প্রীতম বসু
“ডোম! তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে গোবিন্দ?” অঞ্জন বৈরাগী ব্রাহ্মণ সন্তান, সে প্রকাশ্যেই বিদ্রোহ করল। না না ওসব ডোম-মেথর যদি আমাদের কীর্তনের দলে ঢোকে তবে আমি কীর্তনের দলে থাকব না।”
করতালতলী কীর্তন কোম্পানিতে সদস্য কমতে কমতে এখন তিন জনে এসে ঠেকেছে। প্রৌঢ় গোবিন্দ অধিকারী, আর দুই বৃদ্ধ - কোলগায়েন গোপাল ঠাকুর, আর কোলবায়েন অঞ্জন বৈরাগী। তাদের দু‘জন প্রকাশ্যে বিক্ষোভ শুরু করল।
পদাবলী সকাল বেলা নীলমাধবের মন্দিরের চাতালে এসে দেখল ভজন ডোম এখনো এসে পৌঁছায় নি। কিন্তু বাতাবরণ উত্তপ্ত। গোবিন্দ অধিকারীর মুখে নতুন সদস্যের হুলিয়া শুনে বাকি দু‘জন সদস্য যারপরনাই ক্ষিপ্ত।
“চণ্ডালো‘পি দ্বিজোশ্রেষ্ঠো হরিভক্তিপরায়ণঃ, গোবিন্দ অধিকারী বোঝাল। “কীর্তনের জগতে কোনও জাতপাত নেই, বৈরাগী ঠাকুর। হরিদাস ঠাকুর যবনের ঘরে পালিত ছিলেন। আপনিই তো চণ্ডীদাসের পদাবলী গাইতেন কহে চণ্ডীদাস কানুর পীরিতি -
জাতি-কুল-শীল ছাড়া
“দেখ বাপু, আমার মন অত বড় নয়,’ বৈরাগী রেগে কাঁই। ‘কই, অদ্বৈত ঠাকুর, নিত্যানন্দ ঠাকুর তো কখনো ব্রাহ্মণ সমাজের বাইরে বিবাহের সম্পর্ক স্থাপন করেন নি। মহাপ্রভুর কথা আলাদা। এখন সমাজ অনেক বদলে গেছে। আমাকে সমাজে থাকতে হবে।’
“আরে বাবা, তুমি তো মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ না, একসঙ্গে কীৰ্তন গাইছ। নবশাখ, জল-অব্যবহার্য বা অন্ত্যজ জাতের কত কীর্তনীয়া বাঙলার কীর্তন জগৎকে আলোকিত করে গেছেন।’ তারপর গোবিন্দ অধিকারী বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনী দিয়ে কানের লতি স্পর্শ করে বলল, ‘বিখ্যাত কীর্তনীয়া মুর্শিদাবাদের পাঁচথুপির কৃষ্ণদয়াল চন্দ ছিলেন সুবর্ণবণিক, বীরভূমের দুই বিখ্যাত কীৰ্তনীয়া কোঙারপুরের হারাধন সূত্রধর আর অখিল দাস ছিলেন ছুতোর, বীরভূমেরই বিখ্যাত বাদক কোপা হরিদাসও ছিলেন ছুতোর, মুর্শিদাবাদের ফটিক চৌধুরী ছিলেন মাহিষ্য, কাঁদীর দামোদর কুণ্ডু তিলি, প্রসিদ্ধ বাদক গোষ্ঠ দাস মুচি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় কীর্তনীয়া ছিলেন কুষ্ঠিয়ার শিবনাথ সাহা, তিনি ছিলেন জাতিতে শুঁড়ি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ সব জানি, বৈরাগী হাত তুলে উদাহরণের বন্যাকে থামিয়ে দিল।
“ডোম যখন, তখন মাছ - মাংস - মদ নিশ্চয়ই খায়?”
গোবিন্দ অধিকারী ধীরে ধীরে মাথা নাড়াল ‘হ্যাঁ।’
“তাহলে? কীর্তনীয়া হল সাধক। তারা মাছ, মাংস, মদ খাবে?
“অবধূত তান্ত্রিকরাও তো সাধক, বৈরাগী মশাই। তারাও তো মাছ, মাংস, মদ খায়, গোবিন্দ অধিকারী বোঝাবার চেষ্টা করলেন। মাছ, মাংস, মদ তন্ত্রসাধনের উপাচার।’
‘থামো থামো,” বুড়ো অঞ্জন বৈরাগী বলল। ‘তাহলে বাকি দুটো ম’কার বাদ যায় কেন? ওগুলোকেও ঢোকাও!”
গোবিন্দ অধিকারী ঢোক গিলল। বেশ্যাবাড়ির কথা শুনলে কীর্তন কোম্পানি এক্ষুনি ভেঙে যাবে। সে পালটা প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি জানেন আমাদের নিত্যানন্দপ্রভু অবধূত ছিলেন? মাছ, মাংস, মদ খেতেন, ভাল ভাল কাপড়চোপড়, সোনার গয়না পরতেন, কর্পূর দিয়ে পান খেতেন।’
‘জানি। এজন্য নিত্যানন্দপ্রভুকে নিয়ে বৈষ্ণব সমাজে কম গোল বেধেছিল! অদ্বৈত আচার্য নিত্যানন্দকে মাতাল, আমিশাষী বলে নিন্দা করতেন। তবে নিত্যানন্দ প্রভুর কথা আলাদা। উনি কেবলমাত্র চৈতন্যমহাপ্রভুর নির্দেশে সম্প্রদায় রক্ষার নিমিত্তে সন্ন্যাসী হয়েও আবার দারপরিগ্রহ করে সংসারে ফিরে গেছেন। যে মানুষ বিরজা হোম করে নিজের পিণ্ড দিয়ে সন্ন্যাসী হন, সে তো সমাজের কাছে মৃত। তার পুনরায় গৃহী হওয়া মানে, কুকুরের মত নিজের বমি ভক্ষণ করা। আর এজন্য লোকে প্রভু নিত্যানন্দকে আড়ালে বান্তাশী বলে ডাকত। তবুও মহাপ্রভুর জন্য তিনি এত বড় অপবাদ শিরে ধারণ করেছিলেন। তাই বলছি নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে কারোর তুলনাই হয় না।’
‘ঠিক মাছ-মাংস খাওয়া সত্ত্বেও শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভুর প্রধান পার্শ্বচর ছিলেন উনি। কারণ শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু জানতেন যে সর্বসাধারণের মধ্যে প্রেমভক্তির প্রচারের জন্য নিত্যানন্দই যোগ্যতম পাত্র। নীলাচলে থেকে শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু এত সত্ত্বেও এই নিত্যানন্দকেই বাংলায় কীর্তন প্রসারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আজ এই নিত্যানন্দের পুজোই আমরা করি গৌর-নিতাইয়ের জয়ধ্বনি একসঙ্গে দেওয়া হয়। শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু হলেন শ্রীকৃষ্ণের অবতার আর নিত্যানন্দকে বলি বলরামের অবতার,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘ছেলেটার গলা মিষ্টি। ওকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নেবেন, তাহলেই –’ -
*আমি? আমি ব্রাহ্মণ-সন্তান হয়ে ডোমকে শেখাব?’ অঞ্জন বৈরাগী বিরক্ত। ‘আমাদের কীর্তন গানের শিক্ষার জগতে জাতিভেদের কোনও বাধা তো ছিল না, বৈরাগী মশাই। স্বনামধন্য কীর্তনীয়া কেশব চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ বংশের সন্তান হয়েও কীর্তন শেখেন গোবিন্দ বাইতির কাছে, যিনি জাতে মুচি। বিখ্যাত কীৰ্তনীয়া অদ্বৈতদাস বাবাজী কায়স্থ ছিলেন, কিন্তু তাঁর গুরু ছিলেন সুবর্ণবণিক কৃষ্ণদয়াল চন্দ্র আর তিলি জাতির দামোদর কুণ্ডু। অবধূত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাজনা শিখিয়েছিলেন মুচি জাতির জটে গোবিন্দ। এরকম কত উদাহরণ আছে। কীর্তন আমাদের বাঙলার মানুষকে জাতি-ধর্মের সংকীর্ণতা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছিল। বাঙালি হিন্দু সমাজে নবশাখ, অজলচল, অন্ত্যজরা হল এইটটি ফাইভ পার্সেন্ট। হাড়ি, মুচি, মল্ল, সাঁওতাল, বাগদী, বাউরি, ডোম, এসবই তো অধিক ছিল আমাদের বাংলায়। ছোটবেলার ছড়া মনে নেই - আগে ডোম বাগে ডোম, ঘোড়ায় ডোম সাজে? এই বাংলায় আজ পর্যন্ত যত পুঁথি আবিষ্কার হয়েছে তার অধিকাংশই হল বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ আর সেসব পুঁথিগুলো পাওয়াও গেছে সাধারণতঃ সমাজের এই নিম্নবর্গের মানুষদের বাড়ি থেকে।’ -
- উঠে দাঁড়াল বৈরাগী ঠাকুর – ‘অধিকারী, আমায় মাফ করো, আমি ডোমের পাশে বসে কীর্তন গাইতে পারব না। আমার উপর থেকে ডাক আসার সময় হয়ে এল। বাকি ক’টাদিন না হয় বাড়িতে একা একাই কৃষ্ণ নামকীর্তন করব।’ বৈরাগী চলে গেল।
‘আমিও আসি, এবার গোপাল ঠাকুরও উঠে দাঁড়াল। ছিদাম গোঁসাইকে আমার পেন্নাম জানিও। আর তুমিও একটু ভেবে দেখ, জাত বড় না কীর্তন বড়।’ গোপাল ঠাকুরও চলে গেল।
গোবিন্দ অধিকারী কপালের ফুলে থাকা রগ টিপে ধরে বসে রইল। জলের ধারের পাকুড় গাছের ডালে মাছরাঙাটার মত সে নিথর। পদাবলীও নীরব। দূরের ট্রেন লাইনে একটা ট্রেন ঝমঝম করতে করতে ছুটে চলে গেল। এই করতালতলীর জলা পার হতে ট্রেনটার আধ মিনিটও লাগল না। ট্রেনের জানলায় বসে থাকা যাত্রীরা চিন্তাই করতে পারল না অবহেলাভরে পেরিয়ে যাওয়া এই মাঠ-জলায় কী ভীষণ সামাজিক বৈষম্যের বচসা হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর ভজন ডোম এসে পৌঁছাল - জলে ডোবা মড়াটা পুড়তে একটু সময় লাগল। তাই দেরি হল।’
‘এসো এসো, উঠে এস,’ গোবিন্দ অধিকারী ডাকল। ‘আপনারা একা? বলছিলেন যে কীর্তনের দলের লোকেরা সবাই আসবে?”
‘আমাকে ছেড়ে সবাই চলে গেছে ভাই। আমি একাই রক্ষা করছি আমাদের কীর্তনের নকল বুঁদির কেল্লা।’
“জানতাম। বলেইছিলাম আমাকে নিতে রাজি হবে না আপনার দলের লোকেরা। তাহলে আর শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আমি যাই। মড়া আটকে থাকবে। আমায় দরকার পড়লে মাঝিকে বলে দেবেন, মাঝি ওপারে আমায় খবর করে দেবে।’ ভজন ডোম শিস দিতে দিতে চলে গেল।
পদাবলী বলল, “কী করবেন? এই ছেলেটাকে বাদ দিয়ে দেবেন?”
‘ ‘কিছুতেই না,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘কীর্তনে সকলের সমান অধিকার রূপ গোস্বামী বলেছিলেন সামান্য পুলিন্দ বা শবর যদি কাঠ ঘষে আগুন জ্বালায় তবে সেই আগুনে সোনা জ্বালালে কি সোনা থেকে খাদ বের হবে না? আগুন জ্বালানোটাই মুখ্য কথা, কে জ্বালাল সেটা মুখ্য না। আমি এই বর্ণাশ্রমের বাঁধনে আমার কীর্তনকে বাঁধব না। কিছুতেই না।’
পদাবলী ঘড়ি দেখল। আজ আর এদিকে কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। মনে কৌতূহল প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কী হল? ছিদাম বায়েনের কাছে গিয়ে বাকি গল্পটা শোনা যাক। গোবিন্দ অধিকারীও বাড়িমুখো হল।
ছিদাম বায়েন দাওয়ায় বসে রোদ্দুর পোহাচ্ছিল। পদাবলীকে দেখে খুশি হয়ে বলল, ‘রাধেকৃষ্ণ।’
আজ ছিদাম বায়েনকে বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে। পদাবলী খুশি। আজ আরও কিছুটা গল্প শুনতে পাবে। ‘রাধেকৃষ্ণ,’ পদাবলী হাতজোড় করে বলল। তারপর ছিদাম বায়েনের পাশে দাওয়ায় বসতে বসতে বলল, ‘রাধার ভগবান কৃষ্ণ। তাহলে “রাধেকৃষ্ণ” কেন? কৃষ্ণের নাম তো রাধার আগে হওয়া উচিত।’
ছিদাম বায়েন হাসল - ‘গোঁসাইজ্যাঠাকে জিজ্ঞাসা করলে তোমায় অং বং চং করে একটা সংস্কৃত শ্লোক বলে দিত। আমি খুঁটআখুরে মানুষ, আমি কি আর সেসব জানি? গোঁসাইজ্যাঠা বকাঝকা করে তুলসীমন্ত্রটা শিখিয়েছিল, ওটাই অনেক। তবে নারদ পঞ্চরাত্রে বলা আছে সংস্কৃতে রাধাং পশ্চাৎ কৃষ্ণঞ্চ মাধবম্ না কী যেন। এর মানেটা গোঁসাইজ্যাঠা বলেছিল - আগে রাধার নাম না করে আগে কৃষ্ণের নাম উচ্চারণ করলে ব্রহ্মহত্যার পাপে লিপ্ত হবে।’
পদাবলী বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এটাই আমার ভাল লাগেনা। একটা সংস্কৃত শ্লোক বলে তারপর জবরদস্তি। কিন্তু কারণটা কী?”
ছিদাম বায়েন ধৈর্য সহকারে বলল, ‘নারদ পঞ্চরাত্রেই আছে শ্রীকৃষ্ণ জগতের পিতা আর রাধা জগতের মাতা। মাতা পিতার চেয়ে শতগুণ বন্দনীয়া, পূজনীয়া ও গরীয়সী। তাই রাধার নাম কৃষ্ণের আগে।’
এবার পদাবলীর মনে ধরল কথাটা। ছিদাম বায়েনের পায়ের কাছে বসল গল্প শুনতে -
***
জাতবৈষ্ণব পারলৌকিক প্রথা মেনে মৃদঙ্গমের শ্রাদ্ধ হল। হিন্দুদের শ্রাদ্ধকর্মের এলাহি ব্যাপার প্রাণনাথ মোটেই পছন্দ করে না থালায় থালায় মৃত আত্মার নামে সাজিয়ে দেওয়া হয় চাল, ডাল, সব্জি, তার পাশে লেপ, কম্বল, তোষক, বালিশ, ছাতা। সব পুরোহিত নিয়ে চলে যায়। এখানে সেসব কিছুই হল না। মাটির মালসায় চৈতন্যপূজার ভোগরাগ রাখা হল – চিঁড়ে ভিজিয়ে তাতে দই, ইক্ষুগুড়, মুড়কি, পাকা কলা মেখে, তার ওপরে ঘৃত, মধু, এলাচগুঁড়ো দিয়ে মালসা ভর্তি করা হল। পাশে মাটির গ্লাসে জল, এক খিলি পান রাখা হল। চৈতন্যদেবের ছবির পাশে মন্দিরার হাতে আঁকা মৃদঙ্গমের ছবি। ভোগারতি শুরু হল। বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন নিজে ঘরের ভিতর চৈতন্যমহাপ্রভুর পুজো শেষ করলেন। তারপর মৃদঙ্গমের আত্মার শান্তির জন্য কিছুক্ষণ নামকীর্তন হওয়ার কথা। কুমুদরঞ্জন কীর্তন গাইতে বসে বহুক্ষণ নিস্তব্ধ নির্জীবের মত বসে রইলেন, তাঁর কণ্ঠস্বর কে যেন রুদ্ধ করে দিয়েছে আজ, বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছে না। মন্দিরা বাবার অবস্থা বুঝে অস্ফুটস্বরে করুণ সুরে গাইল -
কি বা সে কোমল তনু, শিরীষ কুসুম জনু
প্রেমে দর দর দুনয়ন
প্রেমদাতা রসের সদন শ্রীরাধারমন।
ছিদাম খোলে চাপড় মারল, যেন নিদ্রা থেকে জেগে উঠলেন কুমুদরঞ্জন, তিনি যোগ দিলেন সূচক কীর্তনে। কীর্তন শেষ হলে মালসাভোগের প্রসাদ খেয়ে অশৌচ ভঙ্গ হল। ব্যাস। সব শেষ।
কিছুক্ষণ পর, বাইরে অনেক গলার আওয়াজ। প্রাণনাথ একচালার ভিতর বসে বসে টের পেল কারা এসেছে। প্রাণনাথ বন্ধ জানলার ফাঁকে উঁকি মেরে দেখল একদল বৈষ্ণব এসেছে। মন্দিরা দাওয়ায় মাদুর পেতে দিল। একজন বৃদ্ধ বৈষ্ণব ইতস্ততঃ করে বলল, ‘জমিদারগোঁসাই, অনেক মহান্ত আমাদের প্রশ্ন করছেন যে এবছর করতালতলীতে ধুলট হবে কিনা?”
বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে নিম্নস্বরে বললেন, ‘হবে।’
উপস্থিত মানুষগুলো এই কথায় আনন্দিত হল তা তাদের মুখ দেখে বোঝা গেল। তবু একজন খুঁতখুঁত করে বলল, ‘কিন্তু ইংরেজদের হুকুম! জনসমাবেশ যে বারণ। তার কী হবে?”
‘আমরা কোনও রাজনৈতিক সমাবেশ করছি না। এটা বৈষ্ণব ধর্মের অনুষ্ঠান। করতালতলীর ধুলট কুড়ি বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আমরা ইংরেজ অধিকারীর অনুমতি নিয়ে আসব। সে দায়িত্ব আমার।’
‘উত্তম কথা, জমিদারগোঁসাই,’ বৃদ্ধ বলল। ‘কিন্তু আপনার পুত্র এই উৎসব পরিচালনার দায়িত্ব নেন, কিন্তু এ বছর -‘
‘এই বছর দাদা ধুলটে আসতে পারবে না। কিন্তু দাদার কাজ আমি দেখব, ‘ মন্দিরা বলল।
‘তুমি দেখবে?” বৃদ্ধ কীর্তনীয়ার কণ্ঠস্বরে দ্বিধা। ‘পারবে?”
‘আমি দাদার সঙ্গে প্রতিবছর ধুলটের কাজ দেখেছি। আমি ব্যবস্থা করব। আমাদের কাছে গতবছরের সমস্ত হিসেব, অনুষ্ঠানসূচী সব লেখা আছে। গত বছর ধুলটে যে গোষ্ঠী যেই আখড়ায় ছিল এবার তারা সেই আখড়াতেই স্থান পাবে। গত বছর যেই গোষ্ঠী ধুলট অনুষ্ঠানের যে দিন যে প্রহরে গেয়েছিল তারা সেই প্রহরেই এ বছর গাইবেন। যদি কেউ না আসতে পারেন সে খবর আমাকে জানাবেন আমি তার পরিবর্তে অন্য কোনও গোষ্ঠীকে সেই স্থানে কীর্তন গাওয়াবার বন্দোবস্ত করব।’
‘কিন্তু সকলের কি মনে আছে সব? একটা কাৰ্যসূচী থাকলে
– ‘ -
‘আমি কার্যসূচী বানিয়ে রাখব। আপনারা আগামী শনিবার আমাদের বাড়ি আসবেন, অন্যান্য মহান্তরা যারা আসতে পারবেন তাঁদেরও বলবেন আমার কাছে এসে তাঁদের সূচী নিয়ে যেতে।’
‘কিন্তু নগরকীর্তনের দিন অত লোকের খাওয়া-দাওয়া?’
‘চিন্তা করবেন না,’ মন্দিরা আশ্বাস দিল। ‘এখনো আমার বাবা জীবিত। আমাদের সাধ্যমত আমরা ব্যবস্থা করব। ‘
“না মা, আমি জানি জমিদারগোঁসাই সব কিছু সুষ্ঠুভাবেই করেন। কিন্তু এ বিশাল দায়িত্ব। এর তত্ত্বাবধান ছোটরাজাবাবু এত বছর করে এসেছেন। ধুলটের আয়োজনের জন্য খুব আটপিটা লোক দরকার হয়।’
‘চিন্তা করবেন না,’ মন্দিরা বলল। ‘সব নীলমাধবের ইচ্ছা। তিনি তাঁর নিজের ব্যবস্থা ঠিক করে নেবেন।”
জয় নীলমাধবের জয় - বলে মহান্তরা খুশি হয়ে গাত্রোত্থান করল। সকলে চলে গেলে মন্দিরা বাবাকে নিয়ে ভিতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মন্দিরা কুঞ্জিতালা খুলে খড়টি ঘরে ঢুকল।
‘খুলটের জন্য পুলিশের অনুমতিটা তাড়াতাড়ি নেওয়া উচিত,’ প্রাণনাথ বলল। ‘ঠিক বলেছ প্রাণনাথদা। বাবাকে আমি কাল পাঠাবো পুলিশ কোতোয়ালিতে। এ তো ধর্মীয় সমাবেশ, পুলিশের আপত্তি করা উচিত না। একজন ভাল কীৰ্তনীয়া খুঁজতে হবে।’
‘কীর্তনীয়া কেন?”
“স্কুলটের অধিবাসের দিন গৌরচন্দ্রিকা কীর্তন গেয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। তুমি তো দেখেছ দাদা সেই গৌরচন্দ্রিকা কীর্তন প্রতি বছর গেয়ে এসেছে। এবছর তো দাদা আর গাইবে না, তাই আমাদের খুব ভাল কীর্তনীয়া দরকার।’
“আমি যখন মৃদঙ্গমের স্থান নিয়েছি, তখন আমি কি সেই গৌরচন্দ্রিকা গাইতে পারি না? তুমি কি কাকাবাবুকে অনুরোধ করবে আমাকে যদি উনি গৌরচন্দ্রিকা কীর্তন শিখিয়ে দেন?”
‘তুমি?” এত দুঃখের মধ্যেও যেন মন্দিরার হাসি পেয়ে গেল। পুলিশ তোমাকে যে হন্যে হয়ে খুঁজছে সে কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, কিন্তু তিন হাজার বৈষ্ণব ভক্তের সামনে দাঁড়িয়ে গৌরচন্দ্রিকা গাইতে পাটাবুক হতে হয়। অনেক বড় বড় কীর্তনীয়াও সে সাহস করে না। তোমার সাহস খুব।’
মনে মনে হাসল প্রাণনাথ। সাহস! এই একটা জিনিসের অভাব তার নেই। না হলে প্রকাশ্য দিবালোকে ম্যাকেঞ্জি লিয়াল অ্যাণ্ড কোং অকশন হাউসের দেওয়ালে বোমা ছোঁড়ার সাহস ক’জনের হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন