প্রীতম বসু
পরদিন সকালে অ্যাপয়ন্টমেন্ট ছাড়াই প্রফেসরের বাড়িতে গেল পদাবলী। এছাড়া আর কোনও উপায়ও ছিল না।
কৌতূহল ওকে ছারপোকার মত কুটকুট করে কামড়ে কাল সারা রাত ঘুমোতে দেয়নি। কলেজ খুলবে সেই পুজোর ছুটি শেষ হলে। অতদিনে এই কৌতূহল ওকে গিলেই খেয়ে ফেলবে। তাই – -
কিন্তু নাইট্রোজেন ব্যাপারটা পছন্দ করেন নি। অন্ততঃ নাইট্রোজেনের মুখ দেখে পদাবলীর তেমনটিই মনে হল। কলিং বেল শুনে দরজা খুলে পদাবলীকে দেখে প্রফেসরের বিরক্ত মুখ - ‘কী ব্যাপার?”
‘নমস্কার স্যার, আমার নাম পদাবলী বোস। আমি আপনার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ক্লাসে ছিলাম কালকে।’
“হ্যাঁ, মনে পড়েছে। নমস্কার। কী ব্যাপার বলতো? একদম আমার বাড়িতে চলে এলে?”
‘স্যার, একটা প্রশ্ন ছিল।’
‘কী প্রশ্ন?” বিনা অনুমতিতে ছাত্রটি বাড়িতে আসায় নাইট্রোজেন স্পষ্ট বিরক্ত। সকালবেলাটা বোধহয় ওঁর লেখার সময়। এসময় হুটহাট কেউ তাঁর বাড়ি চলে আসে এটা তাঁর ঘোর অপছন্দ। ‘আমি আজ একটু ব্যস্ত আছি।’
‘আপনি কি সত্যি জানেন না সনাতন কীর্তনের পঙক্তিগুলো?’
“বুঝলাম না, তুমি কী বলতে চাও? তবে এভাবে আলোচনা হয় না। তুমি একদিন ফোন করে এসো, নাইট্রোজেনের হাত দরজার পাল্লায়।
‘সামোদ দামোদর, অক্লেশ কেশব, মুগ্ধ মধুসূদন, স্নিগ্ধ মধুসূদন, সাকাঙ্ক্ষ
পুণ্ডরীকাক্ষ, ধৃষ্ট বৈকুণ্ঠ, নাগর নারায়ণ, বিলক্ষ লক্ষ্মীপতি, মুগ্ধ-মুকুন্দ ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, নাইট্রোজেন হাত তুলে পদাবলীকে থামিয়ে দিলেন।
পদাবলী থেমে গেল।
‘কাল ক্লাসে যখন জিজ্ঞাসা করলাম তখন বলনি কেন?”
পদাবলী শান্তস্বরে বলল, ‘কাল ক্লাসে মনে হচ্ছিল বাংলার গৌরবোজ্জ্বল অতীত সম্বন্ধে ছাত্রদের অজ্ঞতায় আপনি খুব বিরক্ত। আপনি আমাদের খোঁচা দিয়ে আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগাবার চেষ্টা করছিলেন। আমি উত্তরটা দিলে আপনার সেই মহৎ প্রচেষ্টাটা নষ্ট হয়ে যেত। তাই –’
নাইট্রোজেন স্থির দৃষ্টিতে পদাবলীর দিকে তাকালেন। ‘গীতগোবিন্দ পড়েছ?’
“না স্যার, ঠাম্মা ছোটবেলায় জোর করে এই নামগুলো মুখস্থ করিয়েছিলেন। এসো, ভিতরে এসো, নাইট্রোজেন দরজার পাল্লা খুলে দিলেন। … প্রফেসরের বৈঠকখানায় সাদামাটা বেতের সোফা। দু‘দিকের সোফার মাঝে বেতের টেবিল, উপরে কাচ দেওয়া। ঘরের এক কোনে কাচের শো-কেসে বই ঠাসা। অন্য কোনে টিভি। মাঝে দেওয়াল ঘেঁসে ডিভান। ডিভানে হেলান দিয়ে বসার জন্য জয়পুরি কাজ করা কভারের ছোট ছোট বালিশ। পদাবলী বেতের সোফায় বসল। ভিতরে খিলানের পাল্লাহীন দরজায় পর্দা দু‘দিকে গোটানো। ওপাশে একটা ডাইনিং টেবিল, একটা হালকা নীল ফ্রিজের উপর রাখা টেলিফোন। ফোনটা সাদা কুরুশের লেসের ঢাকনিতে ঢাকা। প্রফেসর সোফায় বসলেন না। পা ঝুলিয়ে ডিভানে বসে বললেন – ‘বল, কী দরকার?” -
পদাবলী কাঁধের শান্তিনিকেতনী ঝোলা ফাঁক করে ভিতর থেকে একটা ভাঁজ করা হলদেটে অতি পুরোনো পেপার কাটিং বের করল।
‘এটা কী?” নাইট্রোজেন তাড়াতাড়ি নিজের কাজে ফিরে যেতে চায়। ‘চল্লিশ বছর আগে রোববারের খবরের কাগজে এই আর্টিকেলটা বেরিয়েছিল।’ পদাবলী পেপার কাটিংটা ভাঁজ খুলে সামনের টেবিলে রাখল। কাগজে একটা প্রবন্ধ লেখা -
সনাতন-কীর্তন কি বাস্তব, না শুধুই গল্পকথা ?
-নীতিশ নাগ
‘এটা কি আপনার লেখা, স্যার?”
‘হ্যাঁ, কিন্তু -’ প্রফেসরের দৃষ্টিতে বিস্ময়। ‘এটা তুমি কোথা থেকে পেলে?”
‘এই আর্টিকেলে সনাতন কীর্তনের দুটো পঙক্তি লেখা আছে,’ পদাবলী আর্টিকেলের মাঝামাঝি একটা জায়গায় তর্জনী দিয়ে দেখাল -
কর্পূর তাম্বুল চৈতন্যলীলা
নীল বিমানে ধন্য বরিখ পণ্ডিতে জাদু ছুঁইলা
কিন্তু ক্লাসে আপনি বললেন যে আপনি জানেন না সনাতন-কীর্তনের লাইন!’ ধরা পড়ে গিয়ে নাইট্রোজেন অপ্রস্তুত। একটু থতমত খেয়ে গেলেন। ‘দেখ, আমার লেকচারের বিষয় হল বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস। ক্লাসে স্টুডেন্টদের উৎসাহ জাগাবার জন্য এসব গল্প ব্যবহার করি। তবে যতটা দরকার ঠিক ততটাই। বেশি গভীরে গেলে ছাত্রেরা সাহিত্যের ইতিহাসকে থ্রিলার ভেবে ফোকাস হারিয়ে শার্লক হোমস হয়ে বছরটা কাটিয়ে দিক সেটা আমি চাই না। তাই বেশি গভীরে ঢুকি না। তবে আমি যখন কীর্তনের ওপর পিএইচডি থিসিস লিখছিলাম তখন সনাতন-কীর্তনের এই পদ উদ্ধার করতে পেরেছিলাম।’
‘আমি প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার ব্যাপারে আরও জানতে আগ্রহী। আপনার কাছে কি প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কোনও ছবি-টবি আছে, স্যার?”
‘ছবি? নাঃ। সেসময় সাধারণ মানুষরা কদাচিৎ ফটো তোলাতো। আর গরিব কীর্তনীয়াদের ফটো কে তোলে?”
‘প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কোনও পরিচয় ?’
“আমি বেশ কিছু বৃদ্ধ বৃদ্ধা বৈষ্ণবদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা কেউ সঠিক জানে না ওর পরিচয়। লোককথা মারফত যতটা জেনেছি তা হল প্রাণনাথ কীর্তনীয়া শ্রীকৃষ্ণের মত সুপুরুষ ছিল। বয়স সাতাশ-আঠাশ। গায়ের রঙ গৌরাঙ্গের মত তপ্তকাঞ্চন। সাত্ত্বিক মানুষটা হঠাৎ আবির্ভূত হয়েছিল ধুলটে। তারপর সংকীর্তনে বিভোর হয়ে মন্দিরে নীলমাধবে বিলীন হয়ে গেল। কিছু ভক্ত তো এখনো বিশ্বাস করে স্বয়ং মধুসূদন কীর্তনকে বাঁচাতে প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার রূপে করতালতলীতে নেমে এসেছিলেন।’
“আপনি প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার সনাতন কীর্তন সম্বন্ধে কীভাবে প্রথম জেনেছিলেন, স্যার?”
ছেলেটা প্রচুর প্রশ্ন করছে! এত বছর পর প্রাণনাথ কীর্তনীয়া? নাইট্রোজেন নাকে নেমে আসা চশমার উপর দিয়ে এই ছাত্রটিকে জরিপ করলেন। ‘কীর্তনে শির-বায়েন, মানে যে প্রধান খোলবাদক, তাকে জানতে হয় পদাবলী কীর্তনের কোন পঙক্তি কোন রাগে, কোন তালে কীর্তনীয়া গাইবে। সেভাবেই গায়েনবায়েনের কথা-বাদ্যের মেলবন্ধন হয়। সেটাই প্রথা। প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার খুব কাছের লোক ছিল আঠারো বছরের বায়েন ছিদাম। করতালতলীতে প্রাণনাথ কীর্তনীয়া ছিদাম বায়েনকে বলেছিল সনাতন-কীর্তনের রহস্যের সূত্র।’
‘কিন্তু আপনাকে কে বলল স্যার, এসব কথা?”
‘ছিদাম বায়েন।’
‘ছিদাম বায়েন? নিজে ?”
‘হ্যাঁ, পিএইচডি থিসিসের জন্য গোটা বাংলা চষেছি। কীর্তনীয়াদের আখড়ায় গিয়ে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতাম। করতালতলীও গেছিলাম। তখন আমার সুযোগ হয়েছিল ছিদাম বায়েনের কয়েকটা সাক্ষাৎকার নিতে। তাও চল্লিশ বছর হয়ে গেল। আমি অবশ্য জানিনা এটা গল্প না সত্যি। কিন্তু তুমি চল্লিশ বছর আগেকার এই কাগজ কোথা থেকে পেলে?’
‘আমার একটা পারিবারিক নোটবইয়ের পিছনের মলাটের ভিতরে এই কাগজটা ভাঁজ করা ছিল, স্যার। আমি এই সনাতন কীর্তন ও প্রাণনাথ কীৰ্তনীয়া নিয়ে কিছু পড়াশোনা করতে চাই। আপনি কি আমায় কিছু হেল্প করতে পারেন?”
‘কীর্তন নিয়ে পড়াশোনা?’ প্রফেসর অবাক হলেন।
‘অবাক হলেন, স্যার?”
“তোমাদের বয়সী কোনও ছেলে কীর্তন নিয়ে পড়াশোনা করছে এটা শুনলেই আজকাল অবাক লাগে।’
‘সনাতন-কীর্তন নিয়ে আপনি কি আমায় কিছু বই সাজেস্ট করতে পারেন?”
‘বই!’ নাইট্রোজেনের বিব্রত মুখ। ‘কোনও বইতে তো আমি এসব পড়িনি। আমাদের বাংলার পাড়া গাঁয়ে এরকম কত গল্প থাকে। এসবের মধ্যে এত সত্যি-মিথ্যা মেশানো থাকে যে ‘
‘এ ব্যাপারে আপনার কি মত, স্যার?”
‘পার্সোনালি, প্রফেসর এক দণ্ড থামলেন। ‘আমি বিশ্বাস করি সনাতন-কীর্তন ছিল। হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই।’
পদাবলী এবার শান্তিনিকেতনী ব্যাগের ভিতর থেকে একটা বাঁধানো নোটবই বের করল। মলাটে গোটা গোটা হাতের লেখায় লেখা “গ্রাম বাংলার ব্রত”। ‘এটা দেখুন, স্যার। -
প্রফেসর নোটবইটা খুললেন। অনেক পুরোনো ব্রতকথা গান লিখে রাখা অরণ্যষষ্ঠী, নাগপঞ্চমী, নিত্যষষ্ঠী, সুবচনী, শীতলা, বুড়ঠাকুরণ, ঝেঁটু, কুলাই, মুলাই, অশোক ষষ্ঠী ব্রত, আদর সিংহাসন ব্রত, আদা-হলুদ ব্রত, ইতু ব্রত। এর কিছু নাইট্রোজেনের পরিচিত, কিছু অপরিচিত। শেষ পাতায় এসে বিস্ময়ে প্রফেসরের দু-চোখ আপেলের মত ফুলে গোল।
সনাতন কীর্তন (অষ্টতাল)
কর্পূর তাম্বুল চৈতন্যলীলা
নীল বিমানে ধন্য বরিখ পণ্ডিতে জাদু ছুঁইলা
পাতার বাকি অংশ ছেঁড়া।
‘সনাতন-কীর্তন! এই নোটবই তুমি কোথায় পেলে?”
‘এটা আমার ঠাকুমার। ‘
‘কীর্তনের বাকিটা?’
‘জানিনা। কেউ ওই কীর্তনের শেষটা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।
‘এই নোটবইটা তোমার ঠাকুমা কীভাবে পেলেন?’ এবার নাইট্রোজেনকে খুব উত্তেজিত মনে হল পদাবলীর।
“তা জানার উপায় নেই, স্যার। এটা ঠাকুমার হাতবাক্সে ছিল। ঠাকুমা কক্ষনো এগুলো সম্বন্ধে আমাকে কিছু বলেন নি। উনি মারা যাওয়ার পর ওঁর শ্রাদ্ধের আগে এটা দেখতে পাই। নোটবইয়ের ভিতর আলপিন আটকানো একটা ছবি আমার কৌতূহল জাগিয়েছিল। কে ইনি? সেই কৌতূহলেই ওই ছবিটা আর নোটবইটা তারপর থেকে এটা আমার কাছেই রাখা ছিল।’
“তোমার বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করোনি?
“আমার বাবা-মা আমার ছোটবেলায় একটা গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। আমি ঠাকুমার কাছেই মানুষ।”
“ও, আমি সরি। তোমার বাড়ি কোথায়?”
আগরতলায়। ঠাকুমার মৃত্যুর পর কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে বাংলায় এম তে ভর্তি হয়ে কলকাতা এসেছি অল্প কিছুদিনই হল।’
“সেটা তোমার বাংলার টান শুনে আন্দাজ করতে পারছি। কোথায় থাকো?” “হাতিবাগানের একটা মেসে।’
*কই এখানে তো কোনও ছবি নেই?”
“আমি খুলে রেখেছি, স্যার।’
‘ফটোটা আছে সঙ্গে?” নাইট্রোজেনের দৃষ্টিতে অস্থিরতা।
*হ্যাঁ স্যার। এই নোটবইএর সঙ্গে ছিল একজোড়া রূপোর নূপুর। আর এই সেই ফটো।’ পদাবলী এবার একটা হলদেটে ফটো প্রফেসরের হাতে দিল। গোঁফ-দাড়িওয়ালা একজন সুদর্শন পুরুষ, সদ্য গ্র্যাজুয়েট হয়ে স্টুডিওতে গিয়ে মাথায় কালো টুপি, গায়ে কালো ক্লোক, হাতে মোড়ানো সার্টিফিকেট নিয়ে হাসিমুখে ছবিতে। “আমি জানার চেষ্টা করছি, স্যার, এই মানুষটা কে? এই ছবি কেন আমার ঠাকুমার নোটবইয়ের ভিতর রাখা?
‘ইন্টারেস্টিং!’ প্রফেসর স্বগতোক্তি করলেন। প্রফেসর তারপর ফটোটা ভালভাবে দেখলেন। ‘তোমার ঠাকুমার নাম কী?”
‘মধুরিমা বোস।”
‘মধুরিমা। বাঃ সুন্দর নাম।’
‘বেশ মডার্ন নাম,’ পদাবলী বলল।
‘মডার্ন না, তবে খুব আর্টিস্টিক, প্রফেসর বললেন। ‘যাহা যাহা হেরিয়ে মধুরিম হাস, তাহ তাহ কুন্দ কুমুদ পরকাশ। সেই কবে গোবিন্দদাস কবিরাজ লিখে গেছেন। ঠাকুমার এই পুজো - ব্রতকথার নোটবই আগরতলা থেকে কলকাতা আসার সময় তোমার সঙ্গে নিয়ে এসেছ?”
‘আমি ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস করি না। ব্রতকথা, কীর্তন-টীর্তনে আগ্রহ নেই। আগরতলা থেকে কলকাতা আসার সময় ট্রাঙ্ক গোছাচ্ছিলাম, তখন এই নোটবইটা আবার একবার খুলেছিলাম। এই সনাতন কীর্তনের বাকি লাইন ছেঁড়া কেন, আর এই অচেনা মানুষটা কে এই কৌতূহলেই নোটবইটা কী মনে করে সঙ্গে নিয়ে আসি। আপনার এই প্রবন্ধের পেপার কাটিংটা নোটবইয়ের মলাটের পিছনে ভাঁজ করে রাখা ছিল। অথচ আপনি বললেন সেই কীর্তন হারিয়ে গেছে, তাই আপনার কাছে নিয়ে এলাম। ভাবলাম আপনি হয়তো এই মানুষটাকে সনাক্ত করতে পারবেন।
‘না, আমি তো এঁকে চিনতে পারছি না,’ ফটোটা আরেকবার খুঁটিয়ে দেখে পদাবলীকে ফেরত দিলেন প্রফেসর।
‘স্যার, গোটা সনাতন কীর্তনটা যদি ওই পাতায় লেখা থাকত, তবে আমার কিছু বলার থাকত না। কিন্তু সনাতন কীর্তনটা কেউ ছিঁড়ে নিচের অংশটা নিয়ে গেছে। তাই আমার মনে সন্দেহ যে আমার ঠাকুমার কোনও না কোনও ইতিহাস এই সনাতন কীর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে। আপনার ওই কাগজের আর্টিকেলটাতে দেখলাম ঠিক ওই দুটো লাইনই আছে। তাই আপনার কাছে এলাম - পদাবলী কাগজটা ভাঁজ করল। ‘সরি স্যার, আপনার অনেক সময় নষ্ট করে দিলাম।’
“না না, আমার সময় তুমি মোটেই নষ্ট কর নি। এই সনাতন কীৰ্তন আমি বছর চল্লিশ আগে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। না পেয়ে সব আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। এত বছর পর তুমি একটা নতুন সূত্র নিয়ে এলে। সনাতন কীর্তনের সম্বন্ধে জানে এমন জীবিত ব্যক্তি বোধ হয় একমাত্র করতালতলীর ছিদাম বায়েন। ছিদাম বায়েনের আশির ওপর বয়স হয়ে গেছে, চোখের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ, ওর স্মৃতিশক্তি নাকি একদম লোপ পেয়েছে। তবু আমার মনে হয় তুমি একটা চেষ্টা করতে পার। ওকে গিয়ে এই ফটোটা দেখাও। যদি ও এই মানুষটাকে সনাক্ত করতে পারে।’
‘কিন্তু ছিদাম বায়েনের কাছে সনাতন কীর্তন পাওয়া যাবে কি? এত বছর হয়ে গেল।’
‘ছিদাম বায়েন সনাতন কীর্তনের সঙ্গে মৃদঙ্গ বাজিয়েছিল। থাকলে ওঁর কাছেই থাকবে। আমি যখন ওর কাছে গেছিলাম তখন ওর কাছে রোজ দর্শনার্থী লেগেই থাকত। কেউ কাগজের রিপোর্টার, কেউ মহান্ত, কেউ সাহিত্যিক, কেউ বা খুঁজছে এল ডোরাডো। তারপর বুড়োর শরীর খুব ভেঙে গেল। ওর ছেলে আর কারোকে বুড়োর সঙ্গে দেখা করতে দিত না।’
‘স্যার, একদিন চলুন না দু‘জনে করতালতলী যাই। আপনি তো বললেন ছিদাম বায়েন আপনাকে চেনেন, আপনি সঙ্গে থাকলে-
‘আমি?” নাইট্রোজেন চোখ কুঁচকে বললেন। ‘না না, আমি গেলে সব গোলমাল হয়ে যাবে। আমার সঙ্গে ওর ছেলে গোবিন্দ অধিকারীর খুব ঝামেলা হয়েছিল। লোকটা ভীষণ রুড। তুমি একাই যাও।’
নাইট্রোজেনের চোখে মুখে বিরক্তি। পদাবলী বুঝল কিছু একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে নাইট্রোজেনের সঙ্গে, যার রাগ প্রফেসরের এখনও যায় নি। ও আর ঘাঁটাল না। ‘ঠিক আছে স্যার, আমি একাই যাব করতালতলী। কিন্তু আপনার ওই জমিদার অখিলরঞ্জনের অন্তর্ধান হয়ে যাওয়ার কথা শুনে একটা প্রশ্নের উত্তর মিলছে না, স্যার।’
‘কী প্রশ্ন?’
“আমার মনে হয় নীলমাধবের মন্দিরের নিচে ভূগর্ভে নিশ্চয়ই একটা সুড়ঙ্গ ছিল। মন্দির থেকে পালাবার সেই গোপন পথের সন্ধান সাংকেতিক ভাবে দেওয়া ছিল ওই সনাতন কীর্তনে। প্রাণনাথ কীর্তনীয়া সেটা ধরতে পেরেছিল। সে সেই পথেই পালিয়ে যায় এবং ইংরেজদের ভয়ে কোথাও দীর্ঘকালের জন্য আত্মগোপন করে। কিন্তু বুড়ি কীর্তনীয়ার থেকে সেই গোপন পথের সন্ধান জেনে অখিলরঞ্জন যদি মন্দির থেকে সেই একই গোপন পথে বেরিয়ে যায়, তাহলে সে করতালতলীতে ফিরে এল না কেন? কেনই বা ড্যানিয়েল সাহেবকে ডেকে সেই গোপন পথের হদিশ বলে তার রায়বাহাদুর খেতাব পাওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করল না?’
‘সে প্রশ্নটা আমার মনেও এসেছে,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘দেখ পদাবলী, আমি বাঙলার হারিয়ে যাওয়া কীর্তনীয়াদের সম্বন্ধে প্রচুর পড়াশোনা করেছি। শুধু কীর্তনীয়া কেন, পটুয়া, ভাদু, ঝুমুর থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের গম্ভীরা, জাগ, ভাওয়াইয়া, পূর্ববঙ্গের জারি, ঘাটু - সমস্ত লোকগানের গায়েনদের সম্বন্ধে অনেক তথ্য জোগাড় করেছি। কিন্তু আমি এই করতালতলীর প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার সম্বন্ধে কোনও কিছু তথ্য পাই নি। যেটুকু পেয়েছি তা হল উপকথা। প্রাণনাথ কীর্তনীয়াকে ইংরেজ পুলিশ খুঁজছিল। তাই ও পালিয়ে গেলে পরের প্রায় দেড় দশক মানে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্ত ওর গা-ঢাকা দিয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল ও লোকচক্ষুর অন্তরালে কোথায় ছিল? ভারতের স্বাধীনতার পর কেন প্রাণনাথ আত্মপ্রকাশ করল না? আমি চেয়েছিলাম প্রাণনাথ কীর্তনীয়া সম্বন্ধে একটা ভালমত রিসার্চ হোক। যদি একটা রহস্য চাপা পড়ে থাকে, সেটা উন্মোচিত হোক। কিন্তু আমি সে রিসার্চ শেষ করতে পারি নি।’
‘কেন স্যার?’
নাইট্রোজেন ঠোঁটে ঠোঁট টিপে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘ব্যাপারটা যত সরল ভাবছ তত সরল না। এই প্রবন্ধ কাগজে ছাপার ক’দিন পরেই আমার কাছে একটা চিঠিতে হুমকি আসে যে আমি যদি করতালতলীতে কক্ষনো যাই তবে আমাকে খুন করে ওখানকার জলায় পুঁতে ফেলা হবে। সত্যি বলতে কি আমি বেশ ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমি সেদিন থেকে আর এ ব্যাপারে এগোই নি। টু টেল ইয়ু দ্য ট্রুথ, সেজন্যই আমি তোমার করতালতলী যাওয়ার অনুরোধ রাখতে পারছি না। কী দরকার লাইফে টেনশন বাড়াবার?”
‘কারুকে একথা জানান নি?”
‘না। কিন্তু তুমি সনাতন কীর্তনের ব্যাপারে গবেষণা করতে চাও, তাই তোমাকে এ’ব্যাপারটা জানানো আমার দায়িত্ব বলে আমি মনে করেছি। তোমাকে আমার উপদেশ যে করতালতলীর জমিদারবাড়িটাকে এড়িয়ে থেক। এমনকি এ ব্যাপারে যে তুমি এত কিছু জানো সেকথাও কারুকে প্রকাশ কোরো না। তুমি ট্যুরিস্ট হিসেবেই করতালতলী যাও। ঘন্টা তিনেক তো লাগে। ভোরবেলা ট্রেন ধর, রাতে ফিরে আসতে পারবে। করতালতলী স্টেশনে নেমে গোবিন্দ কীর্তনীয়ার বাড়ি বললেই তোমাকে লোকে দেখিয়ে দেবে। তবে তোমার প্রথম বাধা হল গোবিন্দ অধিকারী, ছিদাম বায়েনের ছেলে।
‘বাধা কেন, স্যার?”
‘লোকটা খুব রগচটা। ও আজকাল কারুকে ছিদাম বায়েনের সঙ্গে দেখা করতে দেয় না। দেখ চেষ্টা করে। গুড লাক।’
‘ঠিক আছে, স্যার। ধন্যবাদ।’ পদাবলী নোটবই, কাগজ ব্যাগে ঢোকাল। ‘দেখি গোবিন্দ অধিকারী ছিদাম বায়েনের সঙ্গে দেখা করতে দেয় কিনা। পুজো কেটে গেলেই একবার ঢুঁ মারব করতালতলী।’ পদাবলী উঠে দাঁড়াল।
প্রফেসরের বাড়ি থেকে বেরোবার সময় পদাবলীর মনে হল একটা কীর্তন মানুষকে অদৃশ্য করে দেয় এটা কি কখনো সম্ভব? কিন্তু প্রফেসরের সঙ্গে কথা বলে মনে হল ও যে পথে হাঁটতে যাচ্ছে সে পথে প্রফেসর অলরেডি একসময় হেঁটে এসেছেন। কিছু খুলে না বললেও প্রকাশ পেয়ে গেল প্রফেসরের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর হয় নি। কিন্তু ঠাম্মা এর মধ্যে জড়াল কীভাবে? আর ঠাম্মা কেনই বা এই সনাতন কীর্তনের ব্যাপারটা চিরজীবন গোপন রাখল? রহস্যটা ভাঙতে হবে। প্রথম হার্ডলটা আগে পার হতে হবে। গোবিন্দ অধিকারী। ও কি আদৌ ছিদাম বায়েনের সঙ্গে দেখা করতে দেবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন