প্রীতম বসু
বুড়িকোশীর পাড়ে ধুতরোহাটের শ্মশান। শ্মশান থেকে কিছুটা দূরে খেয়াঘাট। খেয়াঘাটে পদাবলীর পাশে ভারাক্রান্ত মনে বসে গোবিন্দ অধিকারী। নামের মতই বিগতযৌবনা নদী এই বুড়িকোশী। শীর্ণকায়া নদীর মাঝে একটা চর জেগে আছে। উদাস দৃষ্টিতে গোবিন্দ অধিকারী সেদিকে তাকিয়ে আছে। পদাবলীর আজ ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে, কিন্তু এসময়ে এই বৃদ্ধকে একা ছেড়ে চলে যেতে বিবেক সায় দেয় নি। কিছুক্ষণ আগে পদাবলী দেখে এসেছে চিতার আগুনে হারিয়ে যাচ্ছে একজন কীর্তনীয়ার দেহ। একটা পাথরের ওপর বসে গোবিন্দ অধিকারীর হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল পদাবলী। মানুষটার মনে খুবই আঘাত লেগেছে। তার ওপর মাথায় চিন্তা। করতালতলীর কীর্তনও চিতায় উঠবে? হঠাৎ গোবিন্দ অধিকারীর হাতের আঙুলের নাচন থেমে গেল।
‘শুনেছ?”
পদাবলী শুনেছে। ‘শ্মশান থেকে আসছে।’ সুরেলা খালি গলায় গান
আমায় দংশেছে গৌরাঙ্গ ভুজঙ্গ
বিষেতে জারিল জ্বলে গেল সর্ব অঙ্গ
এ ভুজঙ্গ দংশেছে অন্তরে
বিষ যায় না মণি মন্তরে –
নাই তাগা বাঁধবার স্থান কিসে হবে ত্রাণ
শেষে যায় যে পরান আশার সঙ্গ।।
চোখ বুজে বসে গান শুনল গোবিন্দ অধিকারী। গান শেষ হতে তৃপ্তির স্বরে বলল, “আহা! রূপচাঁদের ঢপ কীর্তন। কতদিন পর শুনলাম। মনের যত দুঃখ যেন মুছে দিয়ে গেল। আহা! ‘ গোবিন্দ অধিকারী উঠে দাঁড়াল, ‘চলতো - “কোথায়?”
‘কে গাইছিল একবার দেখতে হবে না?’ গোবিন্দ বলল। ‘কী ভক্তি, আহা! চলতো দেখি লোকটা কে?”
নদীর উঁচু পাড়ে ইট বসানো পথ। পাশেই শ্মশান। কীর্তন থেমে গেছে কিছুক্ষণ। গামছার কৌপীন আঁটা একটা কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলে চিতার পাশের শান বাঁধানো চাতালে কলসী থেকে জল ঢালছে আর নারকেল ঝাঁটা দিয়ে ঝাঁট দিচ্ছে। কালো সুঠাম দেহ, মাথায় ঝাঁকড়া রুক্ষ চুল। ঝাঁটার জল ছিটছে তাই পদাবলী দূর থেকেই গলা খাঁকারি দিতেই ডোম তাকাল। ‘কে গান গাইছিল? তুমি?’ পদাবলী বলল।
“হ্যাঁ, কেন?”
‘ঢপ,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল।
‘ঢপ মারতে যাব কেন?’ ছেলেটা রুক্ষ গলায় বলল।
‘তুই যে কীর্তনখানা গাইলি সেটার কথা বলছি। ওটা রূপচাঁদের ঢপ কীর্তন। কিন্তু এ কীর্তন তো বাংলার মাটি থেকে কবে হারিয়ে গেছে, তোকে এটা কে শিখিয়েছে?”
‘ও,’ ডোম আর কোনও কথা না বলে আবার জল-ঝাঁট লাগাতে লাগল।
‘তোমার গলায় মধু আছে,’ পদাবলী বলল।
প্রশংসাবাক্য ছেলেটার ঠোঁটে সামান্যও হাসি জাগাল না। ও ঝাঁট দিতে দিতে বলল, “তোমরা সরে যাও। পরের মড়া আসার আগে জায়গাটা সাফ করে নিই।’
‘আমাদের কীর্তনের দলের জন্য একজন শিরগায়েন খুঁজছিলাম, ‘ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘তোর নাম কী?’
‘ভজন।’
“তুই আমাদের কীর্তনের দলে গাইবি?”
এবার ঝাঁট দেওয়া বন্ধ হল। ছেলেটা সোজা হয়ে তাকাল, চোখে একরাশ বিস্ময় - ‘আমি?’
‘হ্যাঁ, আমাদের শিরগায়েনটা কলকাতায় ভগবতী জাগরণের দলে যোগ দেবার জন্য দল ছেড়ে দিয়েছে। আমি লোক খুঁজছিলাম - ‘
‘পাগল!’ গোবিন্দ অধিকারীর কথা শেষ করার আগেই ভজন ডোম বলল ‘আমি কোনও দিন কীর্তন-টীর্তন গাই নি।’
‘এই তো বেশ গাইলি বাবা রূপচাঁদের কীৰ্তনখানা।’
হাতে ঝুলন্ত ঝাঁটা থেকে টপটপ করে পায়ে জলের ফোঁটা ঝরছে, ডোম বলল, ‘আপনি কী বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি এই একটা দুটোই গান জানি। আমার দাদু রোজ সন্ধ্যাবেলা চিতার শান ধুতে ধুতে এই গানই গাইত, বাবাও গাইত একই গান। আমিও তাই গাই। রূপচাঁদ-টাদ জানিনা।’
‘আমি সব শিখিয়ে নেব, তুই আমাদের দলে গান গাইবি কিনা বল।
‘আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে বৈরাগী মশাই। আপনি বৈষ্ণব, নিরামিশাষী, আর আমি ডোম – আপনাদের মত রোজ রোজ শুক্তো-ঘন্ট-চচ্চড়ি -আমার মুখে রোচে না। আমি মাছ, মাংস, রসুন, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে মদ, তাড়ি, গাঁজা সবই খাই –’
‘আরে নিত্যানন্দ প্রভু নিজেই তো বৈষ্ণব ভক্তমণ্ডলে থেকেও মাছ, মাংস খেতেন, মদ্যপান করতেন।’
‘নিত্যানন্দ প্রভুটা কে? আপনার গুরুদেব?”
‘হ্যাঁ, তা আমাদের বাংলার সকল কীর্তনীয়াদেরই গুরুই বলতে পারিস।’ ‘দলে চণ্ডাল ঢুকলে বাকিরা দল ছেড়ে পালাবে, ভজন ডোম বলল। গোবিন্দ অধিকারী প্রসন্ন মুখে বলল, না রে। আমরা হলাম বৈষ্ণব –
ব্রাহ্মণ আচণ্ডাল কুক্কুরান্ত করি
দণ্ডবৎ করিবেক বহুমান্য করি ৷৷
এই সে বৈষ্ণবধর্ম্ম সবারে প্রণতি – ‘
‘ছাড়ুন ওসব ছেঁদো কবিতা, ডোম ছেলেটা গোবিন্দ অধিকারীকে মাঝপথে
থামিয়ে দিল। ‘ডোম যদি কীর্তন গায় কেউ শুনতে আসবে না। তাছাড়া বাজারে কি কীর্তনীয়াদের অভাব? অন্য কারুকে ধরুন আপনারা। আমার দ্বারা হবে না।’ ‘কেন ভাই? ঠাকুর দেবতার সামনে দুটো গান গাইবি, মানা কেন করছিস?’ ‘সেখানেই তো বিপদ, ডোম বলল। ‘আমি নিচু জাত – আপনাদের ঠাকুরের সামনে গাইতে গেলেই লোকজন হৈ হৈ করে উঠবে।’ -
‘নাম সংকীর্তনে উঁচু জাত নিচু জাত হয় না। সবাই সমান,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল, “আরে আমাদের এত পুরোনো কীর্তন কোম্পানি প্রায় উঠে যেতে বসেছে। কীর্তন কোম্পানির এতগুলো লোক না খেতে পেয়ে মারা যাবে। জমিদারবাড়িতে আমাদের কীর্তন শুনে খেপে গিয়ে জমিদারের ছেলে আমাদের বেধড়ক পিটিয়েছে, টেম্পোভ্যানের কাচ পাইপ মেরে ভেঙে দিয়েছে, আমাদের কাছে মাইনে দেবার মত টাকা নেই। লোকগুলোর পরিবার খাবে কী?’
ডোম ঝাঁটা হাত থেকে ফেলে বলল, ‘কীর্তনে খুব ভক্তি লাগে, ঠাকুর। আমার ভক্তি-টক্তি একদম নেই। তোমরা এখন যাও। আমার এখানে পুরোটা জল-ঝাঁট দিতে হবে। কার কী রোগ টোগ থাকে তো জানিনা, তাই জল-ঝাঁট দিতে হয় ভাল করে। আর বৈরাগী ঠাকুর, আরেকটা কথা, আমার ক্যারেক্টার ভাল না। আমি বেশ্যাপট্টিতে যাই মেয়েছেলের দোষ আছে আমার। আমাকে নিলে তোমাদের বদনামই হবে।’ ডোম আবার ঝাঁট দেওয়া শুরু করল। -
গোবিন্দ অধিকারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পদাবলী সেই দীর্ঘশ্বাসের ভাষা পড়তে পাড়ল। এই প্রৌঢ় মানুষটা খুব ক্লান্ত, তার মনে এখন ধীরে ধীরে সংশয় চেপে বসছে – করতালতলীর মাটি থেকে তাহলে কি সত্যিই কীর্তন মুছে যাবে? -
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন