প্রীতম বসু
করতালতলীতে যেমন একদিকে ধুলটের প্রস্তুতি চলতে লাগল, অন্যদিকে জমিদার অখিলরঞ্জনের সহায়তায় পুলিশ সুপার ড্যানিয়েল প্রাণনাথ কীর্তনীয়াকে গ্রেফতার করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে লাগল। নদীর জলে পুলিশের লঞ্চের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হল, ছদ্মবেশী আউল-বাউলেরা ধুলডাঙায় এসে জড়ো হতে লাগল। ড্যানিয়েল প্রাণনাথকে চেনে না। অখিলরঞ্জনকে বুড়ি বলে গেছে যে এবার অধিবাসে সনাতন কীর্তন গাইবে প্রাণনাথ। ড্যানিয়েল প্রস্তুত।
- ধুলডাঙাতে লোকসংখ্যা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। বৈষ্ণব, বাউল, সাধক, বৈরাগী, ভিখিরী – কারোর হাতে একতারা, কারোর দোতারা, গোপীযন্ত্র, খমক, করতাল, খোল লোকে লোকারণ্য। দলে দলে বৈষ্ণব গোষ্ঠীর গুরু-শিষ্যরা এসে তাদের জন্য নির্দিষ্ট আখড়ায় তাদের বালিশ তোষক ফেলছে। কীৰ্ত্তন, নামগান, পাঠ, এসব চলছে - ধুলডাঙায় আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। নীলমাধবের মন্দিরের দক্ষিণ দিকে একদল মহাতপা ভৈরব-ভৈরবী এসে বিল্ববৃক্ষমূলে স্থির ভাবে ধ্যানস্থ। অনেক সাধু-সন্ন্যাসী শীত তাড়াতে আঁকর সমিধের ধুনি জ্বালিয়ে গাঁজার টানে উর্ধ্বনেত্র। এদের মধ্যে তাগাতাবিজ বেঁধে ইংরেজদের টিকটিকিও বসে আছে কিনা তা প্রাণনাথ জানে না।
অধিবাসের দিন দুপুর থেকে ভক্তরা সামিয়ানার তলে জড়ো হতে লাগল। গোধূলির অন্তিম রক্তরাগ আকাশে রাঙিয়ে গেল, শঙ্খধ্বনি করে শুরু হল খোলমঙ্গল। জমিদার কুমুদরঞ্জন শ্রীখোল-করতালে মালা পরালেন, চন্দন লেপে দিলেন, আর হরিধ্বনি দিতেই প্রাণনাথ কীর্তনীয়া উঠে দাঁড়াল। এই নবীন জ্যোতির্ময় বৈষ্ণবকে দেখে অনেকে হরি হরি বলে উঠল। প্রাণনাথ ধীর পায়ে নীলমাধবের মন্দিরের সিঁড়িতে এসে দণ্ডবৎ হয়ে প্রণাম করল। তারপর সুমিষ্ট কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে বলল জয় নীলমাধবের জয়। ভক্তরা চতুর্দিকে সোৎসাহে - প্রতিধ্বনি তুলে বলল জয় নীলমাধবের জয়। হঠাৎ কোথা থেকে হাজির হয়ে মৃদঙ্গে চড়াং চড়াং করে বোল তুলে প্রাণনাথের পাশে এসে দাঁড়াল ছোকরা খুলী ছিদাম বায়েন। প্রাণনাথ এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। তারপর দু‘চোখ বুজে সনাতন কীর্তনে ডুবে গেল। চৈতন্যপুখুরীর পাড়ে বিশিষ্ট মানুষদের সামিয়ানার নিচে চেয়ারে বসে ড্যানিয়েল সাহেব এতক্ষণে বুঝতে পারল যে তার শিকার কে। খুব সাবধানে একে ধরতে হবে যাতে এই ফাংশনে ভিড় করা রিলিজিয়াস ম্যানিয়াক নেটিভগুলো কোনও রেসিস্টেন্স না দেয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন