প্রীতম বসু
বাড়িতে দুটো ঘর। মন্দিরা তক্তপোষে প্রাণনাথের বিছানা করে দিয়েছে। ঘরের জানলার পাশে কাঠের টেবিল। মৃদঙ্গমের লেখাপড়ার জায়গা। দু’ঘরে দুটো ইজিচেয়ার। প্রাণনাথ ইজিচেয়ারে লম্বা হয়ে ছাতের কার্নিশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল এবার কোথায় যাবে। কাঁসার গ্লাসে জল নিয়ে মন্দিরা ভিতরে ঢুকল। ‘সত্যি প্রাণনাথদা, তোমায় গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে মোটেই ভাল লাগছে না। দেখতে। তোমার ভূষণ সেই গাম্ভীর্যটাই যেন চলে গেছে। গোঁফটা না কাটলে কি চলছিল না?”
“গুঁফো কীর্তনীয়া কখনো দেখেছ? স্টেশনেই ধরা পড়ে যেতাম। আমারই কী ভাল লেগেছিল, অত সাধের গোঁফ বিসর্জন দিতে?”
- … মন্দিরা হাসল “স্বাধীনতার জন্য কী আত্মত্যাগ!’ গ্লাসটা প্রাণনাথের তক্তপোষের শিয়রের পাশে রাখা জলচৌকিতে রেখে একটা সরা দিয়ে ঢাকল মন্দিরা। ‘ওই গেরুয়া বৈরাগীর পোশাকে তোমাকে মনে হচ্ছিল জোর করে সন্ন্যাস নেওয়ানো হয়েছে তোমায়।’ তারপর প্রাণনাথের পোশাকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দাদার পিরান তোমার ভালই ফিট করেছে। এই পিরানে আবার গৃহস্থ-গৃহস্থ লাগছে। ‘
‘হ্যাঁ, মৃদঙ্গমের কাপড়-জামা কাচায় খুবই আলসেমি। কতবার সভা করতে যাওয়ার জন্য আমার পাঞ্জাবী গায়ে গলিয়ে বাবু দিব্যি চলে গেছেন। এখন ক’দিন তার হিসেব চুকাবো।”
প্রাণনাথের পায়ের কাছে মোড়া টেনে বসল মন্দিরা। প্রাণনাথের চোখে চোখ রেখে উদ্বিগ্নকণ্ঠে নিচু গলায় বলল, ‘তুমি পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন প্রাণনাথদা? সত্যি করে বলোনা, কী হয়েছে?”
- প্রাণনাথ কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে সামলাল, মৃদঙ্গমের বাবা ঘরে ঢুকলেন “আচ্ছা প্রাণনাথ, আমি তো খুব চিন্তায় পড়েছি বাবা।’ ‘কীসের চিন্তা, কাকাবাবু?”
‘এ বছর করতালতলীতে ধুলট হবে তো?”
“কেন হবে না কাকাবাবু, নিশ্চয়ই হবে।’ ‘কিন্তু বড়লাট দেশে মিটিং করা আইনতঃ অপরাধ বলে ঘোষণা করেছে। আশেপাশে কীর্তনের আসরে পুলিশ হামলা করছে। যাদের ধরছে তাদের অনেকেরই জরিমানা ও দু-চারদিনের হাজতবাস, পিটুনি এসব হয়েছে।
ভেবেছিলাম মৃদঙ্গমের সঙ্গে এ নিয়ে পরামর্শ করব, কিন্তু সে ছেলে যে কোথায় উধাও হয়ে গেল? আর আজ এসে পুলিশ বাড়ি তছনছ করে দিয়ে গেল। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে ধুলট হবে বাবা?”
‘আপনি চিন্তা করবেন না, কাকাবাবু,’ প্রাণনাথ আশ্বাস দিল। ‘প্রতিবারের মত ধুলট এবারও হবে। আমরা ঠিক কোনও একটা ব্যবস্থা করব।’
ওর আশ্বাসের ওপর বৃদ্ধের বড় একটা ভরসা হল বলে মনে হল না প্রাণনাথের। ‘দিব্যি আছে জগন্নাথ/পট্টডোরীর মাথায় হাত,’ বিড়বিড় করে বলে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
‘কী বললেন উনি? ঠিক বুঝতে পারলাম না, প্রাণনাথ বলল।
- “ভগবানের ওপর অভিমান, মন্দিরা হেসে বলল। ‘পুরীতে রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার বিগ্রহ রত্নবেদী থেকে নামানো ওঠানোর জন্য খুব শক্তপোক্ত রেশমী দড়ি লাগে তাকে বলে পট্টডোরী। মালাধর বসু যিনি শ্রীমদ্ভাগবত অবলম্বনে শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য লিখেছিলেন, তাঁর নাতি রামানন্দকে চৈতন্যদেব বলে রেখেছিলেন প্রত্যেক বছর বাংলা থেকে পট্টডোরী নিয়ে আসতে। অত দূর থেকে রথযাত্রার পট্টডোরী আসত। করতালতলীর ধুলটের জন্য বাবা নিজেকে পট্টডোরী বলছেন।’
প্রাণনাথ বুঝতে পারছে ধুলট এই মানুষটার জীবনে কতখানি জায়গা জুড়ে আছে।
*তুমি কি স্বদেশীদের কোনও দলের সদস্য?’ মন্দিরা আচমকা প্রশ্ন করল। “মানে?”
*দাদার কাছে শুনেছি স্বদেশীদের নাকি অনেক দল – শিবপুর দল, কুষ্টি দল, হলুদবাড়ি, চাঙরিপোতা, কৃষ্ণনগর, নাটোর, ঝাউগাছা, যুগান্তর দল, আরও কত কী। তাছাড়া আছে অনুশীলন সমিতি, বগুড়ার যতীন রায়ের দল, বরিশালের প্রজ্ঞানন্দের দল – তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম তুমি কোন দলের?” -
“আমি এদের কোনও দলের না। তবে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত দলগুলির সদস্যরা তোমাকে তাদের নাম ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করবে না। ওরা মন্ত্রগুপ্তির শপথ নেয়।’ ‘দাদাও শপথ নিয়েছে?’
“না। তোমার দাদা আমাদের এসব সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী না। ওর পথ গান্ধীজির অহিংস বিপ্লব। আর বিনা অস্ত্রে স্বাধীনতা আসতে পারে এটা আমরা বিশ্বাসই করতে পারি না। আমাদের দু‘জনের পথ একদম আলাদা। মৃদঙ্গম পড়ে রামকৃষ্ণ কথামৃত, অশ্বিনীকুমারের ভক্তিযোগ, কুরুক্ষেত্রে প্রচারিত গীতা, শ্রীঅরবিন্দের লেখা “যৌগিক সাধন”, আর আমরা পড়ি যুগান্তর থেকে ছাপা “ভবানীমন্দির”, “বর্তমান রণনীতি”, “মুক্তি কোন পথে”, এসব।’
‘তুমি এই শপথের কথা কীভাবে জানলে?”
‘আমি এইসব দলগুলিকে হাতবোমা বানিয়ে দিই। এদের সদস্যরা আমার কাছে গোপনে হাতবোমা কিনতে আসে। আমাকে কাছের মানুষ মনে করে আমাকে একজন বলেছিল। তাদের নাকি আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে অঙ্গীকারপত্রে নিজের নামে শপথ করতে হয়েছে। অনেকের শরীরে আবার দলের উল্কি আঁকা থাকে।’
‘বাপরে! তুমি বোমা বানাতে জান?” মন্দিরার চোখ কপালে।
‘হ্যাঁ।
তুমি মানুষ খুন করেছ?”
প্রাণনাথ ভাবল কী উত্তর দেবে। এদের তো সব কথা বলতেই হবে। কিন্তু আজ থাক। সুযোগ বুঝে ওদের বলতে হবে। প্রাণনাথ হেঁয়ালি করে বলল, ‘মানুষ না অমানুষ?”
মন্দিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘প্রাণনাথদা, তুমি তো শুনেছি বিপুল বৈভবে মানুষ হয়েছ। তোমার বাবা জমিদার –
‘মন্দিরা, দেশের স্বাধীনতার জন্য আমার থেকে অনেক অবস্থাবান পরিবারের যুবক-যুবতী ত্যাগের মন্ত্র উচ্চারণ করে বিপ্লবের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। —তুমি কখনো জেলে গেছ?”
‘নাঃ, এখনো পর্যন্ত আমায় ধরতে পারেনি। তবে আমায় যেদিন ধরবে, সোজা ফাঁসিকাঠে।’
‘অশুভ কথা বোলো না,’ মন্দিরা বলল। ‘জানো, আমার দাদার জন্য খুব দুশ্চিন্তা হয়। দাদা এত সাধাসিধা ছেলে, ভয় হয় কোনও বিপদে না পড়ে।’ প্রাণনাথ হাই তুলল “খুব ঘুম পাচ্ছে।’ -
মন্দিরা উঠে দাঁড়াল। প্রাণনাথ মনে মনে ঠিক করল, বাপ-মেয়েতে কাল সকালে মন্দিরে গেলে সে লুকিয়ে লুকিয়ে মৃদঙ্গমের দেহাস্থির সমাধি দেবে। তারপর কাল সন্ধ্যা নামলেই সে এই বাড়ি থেকে চলে যাবে। এদের কিছুতেই সে দুঃসংবাদটা দেবে না। কিছুতেই না। পুলিশের খাতায় মৃদঙ্গম মৃত নয়, তাই সে পলাতক হিসাবেই এদের মনে বেঁচে থাকুক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন