প্রীতম বসু
মন্দিরা রাতে খড়ুটি ঘর থেকে খাবারের থালা নিয়ে বেরোবার সময় প্রাণনাথ
বলল – ‘মন্দিরা, এই দরজার তালার কটা চাবি আছে?” -
‘দুটো। কেন?”
‘একটা চাবি আমার কাছে থাক।’
‘তুমি চাবি নিয়ে কী করবে?’ মন্দিরা অবাক।
‘দরকার হলে আমি তালা খুলে বের হয়ে যেতে পারব।”
‘দরজার বাইরে লাগানো তালা ঘরের ভিতর থেকে খুলবে কীভাবে?”
‘আমি প্র্যাকটিস করেছি,’ প্রাণনাথ বলল। ‘দরজাটা ভিতর দিকে টানলে পাল্লা ফাঁক হয়ে যায়। সেই ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে বাইরের তালায় পৌঁছানো যাচ্ছে। তুমি বাইরে গিয়ে তালা লাগিয়ে চাবিটা দাও আমি খুলে দেখিয়ে দিচ্ছি।’
মন্দিরা বিস্মিত হয়ে বাইরে থেকে তালা লাগাল। প্রাণনাথ দরজার পাল্লা ভিতরে টানল। মন্দিরা সেই ফাঁক দিয়ে চাবিটা প্রাণনাথকে দিল আর প্রাণনাথ অবলীলাক্রমে সেই দরজার বাইরের তালা ভিতর থেকে খুলে দিল।
‘বাপরে, তোমাদের তো তুলনাই হয় না!’ মন্দিরা প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাল। ‘কিন্তু হঠাৎ তোমার এই চাবির দরকার হল কেন?”
“অত রাতভোরে এসে তোমাকে আর এসে দরজা খুলতে হবে না।” ‘উঁহু! আসল কথাটা এখনও পেট থেকে বের করো নি।’
প্রাণনাথ একদণ্ড ভাবল। এ মেয়ে যেন ওর মন পড়তে পারে। আমি একবার
মৃদঙ্গমের অস্থিকলস খুঁড়ে বের করতে চাই,’ প্রাণনাথ বলল। ‘কাকাবাবু ঘুমিয়ে পড়লে তবেই এ কাজ করা সম্ভব।’
‘দাদার অস্থিকলস! তার তো সমাধি দেওয়া হয়ে গেছে। কেন খুঁড়ে বের করতে চাও? কী আছে ওতে?’
‘মৃদঙ্গমকে কেন হত্যা করা হল সে প্রশ্নের উত্তর আমি মনে মনে খুঁজেই চলেছি। মৃদঙ্গম ভুবনকাকাকে বলে গেছিল যে প্রাণনাথকে বোলো মৃদঙ্গমকে বাইরে থেকে যেন বিচার না করে, মৃদঙ্গমের অন্তরটা যেন ও খুঁজে দেখে।’ ‘দাদা একথা বলে গেছিল?”
‘হ্যাঁ। সেজন্য –’
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, মন্দিরা ঠোঁট কামড়ে একদণ্ড ভাবল। ‘মৃদঙ্গমের অন্তর? আচ্ছা, এজন্যই দাদার খোলটা থেকে মিষ্টি আওয়াজ আসছে না, আর বাবা রোজ গজগজ করছে।’
“তার মানে?”
- ‘মৃদঙ্গম মানে খোল। মৃদঙ্গমের অন্তর মানে খোলের ভিতর দাদা কিছু ঢুকিয়ে আটকে রাখেনি তো?”
‘খোলটা মৃদঙ্গমের?”
“হ্যাঁ, এটা মায়ের খোল। গতবার দাদা নিয়ে গেছিল ওদের এক কীর্তন আসরের জন্য।’
এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হল প্রাণনাথের কাছে। ‘খোলটা কোথায়?” ‘ছিদাম নিয়ে গেছে ওর বাড়ি। আমি নিয়ে আসব?”
*এই রাতে যাবে?”
“পাশেই তো। আমাদের অভ্যাস আছে। আমি এক্ষুণি ফিরে আসব।’
দ্রুতপায়ে বেরোল বাইরে। কিছুক্ষণ পর মন্দিরা ফিরে এল, হাতে
মন্দিরা একটা খোল। মন্দিরা প্রাণনাথকে খোলটা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এটা তাড়াতাড়ি তোমার কাছে রেখে দাও। কাল সকালে আমি এসে আলাতলা খুলব।’ তারপর মন্দিরা বলল, ‘ভুবনকাকা এসেছে।’
‘ভুবনকাকা! হঠাৎ? আমাকে বলেছিল যে ছুটি স্যাংশন হচ্ছে না।’
*ভুবনকাকা খুব অসুস্থ। কলকাতায় নাকি দু‘বার অজ্ঞান হয়ে গেছিল। মাথায় নাকি খুব ব্যথা হয়। অন্যবার আমাকে দেখলে কত হেসে কথা বলে, এবার যেন চিনতেই পারল না। অন্যমনস্ক হয়ে বসে ছিল বিছানায়।
“তাই নাকি? এতো চিন্তার কথা - ‘
“নিজের হাতের রেখা দেখছিল আর বিড়বিড় করে কীসব বলছিল। আমি চলে আসার সময় বলল প্রাণনাথকে বোলো সামনে ওর খুব বিপদ। তারপর বলল, আমি যাব ওর সঙ্গে দেখা করতে কাল খুব সকালে। খুব গোপনে দেখা করতে হবে।’ মন্দিরা দরজার দিকে এগোল। ‘আমি এখন যাই।’ মন্দিরা প্রাণনাথের দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিল। প্রাণনাথ জানলার ফাঁক দিয়ে দেখল মন্দিরা দ্রুতপায়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।
প্রাণনাথ এবার খোলটা ঝাঁকালো। ভিতরে কিছু আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ঘরের ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আলো জ্বালানোও যাবে না। কীভাবে খোলের ভিতরটা দেখবে? সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
রাতে উত্তেজনায় প্রাণনাথের ঘুম এল না। খুব কৌতূহল হচ্ছিল। ইচ্ছা করছিল খোলটা ফাটিয়ে দেখতে ভিতরে কিছু আছে কিনা, কিন্তু উপায় নেই। কী এমন জানত মৃদঙ্গম যে ইংরেজরা তাকে ভীষণ বিপজ্জনক মনে করেছিল?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন