প্রীতম বসু
ঘরের উঠোনে বাঁধানো বেদি, তার ওপর তুলসীগাছ। পদাবলী বাইরের গ্রিলের দরজা দিয়ে দেখতে পাচ্ছে ছিদাম বায়েন স্নান সেরে তুলসী গাছের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে তুলসী পাতা ছিঁড়ছে। পদাবলীর বিস্মিত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে গোবিন্দ অধিকারী মৃদু হেসে বলল, ‘কেশবার্থে চিনোমি ত্বাং বরদা ভব শোভনে। বৈষ্ণব তুলসী গাছের পাতা ছেঁড়ার আগে মন্ত্র পড়ে ক্ষমা চেয়ে নেয়, এর মানে - শ্রীকেশবের পূজার উদ্দেশ্যে আপনার পত্র ও মঞ্জরী আমি চয়ন করছি, কৃপা করে আমাকে বরদান করুন। তারপর আরও ক্ষমা প্রার্থনা মন্ত্র বলে চয়নোদ্ভবদুঃখং চ যদ্ হৃদি তব বর্ততে। তৎ ক্ষমস্ব জগন্মাতঃ বৃন্দাদেবী নমোহস্ততে৷ মানে, হে তুলসী দেবী আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাই। হে জগন্মাতা, আপনার পত্র ও মঞ্জরী চয়ন কালে যদি আপনার হৃদয়ে দুঃখের উদ্ভব করে থাকি, তবে কৃপা করে আমাকে ক্ষমা করুন।’
পদাবলী চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল আর ভাবতে লাগল যে কী অসামান্য শিক্ষা আমাদের প্রাচীনকালের মুনি ঋষিদের! গাছের পাতা ছিঁড়ছে বলে গাছের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। আর আজকের মানুষ!
ছিদাম বায়েনের তুলসীপত্র চয়ন শেষ হলে, গোবিন্দ অধিকারী গ্রিলের দরজা খুলে পদাবলীকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে ঢুকল। ছিদাম বায়েন গোবিন্দ অধিকারীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী রে, তোর মুখ শুকনো? জমিদার কী বলল?”
‘জমিদার ফাইনাল ওয়ার্নিং দিল। বলল, জমিটা বিক্রি করে দিতে, না দিলে কপালে দুঃখ লেখা আছে। ওর কাছে ভাল খদ্দের আছে। ভাল মুনাফা হবে, দু‘জনে ভাগাভাগি করে নেব।’
“তুই কী বললি?”
‘আমি তো না বলে এলাম, কিন্তু ওই শকুনের নজর একবার যখন পড়েছে তখন ওর হাত থেকে ওই জমি আর মন্দির কতদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারব কে জানে?’
উদ্বেগে ছিদামের মুখ ফ্যাকাসে – ‘এই জলাজমি নিয়ে কী করবে চন্দ্রকান্ত?” গোবিন্দ অধিকারী বলল, ‘জমিদার বলে ঐ জলাজমি কারোর কোনও কাজে লাগছে না। ওটা বেচে ভাল পয়সা পাওয়া যাবে। ওখানে রিসর্ট করবে।’
“কী করবে?”
“রিসর্ট। হোটেলই বলতে পার। বড়লোকেরা ছুটি কাটাতে গ্রামে আসবে, শহরের দমবন্ধ করা ঘিঞ্জি থেকে ক’দিন মুক্ত পরিবেশে কাটিয়ে মদ-টদ খাবে, গলফ খেলবে, টেনিস খেলবে, সাঁতার কাটবে, ছিপ ফেলে মাছ ধরবে, ফূর্তিটুর্তি করে ছুটি কাটিয়ে আবার ফিরে যাবে শহরে।
ছিদাম পদাবলীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিনসেগুলো আর জায়গা পেল না? করতালতলীর এত মহান ধুলটের ঐতিহ্য মুছে যাবে?”
‘কী সেই ধুলটের ঐতিহ্য, দাদু?’
‘ধুলট হল বৈষ্ণবদের এক প্রধান উৎসব। মাঘ মাস হল বৈষ্ণবদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। মাঘের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে অদ্বৈতপ্রভুর জন্ম, শুক্লা ত্রয়োদশীতে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্ম, আর মাঘী পূর্ণিমাতে শ্রীচৈতন্য কাটোয়াতে কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। এই তিনটে দিন স্মরণ করে মাঘের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথি থেকে মাঘী পূর্ণিমা পর্যন্ত বৈষ্ণবরা অত্যন্ত সমারোহের সঙ্গে এই ধুলট উৎসব করে। এই ধুলট উৎসব একসময় আমাদের এই করতালতলীতে খুব ঘটা করে হত,’ ছিদাম বায়েন বলল।
পদাবলীর মনে হল এই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না। ও বলল, ‘সেই ধুলটেই সনাতন কীর্তন গেয়ে নীলমাধবে মিলিয়ে গেছিলেন প্রাণনাথ কীর্তনীয়া?”
“হ্যাঁ, রে।’
“সত্যি? বিশ্বাসই হয় না।’
“তিন হাজার লোক সাক্ষী ছিল, ছিদাম বায়েন চোখ বড়বড় করে বলল। “তিন হাজার লোক আসত? বিরাট উৎসব হত তাহলে?”
- ‘বিরাট মানে বিরাট! আট দিন ধরে চলত এই ধুলট খুব ধুমধাম করে, হাজার হাজার ভক্ত – নবদ্বীপ, কাটোয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া - পিলপিল করে লোক জড়ো হত। বুড়িকোশীর জলে কত্ত নৌকো - ভাউলিয়া, পানসিতে কীর্তনীয়ারা মৃদঙ্গ করতাল বাজিয়ে সংকীর্তন করছে, পাশের নৌকো থেকে তাদের উদ্দেশ্যে হরিবোল ধ্বনি দিচ্ছে মাঝি। ভক্তদের নিয়ে পর পর সব নৌকো ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। ঘাটে জায়গা নেই, আঘাটায় খুঁটি পুঁতে কাছি বেঁধে একের পর এক নৌকো লাগছে।
“এত লোক সব থাকত কোথায়?’
“মাঠে চৈতন্যপুখুরীর পাড়ের জমিতে দরমা, হোগলার ছাউনি করে, ভিতরে মেঝেতে আটন, খড় এসব বিছিয়ে বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের থাকার বন্দোবস্ত করা হত। ভক্ত মানুষের সমুদ্র, যেন গঙ্গাসাগরের মেলা লেগেছে। কোনও আখড়ায় গোঁসাইরা সৎপ্রসঙ্গ পাঠকথন করছেন আর শ্রোতারা গুরুপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে নিবিষ্ট মনে বৈষ্ণব ধর্মালোচনা শুনছে, কোথাও নাম সংকীর্তন হচ্ছে, কেউ বা শুধু খোল বাজিয়ে নিজেদের সময় কাটাচ্ছে। চৈতন্যদেব বলেছেন, গ্রাম্যকথা কইও না, গ্রাম্যকথা শুনিও না, আমাদের এখানে পরনিন্দা কেচ্ছা কাহিনীর কলুষিত বাতাস ছিল না। বাতাস ভাবের সৌরভে সুরভিত, ধূলি মধুময়।’ 1
- ছিদাম বায়েনের চোখে আবেশ। যেমন ভাবে দাদু নাতিকে গল্প শোনায় সেভাবে পদাবলীর দিকে তাকিয়ে বলল – ‘চৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু আর অদ্বৈতপ্রভুর আসন স্থাপনা করে তার সামনে এক সপ্তাহ ধরে পূজা, উপাসনা, আরতি, ভোগরাগ কীর্তন চলতে থাকে। আহা! সে কী পবিত্র দৃশ্য। এখনো যেন দেখতে পাই। ভোগরাগের প্রসাদ ভক্তরা মাথায় ঠেকাবার সময় আবেশে দুচোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তারপর এত ভক্তিতে সেই প্রসাদ দাঁতে কাটছে যেন জিহ্বা পবিত্র করে দিচ্ছে সেই প্রসাদ-স্পর্শ। ছিদাম বায়েন ভক্তিতে যুক্তকর কপালে ঠেকাল। ওর নিমীলিত অক্ষি কাল অতিক্রম করে চলে গেছে করতালতলীর ধুলটের গরিমার দিনগুলোতে।
‘সন্ধ্যায় কীর্তনের আসরে সামিয়ানায় গিজগিজ করছে ভিড়। ম্যারাপ বাঁধা মণ্ডপ কার্বাইডের বাতির আলোতে আলোকিত। মণ্ডপে কার্বাইডের গ্যাসের গন্ধ। শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির পবিত্র আগমনীতে খোল-করতাল বাজিয়ে ভুবনমঙ্গল হরিনাম ধ্বনির সংকীর্তন শুরু। একের পর এক কীর্তনের দল এসে প্রভুর উদ্দেশ্যে ভাববিহ্বল গীতি বন্দনায় শত শত দর্শকের মনে পুলক কম্পন জাগিয়ে চলেছে। শ্রীখোলে বেজে চলেছে দশকোশী, তেওটা, গড়খেমটা, লোফা, মধ্যমান, ঝাঁপতাল, রূপক, একতাল, ব্রক্ষ্মতাল, সমতাল, দোঠুকী। অপলক নেত্রে শুনতে শুনতে কেউ হঠাৎ যেন দেখতে পায় তিন প্রভু পট থেকে বের হয়ে সামনের মণ্ডপের সাদা চাদরে নৃত্য করে আবার পটে ফিরে যায় - সম্বিত হারিয়ে সেই ভক্ত পাশের দর্শকের গায়ে ঢলে পড়ে। আসরে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সেজন্য পাশের শ্রোতারা তাকে মাটিতে শুইয়ে কানের কাছে ধীরে ধীরে হরি ওঁ নামের অমৃতবর্ষণ করায় সে আবার সম্বিত ফিরে উঠে বসলে দর্শক আবার তৃপ্তিতে মন বসাচ্ছে কীর্তনে। সে এক অনির্বচনীয় ভাবের উচ্ছ্বাস। রাতের আকাশের তারারা যেন কাছাকাছি নেমে আসে এই আনন্দঘন কীর্তন শুনতে – মধুরং, মধুরং, মধুরং, মধু, মধু।’ ছিদাম বায়েন থেমে একটু দম নিল। ‘ধুলট মহোৎসবের অষ্টম দিনে মঙ্গলারতির পর অনুব্রজা নগর সংকীর্তন হত। করতালতলী থেকে সংকীর্তন যেত উদয়নপল্লীতেও। শত শত মৃদঙ্গ, করতাল নিয়ে বাদ্যে-লক্ষে প্রাণবন্ত হরিনামে ছুটে চলেছে হাজার দুই নরনারীর সংকীর্তন দল - হরি বলব মুখে যাব সুখে ব্রজধাম, কলিতে তারকব্রহ্ম হরিনাম - ভাবের বন্যায় করতালতলী ভেসে যাচ্ছে সে এক দেখবার মত দৃশ্য। এক শক্তির প্রবাহ আনন্দস্রোতে এগিয়ে চলেছে, দু‘পাশে নকুলদানা, বাতাসা, খৈ এর হরির লুঠ হচ্ছে। সিদ্ধ-প্রেমিক-ভক্তরা নাকি কেউ কেউ সেই বাতাসার বৃষ্টিতে বিদ্যুৎকণা দেখতে পান। পথপার্শ্বের বাড়ি থেকে মেয়েরা উলুধ্বনি করে চলেছে, যারা নগরকীর্তনে যোগ দিতে পারছে না তারা নগরকীর্তন চলে যাওয়ার পর পথের ধুলো মুঠোভরে নিয়ে মুখে মাথায় মাখছে। অনেকে কলসী করে জল দিয়ে পথ ধুয়ে রাখত। ধুলটের পর রাতে ধুলট মাঠের পাশে নদীর বাঁধের আলের ওপর পাত পড়ে। তিন হাজার মানুষ মাটিতে বসে ভোজন করে খিচুড়ি, কুমড়ো ভাজা, ঘ্যাঁট আর তেঁতুলের টক। জাতি ধর্মের কোনও বাদবিচার নেই। বামুনের পাশে বসে খাচ্ছে ডোম। জমিদারগোঁসাইয়ের বাড়ির পিছনে মাটি খুঁড়ে বিশাল বিশাল তিউড়ি উনুনে আগের দিন থেকে রাত জেগে মশাল জ্বালিয়ে রান্না হয়েছে। অত লোকের খিচুড়ি রাখার পাত্র কোথায়? মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে চওড়া গর্ত খুঁড়ে তাতে কলাপাতা বিছিয়ে তার ওপর ঢেলে রাখা হচ্ছে খিচুড়ি। গর্ত ভরে গেলে তার ঢাকনা সেও কলাপাতা, তারপর পাশের গর্তে।
‘মেলায় নিশ্চয়ই দোকান-টোকান লাগত?”
“মেলায় অনেক কারিগরের অন্ন সংস্থানও হত। নবদ্বীপের কাঠের পুতুল, বর্ধমানের পূর্বস্থলীর সূত্রধরদের কাঠের পুতুল, কৃষ্ণনগর থেকে মাটির পুতুল, তালপাতার ভেঁপু, কাগজের বিখ্যাত সব মুখোশ নিয়ে ফেরিওয়ালারা পথের দু‘পাশে এসে বসে বিক্রিবাটা করত। ধুলটের শেষে এরপর বাড়ি ফেরার পালা। ঈশ্বরের সামনে যা কিছু দক্ষিণা জমা হত তা থেকে দরিদ্র বৈষ্ণবদের ফিরে যাওয়ার গাড়ি ভাড়া দিয়ে দেওয়া হত। আট দিনে কত নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হল। একে অন্যকে বিজয়ার মত আলিঙ্গন করে নিজ নিজ পানসিতে গিয়ে ওঠে – মন ভারাক্রান্ত মনে আশা, আবার আগামী বছর ধুলটে আসতে - পারলে দেখা হবে। ” -
“ধুলট বন্ধ হয়ে গেল কেন?”
‘প্রাণনাথ কীর্তনীয়াকে নিয়ে গণ্ডগোল হল খুব, তখন ইংরেজ পুলিশের কর্তা ড্যানিয়েল সাহেব এই মন্দির বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর জমিদার অখিলরঞ্জনও মন্দির থেকে বেপাত্তা। সেই থেকেই বন্ধ হয়ে গেল ধুলট। তারপর তো ইংরেজ দেশ থেকে চলে গেল, কিন্তু কে করবে ধুলট ?”
‘কেন? জমিদারগোঁসাই?’
‘জমিদারগোঁসাই মানুষটা অত ঝড় ঝাপটা আর নিতে পারে নি। সে তো কবেই করতালতলীতেই শেষ নিঃশ্বাস ছেড়েছে।”
“বাবা, জানি না জমিদার আর ওর ছেলে মিলে কী চাল চালবে। আমার মনে হয় মন্দিরটা এভাবে ফেলে রাখা চলবে না, গোবিন্দ অধিকারী বলল। মন্দিরে নিত্যপুজো শুরু হলে এপাশ-ওপাশের গ্রামের ভক্তরা রোজ আসতে আরম্ভ করলে সে মন্দির ভাঙা অত সহজ হবে না। আমি ওখানে রোজ পুজোর ব্যবস্থা করব। আমাকে মন্দিরের চাবিটা একবার দাও তো, দেখে আসি মন্দিরটা এখন কী দশায় আছে। একটু ঝাঁট দিয়ে ধুলো ঝেড়ে, জল দিয়ে মেঝে ধুয়ে ঠাকুরের পুজো শুরু করা যায় কিনা চেষ্টা করে দেখি।’
‘পারবি?” একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছিদাম বায়েন এবার কোমরের গেঁজে থেকে একটা চাবি বের করে দিল। কিন্তু মন্দির সারাতে অনেক টাকা লাগবে। সে সব কোথায় পাবি?”
‘একবার যাই তো। দেখাই যাক কতটা কী হয়। নাহলে ওই রক্তচোষা জমিদার দু‘দিনে ওই মন্দির মাটিতে মিশিয়ে দেবে।’
মন্দির খুলবে? মন্দিরের ভিতরটা দেখা যাবে? পদাবলীর সুষুম্না দিয়ে শিরিশিরানির স্রোত নেমে গেল। ‘চলুন আমিও যাব আপনার সঙ্গে। আমি জল এনে এনে মন্দির ধুয়ে ঝাঁট দিয়ে দেব।’
‘চল তাহলে,” গোবিন্দ অধিকারী চাবিটা নিজের গেঁজেতে গুঁজল। ‘কিন্তু গোখরো সাপদুটো?”
‘কার্বলিক অ্যাসিড সঙ্গে নিচ্ছি। চারদিকে ছড়িয়ে রাখলে সাপ আসে না,” গোবিন্দ অধিকারী বলল। তবে সামনের ঝোপগুলো পরিষ্কার করাতে হবে। বিশেটাকে বলব।’ গোবিন্দ অধিকারী ঘর থেকে ধূপকাঠির বাক্স নিয়ে উঠোনের পিছনে গিয়ে অ্যাসিডের বোতলটা তুলে নিল। ‘এবার চল।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন