ত্ৰিশ

প্রীতম বসু

‘কাকাবাবুর জ্বর কেমন আছে?”

খুব সকালে পাতকুয়োর পাড়ে এসে মন্দিরাকে দেখে প্রশ্ন করল প্রাণনাথ। মন্দিরাকে দেখে কষ্ট হল প্রাণনাথের। মেয়েটা সারা রাত কেঁদেছে।

‘রাতে জ্বর বেড়েছিল। এখন জ্বরটা কম। অন্যদিন কত ভোরে উঠে পড়ে

বাবা। আজ অঘোরে ঘুমোচ্ছে। চল তোমার থাকার জায়গাটা ঠিক করে দিই।’ খড়টি ঘরের দরজা খুলল মন্দিরা। ছোট একচালা মাটির ঘর। ঘরের একটা জানলা উঠোনের দিকে খোলে, অন্য জানলা বাইরের পথের দিকে। মেঝেতে ডাই করে রাখা অনাবশ্যক বস্তুর জঞ্জাল - লাঙলের ফাল, খেপলা জাল, ঢেঁকির খাঁজ কাটা খুঁটি, বেতের পেটরা, ধামা, কুনকে, জারুল কাঠের পিঁড়ি, বেতের মোড়া, ভাঙা আড়ানি, বস্তা – কী নেই এইটুকু ঘরে। ঘরের দেওয়ালে দাঁড় করিয়ে রাখা খাটিয়া, মেঝেতে গোটানো তোষক, বাঁশের বাখারি, ঘরের কোনে একটা মাটির জালা। মন্দিরা গোটানো মাদুরটা মেঝেতে ফেলল, মেঝে থেকে ধুলো উড়ে উপরে উঠল। -

‘এখানে লুকিয়ে থাকব?’ প্রাণনাথ বলল। ‘কিন্তু পুলিশ আসলে তো ধরা পড়ে যাব!”

“যদি পুলিশ আসে তাহলে - ‘ মন্দিরা ঘরের কোনে রাখা বড় মাটির জালা ধরে টানতেই মেঝের একাংশ সহ জালা কাত হয়ে গেল। প্রাণনাথ বিস্মিত হয়ে দেখল একটা ছোট মই নেমে গেছে। নিচে একটা ছোট অন্ধকার চোরা-কুঠুরি। “জমিদারবাড়িতে দামি সোনা-দানা লুকিয়ে রাখার জন্য গোপন দেরাজ থাকে,’ মন্দিরা বলল। ‘দাদা করতালতলীতে এলে পুলিশের চোখ এড়াতে এই একচালার ভিতরেই থাকত।’

দেওয়ালে হেলান দেওয়া দড়ির খাটিয়াটা পাতল মন্দিরা। “ঘরের এই মাকড়সার জালগুলো পরিষ্কার করছি না। দাদা বলত এগুলো দেখলে সন্দেহ কম হবে। তোষক, কম্বল এনে দিচ্ছি। জানি এখানে থাকা খুব কষ্টকর।’

“জেলের গরাদের মধ্যে অত্যাচার সহ্য করে থাকার থেকে অনেকগুণ ভাল।’

‘এটা আমার মা’র অশুচঘরও ছিল। দাদা আর আমি এখানেই হয়েছিলাম।’ তারপর মন্দিরা কয়েকবার ভিতর বাইরে যাওয়া আসা করল। একবার এল চাদর, বালিশ, আর কাঁথা-কম্বল পালটাতে। প্রাণনাথকে ভিতরে রেখে মন্দিরা ঘরের দরজা বন্ধ করে তালা দিয়ে বেরিয়ে গেল। প্রাণনাথ মাটির নিচের কুঠুরিতে নামল। হাওয়া আসা যাওয়ার ছিদ্র আছে। প্রাণনাথ দু-একবার নেমেউঠে সড়গড় করে নিয়ে তারপর উপরে খাটিয়ার তোষকের ওপর বসল, দেওয়ালে হেলান দিয়ে। মৃদঙ্গমের চিতাস্থি যথাস্থানে সমাধি দেওয়া হয়েছে। আত্মা-টাত্মা বিশ্বাস করেনা প্রাণনাথ, তবু যদি সেসব কিছু থাকে তবে মৃদঙ্গম শান্তি পেয়েছে, ওর একটা দায়িত্ব শেষ। এখন যে চিন্তাটা ওর মাথায় ঘুরছে সেটা হল ওর অনুপস্থিতিতে চন্দননগরের বিপ্লবের কাজগুলোর কী হবে? কাস্টমসের গোডাউন থেকে চুরি করা রড্ডা কোম্পানির মজার পিস্তল আর কার্তুজভরা বাকি বাক্সগুলোর কী হবে? খবরের কাগজে এই চুরির খবর ছাপা হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ পুলিশ একের পর এক গুদাম রেইড করতে থাকে। সাহস করে ত্রিশটা পিস্তল আর অনেক কার্তুজ নিয়ে গঙ্গায় পালাবার সময় পুলিশ লঞ্চের হাত থেকে বাঁচতে সব আগ্নেয়াস্ত্র জলে ফেলে দিতে হয়েছে। কিন্তু কুড়িটা পিস্তল আর দশ হাজার রাউণ্ড কার্তুজের বাক্স এখনও লুকিয়ে রাখা আছে সালকিয়ার একটা গুদামে। বাক্সগুলোকে গুদাম থেকে বের করতে পারছে না। এই বন্দুকগুলো বিপ্লবীদের এখন খুব দরকার। বোমা নিয়ে পথেঘাটে যাতায়াত সম্ভব হয় না। ওগুলো লুকিয়ে চন্দননগরে না ঢোকাতে পারলে প্রাণনাথের রাতের ঘুম হচ্ছে না। প্রাণনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এখন এখান থেকে বেরোবার কোনও উপায় নেই। প্রাণনাথের পরক্ষণেই মনে পড়ল সে বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জনকে কথা দিয়েছে যে সে অস্ত্রের চিন্তাকেও মাথায় স্থান দেবে না। পিস্তলের চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল প্রাণনাথ। কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা বারবার ঘুরে ঘুরে মাথায় আসে। বোমা-পিস্তল আজকাল প্রাণনাথের বুকের পাঁজর। ওগুলো ত্যাগ করা এত সহজ নাকি? তবু চেষ্টা তো করতে হবে। প্রাণনাথ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।

এই নির্জ্জনতার মধ্যে কয়েকঘন্টা কেটে গেল, প্রাণনাথের মনে হল এভাবে জড়ভরত হয়ে বসে থাকা অসম্ভব। বিপ্লবীর জীবন কাটে প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে। সারাদিন কত ধরনের লোক আসে, কত পরিকল্পনার কথা আলোচনা হয়, একসঙ্গে মিলে খবরের কাগজ পড়া হয় জানা যায় অন্যপ্রদেশের বিপ্লবী সংগঠনের নতুন আক্রমণের কথা। তাছাড়া প্রাণনাথের দায়িত্ব চন্দননগর থেকে বিপ্লবীদের অর্থ সাহায্য করা এবং আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করা। সারাক্ষণ মন চঞ্চল থাকে, দিন যে কীভাবে কেটে যায় তা টেরই পাওয়া যায় না। রাতে প্রাণনাথের দেহ অবসন্ন হয়ে নিদ্রায় ঢুলে পড়ে শরীর, তখনও বিপ্লবীরা আসে রাতের গভীরে। কেউ এসে লুঠতরাজ করা অর্থ, সোনার অলঙ্কার, এসব দিয়ে যায় প্রাণনাথের হেফাজতে, কেউ বা আসে রাতের আশ্রয়ের জন্য।

ঘরের দুটো জানলাই বন্ধ, ভিতরটা অন্ধকার-অন্ধকার, বন্ধ দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো ঘরের ভিতরে ঢুকে এক আলো-আঁধারি পরিবেশ। ক’টা বাজে তাও বোঝার উপায় নেই। কীর্তনীয়ার পোশাকে আসতে হয়েছে তাই প্রাণনাথ ঘড়ি আনতে পারে নি। এ বাড়িতে ঘড়ি নেই। সময় জিজ্ঞেস করলে উঠোনের তুলসী গাছের ছায়া দেখে মন্দিরা সময় বলে। চিন্তার স্রোত মাথায় ঢুকছে মাথার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যেন প্রাণনাথ একটা নির্জন দ্বীপে, সমুদ্রের তীরে একটা গুহায় বসে, সমুদ্রের জল সেই গুহায় এসে ঢুকছে আবার ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে। এভাবে সারাদিন ধরে চলেছে। প্রাণনাথ উপলব্ধি করতে পারছে যে নির্জন সেলে রাখা কয়েদীর মাথার ভিতর কী ভয়ানক অত্যাচার চলে। প্রাণনাথের মনে হল এভাবে থাকতে হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সে উন্মাদ হয়ে যাবে।

মন্দিরা সারা দিন এল না। দিন গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। উঠোন ঝাঁট দেওয়ার আওয়াজ। উঁকি মেরে দেখল প্রাণনাথ। মন্দিরা শাড়ি গাছকোমরে বেঁধে উঠোনে ঝরে পড়া হরীতকীর পাতা ঝাঁট দিয়ে সরাচ্ছে। আবার অখণ্ড নীরবতা। সন্ধ্যাও কেটে গেল, এ কক্ষে আলো রাখার কোনও সম্ভাবনাই নেই। বাইরের জানলার কবাটের ফাঁকের আলো মিলিয়ে গেল, বাইরে ঝিঁ ঝিঁ ডাকতে শুরু করেছে। গতবার সন্ধ্যায় প্রাণনাথ দেখেছিল মৃদঙ্গমের বাবা, মন্দিরা, ছিদাম সবাই গোধূলির সময় নীলমাধবের মন্দিরে গিয়ে সন্ধ্যা আরতি করে। খোল, করতাল, কাঁসর বাজে, কিছু ভক্তও আসে। প্রাণনাথের এখনো মনে আছে মন্দিরা চোখ বুজে ভক্তিভরে গাইছে – যমুনা পুলিনে বিহরত গোপী চিত্রচোর। আজ এই গৃহে কারোর মনে শক্তি নেই নীলমাধবের সম্মুখে কীর্তন গায়। মন্দিরে হয়তো কোনওমতে প্রদীপ জ্বালিয়ে এসেছে মন্দিরা। -

এবার দরজার বাইরে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকল মন্দিরার ছায়া, মন্দিরার হাতে পাতিল। ‘অন্ন আর ব্যঞ্জনসিদ্ধ। এখন আমাদের হবিষ্যি।’

কথা বলবার লোক পেয়ে প্রাণনাথ শান্তি পেল। ‘সময় কাটছে না একদম‘কথা বোলো না,’ মন্দিরা নিচু গলায় বলল। ‘ছিদাম কিছু সন্দেহজনক লোককে এদিকে বারবার ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। নীলমাধবের মন্দিরের সামনে জারুল গাছের তলায় একটা সন্ন্যাসী এসে বসে রয়েছে। চুপচাপ খেয়ে নাও। আমি থালা-পাতিল নিয়ে যাব।’ মন্দিরা দরজা বন্ধ করে মোড়ায় বসল।

প্রাণনাথ আর কথা বলল না। মন্দিরার মুখ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারে জেগে আছে সিদ্ধ ভাতের গন্ধ। আলু আর কলা সিদ্ধ মাখা। প্রাণনাথ গবগব করে তাই খেল। মন্দিরা কুঁজো থেকে পিতলের গ্লাসে জল গড়িয়ে প্রাণনাথের সামনে এনে রাখল। খাওয়া শেষ করে জল খেল প্রাণনাথ। মন্দিরা এবার থালা তুলতে তুলতে বলল, ‘ভোর হওয়ার আগে রাত থাকতে থাকতে আমি এসে দরজা খুলে দেব।’ মন্দিরা থালা গ্লাস নিয়ে চলে গেল। তারপর আবার বাইরের দরজায় তালা লেগে গেল। রাতে প্রাণনাথ জানলাটা অল্প করে ফাঁক করল। আকাশে অজস্র তারা। অতদূরে, কিন্তু মনে হচ্ছে ওরাই যেন তার একাকীত্ব লাঘবের সঙ্গী। ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। প্রাণনাথ আবার জানলা বন্ধ করে দিল।

অনেক রাত পর্যন্ত প্রাণনাথের চোখে ঘুম এল না। মাথা জুড়ে অজস্র চিন্তা। বাইরে একটানা ঝিল্লীরব, আর তার ফাঁক-ফোকর দিয়ে মনে উঁকি মারছে মৃদঙ্গমের উজ্জ্বল মুখ। মৃদঙ্গমকে ভীতু আর নিজেদেরকে বীর ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করত প্রাণনাথ আর তার সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী সঙ্গীরা। আসলে মৃদঙ্গমকে কখনো গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতা সংগ্রামী বলে মনেই করত না প্রাণনাথ। ও যেসব কথা বলতো তাতে কান দিত না প্রাণনাথ। মৃদঙ্গম বলত জাতির মেরুদণ্ড সোজা করা আবশ্যক আগে, তারপর বিপ্লব। বীর জাতির মানুষ কখনো ডাকাতি বা গুপ্তহত্যা করেনা। মৃদঙ্গম বলত যে দেখা গেছে যেদিন একটা রাজনৈতিক ডাকাতি হচ্ছে সেদিন সে এলাকায় গুপ্তসমিতির সভ্য অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এদের অনেকে হুজুগে ছোকরা। তাই ধরা পড়লে এরা সব গুপ্তকথা ফাঁস করে দেয়। তোমাদের সভ্য বেছে বেছে নেওয়া উচিত। সেসব কথা প্রাণনাথ কানেই তুলত না। সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া কখনো স্বাধীনতা আসে? আর ওই কীর্তন? প্রাণনাথ ভাবছিল সে মৃদঙ্গমকে শুধু ব্যবহার করেছে এতদিন। মৃদঙ্গমরা ছয়জন ছাত্র মিলে চন্দননগরে একটা কীর্তনের দল বানিয়েছিল। ওরা একটা বাগানওয়ালা পুরোনো বাড়ি ভাড়া করে থাকত। দিনে পড়াশোনা আর কলেজের পর সন্ধ্যায় বাগানে বসে কীর্তন গাইত। মাঝে মাঝে ওরা খোল-করতালহারমোনিয়াম নিয়ে কোথায় কোথায় গ্রামে চলে যেত কীর্তনের আসরে গিয়ে কীর্তন গাইতে। প্রাণনাথ মৃদঙ্গমের চন্দননগরের ভাঙা বাগানবাড়িটা বোমা বানাবার জন্য ব্যবহার করে এসেছে। বাগানবাড়ির বাগানের মাটি খুঁড়ে সেখানে বোমা বানাবার উপাদান রাখত। স্যাঁকরার দোকান থেকে গোপনে বোমা বানাবার সালফিউরিক অ্যাসিড আর নাইট্রিক অ্যাসিড বোতল বোতল আসত আর সব এই বাগানবাড়ির মাটির তলায় চাপা থাকত। পুলিশ কখনো সন্দেহ করে নি যে কীর্তনের আখড়ায় এত বিপজ্জনক সব কাজ হতে পারে। মৃদঙ্গম নিজে এই বোমা তৈরির ধারে কাছে যেত না, কিন্তু প্রাণনাথ জানত পুলিশ ধরলে বিপদে পড়বে মৃদঙ্গম। প্রাণনাথ মৃদঙ্গমকে বিভিন্ন সময় ব্যবহার করেছে। কলকাতায় ব্রিটিশদের জন্য অস্ত্র আসত রড্ডা কোম্পানির মারফত। প্রাণনাথদের দলের একজন বিপ্লবী কলকাতায় রড্ডা কোম্পানির অফিসে কাজ করতেন। কলকাতা বন্দরে আড়াইশ’ বাক্স অস্ত্র আসে। মজার পিস্তল আর কার্তুজ। উনি কাস্টমস থেকে ত্রিশটা বাক্স সরিয়ে দেন। তাতে ছিল পঞ্চাশটা মজা কোম্পানির পিস্তল আর কুড়ি হাজার রাউণ্ড কার্তুজ। এই পিস্তলগুলো বিপ্লবীরা সালকিয়ায় একটা গুদামে গিয়ে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু পরে ড্যানিয়েলের পুলিশ ধর-পাকড় শুরু করে। পুলিশ রেইডের খবর পেতেই প্রাণনাথ মৃদঙ্গমকে অনুরোধ করে ওই পিস্তল কার্তুজ সরাতে সাহায্য করতে। সেদিন মৃদঙ্গম প্রাণনাথের জন্য খুব ঝুঁকি নিয়েছিল। ত্রিশটা পিস্তল আর অজস্র কার্তুজ নৌকার খোলের ভিতর রেখে মৃদঙ্গমের কীর্তনের দল নৌকার পাটাতনে শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলার গান গাইতে গাইতে আসছিল। পুলিশের কালো লঞ্চ ওদের খুব কাছাকাছি এসে পড়ায় ওরা বুদ্ধি করে কাঠের বাক্স অতি সাবধানে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে নিজেদের প্রাণ বাঁচায়। ধরা পড়লে ওদের কপালে খুব দুঃখ ছিল। মৃদঙ্গম নিজে সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাস করত না, কিন্তু প্রাণনাথের জন্য প্রাণের ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় নি। আর প্রাণনাথ! সে ওর জন্য কী করেছে! ওকে বাঁচাতে পর্যন্ত পারল না!

প্রাণনাথের দু‘চোখে মাঝে মাঝেই ভেসে আসে কাল্পনিক দৃশ্যটা - ড্যানিয়েল ভারী বুট পরে শায়িত মৃদঙ্গমের বুকে জোড়া পায়ে লাফিয়ে লাথি মারছে। ওই দৃশ্যটা কল্পনা করলেই প্রাণনাথের মাথায় খুন চেপে যায়। ওই ড্যানিয়েলের বুকেও ওভাবেই আমি লাফিয়ে লাথি মারব। তারপর ওর খুলিতে গুলি করব। প্রাণনাথ বিড়বিড় করে বলল, তারপরই নিজেকে সংযত করল, সে মৃদঙ্গমের বাবার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তার পথ এখন অহিংসার।

আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে প্রাণনাথ কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। দরজায় টকটক শব্দ। প্রাণনাথ উঠে বসল। রাত থাকতে থাকতে উঠে মন্দিরা তালা খুলছে। কী অদ্ভুত নিষ্ঠা এই মেয়ের! সবেমাত্র পরশু সে তার প্রিয় দাদার চিতাস্থি সমাধি দিয়েছে।

পাঁচিলের বাইরে পায়খানা। কাঠের খুঁটির ওপর মাচা, তার চারদিকে কাঠের দেওয়াল। নিচের গর্তে পাতা, বালি, মাটি। প্রাণনাথ অন্ধকারে প্রাতঃকৃত্য সেরে বাড়িতে দ্রুতপায়ে ফিরে এসে কুয়োর জলে হাতমুখ ধুলো। পিছনের দাওয়ায় মন্দিরা দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ঘটি। ‘ফ্যানা ভাত আছে। সময় করে খেয়ে নিও, প্রাণনাথদা। বেলা হলে তোমার ঘরে ঢোকা বিপজ্জনক হতে পারে। ক’টা দিন না কাটলে বোঝা যাচ্ছে না কিছু। কাল কোনও অসুবিধা হয় নি তো?”

‘সময় একদম কাটে না। যেন জেলের বন্দীদশা, প্রাণনাথের কাতর কণ্ঠ।

‘একটু দাঁড়াও,’ মন্দিরা দ্রুত মৃদঙ্গমের ঘরে ঢুকে বেরিয়ে এল। হাতে একটা বই। ‘অরবিন্দ ঘোষের কারাকাহিনী। অরবিন্দ ঘোষ কারাগারে একলা নিঃসঙ্গ অবস্থায় এক বছর বন্দী ছিলেন। তখন উনি লিখেছিলেন।’

প্রাণনাথ খুব অভক্তির সঙ্গে বইটা হাতে নিল। সেটা মন্দিরার নজর এড়াল না। মন্দিরা বলল, “কাল সারা রাত আমি ভাবছিলাম, তুমি কীভাবে সশস্ত্র বিপ্লব থেকে সরে এসে নামসংকীর্তন করবে? কীভাবে তুমি এই রক্তপাতের পথ থেকে নিজের চিন্তার স্রোতকে সরিয়ে আনবে? এতো অসম্ভব কাজ! তখন আমার অরবিন্দ ঘোষের কথা মনে হল। মনে হল উনিও তো একসময় বিপ্লবীদের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর সশস্ত্র বিপ্লবের পথ থেকে সরে এসেছেন। ওঁর ভাবনা চিন্তাগুলো কী ছিল? সেটা কি তোমাকে সাহায্য করতে পারে? দাদা অরবিন্দের একজন ভাবশিষ্য ছিলেন। এটা দাদার খুব প্রিয় বই ছিল। জানিনা তোমার কাজে লাগবে কিনা। দেখ পড়ে।’

প্রাণনাথ খড়ুটি ঘরে ঢুকে গেল। মন্দিরা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। প্রাণনাথের মাথায় একটা চিন্তা ঢুকল ধুলটে নিশ্চয়ই অনেক খরচ হয়। সে অত অর্থ কোথা থেকে জোগাড় করবে?”

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%