প্রীতম বসু
“সত্যি করে বল তো, তুই রোজ রোজ এখানে আসিস কেন?” ছিদাম বায়েন পদাবলীর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর খুঁজছে। *প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার খোঁজে। আপনি সত্যি সত্যি ওই ফটোর লোকটাকে চেনেন না?”
-বললাম তো চিনি না।’
পদাবলী কোনও কথা বলল না শুধু শান্তিনিকেতনী ঝোলা থেকে ঠাম্মার রূপোর নূপুর-জোড়া বের করে ছিদাম বায়েনকে দেখিয়ে বলল, দেখুন তো এটা চিনতে পারেন নাকি?”
নূপুরটা ছিদাম বায়েন চোখের সামনে নিয়ে ভালভাবে দেখল ছানি পড়া চোখ দিয়ে। তারপর বিড়বিড় করে বলল, বিভাবরী দাসী!” ‘সে কে?”
ছিদাম বায়েন নিরুত্তর। কী যেন ভাবছে লোকটা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ছিদাম বায়েনের দিক থেকে কোনও আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে পদাবলী এবার ওর অ্যালবাম থেকে আনা কয়েকটা পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে ঠাম্মার সঙ্গে পদাবলী এক ছবিতে, যাতে প্রমাণিত হয় এই মহিলাই পদাবলীর ঠাম্মা। ছিদাম বায়েন ছবিগুলো ফেরত দিল কিন্তু কথা বলল না। ও কিছু ভাবছে। পদাবলী এবার তুরুপের তাস বের করল। ঠাম্মার নোটবই। ছিদাম বায়েন নোটবইটা দেখে যেন এক মুহূর্ত শ্বাস নিতে ভুলে গেল। পাতার পর পাতা উল্টে সনাতন কীর্তনের পাতায় গিয়ে থামল ছিদাম বায়েন। সনাতন কীর্তনের ছেঁড়া পাতাটা দেখে বলল, ‘আমি ঠিক জানতাম। নীলমাধব ঠিক ব্যবস্থা করে দেবেন।’ তারপর পদাবলীর দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে বলল, ‘অনেক দিন অপেক্ষা করিয়ে তবে এলি বাছা।’
পদাবলীর মনে অনেক প্রশ্ন। ও শুধু শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল ‘ঠাম্মার নোটবইতে যে লোকটার ছবি ছিল সেই কি প্রাণনাথ কীৰ্তনীয়া?” ছিদাম বায়েন চুপ করে রইল।
‘কেন আপনি কথা বলছেন না? কেন আমার ঠাম্মাও ওই ফটো গোপন করে রেখেছিল?”
“আমি আর মন্দিরাদিদি প্রাণনাথদাদার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে তাঁর জীবদ্দশায় কেউ জানবে না তাঁর পরিচয়।’
‘আপনি কি সনাতন কীর্তনের কথা আর তার “বদসি যদি” অষ্টতালের কথা কারুকে কক্ষনো বলেছেন?’
‘না কক্ষনো না,’ মেঘমন্দ্রস্বরে বলল ছিদাম বায়েন। ‘আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
তবে নাইট্রোজেন কেন মিথ্যা কথা বলল যে ছিদাম বায়েন ওকে সনাতন কীর্তনের পদগুলো দিয়েছে? পদাবলী চিন্তাটা আপাততঃ সরিয়ে বলল, ‘আজ আপনার মন্দিরাদিদি নেই, আপনার প্রাণনাথদাদাও সম্ভবতঃ নেই। আপনি আমাকে প্লীজ বলুন প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কথা। আমার জানার অধিকার আছে। আমি কথা দিচ্ছি আপনি সম্মতি না দিলে আমি কারুকে বলব না প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার পরিচয়। আপনার যদি ভাল-মন্দ কিছু একটা হয়ে যায়, তবে কী হবে? প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার মহান কাহিনী চিরতরে চাপা পড়ে যাবে? অন্ততঃ আমি তো সেই মহান কীর্তনীয়ার কাহিনী লোকের সামনে নিয়ে আসতে পারব। আজ দেখুন কীর্তনের কী দশা হয়েছে! কেউ কীর্তন শুনতে চায় না। করতালতলীর কীর্তনের দল ভেঙে গেছে, আপনার চৈতন্যপুখুরী, ধুলডাঙা আজ না হয় কাল জমিদার কব্জা করে নেবে। সেখানে রিসর্ট বানিয়ে মদের ফোয়ারা ছুটবে। যদি প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কাহিনী আবার কীর্তনকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে সেটা কি আপনি চান না?”
ছিদাম বায়েন ম্লান হাসল। ‘ঠিক বলেছিস। আমি চলে গেলে প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কাহিনী চিরতরে হারিয়ে যাবে। আমার না আছে আর্থিক বল, না আছে শরীরে বল যে করতালতলীতে ধুলটমেলা করি।’
‘আমি কথা দিচ্ছি আপনার করতালতলীতে আবার ধুলট ফিরিয়ে আনব। আমাকে শুধু এইটুকু বলুন যে প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার সঙ্গে আমার ঠাম্মার কী সম্পর্ক ছিল?’
ছিদাম বায়েনের কোঁচকানো মুখের চামড়ায় হাসি ছড়িয়ে গেল। বৃদ্ধের শুষ্ক অধর স্পন্দিত হতে লাগল, ও যেন অনেক কিছু বলতে চাইছে। একসঙ্গে। ছিদাম বায়েনের কালো মণি ঘোলাটে পুরু ছানি কেটে যেন বেরিয়ে এসে অতীতকে আরেকবার দেখতে চাইল। কিন্তু শরীরে অত শক্তি নেই, স্মৃতিশক্তিও দুর্বল, তাই স্মৃতির অতল থেকে তুলে আনতে কষ্ট হচ্ছে। অতীতে চলেছে এক বৃদ্ধের মন – পঁয়ষট্টি বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু চোখ বন্ধ করলে মনে হয় এ যেন সেদিনের ঘটনা। বাবা ভুবন ডোম ইংরেজদের চাকরি পেয়ে হয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলের জমাদার, তারপর তো সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। বাবার মাথার রোগ দেখা দিল। নিজের মনে বিড়বিড় করত। বাবার থেকেই এসব কথা শুনেছিল ছিদাম
***
কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলের কম্পাউণ্ডে কাকডাকা ভোরে একজন স্বদেশী সন্ত্রাসবাদীকে ব্ল্যাক মারিয়া থেকে নামানো হচ্ছে। ঝাঁটা আর বালতি নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল ভুবন জমাদার এটা আজকাল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের হেনস্থা ভুলতে পারেনি ইংরেজ কর্তারা। শহর ছেড়ে পড়িমরি করে কোনও রকমে স্টিমারে উঠে কর্ণফুলিতে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে আতঙ্কে গোটা রাত কাটাতে হয়েছিল ইংরেজদের। তার প্রতিক্রিয়ায় সারা বাংলায় ধরপাকড় খুব বেড়ে গেছে। কয়েক মাস ধরে প্রায় রোজই ভোর রাতে পুলিশ অপারেশনে বিপ্লবীরা ধরা পড়ে, আর সাতসকালে পুলিশ ভ্যান লোহার গেটের ভিতর দিয়ে জেল কম্পাউণ্ডে ঢুকতেই বন্দেমাতরম ধ্বনিতে জেল মুখরিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আজ বন্দীর মুখ দেখেই চমকে উঠল ভুবন।
ছোটরাজাবাবু !
হাতকড়া পরা বন্দীকে পায়ে শিকল পরিয়ে ছয় ডিগ্রীর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বন্দীর ডান পায়ে এত জোরে আঘাত লেগেছে যে বন্দী ব্যাথায় পা ফেলতে পারছে না। পা টেনে টেনে এগিয়ে চলেছে। জেলের চানঘর সাফ করার ব্লিচিং পাউডার নিয়ে তাড়াতাড়ি সরে গেল ভুবন। সুবল সান্ত্রী পেচ্ছাপ করতে ভিতরে এল, ভুবন ওকে বলল – ‘আজকের ওই গোবেচারা মুখের বন্দীর আগে পিছে অত্ত পুলিশ কেন? স্পেশাল কেউ?’ -
‘দেখতে গোবেচারা, কিন্তু পাক্কা বদমাশ,’ সুবল বলল। ‘লালবাজারের পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট ড্যানিয়েল সাহেবের ভাইকে বোমা ছুঁড়ে মেরে ফেলেছে এই লোকটা।’
‘বল কী?” ভুবন অবাক। মনে মনে বলল, ছোটরাজাবাবু বোমা ছুঁড়ে মানুষ মেরেছে? অসম্ভব! পরম বৈষ্ণব পরিবারের ছেলে ছোটরাজাবাবু স্বদেশী করতে পারে, কিন্তু ইংরেজ মারার জন্য বোমা ছুঁড়বে? এটা কিছুতেই সম্ভব না।
“পার্ক স্ট্রীটের নিলামঘরে কাল নিলাম ছিল। ছেলেটার দল ওখানে বোমা ছুঁড়েছে। বেশ কয়েকজন ঘায়েল হয়েছে। পুলিশ সুপার ড্যানিয়েল সাহেবের ভাইয়ের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। প্রতিহিংসায় ড্যানিয়েল সাহেব পাগলা কুকুরের মত ফুঁসছে।’
“তাই নাকি?’ ভুবন ঝাঁট দিতে গিয়ে থমকে গেল। ‘কী হবে এর?’
‘ফাঁসি তো হবেই। তবে তার আগে থার্ড ডিগ্রি নিশ্চয়ই চালাবে। আমি বলে দিলাম এর কপালে ভীষণ দুঃখ আছে। এই ড্যানিয়েল সাহেব কি তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেবে না? ছয় ডিগ্রীতে ঢোকাল ছেলেটাকে।’
শিউরে উঠল ভুবন জমাদার। মাথা থেকে ঘাড় হয়ে ব্যাথাটা আবার শিরদাঁড়া দিয়ে নিচে নামছে। আজকাল কী যে হয়েছে ভুবনের! রাতে ঘুম হয় না, অল্প কিছুক্ষণ ঘুমোলেও ভোরের আগেই ঘুম ভেঙে যায়, আর মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এক অপরাধবোধ। জমাদারের কাজ, খুব সকালে কাজে আসতেই হয়, কিন্তু একদম মন চায় না। মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে চলে যায় বুড়িকোশীর পাড়ে, করতালতলীতে। এখানে কেন যে মরতে এল ভুবন? কাজে মন বসে না, খিদে পায় না, কেবল মন চায় বিছানায় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতে।
পরদিন সকালে ছয় ডিগ্রীর সেল সাফাই করতে গেল ভুবন জমাদার। দশ ফিট বাই আট ফিটের এই নির্জন কুঠুরিগুলিতে একজনের বেশি বন্দী রাখা হয় না, যাতে কেউ কারোর সঙ্গে কথা না বলতে পারে।
গুর্খা সিপাই এক একটা কুঠুরির কাঠের দরজার গোল ছিদ্রে উঁকি দিয়ে দিয়ে দেখে, তারপর কুঠুরির তালা জোরে জোরে নাড়িয়ে কুঠুরি খোলে, আর ভুবন জমাদার ভিতরে ঝাড়ু আর বালতি নিয়ে ঢুকে বাঁশের ঝুড়িতে রাখা শৌচগামলা পরিষ্কার করে। ভিতরে জলাভাবে এত পেচ্ছাপের দুর্গন্ধ যে সে মেথর হওয়া সত্ত্বেও তারই বমি চলে আসে। কীভাবে এরা এত সহ্য করতে পারে কে জানে? কয়েকটা কুঠুরি সাফ করার পর একটাতে ছোটরাজাবাবুকে দেখল ভুবন। উস্কোখুস্কো চুল, রাতজাগা চোখে অনেক ঝড়ঝাপটার চিহ্ন। ছোটরাজাবাবু ভুবনকে দেখে গুর্খা সিপাইয়ের সামনে না চেনার ভান করল।
ব্যাস, সারাদিনে এই একবারই ছয় ডিগ্রীতে ঢোকার অনুমতি। পরদিন ভুবন ঠিক করে রেখেছিল ছোটরাজাবাবুর সঙ্গে একবার অন্ততঃ লুকিয়ে কথা বলবে। কিন্তু পরদিন ঝাঁটা হাতে সেলের ভিতরে ঢুকে ছোটরাজাবাবুর দিকে তাকিয়েই চমকে উঠেছিল ভুবন। দু‘চোখ লাল, হাতের আঙুলগুলোতে ব্যাণ্ডেজগুলো রক্ত চুষে ফুলে ওঠা লাল জোঁকের মত ফুলে ফুলে রয়েছে।
‘জলদি কিজিয়ে,’ সাহেবদের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে গুর্খা সিপাইয়েরও নাসিকা সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সে গন্ধে টিঁকতে না পেরে বেরিয়ে গেল।
‘ছোটরাজাবাবু!” ভুবন আর্তনাদ গলায় চাপল। ছোটরাজাবাবু ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, ‘বড্ড ঘুম পাচ্ছে, সারা রাত ঘুমাতে দেয় নি।’
ভুবন ভালই জানে প্রেসিডেন্সি জেলের এই ছয় ডিগ্রীর ইতিকথা। এখানে কথা বের করার জন্য বন্দিদের সারারাত জাগিয়ে রাখা হয়, পাশে থাকে রুল হাতে পুলিশ। তার দায়িত্ব বন্দি যেন দু‘চোখের পাতা এক না করতে পারে। কোনও কোনও সেপাই এটা সহ্য করতে না পেরে একটু দয়াপরবশ হলে তৎক্ষণাৎ তার চাকরি গেছে। তারপর রাতে সাহেব এবং বাঙালি অফিসাররা মদ খেয়ে নেশায় চুর হয়ে এসে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে করতে এদের ওপর নৃশংস অত্যাচার করে। পুরুষাঙ্গ রুল দিয়ে থেঁতলে দেয়, মলদ্বারে রুল ঢোকাবার জন্য চেপে ধরে, শৌচগামলার মল-মুত্র মাথায় ঢেলে দিনের পর দিন জল গায়ে ঢালতে দেয় না, স্বদেশী ছেলেগুলোর কারও কারও গা জ্বরে পুড়ে যায় তবু রেহাই নেই। অত্যাচার সামলাতে না পেরে কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ভুবন নিজের চোখে দেখেছে প্রেসিডেন্সি জেলের এই ধর্ষকাম অত্যাচার। শুনেছে যে শনি, বহরমপুর, ফরিদপুর, রাজসাহী জেলে বন্দীদের জীবন আরও দুর্বিষহ। তারা আরও অকথ্য অত্যাচারের শিকার। ছোটরাজাবাবুর নখগুলো সম্ভবতঃ কাল রাতে উপড়ে নিয়েছে। কী অপূর্ব মৃদঙ্গ বাজাতো ছোটরাজাবাবু! ঠিক ওর বাবার মত মিষ্টি হাত। আঙ্গুলগুলো ভক্তির নেশায় মৃদঙ্গের বাঁয়ার আলাতলা আর ডাইনার চুনাতলা চাপড়ে এত জোরালো ‘ঝা’ তুলত যে মন্দিরে নীলমাধবের মূর্তিতে যেন প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়ে যেত। সেই আঙ্গুলগুলো কখনো মানুষ মারার জন্য বোমা মারতে পারে? কিছুতেই তা মানতে পারে না ভুবন জমাদার।
ভুবন মাথা নিচু করে ঘর ঝাঁট দিতে লাগল। কুঠুরি পরিষ্কার হতে সময় লাগছিল। রাইফেল ঘাড়ে হাইল্যাণ্ডার সৈন্য উঁকি দিল, আর কথা হয় নি। তারপর যে কী কী সব হয়ে গেল সে সব ভেবে বহুদিন ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে উঠত ভুবন জমাদার।
ছিদামের নিজের বিশ্বাস যে প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার করতালতলীতে পা রাখা কোনও মামুলি ব্যাপার না, ঈশ্বরের নির্দেশ ছিল এর পেছনে। স্বয়ং চৈতন্যদেব প্রাণনাথ হয়ে ধরাধামে এসেছিলেন শুধু কীর্তনকে বাঁচাতে। সাড়ে চারশ’ বছর আগে কীর্তনের তিরোধান আটকাতে নবদ্বীপে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। তিনি কীর্তনের পুনর্জীবন ও যৌবন দান করে কীর্তনকে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। শ্রীচৈতন্য নাকি বলতেন ঘরে ঘরে প্রবর্তাইমু নাম সংকীর্তন। আবার যখন কীর্তনকে ক্ষয়রোগে ছেঁকে ধরল তখন এখানে প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার আবির্ভাব হল। কিন্তু ভুবন জমাদার বলেছিল প্রাণনাথ কীর্তনীয়া শ্রীচৈতন্যদেবের অবতার-টবতার নয়, ওর পরিচয় ইংরেজ পুলিশের খাতায় লেখা কুখ্যাত স্বদেশী টেররিস্ট। কিন্তু ছিদাম ভাবতো ঈশ্বরের নির্দেশ অবশ্যই ছিল। মৃদঙ্গমদাদার জন্য ও করতালতলীতে এসেছিল সেটা যতটা সত্যি, ঠিক ততটাই সত্যি যে বিধাতার এক বড় ছক আঁকা ছিল এর পিছনে। ঘটনাটা যদি মামুলিই হবে তবে কীর্তনকে কেন ও জড়িয়ে ধরল? আসলে প্রাণনাথ নিজেকে চিনত না, জানত না তার রক্ত মৃদঙ্গের তালে তালে ঢেউ তোলে। আনন্দময় কৃষ্ণ পরমানন্দে মোহনবাঁশি বাজিয়েই চলেছেন, সেই আনন্দের আহ্বান সকলে শুনতে পায় না। কৃষ্ণের বাঁশিই ঠিক খুঁজে নেয় যোগ্য ভক্তকে। মুরলী-গান পঞ্চম তান কুলবতী চিত চোরণী - ব্রজধামে এত গোপিনী থাকা সত্ত্বে মোহনমুরলী শুধু রাধাকেই ডাকে। ছিদামকে গোঁসাইজ্যাঠা চণ্ডীদাসের পদাবলী শিখিয়েছিল –
ব্রজে কত নারী আছে, তারা কেহ না পড়িল বাঁধা।
নিরমল কুলখানি যতনে রেখেছি আমি
বাঁশী কেন বলে রাধা রাধা।
যতই নিজেকে সরিয়ে রাখ, বাঁশি ঠিক খুঁজে বের করবে তোমায়। সেই আহ্বান কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিবে গো। যেমন নাকি বাঁশিই খুঁজে বের করেছিল প্রাণনাথদাদাকে। আর তাই তো সে সব কিছু ছেড়েছুড়ে নাস্তিক প্রাণনাথ বিপ্লবী একদিন প্রাণনাথ কীর্তনীয়া হয়ে গেল।
ছোটরাজাবাবুর কথা ছিদাম বায়েনকে বলতে বলতে শিউরে উঠেছিল ভুবন জমাদার। ছিদামের এখনো মনে আছে সেই অত্যাচারের বর্ণনা
‘এবার ছোটরাজাবাবুর ওপর অত্যাচার শুরু হল,’ ভুবন জমাদার বলতে বলতে দু‘হাতের তালু দিয়ে কিছুক্ষণ মাথা শক্ত করে চেপে বসেছিল। আজকাল ওর মাথায় খুব কষ্ট হয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে পিরানের নিম্নাংশ তুলে মুখ মুছে বলেছিল - ‘প্রথম প্রথম ভাদ্র মাসের প্রচণ্ড গরমে স্নান করা তো দূরে থাক, মুখ ধোওয়ার জল পর্যন্ত দিত না। সারা রাত একের পর এক লালবাজার থেকে সি আই ডি অফিসাররা এসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যেত, একজনের ঘুম পেয়ে গেলে শিফটে অন্য সি আই ডি অফিসার এসে প্রশ্ন করত এভাবে সারা রাত দু‘চোখের পাতা এক করতে দিত না। তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে গেলেও, এক বিন্দু জল দিত না।’ শৌচের গামলাটা পরিষ্কার করতে গিয়ে পুলিশের কড়া নির্দেশ সত্ত্বেও গোপনে ভুবন ছোটরাজাবাবুর মগে আধমগ জল ভরে রেখে এসেছিল, সেই জল ছোটরাজাবাবু খেয়ে তেষ্টা মেটাচ্ছে এমন সময় তা দেখে ফেলল ওয়ার্ডার। শৌচের গামলাটা না পরিষ্কার করার নির্দেশ এল সার্জেন্ট ওয়ার্ডারের কাছ থেকে। গরমের মধ্যে কী বিটকেল গন্ধ! ‘ভিতরে কথা বলার বিশেষ সুযোগ ছিল না, তবে পরের দিন দেখলাম ছোটরাজাবাবুর দু‘পায়েই ব্যাণ্ডেজ, দাঁড়াতে পারছে না।’ ভুবনের আজকাল সব কিছু হঠাৎ এলোমেলো হয়ে যায়, রাতের পর রাত ঘুম হয় না, বাইরের দালানে বসে বসে আকাশের তারা দেখতে দেখতে অতীত-বর্তমান গুলিয়ে যায়। রাতজাগা পেঁচার আওয়াজে কিংবা জেলখানার লাগোয়া বটের ঘনসন্নিবিষ্ট ঝুরির আঁধার থেকে ভগ্ননিদ্র কাকের ডানা ঝাপটে বিরক্তি প্রকাশের আওয়াজে সম্বিত ফিরে আসে। পরের দিন সকালে আবার কোনও নতুন অত্যাচারের দৃশ্য দেখতে হয় জেলখানায়। ভুবন ভাবল এভাবে চললে সে সত্যি উন্মাদ হয়ে যাবে। ভুবন ছুটির আবেদন করল। কিন্তু আবেদন না-মঞ্জুর হল। ঊর্ধ্বতন অফিসারকে মিথ্যা বলল ভুবন, গ্রামে যেতে হবে। ঝড়ে ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে গেছে, শনের চাল ছাইতে হবে। কিন্তু তাতে লাভ হল না। ভুবনের দরখাস্ত সাহেবের ময়লা কাগজের ঝুড়িতে স্থান পেল।
ভুবন জমাদার ভেবেছিল কয়েকদিনের মধ্যেই ছোটরাজাবাবুকে বাঁকশাল স্ট্রীট কোর্টে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে বিচারের জন্য হাজির করা হবে। কিন্তু তা হোল না। রোজ রাতে ছোটরাজাবাবুর ওপর অত্যাচার চলতে লাগল। পরদিন ছয় ডিগ্রীর সেল পরিষ্কার করার সময় ছোটরাজাবাবুকে দেখে ভুবন চমকে উঠল। বৈষ্ণবদের কণ্ঠিমালার মত গলায় মালা এঁকে দিয়েছিল ড্যানিয়েল সাহেবের দলবল সিগারের ছ্যাঁকা দিয়ে দিয়ে।
“আমি জানি তুমি বোমা ছুঁড়তে পারো না। তুমি কি সত্যি বোমা ছুঁড়েছিলে ছোটরাজাবাবু?”
“না,’ ছোটরাজাবাবু মলিন হেসে বলেছিল। ‘সেটা এরাও ভালভাবেই জানে কে বোমাটা ছুঁড়েছে। আসলে আমি এদের কাছে বিপজ্জনক মানুষ। আমার বিচার হলে গোটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এতবড় একটা দুর্নীতি ফাঁস হয়ে যাবে। নড়বড়ে হয়ে উঠবে ওদের গরিমার ঐতিহ্য।’
দজ্জাল জেলার পার্কার সাহেব চলে আসাতে আর কথা হয় নি। এবার একটা আরও ছোট সেলে ছোটরাজাবাবুকে রাখা হল, তিনদিকে দেওয়াল, অন্যদিকে লোহার গরাদ, চিড়িয়াখানার শিয়ালের খাঁচাও এর চেয়ে বড় হয়। খাঁচার বাইরে পুলিশ তো থাকতই জেলের সুপারিন্টেডেন্টও ওখানে অনেকটা সময় থাকত। ছোটরাজাবাবুর সঙ্গে গোপনে দেখা করার কোনও উপায় ছিল না। ঘরের কোনে মাটি ঢাকা একটা বাঁশের চুবড়ীতে পায়খানা করতে হত, সেটা পরিষ্কার করার জন্য যেটুকু সময় থাকা। সাহেবরা তখন পায়খানার গন্ধে ঘেন্নায় উঠে চলে যেত, সেটুকুই যা সুযোগ।
ভুবন জমাদার ভেবে পাচ্ছিল না ছোটরাজাবাবু বোমা ছোঁড়েনি, ইংরেজ মারেনি, এমন কী অপরাধের সঙ্গে সে যুক্ত যে ওর ওপর এত অমানুষিক অত্যাচার হচ্ছে? তারপর সুবল সান্ত্রী ভুবন জমাদারকে একটা অদ্ভুত খবর দিল ছোটরাজাবাবুর নাম নাকি জেলের রেজিস্টারে নেই। তার মানে ওকে আইনতঃ এই জেলে আনাই হয় নি। তার মানে? শিউরে উঠেছিল ভুবন জমাদার। পনের বছর হয়ে গেল জেলের কাণ্ড কারখানা সে দেখেছে। মানেটা বুঝতে ওর এতটুকু দেরি হল না। শুধু ও ভেবে পাচ্ছিল না ছোটরাজাবাবু কী অন্যায় কাজ করেছে? বোমা মেরে সাহেব মারলে বিচার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়াই ইংরেজদের নিয়ম, কিন্তু এতো তার চেয়েও মারাত্মক কিছু মনে হচ্ছে! পরদিন সকালে পায়খানার চুবড়ি নিয়ে বেরোবার সময় ছোটরাজাবাবু
ফিসফিস করে বলেছিল, ‘একটা উপকার করতে পারবে ভুবনকাকা?”
ভুবনের বাপ-ঠাকুর্দা আর ভুবন নিজেও শ্মশানের ডোম ছিল, ছোটরাজাবাবুর বাবা জমিদারগোঁসাই ছিল জমিদার। অথচ সেই মানুষটা ভুবনকে পাশে বসিয়ে একসঙ্গে কীর্তন গাইত, ধুলটে আলিঙ্গন করত, নগর সংকীর্তনে ভুবনের হাতে ধরে রাখা ধামা থেকে বাতাসা তুলে তুলে হাওয়ায় ছুঁড়ে দিত। ছিদামকে নিজের বাড়ির দাওয়ায় মাদুর পেতে ছোটরাজাবাবুর পাশে বসিয়ে লেখাপড়া শিখিয়েছে জমিদারগোঁসাই। এদের পরিবারের জন্য ভুবন যে কোনও কাজ করতে পারে।
‘ছোটরাজাবাবু, তুমি বল কী করতে হবে?”
‘আমাকে মনে হচ্ছে এরা কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যাবে না, এখানেই মেরে ফেলবে।’
ভুবন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে এটাই সত্যি। ছোটরাজাবাবুর চোখের দিকে মাথা সোজা করে তাকাবার মত শক্তি তার ঘাড়ে নেই। নিজের ঘাড়ই যেন ফাঁসিতে ঝুলে গেছে।
‘এরা কারুকে জানতে দেবে না যে আমাকে হত্যা করেছে এরা। যদি আমার দেহ এখানে জ্বালিয়ে দেয়, তুমি আমার চিতার ছাই একটা মাটির কলসীতে নিয়ে রাখতে পারবে?”
ভুবন জমাদার জানে সে বড় কঠিন ব্যাপার। ক’দিন আগে একজন বড়সড় বিপ্লবীর ফাঁসি হল, কিন্তু তার ফাঁসির পর তার দেহ সৎকার করার জন্যে এমন বিপুল সমারোহ বেরিয়েছিল যে গোটা কলকাতায় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। কালীঘাট শ্মশানে এমন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল যে পুলিশ এক সময় হস্তক্ষেপ করল। কিন্তু কিছু মানুষ পুলিশকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ল, পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ল। তাই ইংরেজ হুকুম দিল এবার থেকে ফাঁসির সময় শুধু ইউরোপীয়ান ওয়ার্ডাররা থাকবে, আর মৃতদেহের সৎকার জেলের ভিতরেই হবে।
আমার বন্ধু প্রাণনাথকে তুমি ধুলটের সময় দেখেছ। ওর কাছে আমার চিতার ছাই পৌঁছে দিয়ে বোলো সুযোগ বুঝে যেন ও আমার চিতাস্থি বাবার কাছে পৌঁছে দেয়। আমাদের উঠোনের কোনে আমার মায়ের সমাধির পাশে তুলসী পাতা ঢেকে বাবা আমার চিতাস্থির সমাধি দেবে।”
‘ ভুবন জানে জাতবোষ্টমরা অবৈদিক। বৈদিক হিন্দুদের যাগযজ্ঞ, বিয়ে, শ্ৰাদ্ধ সবই অগ্নির উপস্থিতিতে হয়, কিন্তু জাতবোষ্টমদের কোনও অনুষ্ঠানে অগ্নির ব্যবহার নেই। কোনও হোমযজ্ঞ হয় না। তাই জাতবোষ্টমদের মৃতদেহ কোনও মতেই আগুনে পোড়ানো হয় না। সমাধি দেওয়া হয় কিংবা জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
আমি কথা দিলাম ছোটরাজাবাবু,’ ভুবন অশ্রুসংবরণ করল। ‘কিন্তু প্ৰাণনাথ দাদাবাবু কেন? আমিই দিয়ে দেব জমিদারগোঁসাইকে তোমার ‘ ভুবন কথা শেষ করতে পারেনি, ওর বাক রুদ্ধ হয়ে গেছিল।
“না, প্রাণনাথকেই যেতে হবে।’
“কোথায় পাব প্রাণনাথ দাদাবাবুকে?”
‘চন্দননগরে দুপ্লে কলেজের কাছে বলরাম গোঁসাই এর আখড়ায় প্রতিমা নামে একজন বোষ্টমি থাকে। তাকে গোপনে গিয়ে আমার সব কথা জানিও। প্রাণনাথ তাকে চেনে না। কিন্তু সে প্রাণনাথের গোপন আস্তানা জানে। তোমাকে জানিয়ে দেবে প্রাণনাথকে কোথায় পাওয়া যাবে। আর বাবাকে বোলো এবারে ধুলট আমি করতে পারলাম না।’
‘ধুলট এবছর মনে হয় না হবে। বড়লাটের হুকুম আছে জনসমাবেশ হলেই গ্রেফতার করা।’
‘জানি,’ ছোটরাজাবাবু বলল। ‘ইংরেজ ভাবে কীর্তন বন্ধ করে দিলে আমাদের বাংলার ভক্তি আন্দোলনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে যাবে। কীর্তন বন্ধ করা এত সোজা? দেখবে প্রাণনাথ কিছুতেই ধুলট বন্ধ হতে দেবে না।’
‘কিন্তু প্রাণনাথবাবুকে কেন যেতে হবে?”
‘প্রাণনাথের একটা আমানত আমার কাছে গোপনে রাখা আছে। ওটা আমি ওকে ফিরিয়ে দিতে চাই।’ ‘কী আমানত?”
“সেটা ও খুঁজে নেবে, ছোটরাজাবাবু মলিন হাসল। ‘প্রাণনাথকে বোলো ওর কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ও যেন আমাকে ক্ষমা করে দেয়।’
“ক্ষমা? কীসের জন্য?’
র‘এর উত্তর প্রাণনাথ করতালতলী গেলে পাবে। প্রাণনাথকে বোলো আমাকে যেন বাইরে থেকে বিচার না করে, ও যেন আমার অন্তরটা খুঁজে দেখে।’ ভুবন ডোম পায়ের শব্দ শুনতে পেল। ভারী জুতোর আওয়াজ। ওয়ার্ডার
আসছে। * ছোটরাজাবাবুর রহস্যের অর্থ বুঝতে পারে নি ভুবন জমাদার। পরদিন সকালে জেলে ঢুকে খবরটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল ভুবন। ছোটরাজাবাবু নাকি কাল রাতে আত্মহত্যা করেছে। লৌহকপাটের আড়ার সঙ্গে নিজের বস্ত্র বেঁধে ঝুলে পড়েছিল। কিন্তু জেলের সিপাই-সান্ত্রীদের ফিসফিসানিতে থাকে আসল খবর। ভুবন জমাদার জানল যে রাতে ভারী বুট পরে জোড়া পায়ে নাকি ড্যানিয়েল সাহেব ছোটরাজাবাবুর বুকের ওপর লাফ দিয়ে বুকে পা ডলে ওঁর বুকের পাঁজর ভেঙে দিয়েছিল। হৃদপিণ্ড-ফুসফুসে এত জোর আঘাত লাগে যে তাতে ছোটরাজাবাবুর মৃত্যু হয়। ড্যানিয়েল সাহেব তার রাগ মিটিয়ে নিয়েছিল। জেলার আদেশ দিল জেলের মধ্যে অত্যন্ত গোপন ভাবে দাহ করতে হবে, আর কোনও স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে যাওয়া চলবে না। ভুবনের দু‘চোখ ঝাপসা। কিন্তু এদের শ্যেনদৃষ্টির সামনে চোখ মুছবারও উপায় ছিল না। চিতার আগুন নেভার আগে ক্লান্ত ড্যানিয়েল সাহেব বাড়ি চলে গেল। সিআইডিদের ডিউটিও সন্ধ্যা পর্যন্ত, ওরাও এক এক করে চলে গেল, কিন্তু ইউরোপীয় সুপারিন্টেন্ডেন্ট ঠায় চেয়ারে বসে বসে সব দেখতে লাগল। জল-ঝাঁটা দিয়ে জায়গাটা ধোওয়ার আগে ভুবন বেশ কিছুটা ছাই ঝাঁটায় মাখিয়ে নিল। তারপর ঝাঁটাটা যেন খারাপ এমন ভাবে অভিনয় করে চাতালের কোনে বিরক্তমুখে ছুঁড়ে অন্য একটা ঝাঁটা নিয়ে এল। অন্য ঝাঁটা দিয়ে চিতার শান ধুয়ে তারপর মেথরের কামরায় গিয়ে ঝাঁটার কাঠির ভিতরে আটকে থাকা ছোটরাজাবাবুর ছাই ঝেড়ে ঝেড়ে যতটুকু পেল একটা কাগজে মুড়ে নিজের উর্দির পকেটে ভরে কোয়ার্টারে যখন ফিরে এল ভুবন জমাদার, তখন সে বিধ্বস্ত। ওর মনে এক প্রবল ভূকম্পন হয়ে গেছে। ভুবন টলছে। শারীরিক ধকল সে সহ্য করে নেয়, কিন্তু এই মানসিক ধকল অসহনীয়। এই ছোটরাজাবাবুকে সে নিজের হাতে বুড়িকোশীতে সাঁতার শিখিয়েছে, কাঁধে করে নিয়ে গেছে গাজন, রথের মেলায়। ছোটরাজাবাবু যখন উদয়নপল্লীতে প্রাইমারি ইস্কুলে যেত ভুবন ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত, নিয়ে আসত। চন্দননগরে কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় ভুবন আর ছিদাম গেছিল সঙ্গে, ছোটরাজাবাবুর ট্রাঙ্ক, হোল্ডল মাথায় নিয়ে। আর আজ সেই মানুষটার দেহাস্থি বহন করে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে তাকে।
ভুবন ঠিক করল কাল খুব সকালের গাড়িতে রওনা দেবে, গোছগাছ করছিল, এমন সময় সুবল সান্ত্রী একটা গোপন খবর নিয়ে এল। ইংরেজ পুলিশ জেনেছে যে প্রাণনাথ বোস নামের এক বিপ্লবী এই বোমাকাণ্ডের নেতা। সে নাকি কাল চন্দননগর থেকে মাদ্রাজ রওনা হবে। পুলিশ তৈরি, হাওড়া স্টেশনে প্রাণনাথকে দেখামাত্রই গুলি করা হবে।
ভুবন জানে কোথায় প্রাণনাথকে পাওয়া যেতে পারে। প্রাণনাথকে আটকাতে হলে এক্ষুনি বেরোতে হবে। কিন্তু তখন কি আর ভুবন জানতো যে প্রাণনাথ অন্তিমে লাগিবে গিয়া ত্রিদিবের ঘাটে আর প্রাণনাথের সঙ্গে গোটা করতালতলীর কীর্তন এমনভাবে জড়িয়ে যাবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন