প্রীতম বসু
দিন গড়িয়ে পৌষ মাস শেষ হয়ে এল। খড়টি ঘরের ভিতর থেকে প্রাণনাথ বুঝল আজ ভাল কিছু রান্না হচ্ছে। ঘিয়ে ভাজার সুগন্ধ আসছে। বেলার দিকে মন্দিরা থালায় সাজিয়ে নিয়ে এল ক্ষীরপুলি আর গুড়ের পায়েস। আর হাতে এক মুঠো ধানগাছ। প্রাণনাথের জিভে জল চলে এল। ‘কতদিন ক্ষীরপুলি খাই না,’ প্রাণনাথের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘দাঁড়াও, আগে আওনি বাওনি করে নিই। এই বলে মন্দিরা ধানগাছের গোছা থেকে কিছু ছিঁড়ে চালাঘরের কোনায়, দরজায়, চালে গুঁজে বলতে লাগল
‘আওনি বাওনি চাওনি। তি
ন দিন পিঠা খাওনি।।
তিন দিন না কোথা যেও।
ঘরে বসে পিঠা খেও।।
‘এটা কী হল?” প্রাণনাথ বলল।
‘আওনি বাওনি,’ মন্দিরা হেসে বলল। ‘আওনি মানে মা লক্ষ্মীকে ঘরে আসতে বললাম, বাওনি মানে মা লক্ষ্মীকে ঘরে বসতে বললাম, আর চাওনি মানে মা লক্ষ্মীর কাছে সুখ চাইলাম। এই ঘরটা ভুলেই গেছিলাম। কেউ থাকে না তো তাই। নাও, এবার খাও।’
প্রাণনাথ কামড় লাগাল ক্ষীরপুলিতে – “আঃ!”
‘দাদা খুব ভালবাসত এই পৌষ পার্বণের ক্ষীরপুলি।’
এক মুহূর্তে প্রাণনাথের মুখের ভিতর ক্ষীরপুলির স্বাদ যেন তেতো হয়ে গেল। কোনও রকমে মুখের লালাসম্পৃক্ত খাদ্যের দলাকে গলার্দ্ধকরণ করল প্রাণনাথ। মন্দিরা যেন প্রাণনাথের মনের ভাব বুঝতে পারল। মলিন হেসে প্রাণনাথকে বলল, ‘সত্যি প্রাণনাথদা, আমি বুঝতে পারি, দাদা কেন তোমায় পাঠিয়েছে আমাদের বাড়িতে। তুমি না থাকলে আমরা শোকে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম।’
‘খেয়াল আছে তো, আজ রাতের অভিযানের কথা?’ প্রাণনাথ মনে করিয়ে দিল।
‘আমি ঠিক সময় মত আসব, চিন্তা কোরো না।’ মন্দিরা বেরিয়ে গেল।
***
গভীর রাত। অন্ধকার ধুলডাঙায় মন্দিরা আর প্রাণনাথ আলোয়ান মুড়ি দিয়ে চুপিসাড়ে হেঁটে চলল। চারদিকে মেলার আয়োজন। বিশাল তোরণের বাঁশ বাঁধা হয়ে গেছে, চাটাই-খলপার অজস্র আখড়া খাড়া করা হয়েছে। বিশিষ্ট অতিথিদের জন্য আলাদা সামিয়ানা। নদীর উঁচু পাড়ে রান্নার জন্য গর্ত খুঁড়ে বড় বড় তিউরি বানানো হয়েছে। করতালতলী আবার সেজে উঠছে।
চৈতন্যপুখুরীর আঁধারে অজস্র জোনাকি জ্বলছে। জলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নলখাগড়ার বন থেকে ‘ভুপ-ভুপ’ শব্দ জেগে উঠল।
“ওটা কী?” প্রাণনাথ চমকে উঠল।
‘কিছু না, ভুতুম, মন্দিরা বলল। মন্দিরা আলোয়ানের ঘোমটা মাথায় টেনে নিল।
‘ভুতুম?”
“হ্যাঁ পেঁচা। ওরা জলা থেকে ছোট মাছ, ব্যাঙ, সাপের বাচ্চা ধরে খায়। প্রাণনাথদা, তুমি নিশ্চিত যে তোমায় ইংরেজরা ধরতে পারবে না?”
‘এখনও নিশ্চিত নই, মন্দিরা। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে কিছুক্ষণের মধ্যে তুমি আমি দু‘জনেই নিশ্চিত হয়ে যাব।’
দু‘জনে নীলমাধবের মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল। মন্দিরা সিঁড়ি দিয়ে ‘ভিতরে এস, দ্রুতপায়ে উঠে মন্দিরের দরজা খুলে প্রাণনাথকে ডাকল প্রাণনাথদা।’ -
প্রাণনাথ ভিতরে ঢুকতেই মন্দিরা মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দিল। অনেক বছর পর প্রাণনাথ কোনও মন্দিরে ঢুকল। মন্দিরা দীপশলাকা ঠুকে মন্দিরের প্রদীপ জ্বালাল। প্রাণনাথের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। মন্দিরের আলো বাইরের মানুষের নজরে আসতে পারে।’
প্রাণনাথ একনজরে চারদিকে তাকিয়ে নিল। সামনে নীলমাধব আর রাধিকা। এখানে পীতাম্বর পরিহিত শ্রীকৃষ্ণ নবজলধর শ্যামবর্ণ নয়, নারায়ণের মত নীলবর্ণ। মুরলীবদন, শিখিপুচ্ছ চূড়া, নানা অলঙ্কার শোভিত নীলমাধব। পাশের শ্রীরাধিকা গৌরবর্ণা, কাঞ্চন চম্পক কুঙ্কুম শোভিতা লজ্জিতা মধুরাননা। শ্রীকৃষ্ণের আনন দেখে মনে হয় তিনি রাধিকার মানভঞ্জনের চেষ্টা করছেন। প্রাণনাথ হাতের তালু দিয়ে রাধিকার চরণতল স্পর্শ করল আর ওর মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
‘কী করছ?” মন্দিরা বলল।
কৃষ্ণের মাথায় হাত রেখে প্রাণনাথ বলল, ‘কৃষ্ণের মনের ইচ্ছা পূর্ণ করছি।’
‘তার মানে?”
‘দেহিপদপল্লবমুদারম, প্রাণনাথ রাধিকার বিগ্রহ তুলে ধরে রাধিকার চরণ কৃষ্ণের মস্তকে স্থাপন করল। আর তৎক্ষণাৎ গুরুগম্ভীর আওয়াজে ধরণী যেন দ্বিধা হল। নীলমাধবের মূর্তি আড়াআড়ি ভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে দু‘দিকে সরে গেল। অর্ধমূর্তি দু‘পাশে সরে যেতে বেদীর ফাঁকে দেখা গেল একটা গহ্বর। পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। মন্দিরা ভয় পেয়ে প্রাণনাথের হাত আঁকড়ে ধরল। প্রাণনাথ মন্দিরার হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘এবার আমি নিশ্চিত যে ইংরেজ আমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না। আমি জানি নিচের ওই পথ কোথায় গিয়ে মিশেছে। ওটাই আমার অদৃশ্য হওয়ার পথ।”
মন্দিরা নিচের গহ্বরের দিকে অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল। ‘এটা কীভাবে সম্ভব হল?’
‘শ্রীকৃষ্ণের মস্তকে যেমন সাতটা সুক্ষ্ণ ছিদ্র আছে, তেমন রাধিকার চরণের নিচে সাতটা খাঁজকাটা শলাকা আছে। সেই শলাকাগুলি হল চাবি,’ প্রাণনাথ রাধার পায়ের নিচটা দেখাল। ‘শ্রীকৃষ্ণের মস্তকে রাধিকার চরণ রাখলে এই শলাকা সেই ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে একটা দণ্ডকে আঘাত করে। সেই দণ্ড সরে গেলেই বেদীর পায়ের নিচের পাটাতন সরে যায়।’
“তুমি জানলে কীভাবে?”
“আমি যে তোমাদের সনাতন কীর্তন আত্মস্থ করেছি,’ প্রাণনাথ হেসে বলল। রাধিকার মূর্তি যথাস্থানে স্থাপন করল প্রাণনাথ। আর অবাক হয়ে দেখল কৃষ্ণের দুই অর্ধমূর্তি ধীরে ধীরে বেদীর ওপর একে অপরের কাছে এগিয়ে এসে আবার জোড়া লেগে গেল।
‘নিচে ঘূর্ণায়মান লোহার চাকা আর স্প্রিং দিয়ে বানানো কিছু কলকব্জা আবার কৃষ্ণকে জোড়া লাগিয়ে দিল,’ প্রাণনাথ মন্দিরার বিস্মিত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ব্যাখ্যা করল।
মন্দিরার চোখ মুখ এবার আনন্দে খুশিতে ঝলসে উঠল। এতদিন ধরে প্রাণনাথের জন্য উদ্বেগে ওর মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে রক্তহীন ছিল। প্রাণনাথ ইংরেজদের হাতে গ্রেফতার হলে ওর ওপর ওরা অকথ্য অত্যাচার করবে। এতদিন মন্দিরা ভেবেই পাচ্ছিল না প্রাণনাথ ধুলটে ইংরেজদের সামনে আত্মপ্রকাশ করে কীভাবে ওদের চোখে ধুলো দিয়ে পালাবে? এখন সেই সমাধান নিজের চোখে দেখে মন্দিরা খুশি। তবু শঙ্কার সঙ্গে বলল, ‘নিচে পাতালে নামবে কীভাবে?’
‘যেভাবে সনাতন চাবিওয়ালা নিচে নেমেছিল।’ প্রাণনাথ মাথার ওপরে ঝুলন্ত ঘন্টার দড়ি খুব ধীরে ধীরে নিজের দিকে টানল। ছাতে লাগানো পুলি ঘুরে ঘন্টাসহ দড়িটা একদিকে নিচে নেমে অন্যদিকের ঘন্টাসহ উপরে উঠে গেল। প্রাণনাথের মুখে হাসি। ‘অন্যদিকের ঘন্টাটা বেশি ভারি। দড়ি ধরে নিচের গহ্বরে নেমে দড়িটা ছেড়ে দিলেই পুলি ঘুরে গিঁট উপরে সস্থানে ফিরে গেলে দুই ঘন্টা আবার যথাস্থানে ফিরে যাবে।’
‘বাকিটা সামলাতে পারবে তো?”
‘সব তোমার নীলমাধবের ইচ্ছা,’ প্রাণনাথ ভগবানের মূর্তির দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, “উনি স্বপ্নে এসে পথ না দেখালে পথ পেতাম না। আমার অবচেতন মন আস্তিক।’
‘তুমি কৃষ্ণের এতবড় একটা ইচ্ছা পূরণ করেছ। ইনি তোমার ইচ্ছাও পূরণ করবেন। জানিনা উনি আমার বাসনা পূরণ করবেন কিনা?”
‘তোমার কী বাসনা?” প্রাণনাথের চোখে কৌতূহল।
‘সেদিন তোমার থেকে উজ্জ্বলনীলমণি নিয়েছিলাম মনে আছে?”
‘হ্যাঁ।’
- ‘শ্রীরূপ গোস্বামী বসন্ত রাস বর্ণনা করছেন গোপীরা সবাই কৃষ্ণের সঙ্গলাভের জন্য ছুটে আসছে। বেগতিক দেখে কৃষ্ণ কুঞ্জে প্রবেশ করে চতুর্ভুজ নারায়ণের মূর্তি ধরে আসনে বসলেন। গোপীরা নারায়ণকে প্রণাম করে বললেন – ঠাকুর, আমাদের কৃষ্ণকে তুমি খুঁজে দাও -
নমো নারায়ণ দেব করহ প্রসাদ।
কৃষ্ণসঙ্গ দেহ মোরে খণ্ডাহ বিষাদ।।
কৃষ্ণ তবু চতুর্ভুজ নারায়ণের রূপে ধ্যানস্থ অবস্থায় অনড় হয়ে বসে রইলেন। অতঃপর এল রাধা। রাধার প্রেমের সামনে কৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব পরাভূত হল। চতুর্ভুজ নারায়ণ তখন দ্বিভুজ মানুষে পরিণত হলেন। শ্রীরূপ গোস্বামী উজ্জ্বলনীলমণিতে লিখলেন -
সা শক্যা প্রভবিষনাপি হরিণা
নাসীচ্চতুর্বাহুতা।’
প্রাণনাথ বুঝতে পারছে না মন্দিরা কী চায়? এত রাতে এই গল্প বলার কী মানে? কিন্তু মন্দিরার স্বভাব সে জানে, নিশ্চয়ই কথাটা এখনই বলার জন্য, নতুবা এই গল্প সে আগামীকাল সকালে খড়ুটি ঘরেই বলত।
‘তুমি ভাবছ তোমায় এখন এই গল্প কেন বলছি, প্রাণনাথদা, মন্দিরা বলল। ‘আমি শ্যাম অনুরাগে এ দেহ সঁপেছি তিল তুলসী দিয়া। তিল-তুলসী দিয়ে দান হল সর্ব্বত্যাগের দান। তার প্রত্যাহার সম্ভব না। মনে মনে ঈশ্বর কৃষ্ণকেই আমার ভাবী স্বামী হিসাবে কল্পনা করে এসেছিলাম। তারপর তুমি যখন এলে তখন আমার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। তোমার চোখে আমি প্রেম দেখলাম, তারপর একদিন তোমার কাছে খাবার পৌঁছে দিতে আসার আগে আমি দেখলাম আমিও বিদ্যাপতির রাধার মত মুকুর লেই অব করত শৃঙ্গার। অজান্তেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাজললতা হাতে অলকা-তিলকায় ব্যস্ত, আনমনে গিলাবাটা ঘষা মাথার চুলে কাঁকুই চালিয়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। বুঝলাম তোমার সেই প্রেমের আগুন কীভাবে যেন আমার বুকের ভিতর ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এক অপরাধবোধ আমার মনকে আচ্ছন্ন করে দিল। আমি তো ঈশ্বরের কাছে মনে মনে বাগদত্তা। আমার মনের মধ্যে যে এক সম্ভাব্য আড়ষ্ট মানবী প্রেমিকা মাথা উঁচু করার জন্য ছটফট করতে পারে তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। তাই মনের মধ্যে হাজার আনন্দ সত্ত্বেও এক পরকীয়া প্রেমের পাপের অনুভূতি আমাকে যন্ত্রণা দিতে লাগল। মনে সর্বক্ষণ এক দ্বন্দ্ব অবিরত চলতে লাগল ঈশ্বর না তুমি? কিন্তু আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম যে আমি আর নিজের বশে নেই। আমি একজন সাধারণ মেয়ে, আমার মধ্যেও এক সম্ভোগ তৃষ্ণা আছে। যাকে আমি জোর করে অন্তঃসলিলা ফল্গু বানিয়ে রেখেছি, সে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমার রাতে ঘুম ভেঙে যেত। এক অদ্ভুত ভাল লাগা আর কষ্টের মিলমিশ সহাবস্থান আমাকে আধঘুমে জড়িয়ে রাখত। তারপর আমি কাল আবার উজ্জ্বলনীলমণি পড়লাম। রাসলীলার এই বর্ণনা আমার চোখ খুলে দিল। মুরলীধর শ্রীকৃষ্ণ তো প্রেমের দেবতা। তিনি নিজেই তো রাধার জন্য ঈশ্বর-রূপ ত্যাগ করে মানব-রূপ ধারণ করলেন। তিনি তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে আমার সামনে প্রেমিক হয়ে এসেছেন। তাই আমি তাঁর ঈশ্বর-রূপের সামনেই তাঁর মানব-রূপের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাই। তুমি আমায় আপন করে নাও।’
প্রাণনাথ মন্দিরার দিকে তাকাল। পেখলু পিয়ামুখচন্দা। মন্দিরার দু‘চোখে চৈতন্যপুখুরী টলটল করছে। প্রাণনাথ বলল, “তা সম্ভব নয় মন্দিরা, আমার প্রাণ যে কোনও সময়ে দেশের জন্য চলে যেতে পারে।’
‘আমি জানি,’ মন্দিরা শান্তভাবে বলল। ‘আমরা কেউই তো অমর না। মরতে তো সকলকেই হবে। তুমি জনমে জনমে আমার।’
“বেশ, তাহলে তুমিও আমার সঙ্গে পালিয়ে চল। ধুলটের অধিবাসের আগে তুমি এই গোপন পাতাল কুঠুরিতে লুকিয়ে পড়, আমি ধুলটের অধিবাসের সময় পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে চলে আসব। তারপর দু‘জনে এখান থেকে পণ্ডিচেরী চলে যাব। ওখানে ফরাসীদের অধিকার। ইংরেজদের আওতার বাইরে।’
*বাবাকে ফেলে! তাহলে বাবা মরে যাবে। এ অসম্ভব।’
‘ছিদামকে সব শিখিয়ে যাব। ছিদাম তোমার বাবাকে নিয়ে আসবে পণ্ডিচেরী।’
*বাবা এই বাড়ি ছেড়ে কক্ষনো কোথাও যায় না। ওখানে মায়ের সমাধি আছে যে।
“তাহলে?” প্রাণনাথ হতাশ হয়ে বলল। ‘তুমি আমার স্ত্রী এটা জানতে পারলে, আমায় খুঁজে না পেয়ে ইংরেজরা তোমার ওপর অত্যাচার করবে,’ প্রাণনাথ মনের ভয় প্রকাশ করল।
‘আমি সমস্ত অত্যাচার সহ্য করে নিতে প্রস্তুত।’
তা আমি কী ভাবে মানব?’ প্রাণনাথ মন্দিরার চোখের দিকে তাকাল। মন্দিরার দৃষ্টিতে পুণ্যতোয়ায় অবগাহনের জন্য নীরব পবিত্র আহ্বান। এক অপরিচিত কামাবেগ তার সমস্ত যুক্তির প্রদীপকে এক ফুৎকারে নিভিয়ে দিল। অন্ধকার প্রেমের সরণীতে প্রাণনাথ নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ‘বেশ। আমি রাজি। কিন্তু আমার স্ত্রীকে রক্ষা করাও আমার ধর্ম। তুমি নীলমাধবের পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা কর যে পৃথিবীতে তুমি কারোর সামনে বলতে পারবে না যে তুমি আমার বিবাহিতা স্ত্রী। শুধু এই নীলমাধব সাক্ষী থাকবেন।’
*একমাত্র ছিদাম জানবে এই কথা। আমি জানি ছিদামের জিভ কেটে ফেললেও ছিদাম একথা আমার জীবদ্দশায় কারুকে বলবে না।’
“তোমার বাবা যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন তুমি এখানেই থাকবে। আমি ছদ্মবেশে আসব তোমার সঙ্গে দেখা করতে। যদি আমি বেঁচে থাকি –’ “অশুভ কথা বোলো না, প্রাণনাথদা। আমি জানি আমাদের আবার দেখা হবে। আমি অপেক্ষা করব।’
“তোমার নীলমাধবের কাছে তুমি মন্দিরা হয়েই থেক, তোমার মন্দিরার ধ্বনিতে তাঁর পুজো কোরো। আর আমার কাছে তুমি মধুরিমা। তাহলে তোমাকে নিয়ে তোমার নীলমাধব আর আমার মধ্যে কোনও বিভেদ থাকবে না।’ প্রাণনাথ হাসল। ‘যাহা যাহা হেরিয়ে মধুরিম হাস, তাহ তাহ কুন্দ কুমুদ পরকাশ।’
জাতবৈষ্ণবের মালাচন্দনের বিয়ে। এ বিয়েতে না হয় অগ্নিসাক্ষী, না হয় পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ। নীলমাধবের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণনাথ মন্দিরার গলায় নীলমাধবের প্রসাদী আজানুলম্বিত বনমালা পরিয়ে দিল। মন্দিরা তার গলার মালা প্রাণনাথকে পরিয়ে দিল। মালাচন্দনের বিয়েতে শাখা-সিঁদুর পরানো হয় না। প্রাণনাথ মন্দিরার কপালে দিল চন্দনের টিপ, সিঁথিতে সিঁদুরের বদলে লেপে দিল চন্দনের প্রলেপ। চন্দনের সুবাস দু‘জনের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। মালাচন্দনের বিয়েতে বৌ ঘোমটা দেয় না। প্রকৃতি পুরুষ সমান সমান। রাধেকৃষ্ণ বলা হয় রাধার নাম কৃষ্ণের আগে রেখে। বৈষ্ণব নারী তার পতির উচ্ছিষ্ট খায় না। মন্দীভূত পঞ্চপ্রদীপের আলোয় দেখা যাচ্ছে মন্দিরার মুখ আরক্তিম, তাতে আশঙ্কার ছিটে। হিয়ার মাঝারে মরম-বেদনা সদাই চমকে চিত। এ বিবাহের ভবিষ্যৎ নেই। আছে শুধু বর্তমান। মন্দিরা তাই সেই বর্তমানের প্রতিটি পলকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য তার প্রাণনাথের সঙ্গে সময়কেও জড়িয়ে ধরল।
‘এবার কী?’ মন্দিরা প্রদীপের আধো অন্ধকারে প্রাণনাথের চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল।
প্রাণনাথ পিরানের পকেট থেকে বের করল একজোড়া রূপোর পাঁয়জোর ‘তোমার জন্য কোনও অলঙ্কারই নেই আমার। শুধু এটুকু আছে। বুড়ি কীর্তনীয়া আমায় এটা দিয়ে গেছিল। কীর্তনীয়ার বিবাহের সময় পাওয়া শেষ স্মৃতিচিহ্ন। আমায় বলেছিল নাতবৌকে এটা দিস। আমার আশীর্বাদ। তোমার গোড়ালিকে এই নূপুর জড়িয়ে ধরুক, মন্দিরে অন্ততঃ একবার বাজুক শিঞ্জন শব্দ। প্ৰাণনাথ নিচু হয়ে মন্দিরার পায়ে নূপুর পরিয়ে দিতে গেল।
‘না না তা সম্ভব না, মন্দিরা পা সরিয়ে নিল। ‘নূপুর আমি পায়ে পরতে পারব না।’
“কেন সম্ভব না?” প্রাণনাথ বিস্মিত।
- দূরে হঠাৎ কোলাহল জেগে উঠল। প্রাণনাথ থমকে দাঁড়াল। একদল মানুষ কথা বলাবলি করতে করতে এদিকেই আসছে – কারোর হাতে লম্ফ, কারোর হাতে জ্বলন্ত পাটকাঠি। গ্রামবাসী মনে হচ্ছে। প্রাণনাথ মন্দিরার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পুলিশ?’
মন্দিরার চোখে উৎকণ্ঠা।
প্রাণনাথ কান খাড়া করে শুনল - ‘গান গাইছে মনে হচ্ছে। এতদূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে দলে মেয়েরা আছে মনে হচ্ছে।’
মন্দিরা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। ‘আজ মাঘ মাসের প্রথম দিন। আজ থেকে মাঘমণ্ডল ব্রত শুরু হল। মাঘ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত চলবে।’
‘এই অন্ধকারে ব্রত পালন করছে? এরা কারা? এদিকে কোথায় আসছে?”
‘চিন্তা নেই। ওরা এদিকে আসবে না। এই কুমারী কন্যাদের দল ওদের মাকাকীমাদের সঙ্গে চলেছে চৈতন্যপুখুরীতে। ওখানে স্নান করে –’
‘এই কনকনে মাঘের শীতে এরা পুকুরে চান করবে?”
‘হ্যাঁ, এই কৃচ্ছতাই হল এই কৌমার্যব্রতের রীতি। এই ঠাণ্ডায় চান করে ওরা উদিত সূর্যের আরাধনা করে।
উঠ উঠ সূর্যঠাকুর ঝিকিমিকি দিয়া
উঠিতে না পারি আমি হিমালের লাগিয়া
হিমালয়ের পঞ্চকন্যা সূর্যে করল বিয়া।’
হেসে ফেলল মন্দিরা।
“তারপর?”
চান পুজি চন্দনে সুরয পুজি বন্ধনে।
চান পুইজ্যা ঘরে যাই, সুরয পুইজ্যা দুধভাত খাই।
তারপর বাড়ি ফিরে সারা আঙিনা জুড়ে আলপনা আঁকে। এই আলপনা আবার লক্ষ্মীপুজোর মত পিটুলি গুলে আলপনা না। এতে থাকে বেলপাতাগুঁড়ো, লাল সুড়কি, হলুদের গুঁড়ো, পোড়া তুষের কালি কত কি। পালকি, রথ, নৌকা, হাতি, ঘোড়া কতকিছু আঁকে এইসব রঙ দিয়ে।’
‘তুমি কর না এই ব্রত?”
“আমি তো প্রাণনাথের পুজো করলাম,’ মন্দিরা দুষ্টুমিভরা চোখে তাকিয়ে হাসল। ‘প্রাণনাথ পুইজ্যা ঘরে যাই।’
প্রাণনাথ হাসল। তারপর মন্দিরাকে বাহুবন্দী করে বলল, ‘বিয়ের পর তোমার কী অনুভূতি হচ্ছে?”
মন্দিরা হাসল। ওর মনে পুলকে আবিষ্ট চণ্ডীদাসের রাধা
সখি কি পুছসি অনুভব মোয়।
সই পিরিতি অনু - রাগ বাখানিতে
তিলে তিলে নূতন হোয়।।
আর প্রাণনাথ মনে মনে বলল মাঘ মাস পড়ে গেল। মাঘী সপ্তমীতে ধুলটের অধিবাস। মাত্র সাত দিন, তারপরই ওর জীবনে একটা এসপার ওসপার হয়ে যাবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন