে জিলিপি ভাজে। চল এক ঠোঙা জিলিপি নিয়ে যাই। বাসি সন্দেশের থেকে ফ্রেশ জিলিপি খাওয়ার মজাই আলাদা।’
পদাবলী চুপ করে গেল। নাইট্রোজেন সত্যি সত্যি পাঁচ টাকার গরম জিলিপি কিনে ঠোঙাটা পদাবলীর হাতে ধরিয়ে বলল, ‘ধর। এটা পরাশরকে দিও।’ পদাবলী লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিল। এমন কঞ্জুষ মানুষ সে জীবনে দুটি দেখেনি।
পরাশর সেনের বাড়িতে সুরেলা কলিং বেল বাজাতেই রতি দরজা খুলল। পদাবলীর মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। রতি সকালে স্নান করেছে, পিঠে খোলা চুল, একটা হলুদ রঙা সালোয়ার-কুর্তা-দোপাট্টা পরে। জিলিপির প্যাকেটটা রতির হাতে ধরিয়ে দিল পদাবলী। ‘আসুন মাস্টারমশাই। এসো পদাবলী।’ রতি ভিতরে নিয়ে গেল ওদের। ‘পরাশর এক্ষুনি স্নানে ঢুকল। আপনারা বসুন। আমি চা বানিয়ে আনছি।’
পরাশরের বাড়ির বৈঠকখানা কোনও ছোটখাট আর্ট গ্যালারীর থেকে কম নয়। একদিকের দেওয়াল জোড়া বিশাল ম্যুরাল পেইন্টিং। সিলিং জুড়ে জলরঙে ফ্রেস্কোতে নীলাভ ঢেউ সংযুক্ত দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে যেন তরঙ্গের ফেনা সৃষ্টি করেছে। জয়পুরের ছোট ছোট মীনাকারির কাজ করা সোফা, ইজিচেয়ার বিশাল কাঁচের জানলার পাশে প্যাস্টেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা রতির অর্ধসমাপ্ত মুখচ্ছবি। পদাবলীর বিশ্বাস হচ্ছে না সে পরাশর সেনের বাড়িতে বসে। একটু পরেই ওর পরাশর সেনের সঙ্গে দেখা হবে। পদাবলীর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
রতি চা নিয়ে এল। চায়ের গন্ধই আলাদা। চুমুক না দিয়ে শুধু চায়ের বাষ্পের গন্ধ শুকতেই ইচ্ছে করে। একটু পরেই পরাশর সেন পাঞ্জাবী-পায়জামা পরে ভিতরে ঢুকলেন। হাসি হাসি মুখে অভ্যর্থনার ভঙ্গীতে বললেন, ‘অনেকদিন পর এলে নীতিশদা।’
“তোমরা ব্যস্ত মানুষ, তাই বিরক্ত করতে ইচ্ছা হয় না। তবে তোমার সাফল্য আমি খুব উপভোগ করি।’ নাইট্রোজেন হেসে বললেন। ‘এ আমার ছাত্র পদাবলী, তোমার খুব ফ্যান। নিজে খুব ভাল ছবি আঁকে। এর ছবি ত্রিবেণী কলা সঙ্গমের এক্সিবিশনে ডিস্পেড হয়েছিল।’
‘বাঃ! এক্সেলেন্ট! অওসাম!’ পরাশর সেন এমনভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন যেন ওঁর নিজের ছবি ওই এক্সিবিশনে পাঠালে রিজেক্টেড হত।
পদাবলী উঠে দাঁড়িয়ে ওর ভগবানের পা ছুঁতে যেতেই, পরাশর সেন মাঝপথে পদাবলীর দু‘বাহু ধরে আটকে দিলেন। পরাশর হেসে বললেন, “বসো, বসো। কোন মিডিয়াম তোমার পছন্দ? অয়েল পেইন্ট না ওয়াটার কালার?”
‘গ্রাফাইট স্কেচ। আপনি ত্রিবেণী কলা সঙ্গমের ওই এক্সিবিশনের উদ্বোধন করেছিলেন,’ পদাবলী বলল। ‘কিন্তু আপনার এত ফ্যান আপনাকে ঘিরে রেখেছিল যে দশ হাতের মধ্যেও ঢুকতে পারি নি।’
‘আচ্ছা? তাই নাকি? তবে খুব ভাল কাজ তোমাদের বয়সীদের।’ তারপর পরাশর সেন প্রসঙ্গ পালটে বলল, ‘রতি কিছুটা প্রিঅ্যাম্বেল দিয়ে রেখেছে। তুমি বল নীতিশদা, কী ব্যাপার?”
নাইট্রোজেন তারপর সনাতন কীর্তনের ইতিহাস থেকে করতালতলীর কীর্তনের বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত সব বর্ণনা করলেন।
‘ইন্টারেস্টিং,’ পরাশর সেন বললেন। ‘আশ্চর্য যে এসব কোথাও ডকুমেন্টেড নেই?’
নাইট্রোজেন বললেন
‘ছাড়িয়া চৈতন্য কথা, অন্য ইতিহাস বৃথা,
বলে যেই মুখে আগুন তার।
-
তুমি নিজে তো জানো যে ঐতিহাসিক কথাকে বৈষ্ণব মহাজনগণ “আনকথা” বলেন। বৈষ্ণব ভক্তসমাজে বৈষ্ণবদের ইতিহাস আদরণীয় ছিল না। তাই সাল তারিখ মেনে বিধিবদ্ধ ধারাবাহিক বৈষ্ণব ইতিহাস সেভাবে বাংলায় লেখা হয় নি।’
“প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কী হল সেটা জানা গেল না?”
‘না। প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার রহস্য অধরাই রয়ে গেল। যেমন অধরা রয়ে গেল সনাতন কীর্তনের বাকি লাইনগুলো।
“তাহলে নীতিশদা তোমার প্ল্যানটা এখন কী?”
রতি আর পদাবলীও উৎসুক।
‘কালচারাল ট্যুরিজম,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘করতালতলীতে একটা কীর্তন হাব বানাতে চাই।’
‘কিন্তু একটা কথা বল, বাউল গানের মত কীর্তন গানের প্রসার হচ্ছে না কেন?’ পরাশর সেন জিজ্ঞাসা করলেন।
‘যুবসমাজ কীর্তনের প্রতি আকৃষ্ট নয়। ওদের একটা ভ্রান্ত ধারণা মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে কীর্তন হল এক লুপ্তপ্রায় বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গীত।’ ‘বৈষ্ণব ধর্ম?”
‘হ্যাঁ। কিন্তু ওদের কাছে এটা পৌঁছে দেওয়া দরকার যে কীর্তন হল পদাবলী সাহিত্যের গান। এই গান আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের উচিত সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে অন্ততঃ পরিচিত হওয়ার। তারপর গ্রহণ বা বর্জন করুক ওটা ওদের ব্যাপার। কিন্তু, একটা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে কিছু না জেনে বর্জন করা উচিত না। আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে আমি ক্লাসে জিজ্ঞাসা করে দেখেছি ওদের পাঁচজন বিখ্যাত কীর্তনীয়ার নাম জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবে না। এমন কি ওদের সেই পাঁচজনের নাম জানার আগ্রহ পর্যন্ত নেই।’
‘কীর্তন গানের কি ডেথ বেড থেকে উঠে দাঁড়াবার মত শক্তি আছে?” পরাশর সেন জিজ্ঞাসা করলেন।
‘আমি মনে করি আছে। এত বড় লিগ্যাসি -
‘আমাকে কী করতে হবে বল।’
‘করতালতলীতে একটা অন্নকূট ফেস্টিভ্যাল করতে হবে। তাতে সব বিখ্যাত কীর্তন সিঙ্গাররা এসে গাইবে। আমরা ওদের উপযুক্ত সম্মানী দিয়ে গান গাওয়াব।’
‘পাবলিক আসবে?’
‘প্রচার চাই। চাই সেলিব্রিটি এনডোর্সমেন্ট। ইংল্যাণ্ড মিউজিক ফেস্টিভ্যালের মাধ্যমে ওদের দেশে প্রচুর ট্যুরিস্ট টানছে। সেদিন একটা আর্টিকেল পড়লাম যে ইংল্যাণ্ডের ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট স্টাডি করে দেখেছে প্রায় পঁয়ষট্টি লাখ মিউজিক লাভিং ট্যুরিস্ট তাদের দেশে আসতে পারে।’
‘তুমি আমাদের কেঁদুলির জয়দেব মেলার মত প্যারালাল একটা মেলা করতালতলীতে
করতে চাইছ। তাই তো?” ‘স্টেপ ওয়ান হল হ্যাঁ, তাই আমি চাই। তবে স্টেপ টু আমার আসল লক্ষ্য। আমাদের বাংলায় রাঢ় অঞ্চলে মানে ভাগীরথীর পশ্চিমের জেলাগুলোতে একসময় অজস্র কীর্তনের পাটবাড়ি আর আখড়া ছিল। অসংখ্য নামজাদা কীর্তনীয়া ও বৈষ্ণব পদাবলীর কবি এই রাঢ়ের সারস্বত ক্ষেত্ৰকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। গড়াণহাটি ছাড়া আর বাকি চারটে কীর্তন ঘরানা মানে মনোহরসাই, রেনেটি, মন্দারিনী আর ঝাড়খণ্ডী ঘরানার জন্ম রাঢ়ে। আমি বাংলায় কীর্তন ট্যুরিজম জনপ্রিয় করতে চাই। বর্ধমানের শ্রীখণ্ডে মনোহরসাই, আর রাণীহাটিতে রেনেটি কীর্তনের জন্ম, মন্দারণে মন্দারিনী ঘরানা, আর পুরুলিয়ার সেরেগড়ে ঝাড়খণ্ডী ঘরানার জন্ম। আমি চাই একটা কীর্তন সার্কিট তৈরি করতে। ট্যুরিস্টদের এই কীর্তন সার্কিটে ট্যুর করিয়ে দেখান হবে কোথায় কোন কীর্তনের ঘরানার জন্ম হয়েছে। কোথায় কীর্তন মেলা হত, কীর্তনের ইতিহাস কী ছিল, এসব অ্যাওয়ারনেস। আর এর সঙ্গে পদাবলী রচয়িতাদের যোগ করে নেওয়া যেতে পারে। কাটোয়ার পঁচাত্তর মাইলের মধ্যে কিংবা নবদ্বীপের একশ’ মাইল রেডিয়াসের মধ্যে বাংলার প্রায় সব বিখ্যাত বৈষ্ণব কবিরাই থাকতেন। স্মার্ত রঘুনন্দন, জগদীশ তর্কালঙ্কার আর রামভদ্র তো নবদ্বীপেরই লোক, কাশীরামদাস, তার ভাই কৃষ্ণদাস ও গদাধরদাসের বাড়ি হল পঁচিশ মাইল দূরের সিঙ্গি গাঁয়ে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের জন্ম কাটোয়ার দশ মাইল দূরে ঝামটপুরে, শ্রীনিবাস আচায্যি কাটোয়া থেকে তিন মাইল দূরে যাজিগ্রামে। আর বাংলার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব কবি গোবিন্দদাস কবিরাজ, নাইট্রোজেন চায়ে চুমুক দিলেন। ‘ভ্রাতা রামচন্দ্র কবিরাজ ও পুত্র দিব্যসিংহের সঙ্গে বাংলার এই সর্বশ্রেষ্ঠ কবি থাকতেন নবদ্বীপের আশি মাইল উত্তরে ভগবানখোলার এক মাইল উত্তর পশ্চিমে তেলিয়াবুধুরী গ্রামের পশ্চিম পাড়ায়। প্রাইভেট সেক্টরের হেল্প পেলে কাজটা অনেক তাড়াতাড়ি হবে।’
‘এটা একটা ভাল প্রচেষ্টা। আমি এতে ইনভল্ভড হতে রাজি আছি।’
‘আমাদের ইমিডিয়েট দরকার নীলমাধবের মন্দিরের সংস্কার, পদাবলী বলল। আমি দেখেছি ওই মন্দির যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে। গোবিন্দ অধিকারী বলেছে নাকি ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা লাগবে ওই মন্দির সারাতে।’
‘ওর দায়িত্ব আমার,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘মন্দির সারাবার টাকা আমি দেব।’
চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে পদাবলী থমকে গেল। ঠিক শুনছে তো? নাইট্রোজেনের মত কঞ্জুষদের বাদশা, যে কারেন্ট পুড়বে বলে ঘরের আলো বন্ধ করে রাখে, ট্যাক্সিতে না এসে লোকাল ট্রেনে আসে, সন্দেশ না কিনে লোকের বাড়ি জিলিপি নিয়ে যায়, সে এক কথায় এত টাকা বের করে দেবে? পদাবলীর মুখ ফসকে বেরিয়ে এল – “আপনি দেবেন?”
‘আমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে আমি ওই খরচা করতে পারব। কিন্তু একটু গোপনে কাজটা করতে হবে। কেননা গোবিন্দ অধিকারী আমার টাকা নেবে না।”
“কেন তোমার টাকা নেবে না?’ পরাশর সেন বললেন।
“সে এক অন্য গল্প। আরেকদিন বলব। পদাবলী, আমি একজন ঠিকাদার পাঠাচ্ছি করতালতলীতে। তুমি গোবিন্দ অধিকারীর পারমিশন নিয়ে রেখ।’ “টাকা কে দিচ্ছে জিজ্ঞেস করবেই।’
“ওকে বল একজন প্রতিমা দেবী এই ডোনেশন দিচ্ছেন।’
‘প্রতিমা দেবীটা আবার কে?’ পরাশর জিজ্ঞাসা করলেন।
“আমার স্বর্গীয়া মা।’ নাইট্রোজেন মৃদু হাসলেন। ‘কাজ হওয়া নিয়ে কথা। কিন্তু আসল কাজটা আরও অনেক বড়। করতালতলীতে একটা কীর্তনের মিউজিয়াম বানাতে হবে। মায়াপুরে যে বিদেশিরা কীর্তনের প্রচারের জন্য কাজ করছে ওদের ট্যাপ করলে ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিস্টরাও এখানে আসবে।’
‘আয়্যাম ইন,’ পরাশর সেন বললেন। ‘আর কীর্তনকে এক লোকেশনে বন্ধ না রেখে কীর্তন সার্কিট করার আইডিয়াটা আমার বেশ পছন্দ। কীর্তন মিউজিয়াম বানালে আমি আমার কিছু খুব ভাল আর্টিস্ট ছাত্রকে দিয়ে গোটা মিউজিয়ামের দেওয়ালে কীর্তনের থিমে ম্যুরাল পেইন্টিং করিয়ে দিতে পারি। আর আমার আঁকা কীর্তনের কিছু ছবি ডোনেট করতে পারি।’
‘দারুণ হয় তাহলে,’ নাইট্রোজেন খুব খুশি। ‘মনোহরসাই ছাড়া অন্য ঘরানাগুলো প্রায় মৃত। সেইসব রেনেটি, মন্দারিনী, ঝাড়খণ্ডী ঘরানার কীর্তন গান ও কিছু গায়ককে আমি অবলুপ্তির পথ থেকে তুলে আনতে পারব। আমি নিজে শিক্ষার্থীদের বৈষ্ণবরসের আস্বাদনের শিক্ষা দেব। ‘
‘তাহলে তো খুব ভাল হয়, মাস্টারমশাই,’ রতি বলল। আমি আর হরিকাকা আপনাদের মিউজিয়ামে কীর্তন শেখাবার ক্লাস নিতে পারি।’
‘কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে, পরাশর সেন এবার গম্ভীর স্বরে বললেন।
‘কী শর্ত?’
‘মিউজিয়ামের নাম রতির বাবা গীত গায়েনের নাম অনুসারে হবে। ওঁকে অন্যায়ভাবে একদিন করতালতলী থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি চাইব সেই অন্যায়ের একটা প্রায়শ্চিত্ত করুক করতালতলী।’
‘আমি একটা কথা বলব?’ পদাবলী রতির দিকে তাকিয়ে বলল। ‘গোবিন্দ অধিকারীর পরিবার গীত গায়েনের ওপর এই অন্যায়টা করেছিল। গোবিন্দ অধিকারী এজন্য অনুতপ্ত। আপনার মা দেখেছেন যে গোবিন্দ অধিকারী আপনার বাবার মৃত্যুশয্যায় তার পা ধরে ক্ষমা চেয়েছেন। গোবিন্দ অধিকারী আপনার বাবার মুখাগ্নি করেছেন। উনি অন্যায় করেছিলেন একথা যেমন সত্যি, গোবিন্দ অধিকারী করতালতলীর কীর্তনের জন্য অনেক স্বার্থত্যাগ করেছেন, এটাও ততটাই সত্যি। গোবিন্দ অধিকারী জমিদার চন্দ্রকান্ত সেনকে ধুলডাঙা বেচে অনেক পয়সা কামাতে পারতেন, উনি তা করেননি। এমন কি গোবিন্দ অধিকারীর মা যখন পয়সার অভাবে হাসপাতালে মারা যাচ্ছেন, তখনও তাঁরা ধুলডাঙা বেচে দেন নি। গোবিন্দ অধিকারী করতালতলীর কীর্তনকে বাঁচাবার জন্য এক অসম লড়াই লড়ে চলেছেন। ঘটনাক্রমে আমি সেখানে গিয়ে পড়েছি এবং ওঁর এই লড়াইয়ে ওঁকে একা ছেড়ে দিইনি। তাই আমার মতে মিউজিয়ামের নামে গীত গায়েনের সঙ্গে গোবিন্দ অধিকারীর নামও যুক্ত হওয়া উচিত। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার মত লড়াকু মানুষকেও ভুলে না যায়। আর দু‘জনের নাম এক হয়ে পদাবলী সাহিত্যে এক অমর কীর্তি তো সৃষ্টি হয়েই আছে। সেই নামেই মিউজিয়ামের নাম হোক “গীতগোবিন্দ”।
‘অনবদ্য,’ পরাশর সেন রতির মুখের দিকে তাকালেন। রতির দু‘চোখ যেন পদ্মফুলের পাপড়িতে জল টলটল করছে, আরেকটু আবেগের হাওয়া এলেই জলরাশি নিম্নগামী হবে।
‘কুমুদরঞ্জন বা জমিদারগোঁসাইয়ের বাড়িতেই মিউজিয়ামটা তৈরি হোক। তাতে তাঁদের আত্মা শান্তি পাবে,’ পদাবলী বলল।
‘এক্সেলেন্ট!’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘তাহলে অন্নকূট উৎসবের জন্য তৈরি হওয়া যাক? অনেক পারমিশন লাগবে।’
‘আমি সেদিকে কিছুটা এগিয়ে গেছি,’ পদাবলী বলল। ‘আজ দুপুরে আমার লালবাজারে ডিসিপির সঙ্গে অ্যাপয়ন্টমেন্ট আছে। আমাকে অবশ্য তার আগে গোবিন্দ অধিকারীর সঙ্গে বিস্তারিত ভাবে কথা বলতে হবে।’
পরাশর সেন এবার উঠে পদাবলীর হাতে একটা গিফট প্যাক দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমার জন্য। খুলে দেখ তোমার পছন্দ হয় কিনা।’
পদাবলী কাগজের মোড়কটা খুলল। এক বাক্স গ্রাফাইট ড্রয়িং পেন্সিল সেট। পদাবলী উচ্ছ্বসিত হয়ে পরাশর সেনের দিকে তাকাল, ‘প্রিজমাকালার! বাবা, এতো অনেক দামি
‘সিক্স বি থেকে ফোর এইচ,’ পরাশর সেন হেসে বললেন। ‘ছোটবেলায় কাঠকয়লায় স্কেচ আঁকতাম।’
রতি বলল দুপুরে খেয়ে যেতে। নাইট্রোজেনের কাজ ছিল, পদাবলীর আরও কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভবপর ছিল না কেননা গোবিন্দ কীর্তনীয়ার আসার কথা। রাস্তায় নেমে পদাবলীর মনে হল ওর জীবন ধন্য হয়ে গেল। কিন্তু একটা খটকা মাথায় জুড়ে বসল – নাইট্রোজেন এতগুলো টাকা কেন দিচ্ছেন? আর স্যার কেন করতালতলীকে এত সাহায্য করতে চান? -
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন