একত্রিশ

প্রীতম বসু

সকাল হচ্ছে, ঘরের ভিতরের আলো বাড়ছে। কিন্তু আলো এখনো পর্যাপ্ত নয় বই পড়ার জন্য। জানলার ওপাশে জমাট কুয়াশা। কিন্তু আজ কেউ কুয়াশা সরে যাওয়ার মন্ত্র পড়ছে না। এ বাড়িতে এই দু‘দিনে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে আনন্দ চলে গেছে। শুয়ে শুয়ে পাখির কাকলি শুনছিল প্রাণনাথ, আর ভাবছিল। মৃদঙ্গম অরবিন্দ ঘোষকে গুরুর মত শ্রদ্ধা করত। প্রাণনাথ কিন্তু অরবিন্দ ঘোষ নিয়ে শ্রদ্ধাভক্তির পর্যায়ে পৌঁছোতে পারেনি। ওর মনে অনেক সংশয় ছিল। অরবিন্দ ঘোষ নিজে অনেক স্বেচ্ছাসেবীকে বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিপ্লবের মধ্যপথে তিনি সশস্ত্র বিপ্লব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯০৭ সালে যখন মহারাষ্ট্রের বিষ্ণুভাস্কর লেলে বলেছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা আসবে না, তখন অরবিন্দ সেকথা মানেন নি। কিন্তু সাত বছর পর নিজেই বললেন রক্তবিপ্লবের পথ ছেড়ে জাতির চরিত্রগঠনের দিকে জোর দিতে। মৃদঙ্গম প্রাণনাথকে অনেক অনুরোধ করেছিল অরবিন্দের পথ মেনে এই সশস্ত্র বিপ্লবের পথ ছেড়ে দিতে। প্রাণনাথকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল রক্তাক্ত খুনোখুনির পথে স্বাধীনতা না চেয়ে অধ্যাত্মবাদের পথে জাতির সংগঠনে জাতীয় চরিত্র দীপ্ত করতে আর অহিংস আন্দোলন করতে। মৃদঙ্গম বলত স্বাধীনতাকামীর চরিত্রই যদি শক্তিশালী না হয় তবে সেই স্বাধীনতা আমাদের জাতির কোনও উন্নতি ঘটাতে পারবে না। আধ্যাত্মযোগে আমাদের একদল শুদ্ধচরিত্র নারীপুরুষের সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। তবেই ভারতে এক ঐক্যবদ্ধ জাতির অভ্যুত্থান হবে। সে জাতি স্বাধীনতা রক্ষার উপযোগী জাতি হবে। প্রাণনাথ মৃদঙ্গমের সেই কথার অর্থ উপলব্ধি করতে পারে নি। বুঝতে চায়ও নি। প্রাণনাথের একমাত্র লক্ষ্য কীভাবে ইংরেজদের মনে এমন ত্রাসের সৃষ্টি করবে যে ইংরেজ ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাবে। অরবিন্দ ঘোষের সম্বন্ধে বিপ্লবীরা সম্মান করে কথা বলে বটে, কিন্তু অনেকেই এখনো বুঝে উঠতে পারে না যে কীভাবে আধ্যাত্মিক সাধনার পথে ভারতের স্বাধীনতা আসবে। প্রাণনাথও সেই দলের। তবে এটা ঠিক যে অরবিন্দ ঘোষ ইচ্ছা করলে বিলেতে ভবিষ্যতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন। তিনি সেসব লোভ ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দেশে ফিরে এসেও বরোদার মাসিক সাতশ’ টাকার মাইনের চাকরি ছেড়ে মাত্র একশ’ টাকা মাইনেতে কলকাতায় ন্যাশনাল কলেজের অধ্যাপনা করতে এসেছিলেন।

অত্যন্ত পণ্ডিত মানুষ - বন্দেমাতরম নামে ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন? সেখানেই প্রাণনাথের পথ অরবিন্দের পথের থেকে আলাদা হয়ে গেছিল। মৃদঙ্গমের বুকে লাথি মেরে বুকের পাঁজরা ভেঙে দিয়েছে ড্যানিয়েল। ফুসফুস আর হৃদপিণ্ড সেই আঘাত সহ্য করতে না পারায় মৃদঙ্গমের মৃত্যু হয়। এটা কি হত্যা নয়? এই হত্যাকারীর কি শাস্তি হওয়া উচিত না? ইংরেজ বলে তার কোনও বিচার হবে না? আজ ঘনঘন মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে প্রাণনাথের। প্রতিহিংসা বনাম অহিংসা।

পাশে ঘটিতে ঢাকা দেওয়া ফেনাভাত। প্রাণনাথ উঠে বসল। কুয়োর জলে গামছা ভিজিয়ে নিংড়ে এনেছে সে। প্রাণনাথ ভেজা গামছা দিয়ে ভাল করে শরীর, মাথা, ঘাড় সব মুছে আরাম পেল। মন্দিরা ফেনা ভাতে ঘি আর অল্প নুন ঘেঁটে দিয়েছে। প্রাণনাথ ধীরে ধীরে খেল। মেয়েটার বুকের মধ্যে যে কী কষ্টের মোচড় দিচ্ছে তা বুঝতে চেষ্টা করার মত সাহস প্রাণনাথের নেই। কিন্তু এত দুঃখের মধ্যেও প্রাণনাথের জন্য এই ভাত ফুটিয়ে দিয়েছে, যাতে বিস্বাদ না হয় সে খেয়ালও রেখেছে মন্দিরা।

বেলা বাড়ছে। ঘরের ভিতর আলো বাড়তে লাগল। প্রাণনাথ এবার অরবিন্দ ঘোষের কারাকাহিনী খুলল। মানিকতলার বোমাকাণ্ডের অপরাধে গ্রেপ্তার করে আলিপুর জেলে ওঁকে বিপজ্জনক কয়েদী হিসেবে একটা নির্জন কক্ষে রাখা হয়েছিল। প্রাণনাথ পড়তে লাগল -

“আমার নির্জ্জন কারাগৃহটি নয় ফুট দীর্ঘ, পাঁচ ছয় ফুট প্রস্থ ছিল। ইহার জানলা নাই, সম্মুখভাগে বৃহৎ লোহার গরাদ, এই পিঞ্জরই আমার নির্দিষ্ট বাসস্থান হইল।”

প্রাণনাথ চারপাশে তাকাল। এই একচালা খড়ুটি ঘরের আকারও অরবিন্দের জেলের মতই। এখানে জানলা আছে কিন্তু জানলা খোলার উপায় নেই। অরবিন্দের জেলের ভিতর লোহার গরাদের ভিতর দিয়ে আলো আসে, সন্ধ্যাবেলা ইলেকট্রিকের বাতি জলে, এখানে সেসব কিছুই নেই। পিঞ্জর। মনে মনে হাসল প্রাণনাথ। জেলে অন্ততঃ অরবিন্দের আরেকবার গ্রেফতার হওয়ার ভয় ছিল না, কিন্তু এখানে প্রাণনাথের মনে সততই দুশ্চিন্তা। গ্রেফতার হলে সে একা নয়, মন্দিরা এবং মৃদঙ্গমের বাবা সকলকেই পুলিশ থানায় নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করবে। আর জেলে থাকলে আরেকটা প্রিয় জিনিস অন্ততঃ পেত প্রাণনাথ। বড় দুর্বলতা প্রাণনাথের। চা। এখানে তার সম্ভাবনা নেই। প্রাণনাথ পড়তে লাগল –

“একখানা থালা ও একটি বাটি একটু জোরে আঙুল দিলেই থালা আরবীস্থানের ঘূর্ণমান দরবেশের ন্যায় মণ্ডলাকারে নৃত্য করিতে থাকিত, তখন এক হাতে আহার করা, এক হাতে থালা ধরিয়া থাকা ভিন্ন উপায় ছিল না। নচেৎ ঘুরপাক খাইতে খাইতে জেলের অতুলনীয় মুষ্টান্ন লইয়া তাহা পলাইয়া যাইবার উপক্রম করিত। থালা হইতে বাটিটিই আরও প্রিয় ও উপকারী জিনিষ ছিল। বাটির জাত নাই, বিচার নাই, কারাগৃহে যাইয়া সেই বাটিতে জল নিয়া শৌচক্রিয়া করিলাম, সেই বাটিতেই মুখ ধুইলাম, স্নান করিলাম, অল্পক্ষণ পরে আহার করিতে হইল, সেই বাটিতেই ডাল বা তরকারী দেওয়া হইল, সেই বাটিতেই জলপান করিলাম এবং আচমন করিলাম।” –

প্রাণনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধনী পরিবারের সন্তান, বিলেতে এক দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত করা মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য স্বেচ্ছায় বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে এত কষ্ট স্বীকার করে গেল। “ঘরের ভিতরেই দুইখানা আলকাতরা মাখান টুকরী দেওয়া হইত। সকালে ও বিকাল বেলায় মেথর আসিয়া তাহা পরিষ্কার করিত, কিন্তু অসময়ে পায়খানায় গেলে প্রায়ই প্রায়শ্চিত্তরূপে কয়েক ঘন্টা দুর্গন্ধ ভোগ করিতে হইত। …জানি শোবার ঘরের পার্শ্বে পায়খানা রাখা, স্থানে স্থানে বিলাতী সভ্যতার অঙ্গবিশেষ, কিন্তু একটি ক্ষুদ্র ঘরে শোবার ঘর, খাবার ঘর ও পায়খানা আমরা কুঅভ্যাসগ্রস্ত ভারতবাসী, সভ্যতার এত উচ্চ সোপানে পৌঁছানো আমাদের পক্ষে কষ্টকর।”

******

বাইরে উঠোন ঝাঁট দেওয়ার আওয়াজ। তারপর আবার নিস্তব্ধতা। কিছুক্ষণ পর একজন পুরুষ মানুষের গলা। ছিদাম এসেছে। ‘মন্দিরাদিদি, দুধ। তিন পোয়া বেশি আছে।’ প্রাণনাথ বুঝল। মন্দিরা ওর জন্য তিন পোয়া দুধ বেশি রেখেছে।

ছিদামের সঙ্গে উঠোনে নিচু গলায় মন্দিরা কিছু আলোচনা করল। ছিদামের গলা পাওয়া গেল – ঠিক আছে। আমি নজর রাখছি। তোমায় জানাবো।’ ছিদাম বেরিয়ে গেল, দরজা বন্ধ হল। আবার সব চুপ।

প্রাণনাথ বই আবার খুলল।

“সেই সময় যখন আমি ভগবানের দিকে অগ্রসর হই, তাঁর উপর যে আমার জ্বলন্ত বিশ্বাস ছিল তা বলতে পারি না। আমার মধ্যে বিদ্যমান ছিল অবিশ্বাসী, সংশয়বাদী, নাস্তিক; ভগবান আদৌ আছেন কি না সে বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ ছিলাম না। আমি তাঁর বিদ্যমানতা অনুভব করিতাম না “

প্রাণনাথ চুপচাপ ভাবল। সে নিজেও তো এইরকমই। নাস্তিক, সব সময়ে একটা সংশয়ে দুলছে। মন্দিরা জানে ও ঈশ্বর বিশ্বাস করেনা। ভেবেচিন্তেই এই বই ওর হাতে তুলে দিয়েছে।

দিনটা খুব কষ্টে কাটছে। এ এক অসহনীয় নির্জন কারাবাসের মত। আলো অল্প। বেশিক্ষণ বইয়ে চোখ রাখতে পারা যাচ্ছে না। কাকটা পাশের হরীতকী গাছে বসে অনেকক্ষণ ধরে কিছুক্ষণ পর পর কর্কশস্বরে কা-কা করে ডাকছে। প্রাণনাথের মা বলত কাক অশুভ বার্তাবহ, তাই কাক বাড়ির চৌহদ্দিতে এভাবে ডেকে চললে চাকর-বাকরদের বলত কাক তাড়াতে। হিন্দুদের অনেকের বিশ্বাস শ্রাদ্ধ-শান্তি না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির আত্মা কাকের দেহে অবস্থান করে, তাই হিন্দুরা শ্রাদ্ধের পিণ্ড কাককে খাওয়ায়। প্রাণনাথ এসব বিশ্বাস করে না। কিন্তু মা হলে বলত মৃদঙ্গমের আত্মা ওর সমাধির ওপরের হরীতকী গাছের ডালে বসে পিণ্ড চাইছে যাতে সে মুক্তি পায়।

মন্দিরা উঠোনে বেরিয়ে এসে হুশ-হুশ করে কাকটাকে তাড়াল। আত্মা থাক বা না থাক কর্কশ আওয়াজ ভাল লাগে না। আবার বাড়িটা নিঃশব্দতায় ঝিমিয়ে পড়ল। প্রাণনাথ কিছুক্ষণ ওর দৈনন্দিন অভ্যাস মত ডন-বৈঠক দিল। ঢেঁকির মুষলটা নিয়ে মুগুর ভাজার মত কিছুক্ষণ অভ্যাস করল। তারপর আবার বোবা হয়ে দেওয়ালের দিকে চেয়ে বসে রইল।

- দুপুরে মন্দিরা তালা খুলে দ্রুতপায়ে ভিতরে এল “কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?’

মন্দিরার দু‘চোখ ফোলা ফোলা। মেয়েটা দুঃখ সামলাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্রিয় দাদার মৃত্যুর ধাক্কা সামলানো সহজ কি?

‘কাকাবাবুর জ্বর কেমন আছে?”

‘জ্বর আছে। মাথাটা ধুয়ে দিয়েছি। বাবা বিছানা ছেড়ে উঠতেই চাইছে না। মনের দিক দিয়ে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিছু খেতে চাইছে না।’

‘কাল সারারাত ঘুমাও নি, তাই না?’

‘কীভাবে বুঝলে?”

‘ঘুম আসছিল না। জানলা দিয়ে একবার উঠোনের দিকে উঁকি দিলাম। মনে হল তোমার ঘরে প্রদীপ জ্বলছিল।’

‘দাদার ছবিগুলো সব ছিঁড়ে দিয়ে গেছে। শ্রাদ্ধের জন্য দাদার একটা ছবি আঁকছি। খুব কঠিন লাগছে এখন,’ মন্দিরার চোখ উপচে জল। মন্দিরা আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। ‘বাবা একা আছে। আমি যাই।’

‘ক’টা বাজে এখন?”

মন্দিরা জানলার পাল্লা ফাঁক করে তুলসী গাছের দিকে চেয়ে বলল, “একটা বেজে গেছে।’

‘ধুলটের জন্য দরকারি অর্থ কোথা থেকে আসত, মন্দিরা?’

মন্দিরা ঘর ছেড়ে বেরোতে গিয়ে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে গেল। পিছন ফিরে বলল, ‘দাদা টাকা নিয়ে আসত প্রতি বছর।’

মৃদঙ্গম টাকা নিয়ে আসত? প্রাণনাথ অবাক। ‘কিন্তু সে তো নিশ্চয়ই অনেক টাকা। মৃদঙ্গম এত টাকা পেত কোথা থেকে?’

“তা জানিনা। একবার আমি দাদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, দাদা বলেছিল মাধুকরী করে সে অর্থ আনে। ধুলটের জন্য দান করার নাকি লোকের অভাব হয় না। তোমার চিন্তা হচ্ছে তাই না, প্রাণনাথদা? ভেবো না, নীলমাধব নিজের ব্যবস্থা ঠিক করে নেবেন।’ মন্দিরা বেরিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল।

প্রাণনাথের মত ব্যস্ত মানুষের পক্ষে চুপচাপ একা বসে সময় কাটানো খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। অজস্র চিন্তা মাথার মধ্যে জমে জমে যেন চিন্তার পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রাণনাথের মাথা যেন সেই ভার বহন করতে অক্ষম। অরবিন্দেরও নিশ্চয়ই এরকম হয়েছিল। অরবিন্দ কীভাবে এই অলসএকাকীত্বের থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন? প্রাণনাথ এতটুকু পড়ে যা বুঝেছে নির্জনতায় অজস্র চিন্তা অরবিন্দের মাথার মধ্যে এসে আছড়ে আছড়ে পড়ছিল। চিন্তাগুলো এমন অসংলগ্ন ও অসংযত হতে শুরু করেছিল যে অরবিন্দ উপলব্ধি করতে পারলেন যে চিন্তার ওপর বুদ্ধির নিগ্রহশক্তি লোপ পাচ্ছে। তখন অরবিন্দ প্রাণপণে রোজ সর্বক্ষণ ভগবানকে ডাকতে থাকলেন। এভাবে জপ করতে করতে হঠাৎ একদিন উনি শান্তি অনুভব করলেন। উনি লিখেছেন – “ প্ৰাণপণে ভগবানকে ডাকিলাম, আমার বুদ্ধিভ্রংশ নিবারণ করিতে বলিলাম। সেই মুহূর্তে আমার সমস্ত অন্তঃকরণে হঠাৎ এমন শান্তি প্রসারিত হইল, সমস্ত শরীরময় এমন শীতলতা ব্যাপ্ত হইতে লাগিল, উত্তপ্ত মন এমন স্নিগ্ধ, প্রসন্ন ও পরম সুখী হইল যে পূৰ্ব্বে এই জীবনে এমন সুখময় অবস্থা অনুভব করিতে পারি নাই। শিশু মাতৃক্রোড়ে যেমন আশ্বস্ত ও নির্ভীক হইয়া শুইয়া থাকে আমিও যেন বিশ্বজননীর ক্রোড়ে সেইরূপ শুইয়া রইলাম। এই দিনেই আমার কারাবাসের কষ্ট ঘুচিয়া গেল।”

প্রাণনাথের মনে হচ্ছে এই দিনটাই বিপ্লবী অরবিন্দ থেকে ঋষি অরবিন্দ হওয়ার টার্নিং পয়েন্ট। ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ তাঁর অন্তরাত্মায় এক শক্তি দিয়েছিল যাতে তিনি কারাগারের কষ্টকে জয় করতে পেরেছিলেন। প্রাণনাথ বই বন্ধ করে ভাবতে লাগল - এটা কীভাবে সম্ভব হল? মন তাহলে শরীরের সমস্ত যন্ত্রণাকে অস্বীকার করার মত এক বর্ম তৈরি করে ফেলল? এও কি বাস্তবে সম্ভব? প্রাণনাথ পড়তে লাগল অরবিন্দ লিখেছেন – “সর্ব্বঘটে নারায়ণ এই মূল সত্য উপলব্ধি করিবার চেষ্টা করিতাম। বৃক্ষে, গৃহে, প্রাচীরে, মনুষ্যে, পশুতে, পক্ষীতে, ধাতুতে, মৃত্তিকায় সৰ্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম মনে মনে এই মন্ত্রচ্চারণপূর্ব্বক সৰ্ব্বভূতে সেই উপলব্ধি আরোপ করিতাম। এইরূপ করিতে করিতে এমন ভাব হইয়া যাইত যে, কারাগার আর কারাগার বোধ হইত না। সেই উচ্চ প্রাচীর, সেই লোহার গরাদ, সেই সামান্য জিনিসপত্র যেন আর অচেতন নহে, যেন সৰ্ব্বব্যাপী চৈতন্যপূর্ণ হইয়া সজীব হইয়াছে, তাহারা আমাকে ভালবাসে, আমাকে আলিঙ্গন করিতে চায় এইরূপ বোধ হইত। … প্রাণের কঠিন আবরণ খুলিয়া গেল এবং সর্ব্বজীবের উপর প্রেমের স্রোত বহিতে লাগিল। প্রেমের সহিত দয়া, করুণা, অহিংসা ইত্যাদি সাত্ত্বিক ভাব আমার রজঃপ্রধান স্বভাবকে অভিভূত করিয়া বিশেষ বিকাশ লাভ করিতে লাগিল। আর যতই বিকাশ পাইতে লাগিল, ততই আনন্দ বৃদ্ধি হইল এবং নিৰ্ম্মল শান্তিভাব গভীর হইল।”

এটা কীভাবে সম্ভব? প্রাণনাথ বুঝে উঠতে পারল না। ‘যে-জেল আমাকে মানবজগৎ থেকে আড়াল করে রেখেছে সেই দিকে আমি তাকালাম, কিন্তু দেখলাম আমি আর জেলের উচ্চ দেওয়ালের মধ্যে বন্দী নই; আমাকে ঘিরে রয়েছেন বাসুদেব।’এটা কীভাবে হল? প্রাণনাথ ভেবে পাচ্ছে না। “আমার সেলের দরজার গরাদের দিকে চাইলাম, আবার বাসুদেবকে দেখতে পেলাম।”

এও কি সম্ভব? নাঃ! প্রাণনাথের মাথায় এটা ঢুকছে না। কারাগার, লোহার গরাদ সব কিছুতে ঈশ্বর দেখছে মানুষটা? লোকটা কি একাকীত্বে হ্যালুসিনেট করতে শুরু করল? এই বই ওকে ভাবাচ্ছে প্রচুর। জানতে কৌতূহল হচ্ছে এই লোকটা এত কষ্টকে কীভাবে মনের শক্তিতে জয় করে ফেলল? বলে কিনা নির্জন জেলবাস যেন তাঁর কাছে এক আশ্রমবাস, যেখানে নির্জনে সে ঈশ্বরের উপাসনা করার সুযোগ পেয়েছে। যে মানুষ যোগাবস্থাপ্রার্থী তাঁর জন্য নাকি জনতা ও নির্জনতা সমান হওয়া উচিত। এক বৎসরের এই কারাবাসের জন্য সে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে!

প্রাণনাথ বই বন্ধ করল। দিন গড়িয়ে চলল, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। প্রাণনাথ ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ ঘুম ভাঙল। বাড়ির ভিতর থেকে কীর্তন ভেসে আসছে, মন্দিরা গাইছে -

অব মথুরাপুর মাধব গেল।

গোকুল-মাণিক কো হরি নেল।।

গোকুলে উছলল করুণাক রোল।

নয়ন-জলে দেখ বহয়ে হিলোল।।

যেমন মিষ্টি গলা, তেমনি মিষ্টি বাজনার হাত। কিন্তু মনে হচ্ছে দুঃখ যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসছে গানের অবয়ব ধরে। মাথুর। গোকুলের রত্ন শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় চলে যাওয়ার পর তাঁর বিরহে সকরুণ কান্নার রোল উথলে উঠেছে গোকুলে। মৃদঙ্গমের চলে যাওয়ার শোক এবাড়িতে একই রকম দুঃখ ঢেলে দিয়েছে।

শূন ভেল মন্দির শূন ভেল নগরী।

শূন ভেল দশ দিন শূন ভেল সগরি।।

কৈছনে যায়ব যমুনা-তীর।

কৈছে নেহারব কুঞ্জ-কুটির

সহচরী সঞে যাঁহা কয়ল ফুল-খেরি।

কৈছনে জীয়ব তাহি নেহারি।।

এ সঙ্গীত নয়, এ মর্মস্পর্শী ক্রন্দন। সীমাহীন আর্তি ও হাহাকার জেগে রয়েছে এই তিনটি প্রিয়জনের বুকে। চিরবিরহ বেদনা ক্ষণে ক্ষণে ছুরির মত হৃদয়ে বিধছে। এই বাড়িও খাঁ খাঁ করছে। এক অপার শূন্যতায় ভরে গেছে চরাচর।

বাইরে ঝিকিমিকি বেলা। কিছুক্ষণ চলল এই কীর্তন। অন্য সময়ে প্রাণনাথ কীর্তন এড়িয়ে চলে, কিন্তু এখন এই নিৰ্জ্জন কারাবাসের পরিস্থিতিতে মানুষের কথা শুনলেও মনে স্বস্তি লাগছে।

হঠাৎ বাইরে বন্দুকের গুলির আওয়াজ। প্রাণনাথ চমকে উঠল। আবার পরপর দু‘বার বন্দুকের গুলির আওয়াজ। প্রাণনাথ সজাগ হয়ে উঠল। কে বন্দুক ছুঁড়ছে? পুলিশ? প্রাণনাথ তাড়াতাড়ি কম্বল, বালিশ চোরা কুঠুরিতে ছুঁড়ে দিল। খাটিয়াটা দাঁড় করিয়ে দেওয়ালে লাগিয়ে কুঠুরিতে ঢুকে গিয়ে মাথার ওপর পাটাতন টেনে দিল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%