প্রীতম বসু
বাড়ির উঠোনের একপাশে পাঁচিলের প্রান্তে একটা গোলাকৃতি ক্ষেত্র। পাঁচিলের ঠিক বাইরে একটা হরীতকী গাছ উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে। গাছ থেকে পাকা হরীতকী ফল আর কিছু শুকনো পাতা পড়ে আছে সেই গোলাকার জমির ওপর। মন্দিরা চিতাস্থিঘট নিয়ে সেদিকে গেল। মৌন ছিদাম কুমুদরঞ্জনকে ধরে ধরে নিয়ে এগোল। ওখানে মৃদঙ্গমের মায়ের মহাবিশ্রামের স্থান।
ছিদাম কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ল। জাতবোষ্টমদের শবদেহ গর্তের ভিতর উপবিষ্ট অবস্থানে সমাধি দেওয়া হয়। শবের মাথায় তুলসীপাতা রেখে, তার ওপর সৈন্ধব লবণ ঢেলে মাটি চাপা দেওয়া হয়। মৃদঙ্গমের চিতাস্থির ঘট গর্তে রেখে তার ওপর তুলসীপাতা রেখে, লবণ দিয়ে ঢেকে বৃদ্ধ উবু হয়ে বসে ঘটে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বললেন, ‘খোকা, তুই কথা দিয়েছিলি ধুলটে এসে গাইবি। তুই দেখিস আমি ধুলট করবই। তুই স্বর্গ থেকে শুনিস।”
ছিদাম আর কুমুদরঞ্জন সমাধি মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে লাগল। প্রাণনাথ নিচু হয়ে হাঁটু মুড়ে বসে এবার সমাধিতে মাটি দিতে যেতেই বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন আহত সাপের মত হিস হিস করে উঠলেন। কুমুদরঞ্জনের হাতের এক ঝটকায় প্রাণনাথের হাতের মুঠো খুলে ঝুরো মাটি উঠোনে ছড়িয়ে গেল। কুমুদরঞ্জন ঘেন্নার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘একজন খুনি আমার পুত্রের সমাধিতে কক্ষনো মাটি দেবে না।’
প্রাণনাথ আর কোনও কথা বলল না। উঠে ওদের পিছনে অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে রইল। সমাধিতে মাটি ভরাট করে বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন চোখ মুছতে মুছতে ঘরের ভিতরে চলে গেলেন।
দুপুরে কুমুদরঞ্জনের ধুম জ্বর এল। মন্দিরা কম্বল চাপা দিয়ে বাবার মাথার পাশে বসে জলপটি দিতে লাগল। বৃদ্ধ জ্বরের ঘোরে ভুল বকছেন। অস্ফুটস্বরে মৃদঙ্গম-ধুলট এসব বলে চলেছেন। জ্বর আর নামে না। মন্দিরা খলে বেটে বৃদ্ধকে কবিরাজি ভেষজ খাওয়াবার চেষ্টা করল। মন্দিরা বারবার ভেজা গামছা দিয়ে বৃদ্ধের মাথা, গলা, হাত মুছে দিতে লাগল। এতে কুমুদরঞ্জন আরাম পেয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন।
আজ এ গৃহে অরন্ধন। মন্দিরা হেঁসেলে ঢুকল কিন্তু হেঁসেলের উনুনে আগুন দেওয়ার মত শক্তি বা ইচ্ছে মন্দিরার নেই। ছিদাম কবিরাজের কাছে গেল ওষুধ আনতে। প্রাণনাথ পাশের ঘরে এসে বসল। খোলের ভিতর পিস্তলটা। মৃদঙ্গমের বাড়ি মোটেই নিরাপদ আশ্রয় নয়। ওকে এবার এখান থেকে অন্যত্র পালাতে হবে। ইংরেজরা ওকে খুঁজতে বারবার এখানে আসতে পারে। কিন্তু এদের এভাবে অসহায়ের মত ফেলে রেখে প্রাণনাথ যায় কীভাবে? আর এখান থেকে বেরোবার আগে ওর একটা প্রশ্নের জবাব চাই যে কেন মৃদঙ্গমকে মারা হল? রান্নাঘর থেকে অনেকক্ষণ চাপা কান্নার আওয়াজ আসছে। মৃদঙ্গমের বইয়ের তাকের দিকে এগিয়ে গেল প্রাণনাথ। এক এক করে বই নামিয়ে নামিয়ে দেখতে লাগল সন্দেহজনক কিছু যদি পাওয়া যায়। বঙ্কিমবাবুর কপালকুণ্ডলা, দুর্গেশনন্দিনী, কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, পদাবলী সাহিত্য, অরবিন্দের কারাকাহিনী। ছিদাম ফিরে এসে মন্দিরাকে হেঁসেলে গিয়ে নিচু গলায় কিছু বলছিল সেটা টের পেয়েছে প্রাণনাথ। মন্দিরা সন্ধ্যাবাতি নিয়ে ঘরে আসল, মন্দিরার দু‘চোখ লাল। মন্দিরা থমথমে গলায় বলল, ‘বাইরে পুলিশে ছয়লাপ।’ প্রাণনাথ মন্দিরাকে নিচু গলায় বলল, ‘মৃদঙ্গমের শ্রাদ্ধ হয়ে গেলেই আমি
চলে যাব। এই তেরোদিন আমি এখানেই থাকব।’
“আমাদের জাতবোষ্টমদের রীতি তিনদিন অশৌচ পালন করা, তিনদিন হবিষ্যি খাওয়া, চতুর্থ দিনে মহাপ্রভুর ভোগ আর কীর্তন হয়। প্রভুর প্রসাদ খেয়ে আমাদের অশৌচমুক্তি হয়।’
‘শ্রাদ্ধ ? পিণ্ডদান?”
‘আমাদের জাতবোষ্টমদের বিশ্বাস প্রেতাত্মা বলে কিছু নেই। আমরা প্রেতলোক মানিনা। ঈশ্বর আর এই পৃথিবীর এই বর্তমান জীবনই সত্য। তাই আমাদের পিণ্ডদান হয় না। আমার মায়ের মৃত্যুর পরও শুধু মহাপ্রভুর ভোগ আর কীর্তন হয়েছিল।’
‘আমার এখানে থাকাটা তোমাদের পক্ষে বিপজ্জনক। তাই আমি তোমাদের অশৌচমুক্তি হয়ে গেলেই চলে যাব।’
“ছিদাম রেড়ির তেল আনতে গেছিল বাজারে। বলে গেল বাজার লাল পাগড়িতে ছেয়ে গেছে। পুলিশ তোমাকে খুঁজছে। এখন বেরোলেই ধরা পড়ে যাবে। অবস্থা একটু শান্ত হোক, তারপর চলে যেও।’
আর তোমরা?’
মন্দিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দাদা আমার সব চেয়ে আপনজন ছিল। মা মারা যাওয়ার পর দাদাই আমাকে সব থেকে আদর দিয়ে বড় করেছে। আজ মা‘র কথা খুব মনে পড়ছে।’
প্রাণনাথ চাইছিল মন্দিরা কথা বলুক। এ অবস্থায় কাছের মানুষের কাছে মন হালকা করলে বুক থেকে ভারী পাথরটা নেমে যায়। শান্তি পাওয়া যায়। প্রাণনাথ বলল, “মৃদঙ্গম কখনো আমায় তোমাদের মা‘র কথা বলে নি।’
‘মা খুব ভাল কীর্তন গাইত। মা‘র আঁচল ধরে বসে আমি শুনতাম মা‘র গলায় কীর্তন। বাবা নিজে খুব ভাল শ্রীখোল বাজিয়ে কীর্তন গাইতেন।’ ‘তোমার মামাবাড়িতে কারুকে খবর দেবে?’
“আমার মামাবাড়ি মণিপুরে।’
‘মণিপুরের মেয়ে হয়ে কীর্তনগান জানতেন?
‘বাবা একবার তীর্থ করতে কামাখ্যা গেছিলেন। আসামে শঙ্করদেবের ঘোষা কীর্তনে গাইতে এসেছিল এক মণিপুরের কীর্তন দল। ওদের কীর্তন শুনে বাবা চমৎকৃত, ওদের কীর্তন হুবহু বাংলার কীর্তনের মত।’
‘কীভাবে সেটা সম্ভব?”
‘প্রাচীন কালে মণিপুর রাজ্য শৈব ধর্মাবলম্বী ছিল কিন্তু মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র সিংহের সময় বাংলা থেকে নরোত্তম ঠাকুরের শিষ্যেরা এসে সেখানে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। রাজা-প্রজা সকলে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেন। তারপর থেকে মণিপুরবাসীরা বাংলার বৈষ্ণব ধর্মের রীতিনীতি, পূজা পার্ব্বণ, আচার অনুষ্ঠান সমস্ত অনুসরণ করে এসেছে। আসাম থেকে মণিপুরে গিয়ে অবাক হয়ে গেছিলেন বাবা। মণিপুরে বাঙলার মত পালা কীর্তন হয়। কীর্তনের মূল গায়ক সাদা ধুতি, চাদর পরে কপালে চন্দন লাগিয়ে, গলায় মালা পরে মনোহরসাই কীর্তন গায়। ওখানে এক সম্প্রদায়ের কীর্তনীয়া দেখলেন যারা মাথায় পাগড়ি বেঁধে নটপালা কীর্তন করেন। তাদের নট গায়ক বলা হয়। আর এই নট গায়ক বৃদ্ধ নটবর নটের তরুণী মেয়েকে দেখে বাবা থমকে গেলেন। কী অপূর্ব কীর্তনের গলা এই মেয়ের। নিমাইসন্ন্যাসের গান গাইছিল মেয়েটা -
সন্ন্যাসী না হইও রে নিমাই
বৈরাগী না হইও
ঘরে বইসে কৃষ্ণ নামটি
মায়েরে শুনাইও
গান শুনতে শুনতে বাবা যেন শচীমাতার দুঃখ নিজের মর্মে অনুভব করলেন, দু‘চোখ ভরে এল জলে। তারপর আবার রাসলীলায় একই মেয়ের কী অপরূপ নৃত্য ! মণিপুরের কীর্তন নৃত্যের সঙ্গে পরিবেশিত হয়। মণিপুর নাচের দেশ। এখানে কীর্তনে সুরের প্রাধান্য না দিয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় তালের ও নৃত্যের। তাল ভঙ্গের অপরাধ অমার্জনীয়। সেই মেয়ে যখন অভিসারিনী রাধা হয়ে ঘন অন্ধকারে, বজ্র বিদ্যুৎ বৃষ্টির মধ্যে পঙ্কিল পথে কৃষ্ণের অভিসারে চলেছে সেই দৃশ্যের অসামান্য নৃত্য ও কীর্তন শুনে বাবা তার প্রেমে পড়ে যান এবং নায়িকার বাবা নটের কাছে তার মেয়ের পাণি প্রার্থনা করেন। সামান্য নট গায়কের কাছে এই প্রস্তাব সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু সেই মেয়ে বিবাহের জন্য এক শর্ত রাখে যে তার স্বামীকে ভেক নিয়ে তাদের মত জাতবোষ্টম হতে হবে।’
‘জাতবোষ্টম কী?’
‘জাতবৈষ্ণবরা বৈষ্ণবসমাজের একটি উপদল। এরা চৈতন্যোপাসক এবং বর্ণাশ্রমবিরোধী। এরা ব্রাহ্মণ পৌরোহিত্য মানে না, এদের বিয়ে এবং মৃতের সৎকার রীতি একদম আলাদা। এদের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এবং বর্ণাশ্রমী বৈষ্ণবসমাজ অস্পৃশ্য বলে মনে করে।’
“কেন?”
‘উচ্চবর্ণের বৈষ্ণবরা মনে করে সমাজের নিম্নবর্ণের হিন্দু বা বৌদ্ধ নেড়ানেড়ীরাই জাত বদলে বৈষ্ণবধর্ম নিয়ে জাতবোষ্টম হয়। হয়তো আমার মায়েদের পূর্বপুরুষ বৌদ্ধ থেকে ভেক নিয়ে বৈষ্ণব হয়েছিল।’
‘তোমার বাবা ধর্ম পালটাতে রাজি হলেন?”
‘হ্যাঁ। বাবা রাজি হলেন। বাবা ভেক নিয়ে জাতবোষ্টম হলেন। কুমুদরঞ্জন সেন থেকে কুমুদরঞ্জন দাস। তারপর কৃষ্ণের সামনে মালাচন্দন করে দু‘জনের বিয়ে হল। বৎসরান্তে একদিন ভোরবেলা পত্নীর সঙ্গে করতালতলীতে এসে উপস্থিত হলেন বাবা।’
*এই ধর্ম পরিবর্তন বাড়িতে মেনে নিল?’
‘এই বিবাহের খবরে আমার কাকা অখিলরঞ্জন প্রচণ্ড খেপে গেলেন। তিনি নিজে ব্রাহ্ম, বৈষ্ণবদের দু‘চক্ষে দেখতে পারতেন না। উনি নাকি এতদিন সমাজে মদের আসরে ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে বৈষ্ণবদের উচ্চকণ্ঠে গালি দিতেন –
চেটান্তি পেটান্তি মালা টেপা উদাসিনী -
মাগ-হারা যমে পোড়া
এরাই ছ’জন বোষ্টমের গোঁড়া
এখন নিজের ভাই বোষ্টম হয়েছে এ কথা হজম করতে উনি অপারগ হলেন। নিজে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন-মনে ধরেছে, গরিব মেয়েছেলে, তা রক্ষিতা রাখ। ধম্মো পালটে, বেজাতে বিয়ে করে বাড়িতে একটা সেবাদাসী ঢুকিয়েছে! বংশের মান মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দিলে? আমি এই নাচনেওয়ালী মেয়েছেলেকে কিছুতেই বাড়ির গৃহিনী হিসেবে মানি না, কক্ষনো মানবও না।’
‘তারপর?’ প্রাণনাথ এসব কথা এই প্রথম শুনছে।
মন্দিরা উঠে দাঁড়াল - ‘বাবাকে একবার দেখে আসি।’ বলে পাশের ঘরে গেল। অল্পক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, ‘বাবা ঘুমোচ্ছে। জ্বর আছে। আমি কপালে জলপটি পালটে দিলাম।’ মন্দিরা মোড়ায় বসল “জমিদারবাড়িতে এবার নিত্য সান্ধ্যকীর্তন শুরু হল। মায়ের সুললিত কণ্ঠ আর তার সঙ্গে বাবার মৃদঙ্গ যেন ভক্তির প্লাবন বইয়ে দিল। ব্রাহ্মরা কীর্তন ঘোরতর অপছন্দ করত, অখিলকাকা দাদুর কাছে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বললেন অবিলম্বে এই কীর্তন বন্ধ করা হোক। কিন্তু আমার দাদু, জমিদার বৃদ্ধ বরদারঞ্জন, তাঁর পুত্রবধূর কীর্তন শুনে চোখের জল আটকে রাখতে পারতেন না। নিজেই রোজ সন্ধ্যা কখন আসবে এই ভেবে ভেবে সকাল থেকে অস্থিরতায় ভুগতেন। বিকাল হতে না হতেই স্নান সেরে কোরা ধুতি, ফতুয়া পরে উপস্থিত হতেন নাটমন্দিরে, ফিরতেন সেই ভোগারতির পর। অখিলকাকা রোজ রাগারাগি করতেন, কিন্তু উনি পুত্র অখিলরঞ্জনের কথায় কান দিতেন না। কীর্তন যে রকম চলছিল সেরকম চলতে লাগল। অখিলকাকা ইংরাজী আদব কায়দা রপ্ত করেছিলেন। সাহেব মেমদের বাড়িতে ডেকে পার্টি দিতেন। অখিলকাকা খুব রাগী। নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক ব্রাহ্মরা তখন পৌত্তলিকদের বংশীধারী কৃষ্ণের বা চৈতন্যদেবের পট সামনে রেখে গাওয়া কীর্তনকে সহ্য করতে পারত না। অখিলকাকাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। ধুলটে যাতে তাঁর বাড়ির মেয়েরা নগরকীর্তন দেখতে না বেরোয় তার জন্য কড়া হুকুমে সদর দরজা বন্ধ থাকত। অখিলকাকা কীর্তনের জন্য বাড়িতে অশান্তি করতে শুরু করলেন।’
‘তারপর?’ প্রাণনাথের কৌতূহল বাড়ছিল।
‘তারপর, একদিন অবস্থা চরমে উঠল। রায়সাহেব হওয়ার প্রচেষ্টায় সাহেব মেমদের নিয়ে তখন অখিলকাকা ঘনঘন পার্টি দেন, তাদের অনেক উপহার দেন, সেবছর এমনই এক সন্ধ্যাবেলার পার্টিতে হাইকোর্টের জজসাহেবও কৃপা করে অখিলকাকার গৃহে পদধূলি দিয়েছেন। জমিদারবাড়ীর বাঁধানো পুষ্করিণীর পাশে দু‘দিকে ঝাউগাছের সারি দেওয়া খোয়া বাঁধানো পথে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি ঝলমলে জুড়িগাড়ি। রেলস্টেশন থেকে সাহেবদের আনবার জন্য অখিলকাকা এসব ব্যবস্থা করেছেন। ঘরের ভিতরে বিলাতী পিয়ানো-অর্গান বাজছে, জরি দেওয়া উর্দিপরা খানসামারা চপ, কাটলেট, হুইস্কি সোডার বোতল রূপোর থালায় নিয়ে গোরা অতিথিদের আপ্যায়ন তদ্বিরে ব্যস্ত হয়ে তাদের পিছনে পিছনে দৌড়াদৌড়ি করছে। সাহেবরা তাদের গেলাসের মদে চুমুক দিচ্ছে। এমন সময় বাড়ির লাগোয়া নাটমন্দির শঙ্খ-ঘন্টা-আরতি-উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠল। জজসাহেবের মদের নেশা টুটে গেল। “ডিসগাস্টিং” বলে পানপাত্র নামিয়ে রাখলেন জজসাহেব। “হোয়াট ইজ দিজ ক্যাকোফোনি? মনে হচ্ছে জেল থেকে কয়েদী পালাইয়াছে, তাই পাগলাঘন্টি বাজিতেছে।”
“কীর্তন।”
“কীর্টন!”
“হুজুর, মাই লর্ড! সকালে একটু শেক্সপিয়ের পড়ব তাও এই চিৎকারে পারি না।” অখিলরঞ্জন ভাবলেন গোটা সম্পত্তিটি অধিকার করার এর চেয়ে আর ভাল সুযোগ আসবে না। “মাঝে মাঝে ভাবি কোর্টে দিই কেস ঠুকে।”
“কেস লড়ো,” জজসাহেব বলল। “পিস ডিসটার্বেলের জন্য আমি তিন বছরের সাজা দিব।”
“কী করে কেস লড়ি? আমার নিজের ভাই, শেম!”
“টুমাদের ক্যারেক্টার উইক,” জজসাহেব বলল। “তাই তোমরা ভাব যে ভানুমতির খেলের মত কোনও ম্যাজিসিয়ান, কিংবা কংসের দমনের মত কোনও অবতার-টবতার বা ভগবান তোমাদের ফ্রিডম এনে দেবে। তাই তোমরা এখনো দেবতার লীলার জন্য ওয়েট করে থাক। কাওয়ার্ড!”
রায়সাহেব গদগদ কণ্ঠে বলল, “ঠিক বলেছেন সাহেব। আপনি আমাদের বেঙ্গলীদের ক্যারেকটারের ইনসাইড যাকে বলে, লেন্স দিয়ে দেখেছেন।”
“মাইক্রোস্কোপ,” জজসাহেব হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে বলল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছেন।” সাহেবের রূপোর পানপাত্রে স্কটল্যাণ্ডের দামি মদ্য ঢালতে ঢলতে অখিলরঞ্জন বললেন। “যদি আপনি অভয় দেন, তবে আমি মোকদ্দমা করতে পারি। ডিক্রী করে ওদের বাড়ি থেকে উৎখাত করে দিন হুজুর। আমি ওদের ন’বিলের ওপারে করতালতলীর জলা-জঙ্গলে পাঠিয়ে দেব। ওখানে পুরোনো নীলকুঠিতে ও ব্যাটা হাভেলি বানাক, কামটুঙ্গি বানাক, যা খুশি করুক, ওখানে গিয়ে করুক ক্যাকোফোনি কীর্তন।”
জজসাহেবের বিরক্তি বাকি সাহেবদেরও বিরক্ত করল, কৃষ্ণনামে ওদের বল নাচ-টাচ একদম জমল না, সাহেবরা তাড়াতাড়ি প্রস্থান করল। ক্রুদ্ধ অখিলরঞ্জন দুম দুম করে নাটমন্দিরে এসে উপস্থিত হলেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে খুব কলহ হল। অখিলরঞ্জন তাঁর বাবাকে বললেন জমিদারী ভাগ-বাটোয়ারা করে দিতে নতুবা তিনি অন্নজল ত্যাগ করবেন।
কোর্টের লেখাপড়া জজসাহেবের সহায়তায় শীঘ্রই নিষ্পত্তি হল। কৌরবপাণ্ডবদের মত সমান সমান ভাগ। চৈতন্যপুখুরী, নীলমাধবের দেউল ও তার সন্নিহিত জলাজমির মালিক হল বড় ভাই কুমুদরঞ্জন। আর ছোটভাই অখিলরঞ্জন পেলেন বাকি সমস্ত জমিদারি। কিন্তু এই নাটমন্দিরে আর কখনো কীর্তন হবে না। বৃদ্ধ জমিদার বরদারঞ্জনের সায় না থাকলেও কিছু করার ছিল না, নিজে অশক্ত, জমিদারি দেখাশোনা সব করে এই অখিলরঞ্জন। তিনি ছেলের বানানো উইলে সই করলেন - নদীর পাড়ে বিস্তৃত পনের বিঘা নিচু অনাবাদী জলাজমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহৃত হবে, সে জমির মালিকানা থাকবে কুমুদরঞ্জন ও তাঁর বংশধরের হাতে। বাকি সম্পত্তির মালিক অখিলরঞ্জন।
অখিলরঞ্জন গোটা জমিদারবাড়ি রং-টং করিয়ে বিরাট ভিত্তি সেলিব্রেশন করলেন। গাড়ির পর গাড়ি উদয়নপল্লীর কাঁচা রাস্তায়। এত গাড়ি এ’তল্লাটে কখনো আসেনি। টায়ারের ধুলোয় ধুলোয় গোটা গ্রাম ঢেকে গেল। এখন আর কীর্তন নেই। অখণ্ড শান্তি।
করতালতলীর জলাজমির থেকে কোনও আয় ছিল না, স্বল্প উপার্জন ব্যবহৃত হবে নীলমাধবের মন্দিরের উন্নয়ন ও নিত্যপূজার খরচ চালাতে। কুমুদরঞ্জন যতদিন জীবিত থাকবে, বাকি জমিদারির বার্ষিক উপার্জনের দশ শতাংশ ভাতা হিসাবে পাবে। কিন্তু বরদারঞ্জন তাঁর উইলে লিখলেন যে বছরে একদিন দুর্গা পূজার দশমীর রাতে সপত্নী কুমুদরঞ্জন নাটমন্দিরে এসে কীর্তন গেয়ে যাবেন মায়ের বিসর্জনের পর। দশমীর মাঝরাত থেকে একাদশীর বিকেল পর্যন্ত চলত ঠাটকীর্তন। মা গাইত অপূর্ব গলায় শ্যামচাঁদ দাস রচিত শ্রীকৃষ্ণের বাললীলা- তীন্দ্র দ্রিমিকি ধ্বনি তাথৈ তাথৈ শুনি
নৃগধি দূগধি বাজে তাল।।
লহু লহু হাসত ভাষ মৃদু বোলত
নিকসত মতিম দন্ত রসাল।
মায়ের লীলাকীর্তন শুনতে নাটমন্দিরে লোক গিজগিজ করত।
বাবা করতালতলীতে এসে চৈতন্যপুখুরীর সংস্কার করলেন। বাগদী প্রজারা এসে আমাদের এই বাড়িটা যত্ন করে বানাল। জমিদারি ইটের ইমারত না, গরাণ কাঠের খুঁটির ওপর চারচালা। কাদা, তুষ, পাটের কুচি মিহি করে ছেনে টেকসই তুষুটি করা বাড়ি। বাড়ির দেওয়ালে কারুকার্য আঁকা হল। আর বাড়ির সামনে তৈরি হল ছোট একচালা মাটির ঘর। ওটা খড়ুটি করা বলে ওটার নামই হয়ে গেল খড়ুটি ঘর। চতুষ্পাঠী। ওখানেই মা আর বাবা দু‘জনে ছাত্রদের কীর্তন শেখাবেন। কীর্তনের বাদ্যের নামে ছেলে মেয়ের নাম রাখলেন মৃদঙ্গম আর মন্দিরা। কিন্তু মা বেশিদিন বাঁচলেন না। হঠাৎই ম্যালেরিয়ায় উনি দেহ রাখলেন। পত্নী বিয়োগের পর সুহৃদরা বাবাকে দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহের পরামর্শ দেন কিন্তু বাবা আর বিয়ে করেন নি। এই সাদামাটা জীবনের মধ্যেও বাবা একটা বিরাট কাজ করলেন যার প্রসিদ্ধি সারা বাংলায় ছড়িয়ে গেল। বাবা করতালতলীতে নীলমাধবের মন্দিরের সামনে ধুলট মেলা শুরু করলেন, আর দেখতে দেখতে সেই কীর্তন মহোৎসবের খ্যাতি কাটোয়া, শান্তিপুর, জাজীগ্রাম, নবদ্বীপের মেলার মত সর্বজনবিদিত হয়ে পড়ল। এখন এই মন্দির আর বার্ষিক ধুলট মেলা বাবার জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাসের মত। এই ধুলট না থাকলে বাবার প্রাণ চলে যাবে।’
‘তোমার বাবা তাই জ্বরের ঘোরের মধ্যে তোমার দাদার নাম বলছেন আর বলছেন ধুলট। তোমার দাদা চলে যাওয়ার আঘাতেই বাবার এই জ্বর এসেছে। তোমার দাদার অবর্তমানে ধুলট যে হবে না এটা ওঁর অবচেতনে ওঁকে পীড়া দিচ্ছে।’
‘ঠিক,’ মন্দিরা চিন্তিত মুখে বলল।
“গতবছর কী ধুমধাম করে ধুলট হল,’ প্রাণনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘মন্দিরা, আমি মৃদঙ্গমের ইচ্ছা পূরণ করব। এবছরের ধুলটের আয়োজন করব আমি।’ ‘না!” পাশের ঘরে যেন গর্জন করে উঠলেন কুমুদরঞ্জন।
ওঘর থেকে কাঁপতে কাঁপতে কুমুদরঞ্জন ঘরে ঢুকলেন। ‘কিছুতেই না। আমি বলেছি যে একজন খুনি কখনোই কীর্তনের আয়োজক হতে পারে না।’ বৃদ্ধের স্নিগ্ধ চাহনি অন্তর্হিত হয়ে সেখানে ক্রোধ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
মন্দিরা ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল উঠে এলে? চল চল ওঘরে।’ “বাবা, তোমার গায়ে এত জ্বর। তুমি কেন
কুমুদরঞ্জনের চোখ জ্বরে রক্তিম, ‘আমি কিছুতেই তা হতে দেব না। এই খুনিকে আমার বাড়ি থেকে এক্ষুনি বিদেয় হতে বল।’
প্রাণনাথ বলল, “আমি খুনি না। আমি আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র ধরেছিলাম। মৃদঙ্গমকে ওরা যেভাবে মারছিল
‘মিথ্যা কথা বোলো না,’ কুমুদরঞ্জন ধমক লাগালেন। ‘তুমি বোমা বানাও মৃদঙ্গমকে বাঁচাবার জন্য, না ইংরেজদের মারার জন্য?”
“যারা অত্যাচারী ইংরেজ তাদের মারার জন্য,’ প্রাণনাথ শান্তস্বরে বলল। ‘তাহলে! সেটা খুন হল না?”
‘অত্যাচারীকে হত্যা করা যদি খুন হয়, তবে আপনার কৃষ্ণও খুনি। উনি তো কংসকে হত্যা করেছিলেন। তাহলে আপনি খুনির নামকীর্তন করেন কেন?”
কুমুদরঞ্জন নিরুত্তর। বোধহয় মনের ভিতর যুতসই উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তারপর কড়া গলায় তাঁর রায় শোনালেন, ‘আমার বাড়িতে হিংসার কোনও স্থান নেই। এই খুনি যদি এ বাড়িতে থাকে তাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।’
এবার মন্দিরা বিরক্তকণ্ঠে বলল, ‘বাবা, প্রাণনাথদা শুধু দাদার অস্থি মায়ের সমাধির পাশে পৌঁছে দেবার জন্য নিজের প্রাণের ওপর এত বড় ঝুঁকি নিয়ে এখানে এল। ছিদাম খবর দিল বাইরে পুলিশের গুপ্তচর ছদ্মবেশে চারদিকে ঘুরে বেরোচ্ছে। প্রাণনাথদা এখন বাইরে বেরোলেই ধরা পড়ে যাবে। ওর এই বিপদের সময় ওকে কিছুদিন আমাদের এখানে আশ্রয় দিতেই হবে।
প্রাণনাথ এবার দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘বিপদকে আমি ভয় পাই না। আর মরতে তো একেবারেই না। এ পথের প্রতিটি বাঁকে বিপদ ওৎ পেতে থাকবে তা জেনেই আমরা এই পথ বেছে নিয়েছি। আমি আজ রাতেই এখান থেকে চলে যেতে পারি। আপনাদের দয়ার দরকার পড়বে না আমার। নিজের খেয়াল আমি নিজে রাখতে পারব। কিন্তু এই বাড়ি ত্যাগ করার আগে আমার জানতেই হবে নির্দোষ মৃদঙ্গমকে কেন হত্যা করা হল? আর মৃদঙ্গমের অনুরোধ ছিল তার অবর্তমানে আমি যেন তার স্থান গ্রহণ করে ধুলটের আয়োজন করি,’ প্রাণনাথ এক দণ্ড থামল। আর আমি তা করবই।’
‘মৃদঙ্গমের স্থান গ্রহণ করবে?” বৃদ্ধের গলায় শ্লেষ। “বেশ, মৃদঙ্গমের স্থান গ্রহণ করতে হলে তোমাকে মৃদঙ্গম হতে হবে,’ কুমুদরঞ্জন বললেন। মৃদঙ্গম অহিংস আন্দোলন করত। ওর স্বপ্ন ছিল গ্রামসমাজের শক্তি ও দেশজ সংস্কৃতির শক্তির উত্থানের মাধ্যমে বাঙালির আত্মমর্যাদা ও আত্মপ্রতিষ্ঠাবোধের উন্মেষ করা। দেশকে স্বাধীন করা। মৃদঙ্গম সশস্ত্র আন্দোলনকে ঘৃণা করত। মৃদঙ্গমের স্থান গ্রহণ করতে হলে তোমাকে সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়তে হবে। পারবে? তুমি কক্ষনো আগ্নেয়াস্ত্র ধরতে পারবে না। তোমার চিন্তার মধ্যেও তুমি আগ্নেয়াস্ত্র, হত্যা, এসব স্থান দিতে পারবে না। যদি তা পার, তবেই আমি তোমাকে ধুলটের আয়োজনের অনুমতি দেব।’
‘কিন্তু বাবা, প্রাণনাথদাকে ইংরেজ পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওকে পেলে ওরা দাদার মত নৃশংস ভাবে হত্যা করবে। আত্মরক্ষার্থে ওকে আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখতেই হবে যাতে – ‘
‘না!” দৃঢ়স্বরে কুমুদরঞ্জন বললেন। ‘ওকে একটা পথ বেছে নিতে হবে। ধুলট উৎসব হল প্রেমবীথি। হিংসার পথে গেলে ধুলটের কাছেপিঠে আমি ওকে দেখতে চাই না। বল তুমি পারবে?’
প্রাণনাথ নিরুত্তর।
‘রক্তপাত মদের মত একটা নেশা। আর স্বাধীনতার দোহাই সেই নেশার পানপাত্র,’ কুমুদরঞ্জনের গলায় শ্লেষ।
‘জানতাম তুমি পারবে না।’
প্রাণনাথ কিছুক্ষণ চুপ হয়ে ভাবল। তারপর বলল, ‘বেশ, আমি কথা দিলাম। আমি মৃদঙ্গমের ইচ্ছা রাখব। সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে আমার আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না। আমি ধুলটের সমস্ত আয়োজন করব।’
- মন্দিরার দু-চোখে বিস্ময়। মন্দিরা বলল ‘কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে এ ১৭৯।প্ৰাণনাথ হৈও তুমি
যুদ্ধে তুমি অস্ত্র ছাড়া লড়বে কীভাবে প্রাণনাথদা?”
‘শ্রীকৃষ্ণ গোটা মহাভারতের যুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করেন নি।’ তারপর প্রাণনাথ কুমুদরঞ্জনকে বলল, ‘আমি অস্ত্রত্যাগ করলাম।’
‘মন্দিরা, কাল সকালে মন্দিরে যাওয়ার আগেই ওকে চালাঘরে লুকিয়ে রাখ, ‘ সমাধির কুমুদরঞ্জন বললেন। ‘তবে আজ রাতেই তোমার আগ্নেয়াস্ত্র মৃদঙ্গমের পাশে গর্ত খুঁড়ে সমাধি দিতে হবে।’ কুমুদরঞ্জন নিজের কক্ষে ফিরে গেলেন।
মন্দিরার চোখে-মুখে অস্বস্তি। ‘তুমি বাবার কথায় কিছু মনে কোর না, প্রাণনাথদা। বাবার মনের অবস্থা তুমি বুঝতে পারছ।’
প্রাণনাথ মন্দিরার কথায় মনোনিবেশ করছিল না, ও অবাক হয়ে ভাবছিল যে সে এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল! অস্ত্রত্যাগ করলে ওর স্বাধীনতা সংগ্রামের কী হবে? কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে সে প্রতিশ্রুতি রাখতেই হবে। ধুলটের পর আবার সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ফেরা যাবে। প্রাণনাথ ওর খোলের বাঁয়ার আলাতোলার চামড়া ধরে টান মারল। চড়চড় করে আঠা দিয়ে সাঁটা চামড়া খুলে এল। প্রাণনাথের হাতে উঠে এল চামড়ার খাপে রিভলভার। “চলো, এতে যদি মৃদঙ্গমের আত্মার শান্তি হয়, তবে তাই হোক!”
প্রাণনাথ আর মন্দিরা উঠোনে মৃদঙ্গমের সমাধির দিকে হেঁটে গেল। পাঁচিলের বন্ধ সদর দরজায় টক টক করে টোকা মারল কেউ। প্রাণনাথ ক্ষিপ্রপদে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। মন্দিরা দরজা খুলছে। প্রাণনাথ ঘরের প্রদীপ এক ফুঁয়ে নিভিয়ে রিভলভারটা চামড়ার খাপ থেকে খুলে প্রস্তুত হয়ে রইল।
মন্দিরা দরজা খুলল।
“তুই? এখন?” মন্দিরার গলা।
“গোঁসাইজ্যাঠার চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছিলাম ঘর থেকে। ওনার শরীর ভাল
না। তাই এলাম দেখতে যে কিছু দরকার আছে কিনা?”
“আয় আয় ভিতরে আয়। আশেপাশে কেউ নেই তো?” ‘না।’
মন্দিরা দরজা বন্ধ করতেই প্রাণনাথ ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এল। দু‘জনে এবার মৃদঙ্গমের সমাধির দিকে এগোল। পিছনে বিস্মিত দৃষ্টিতে ছিদাম। প্রাণনাথ রিভলভার চামড়ার খাপে ঢোকাল। তারপর মৃদঙ্গমের সমাধির ঠিক উপরে একটা অগভীর গর্ত করল। রিভলভারটা চামড়ার খাপে ঢুকিয়ে বোতাম আটকে সেই গর্তে ঢুকিয়ে দিয়ে মাটি ফেলে সেই গর্ত বুজিয়ে দিল। প্রাণনাথ পিছন ফিরে দেখল দাওয়ার অন্ধকারে এক ন্যুব্জ ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে এই আগ্নেয়াস্ত্রের সমাধি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন