প্রীতম বসু
দুপুরে তৈরি হয়ে ফুলবাগান বাটার সামনে গোবিন্দ অধিকারীর জন্য অপেক্ষা করছিল পদাবলী। গোবিন্দ অধিকারী দূরে ধুঁকতে ধুঁকতে আসছে। লোকটার মুখ খুবই শুকনো। বোঝাই যাচ্ছে এই প্রৌঢ় মানুষটা খুব ক্লান্ত।
‘আবার কোনও ঝামেলা হয়েছে?’ গোবিন্দ অধিকারী কাছে আসতে পদাবলী বলল।
‘ঝামেলা তো লেগেই আছে। আমার টেম্পোভ্যানের ড্রাইভার বিশে এবার আমার দল ছেড়ে চলে গেল। ও এখন থেকে জমিদারের ম্যাটাডোর চালাবে।”
‘জমিদার আপনাকে একদম একঘরে করে দিল, পদাবলী বলল। ‘আজ কাঁধে এত ভারী ঝোলা? কোথাও গেছিলেন নাকি?”
‘হ্যাঁ, একটু কাজ ছিল,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল।
‘অন্য কোনও ঝামেলা নাতো? আপনার মুখ এত শুকনো?”
“না না সে ঠিক আছে। অন্য কিছু কাজ ছিল,’ গোবিন্দ অধিকারী তাড়াতাড়ি বিষয়টা পালটালো। ‘একজনের সঙ্গে দেখা করার ছিল। এখন কী করতে চাও?” ‘আচ্ছা বলুন তো অন্নকূট উৎসব উপলক্ষে কি কীর্তন গানের ধুলট উৎসব করা যেতে পারে? মাঘী সপ্তমী মানে ফেব্রুয়ারি অনেক দেরি হয়ে যাবে। ততদিনে ওরা রাস্তা বানিয়ে ফেলবে। জমিদার চন্দ্রকান্ত সেনকে একদম টাইম দেওয়া যাবে না।’
গোবিন্দ অধিকারী কিছু না বুঝে পদাবলীর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বলল, ‘ধুলট যে কোনও সময়ই করা যেতে পারে। কিন্তু, ধুলটমেলা করা কি মুখের কথা নাকি? তাছাড়া মন্দিরের অবস্থাটা তো নিজের চোখেই দেখলে। সব মিলিয়ে কত খরচ জান? কে এত টাকা দেবে?”
“ওসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। চলুন।’
“কোথায়?”
‘লালবাজার।’
“লালবাজার ! কেন?’
‘মেলার জন্য পুলিশের পারমিশন চাই।’
গোবিন্দ অধিকারী বিস্মিত মুখে পদাবলীর সঙ্গে অটোতে উঠল।
লালবাজারে ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশের কামরায় মুক্তার সঙ্গে দেখা হল। মুক্তা ডালহৌসীতে মামার সঙ্গে দেখা করে সোজা চলে এসেছে। পদাবলী বলল, “ইনি গোবিন্দকাকা। ইনিই তোমার কালাগলা মানিকজোড় দেখেছেন।’
মুক্তা বিগলিত হয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ এই খবরটা দেবার জন্য।’ তারপর মুক্তা গোবিন্দ অধিকারীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে, আপনাকে কিছুক্ষণ আগে ডালহৌসীতে খৈতান অ্যাণ্ড চ্যাটার্জী অ্যাসোসিয়েটস অ্যাট ল’ ফার্মে দেখলাম না? আমার বড়মামা ওই ফার্মের পার্টনার। ওখানে কাজ ছিল?”
‘আপনি উকিলের কাছে গেছিলেন?’ পদাবলী অবাক। গোবিন্দ অধিকারী তাকে কিছু লুকোচ্ছে? ‘কোনও মামলা মোকদ্দমার ঝামেলা না তো?”
‘না না, কোনও অসুবিধা নেই,’ গোবিন্দ অধিকারী তাড়াতাড়ি কথা ঘোরাল। ‘কাল ভোরে আমি আর বিশে গেছিলাম ডহরের মাঝে লগি ঠেলে ডিঙি নিয়ে, দেখে এসেছি পাখি দুটোকে।’
‘আমি কয়েকটা ফটো তুলতে চাই,’ মুক্তা উত্তেজিত হয়ে বলল। ‘আমি করতালতলীতে গেলে আমাকে আপনি পাখির বাসার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারবেন প্লীজ?’
‘কেন পারব না?’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘কবে আসবে আমায় জানিও। আমি না থাকলেও বিশু ড্রাইভার তোমায় দেখিয়ে দিতে পারবে। স্টেশনের বাইরের চায়ের দোকানের পাশের গলিতেই ওর বাড়ি। বিশ্বনাথ বলে খোঁজ করলেই দেখিয়ে দেবে। আমি বিশুকে বলে রাখব।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ,’ মুক্তা বলল। তারপর পদাবলীকে বলল, ‘আমি বাপিকে সব জানিয়েছি। বিজ্ঞাপনটা এনেছ?’
পদাবলী বিজ্ঞাপনের খসড়াটা দেখাল। সব পড়ে মুক্তার বাবা, পুলিশের ডেপুটি কমিশনার বললেন, ‘তোমরা কীর্তনের মত একটা হেরিটেজকে আর একটা হিস্টোরিক্যাল সাইটকে বাঁচাবার চেষ্টা করছ। এতে আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। কিন্তু যে কোনও একটা মেলা আয়োজন করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেক ভিজিটার আসার সম্ভাবনা থাকলে আমাদের সেফটি ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হয়। ফার্স্ট এইড, অ্যাম্বুলেন্স, ড্রিঙ্কিং ওয়াটার, পাবলিক টয়লেট, পুলিশ ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হয়। তোমাদের জেলা প্রশাসকের আর পুলিশের পারমিশন চাই।’
‘সেটা পাওয়া সহজ হবে না,’ পদাবলী বলল। ‘আপনাকে মুক্তা হয়তো বলেছে যে করতালতলীর ভূতপূর্ব জমিদার বংশের উত্তরাধিকারী চন্দ্ৰকান্ত সেন সামনের ইলেকশনে দাঁড়াচ্ছে। সে চায় ধুলডাঙা, পাশের চৈতন্যপুখুরী সব এক প্রোমোটারকে বিক্রি করে দিতে, সেই প্রোমোটার ওখানে একটা রিসর্ট বানাবে, আর তার বিনিময়ে জমিদার অনেক টাকা কামাবে। ওই জমিদার ওই অঞ্চলে খুব প্রভাবশালী ব্যক্তি। উনি নিজেই খোদ বিডিওর সামনেই এই ভদ্রলোককে শাসিয়েছেন। আমার মনে হয় উনি জেলা প্রশাসক আর থানার ওসিকেও প্রভাবিত করবেন। হয়তো মেলার পারমিশনই পাওয়া যাবে না।”
‘সেটা অসম্ভব না। রাজনীতিবিদরা পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সে জন্য আমাদের অন্য রাস্তা ধরতে হবে,’ ডিসিপি বললেন। ‘যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙে।’
“কী সেই রাস্তা?” গোবিন্দ অধিকারী বলল।
‘আপনারা এটাকে ধুলটমেলা বলবেন না। বলবেন আপনারা আপনাদের নীলমাধবের মন্দিরে বিগ্রহের পুণঃপ্রতিষ্ঠা করছেন। সেই উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী কীর্তনগান এসব হবে। নিজের জমিতে নিজেদের মন্দিরের বিগ্রহের পুজো করতে বিধায়কের পারমিশন লাগে না। করতালতলী থানার ওসি আমার পরিচিত। আমি ফোন করে দিচ্ছি আপনারা ওঁকে শুধু চিঠি দিয়ে ফর্মাল ভাবে এটা জানিয়ে রাখুন। ব্যাস।’ তারপর ডিসিপি নিজে বিজ্ঞাপনটা কেটেকুটে ছোট করে দিলেন।

‘এইটা হ্যাণ্ডবিলের মত ছাপিয়ে স্টেশনে স্টেশনে সেঁটে দিতে হবে। তারপর দেখা যাক কী হয়,’ পদাবলী বলল।
গোবিন্দ অধিকারী কাগজটা চোখ কুঁচকে দেখল – ‘এই লোকটা কে?’ -
পদাবলী জিভ কামড়াল। প্রফেসর বারণ করেছিলেন যে উনি এর মধ্যে জড়িত সেটা যেন গোবিন্দ অধিকারী না জানে। কিন্তু এখন টু লেট। ‘ইনি আমাদের প্রফেসর,’ পদাবলী বলল, ‘ইনি আমাদের অনেক সাহায্য করছেন।’
‘এর নাম কেটে দাও।’
‘কেন?’ পদাবলী যারপরনাই স্তম্ভিত।
‘আমাদের বাইরের লোকেদের সাহায্য দরকার নেই।’ গোবিন্দ অধিকারী যেন নিজেকে সংযত করে কথাটা বলল। ‘ওনার নামটা কেটে দাও।’
‘না, উনি আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন, উনিই আপনার কীর্তনের বায়না ধরে দিয়েছিলেন। ওঁকে আমি কাগজটা দেখিয়েছিও। উনি রাজি হয়েছেন। আমি ওঁর নাম কাটতে পারব না।’
গোবিন্দ অধিকারীর চোখ-মুখের বিরক্তি দেখে পদাবলী বুঝতে পারল কথাটা লোকটার একদম পছন্দ হল না। গোবিন্দ অধিকারী পদাবলীর দিকে কুটিল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘একটা সত্যি কথা বলতো, তোমায় কি উনিই বারবার করতালতলীতে পাঠাচ্ছেন?’
“উনি পাঠাবেন কেন? আমি নিজেই যাচ্ছি করতালতলীতে।’
‘উনি আমাদের অত সাহায্য করতে কেন চান?”
প্রশ্নটা পদাবলীর মনেও, কিন্তু আপাততঃ গোবিন্দ অধিকারীর জন্য তার কাছে একটা উত্তর আছে – ‘কারণ উনি কীর্তন ভালবাসেন।’
“ওই ফোর-টোয়েন্টি লোকের সঙ্গে আমি কাজ করব না, গোবিন্দ অধিকারী গম্ভীর গলায় বলল।
‘ফোর-টোয়েন্টি!” পদাবলী বিরক্ত হয়ে বলল। ‘জানেন এই লোকটাই পঞ্চাশ হাজার টাকা ডোনেশন দিচ্ছেন যাতে মন্দির মেরামত করে পুজো শুরু করা যায়। আর আপনি ওকে ফোর-টোয়েন্টি বলছেন?”
‘কেন এত টাকা দিচ্ছেন? জানা নেই শোনা নেই হুট করে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করছেন?’ গোবিন্দ অধিকারী পালটা প্রশ্ন করল।
পদাবলী চুপ। সত্যি প্রফেসর কেন এত বড় একটা ডোনেশন দিচ্ছেন?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন