প্রীতম বসু
পদাবলী যখন ঘুরপথে করতালতলী পৌঁছাল তখন সূর্য ডুবে গেছে কিন্তু আকাশে রক্তিমাভা মুছে যায় নি। খেয়াঘাটে নেমে পদাবলী দ্রুত পায়ে নীলমাধবের মন্দির পেরিয়ে হাঁটতে লাগল গোবিন্দ অধিকারীর বাড়ির দিকে। বাঁদিকে আগাছায় ঢাকা ভাঙা বাড়িটা। গোবিন্দ অধিকারীর টেম্পোভ্যানটা সামনে। পদাবলী টেম্পোভ্যানের দরজা খুলতে ধূপের গন্ধ পেল। পিছনের সিটের নিচ থেকে শাবলটা বের করে পদাবলী ভাঙা বাড়িটার দিকে রওনা দিল। বাড়িটা আধো অন্ধকারে ভূতুড়ে বাড়ির মত দাঁড়িয়ে। পদাবলী টর্চটা বের করে নিল হাতে। ভাঙা পাঁচিলের লাগোয়া কাঠের দরজায় হালকা ধাক্কা মারতেই দরজা ফাঁক হল। ভিতরে ঢুকল পদাবলী। ভিতরে আলো-আঁধারি। সাপ-টাপ না থাকলেই অবাক হওয়ার কথা। পদাবলী মাটিতে পা দিয়ে ধুপ-ধুপ করে শব্দ করল। চালের নিচে ঝুলন্ত একজোড়া চামচিকে বিরক্ত হয়ে দিকভ্রষ্টের মত এদিক ওদিক দ্রুত ডানায় উড়ে বেরিয়ে গেল। উঠোনের সামনে বাড়ির দালান, এখানেই এইদিনেই ছিদাম চোদ্দ-শাক মন্দিরাকে এনে দিয়েছিল। উল্টোদিকে একচালা, এখানে প্রাণনাথ কীর্তনীয়া লুকিয়ে ছিল। চারদিকে এত জঙ্গলা যে এর মধ্যে কোন কোনায় যে এদের পারিবারিক সমাধিক্ষেত্র তা বোঝা যাচ্ছে না। পদাবলীর দৃষ্টিগোচর হল বিশাল হরীতকী গাছটা ধসে যাওয়া মাটির প্রাচীরের গা ঘেঁসে। সমাধির ওপর এই গাছটা ছায়া দিত। তার মানে ওই কোনাটায় মৃদঙ্গমের চিতাস্থির ঘটটা মাটির নিচে পুঁতে ছিল প্রাণনাথ। পদাবলী আগাছা ডিঙ্গিয়ে উঠোনের কোনায় পৌঁছাল আর তারপর শাবল দিয়ে জমি খুঁড়তে শুরু করল। অল্প কিছুক্ষণ খুঁড়তেই শাবল যেন কিসে আঘাত করল। পদাবলী টর্চ মারল। রিভলভারের চামড়ার খাপ। চামড়ার ঔজ্জ্বল্য অস্ত গিয়ে এখন বিবর্ণ ফ্যাকাসে। পদাবলী চামড়ার খাপটা তুলে মাটি ঝাড়ল। ভিতরটা খালি!
রিভলভার নেই!
পদাবলী এবার আরও খুঁড়তে লাগল। মাটির আরও গভীরে গেল, হয়তো রিভলভারটা খাপের বাইরে পড়ে গেছে। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে শাবলের ধাতব প্রান্ত ঠক করে লাগল কিসে। একটা ঘট। মৃদঙ্গমের চিতাস্থির ঘট। পদাবলী মাটি খোঁড়া বন্ধ করল। তারপর খোঁড়া মাটি আবার চাপা দিয়ে গর্ত বুজিয়ে দিল। যে প্রশ্নের উত্তরের জন্য ও এসেছিল তার উত্তর ও পেয়ে গেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন