প্রীতম বসু
পরদিন সকাল বেলা প্রফেসরের বাড়িতে এসে পদাবলী দেখল প্রফেসরের মুখ থমথমে। অন্যদিন নাইট্রোজেন সকাল সকাল স্নানটান করে ফিটফাট হয়ে থাকেন, আজ স্নান করেননি, উসকোখুসকো ভাব। ‘কী হয়েছে, স্যার?”
প্রফেসর কথা না বলে বৈঠকখানার টেবিলে রাখা খবরের কাগজটা পদাবলীর দিকে এগিয়ে দিলেন। পদাবলী দেখল একটা বিজ্ঞাপন -

‘কী আশ্চর্য?” পদাবলী অবাক। ‘এগার তারিখ থেকে চৌদ্দ তারিখ পর্যন্ত তো আমাদের কীর্তনের অনুষ্ঠান! তার মধ্যে –
“শয়তানির একটা সীমা থাকা উচিত,’ প্রফেসর গজগজ করতে লাগলেন। ‘চন্দ্রকান্তকে শিক্ষা দিতে হবে।’ প্রফেসর দুম দুম করে টেলিফোনের কাছে হেঁটে গেলেন। ফোনটা কাছে টেনে নিয়ে চন্দ্রকান্তের নম্বর লাগলেন। ওদিক থেকে ফোন তুলতেই প্রফেসর চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, “মিঃ সেন, মুখোশটা তাহলে এবার খুলেই ফেললেন। একটা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আর একটা পক্ষীর আবাসকে বেচে সেখানে একটা রিসর্ট নিয়ে আসছেন, শুধু টাকার জন্য। বাঃ! না না, আর কিছু শোনার বাকি রাখেন নি আপনি। আপনার যা করার আপনি করেছেন। এবার আমার যা করার আমি করব। বারো তারিখে কিছুতেই আপনার ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন হবে না। আই সোয়ার। আমি কোর্ট থেকে স্টে অর্ডার আনব। হুমকি? হ্যাঁ, ধরে নিন হুমকিই দিচ্ছি।’
প্রফেসর ফোন নামিয়ে রেখে হাঁফাতে লাগলেন। এক গ্লাস জল খেলেন প্রফেসর। কিছুক্ষণ পর রতি আর হরি বায়েন এল। ওরা সব শুনে খুব উদ্বিগ্ন। রতি বলল আমাদের পরাশরকে জানানো দরকার। প্রফেসরের ফোন থেকে রতি পরাশরকে ফোন করল।
“তোমরা তোমাদের মত এগিয়ে যাও। আমি দেখছি কীভাবে ওকে আটকানো যায়। দরকার হলে আমি সিএম এর সঙ্গে কথা বলব।’ পরাশরের আশ্বাসে রতি আশ্বস্ত হয়ে ফোন রাখল।
হরি বায়েন বলল বাইরের কীর্তনের দলের মধ্যে এখন পর্যন্ত চারটে দলকে রাজি করিয়েছে সে। আশা করছে আরও তিনটে দল আসবে নবদ্বীপ থেকে। ওদের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে।
পদাবলী বলল, ‘গোবিন্দ অধিকারীর বাড়িতে বেশ কিছু চাটাই আর লেপের বন্দোবস্ত করতে হবে।
“তাহলে, প্রোগ্রামের সূচী কী দাঁড়াল?’ নাইট্রোজেন জিজ্ঞাসা করলেন। “প্রথম দিন অধিবাস, এগার তারিখে। তারপরের তিন দিন কীর্তন হবে, সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত।’ পদাবলী বলল।
অধিবাসের দিন গৌরচন্দ্রিকায় গাইবে রতি, সঙ্গে মৃদঙ্গে সঙ্গত করবেন হরি বায়েন। সেদিন কিছু সাংবাদিককে নিয়ে আসব আমি,’ প্রফেসর বললেন। সেদিন ওদের সামনে পদাবলী তুমি ভক্তমণ্ডলীকে শোনাবে সনাতন কীর্তনের রহস্য কাহিনী।’
“হ্যাঁ, পদাবলী বলল। ‘দ্বিতীয় দিন ভজন ডোমকে দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করাতে চেয়েছেন গোবিন্দ অধিকারী। ভজন ডোম বলেছিল ছোটজাতের লোককে পুজোমণ্ডপে গাইতে দেখে অনেকে পছন্দ করবে না। কিন্তু গোবিন্দ অধিকারী বলেছেন যে আমি জানি নীলমাধব পছন্দ করবেন। যে কীর্তনে জাতের বিভেদ থাকে সে কীর্তন শ্রীচৈতন্যদেবের কীর্তন না। তুমি গাইবেই।’
“তাহলে গৌরচন্দ্রিকার রিহার্সালটা দেওয়া যাক?’ রতি বলল।
রতি আর হরি বায়েনকে নিয়ে পদাবলী আর প্রফেসর ভিতরের কীর্তনের ঘরে গিয়ে বসল। রতি কিছুক্ষণ গান গাওয়ার পর দরজায় অধৈর্যভাবে কয়েকবার কলিং বেল বাজল। ‘আমি দেখছি,’ পদাবলী উঠে দরজা খুলতে গিয়ে যাদের দেখল তাদের সে মোটেই আশা করে নি।
রাস্তার ধারে একটা সুমো দাঁড়িয়ে। দরজায় একদল গুণ্ডামত ছেলে আর তাদের মধ্যে জমিদারের ছেলে মনু সেন!
‘এটাই তো প্রফেসর নীতিশ নাগের বাড়ি?’ মনু সিগারেটে টান মেরে সিগারেটটা রাস্তায় টুসকি মেরে দু-আঙুলের টোকায় উড়িয়ে দিয়ে বলল। *মালটাকে ডেকে দে তো।’
‘ভদ্রভাবে কথা বল।’ পদাবলী ঝাঁঝিয়ে উঠল। ‘এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।’ “ভদ্দরলোক!” মনু পরিহাস করে বলল। শালা, ঘরে মধুচক্র চালাচ্ছে, সে কিনা ভদ্রলোক?’
প্রফেসর গণ্ডগোল শুনে বেরিয়ে এসেছেন কে আপনারা
‘আপনার নামে থানায় এফ আই আর লিখিয়ে এলাম। পুলিশ আসছে। আগেভাগে বলতে এলাম, পারলে কেটে পড়ুন।
‘ননসেন্স!’ প্রফেসর রেগে বললেন। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটা কীসের?” ‘খুব নোংরা কাজ করেন আপনি, মনু সেন বলল। ‘ছিঃ ছিঃ! একজন শিক্ষক হয়ে বাড়িতে মধুচক্র চালান?”
“থাম!’ প্রফেসর রাগ সংবরণ করতে পারলেন না। ‘লজ্জা করেনা এত নোংরা কথা বলতে?’
‘আপনি থামুন!” মনু সেন পালটা ধমক লাগাল। ‘আমাদের কাছে খবর আছে একটা খানকি আর তার দালাল তবলচি আপনার বাড়িতে এখনো আছে। বাড়ি সার্চ করলেই পাওয়া যাবে। হাতেনাতে ধরতে পেরেছি। সবকটাকে অ্যারেস্ট করাব। কেউ এখান থেকে বেরোতে পারবে না।”
গোলমাল শুনে রতি আর হরি বায়েন দরজায় এসে দাঁড়াল। মনু সেন রতির দিকে তাকিয়ে বলল, “বললাম, আমার ইনফরমেশন কারেক্ট। মালটা বেশ ডবকা আছে তো। অ্যাই, তোর রেট কত রে?”
রতি কোনও উত্তর দিল না। প্রফেসর বললেন, ‘তোমরা ভিতরে যাও।’ তারপর মনু সেনকে বললেন, ‘আমি বুঝতে পারছি এটা কার বদমায়েশি। আমি তোদের মত পাঁকে নেমে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করব না। পুলিশ আসুক, যা বলার পুলিশকেই বলব।’ প্রফেসর মনু সেনের নাকের ওপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
মনু সেন হনহন করে নিজের গাড়িতে ফিরে ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসল। ‘পক্ষীর আবাস!’ দড়াম করে গাড়ির দরজা বন্ধ করল মনু সেন। “পাখির ওপর ভালবাসা উথলে পড়েছে এদের। আমি দেখাচ্ছি আমি কী করতে পারি।’
মনুর সাগরেদ সিগারেটে টান মেরে বলল, ‘বার্ড স্যাংচুয়ারির তকমা একবার ওই জলায় লেগে গেলে কিন্তু রিসর্ট মায়ের ভোগে। প্রচুর ইন্টেলেকচুয়াল জুটে যাবে পক্ষী বাঁচাও আন্দোলনে। এন্ডেঞ্জার স্পিশিস টিসিস সব খুঁজে খুঁজে বের করবে হারামিগুলো। তোর বাপের ইলেকশনের ড্রিমের অ্যায়সি কি ত্যায়সি করে ছাড়বে। দেখিস না সুন্দরবনের বাঘ-ফাগ কমে যাচ্ছে বলে এরা কেমন কাগজে লেখালেখি করে। শালা, মায়ের চেয়ে মাসির ওপর এদের দরদ বেশি।’
‘ঠিক বলেছিস,” মনু সেন বলল। ‘ইমিডিয়েট পাখিগুলোর কল্যাণ করতে হবে। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন