প্রীতম বসু
গণিকাপল্লীতে এই প্রথম এল পদাবলী।
গলিটা প্রশস্ত, স্কুটার-ম্যাটাডোর পাশ দিয়ে হর্ণ বাজিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দু‘পাশে বাড়িগুলোর দরজার সামনে মুখে মেকআপ করা মেয়েরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে। গোবিন্দ অধিকারী দু‘হাত পেটের ভিতর ঢুকিয়ে এত সঙ্কুচিত হয়ে হাঁটছিল যে মনে হচ্ছিল লোকটা একটা পাটকাঠির মত রোগা হয়ে গেছে।
রতি বাঈয়ের কোঠার ঠিকানা খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। সিনেমা-টিনেমায় গণিকালয় যেরকম দেখেছে সেরকম লাগল না। পদাবলী সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠল, পিছনে গোবিন্দ আধিকারী। রতি ওদের দেখে বলল মাস্টারমশাই আপনাদের কথা বলে রেখেছিলেন।’ - “আসুন আসুন,
বাড়ির বাইরেটা পুরোনো দেখতে হলেও ভিতরটা ঝাঁ চকচকে। রতি লেদারের সোফায় ওদের বসতে বলল। রতিকে দেখে পদাবলী হাঁ। কী অপরূপ সুন্দরী! এই সৌন্দর্য গণিকালয়ে ঠিক মানাচ্ছে না। এর স্থান হওয়া উচিত কুমোরটুলির সরস্বতী প্রতিমার মুখে। আয়তনেত্রে এত সরলতা কোনও গণিকার থাকতে পারে? অনিচ্ছাসত্ত্বে তাড়াতাড়ি নজর সরিয়ে নিল পদাবলী। সামনের দেওয়ালে একটাই মাত্র ফটো - খোলের ওপর রাখা খঞ্জনি। পদাবলীদের বসিয়ে রেখে রতি ভিতরে চলে গেল, আর ফিরে এল একটা ট্রেতে দু‘গ্লাস জল নিয়ে। গোবিন্দ অধিকারীর মুখ দেখে মনে হচ্ছে ওর বোধহয় গা ঘিনঘিন করছে। ‘আমার তেষ্টা পায় নি,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। পদাবলীও জল নিল না। কত রকম রোগের কথা সে শুনেছে, রিস্ক না নেওয়াই ভাল।
“ওস্তাদজীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, উনি আর এক ঘন্টার মধ্যেই এসে যাবেন,’ রতি গ্লাসগুলো সরিয়ে রাখল। ওনার শরীরটা আজকাল খুব খারাপ যাচ্ছে।’
‘এক ঘন্টা?” পদাবলী ঘড়ি দেখল।
“মা, তোমার এই দেওয়ালে কীর্তনের খোল -খঞ্জনির ছবি কেন?’ গোবিন্দ অধিকারী বলল।
‘একটা প্রতিজ্ঞা যাতে ভুলে না যাই তাই সর্বক্ষণ ওটা চোখের সামনেই রাখি।’
‘কীর্তন নিয়ে প্রতিজ্ঞা?’
‘আমি যে পরিবার থেকে এসেছি সেখানে কীর্তনের খুব প্রচলন ছিল। আমি কীর্তন শিখেছিলাম কিছুদিন।
“তাই নাকি?” গোবিন্দ অধিকারীর গলায় যেন শক্তি ফিরে এল। ‘একটা কীর্তন শোনাবে মা? শুনি তোমার কেমন গলা।’
‘এখন?” রতি অবাক। ‘এই দুপুরে তো
‘না না, খালি গলাতেই শোনাও না।’
ওস্তাদজী নেই, খোল ছাড়া -
‘কীর্তন থাক,’ রতি বলল। ‘তার চেয়ে দু‘কলি অন্য কিছু গাই। টপ্পা, ঠুংরি, খেয়াল, হিন্দি সিনেমার গান - তারপর পদাবলীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইংরাজী গান কিন্তু আমি জানিনা-‘
‘তাহলে থাক,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘অন্য আরেকদিন শুনিও। তোমাকে দেখে আমার যেন বিষ্ণুপ্রিয়ার মত লাগছিল। এত সৌন্দর্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটা ব্যথা। মনে পড়ে গেল সেই ঘনশ্যাম কবিরাজের বিষ্ণুপ্রিয়ার গান
কো কহু অপরূপ প্রেমসুধানিধি কোই কহত রসমেহ
কোই কহত ইহ সোই কল্পতরু মঝু মনে হত সন্দেহ –
পেখলু গৌরচন্দ্র অনুপাম -
তুমি কখনো শুনেছ ওটা?”
‘কিন্তু ওটা তো কামোদ, গোঁসাই ঠাকুর। রাতের প্রথম প্রহরের গান। একদিন সন্ধ্যায় এসো গোঁসাই, শোনাব,’ রতি বলল। ‘এই দুপুরে বরং এক পদ বৃন্দাবনী সারং শোনাই?”
‘বৃন্দাবনী সারং!’ গোবিন্দ অধিকারীর চোখমুখ ঝকমক করে উঠল। ‘বাঃ! বাঃ! শোনাও শোনাও।’
‘দাঁড়াও, কীর্তন গাইতে হলে কাপড় ছেড়ে আসি।’
রতি চলে গেলে পদাবলী ফিসফিস করে বলল, “
কাপড় ছেড়ে -?’
গোবিন্দ অধিকারী বলল, ‘এই আমাদের বাংলাদেশ, আমি এই ভক্তির অন্তর দেখেছি। হাল ফ্যাশনের মানুষ এর মর্ম বুঝতে পারবে না। রতিবাঈকে টপ্পা, ঠুংরি, খেয়াল, হিন্দি সিনেমার গান গাইতে বললে ও এখানে বসে বসেই তোমায় দু‘কলি শুনিয়ে দিত। কিন্তু দ্যাখ, বেশ্যারা শুদ্ধমাতা হয়ে ধোওয়া কাপড় না পরে কেউ কীর্তন গায় না।’
রতি তৈরি হতে বেশিক্ষণ সময় নিল না। তার মাঝে একটা হাফপ্যান্ট পরা ছেলে এসে মিনারেল ওয়াটারের বোতল পদাবলীর হাতে দিয়ে বলল ‘সিল দেখে নাও।’ -
পদাবলী মৃদু হেসে বোতলটা খুলে দু-চুমুক দিল। তারপর ফিসফিস করে গোবিন্দ অধিকারীকে বলল, ‘দুপুরে কামোদ কীর্তন গাইতে নেই?’
- গোবিন্দ অধিকারী বলল, ‘কীর্তন দু‘ধরণের - শুক কীর্তন আর নারদ কীর্তন। শুক কীর্তনে শুকদেব কৃষ্ণের নাম, লীলা বর্ণনা করতেন কথকতার মাধ্যমে। আর নারদ কীর্তন হত ছন্দ, সুর আর তাল সহযোগে। শুক কীর্তনে যে কোনও গান ইচ্ছেমত যে কোনও সময়ে গাওয়া যায়, কিন্তু আমাদের লীলাকীর্তন হল নারদ কীর্তন। নারদ কীর্তন খুব নিয়ম মেনে হয়। যে সময় যে লীলা হয়েছিল সে সময়েই সেই লীলার গান গাইতে হবে। রাসলীলা গাইলে রাতেই গাইতে হবে আর গোষ্ঠলীলা দিনে, উত্তর গোষ্ঠের গান অপরাহ্নেই গাইতে হবে। তাই লীলাকীর্তনের গানের পদ শুনে বলে দেওয়া যায় এখন দিনের কোন সময়। কুঞ্জভঙ্গ ও খণ্ডিতা গাইতে হলে শুধুমাত্র সকালেই গাইতে হবে, মান বা কলহান্তরিতা কখনো বিকালে গাওয়া যাবে না। তাছাড়া ভোরে ভৈরবী, সন্ধ্যায় পূরবী এসব তো আছেই।’
“তাহলে আপনাদের কীর্তনের আসরে যে সব গান গাওয়া হয় তাতে কি সময়ের নিয়ম মানা হয়?”
- ‘না সবসময় হয় না,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘রঙ্গমঞ্চে ও রাজসভাতে গানের কালদোষ নেই। ভক্তিরত্নাকরে নরহরি চক্রবর্ত্তী লিখেছেন – শ্রেণীবন্ধে নৃপাজ্ঞায়াং রঙ্গভূমৌ ন দোষদম্। তাছাড়া নারদ বলেছেন দশদণ্ডাৎ পরে রাত্রৌ সৰ্ব্বের্ষাং গানমীরিতম্ অর্থাৎ রাত্রি দশ দণ্ডের পর সব রকমের গান করা যাবে, কিন্তু অনেক কীর্তনীয়া এ ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে হন। ‘
রতি ফিরে এল সিক্ত খোলা চুল, লাল ব্লাউজের ওপর কোরা শাড়ি। কীর্তনের জন্য স্নান করল মেয়েটা। পদাবলী অনিমেষভাবে তাকিয়ে রইল। মনে হল এই রতির মুখ খুব চেনা। কোথায় যেন দেখেছে? কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না। রতি এসে মাটিতে পা মুড়ে বসে বলল – ‘গাই?’
‘গাও।’
রতি পদাবলীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গৌরচন্দ্র চৈতন্যদেব নবদ্বীপ ছেড়ে চলে যাবার পর থেকে নবদ্বীপ একদম খাঁ খাঁ করতে লাগল। চৈতন্যদেবের সঙ্গে নিত্যানন্দ, মুকুন্দ দত্ত, গদাধর পণ্ডিত ও জগদানন্দ পণ্ডিত উড়িষ্যার নীলাচলে গেলেন। নবদ্বীপে সংকীর্তন হত সাধারণতঃ শ্রীবাসের বাড়িতে, সেই শ্রীবাস নবদ্বীপ ছেড়ে চলে গেল উত্তর চব্বিশ পরগনার কুমারহট্টে। অদ্বৈত আচার্য শান্তিপুর থেকে নবদ্বীপ যেতেন, তিনি শান্তিপুরেই থেকে গেলেন, আর যেতেন না নবদ্বীপ, হরিদাস ঠাকুর চলে গেলেন ফুলিয়ায়। নরহরি সরকার চলে গেলেন বর্ধমানের শ্রীখণ্ডে, মুকুন্দ দত্তের ভাই বাসুদেব চলে গেলেন কাঁচরাপাড়ায়, আর বড় ভাই গোবিন্দ চলে গেলেন সুখচরে। আগে বাড়িতে সবসময় লোকের আনাগোনা লেগেই ছিল, এখন বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। চৌদ্দ বছরের বিষ্ণুপ্রিয়া হাঁফিয়ে উঠলেন। বিষ্ণুপ্রিয়ার একাকীত্ব গাইছি -‘ রতি চোখ বুজে ধরল -
“তোই না হেরি শকতি হীন কায় মন
ক্ষীণ তনু মাহা মোর অবশ বচন
সংসার অসার আজি সুখহীন কায়া
খর নিদাঘ মাহে জ্বলে তরুছায়া তুয়া
বিনা প্রেম নাহি শুখা কাষ্ঠ হিয়া
বিষাদ বদনে বসি কহে বিষ্ণুপ্রিয়া।।”
পদাবলী দেখল গোবিন্দ অধিকারীর চোখ আবেশে বুজে গেছে। ওর মুখে জেগে উঠেছে এক অনির্বচনীয় আনন্দ। আর রতি যেন নিজেই বিষ্ণুপ্রিয়া হয়ে গেছে। ওর সারা মুখে বেদনার ছায়া, কণ্ঠে অব্যক্ত কান্না। মনের সমস্ত দুঃখ যেন জিভে এসে জমা হয়েছে, আর তা মুক্তি পেয়ে এই ছোট ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা মারছে। আরও কিছুক্ষণ গাইল রতি। গান শেষ করে চোখে জমে থাকা পুষ্করিণীতে শাড়ির আঁচল ভিজিয়ে নিল। গোবিন্দ অধিকারী চোখ মেলল – “আঃ! শুধু এজন্যই বেঁচে থাকতে পারি।’
রতি মৃদু হাসল – ‘আপনারা ওস্তাদজীকে কেন খুঁজছেন?”
‘বলছি,’ গোবিন্দ অধিকারী করতালতলীর ঘটনা শুরু করল। “আমাদের গ্রামের কীর্তনের দল পর্যন্ত ভেঙে দিয়েছে জমিদারবাবু। জমিদারবাবুর ভয়ে আশেপাশের গ্রামের কোনও কীর্তনীয়া আমাদের কীর্তনের দলে আসতে চাইছে না। আমাদের যে ক’টা কীর্তনের আসরের বায়না ছিল সব ক্যানসেল করিয়ে দিয়েছে জমিদারবাবু, আমরা একটা নতুন দল গড়ছি। একজন ভাল গায়েন আর বায়েন চাই। প্রফেসর সাহেব বললেন তোমাদের ওস্তাদজীর কথা -‘
‘ওস্তাদজী খুব গুণী মানুষ। আগে উনি কীর্তনের আসরে খোলই বাজাতেন। কিন্তু একটা অ্যাকসিডেন্টের জন্য এখন আর তেমন পারেন না। কীর্তনের শ্রোতা নেই, পেটের দায়ে উনি ইতিউতি কাজ খুঁজছিলেন, আমি জানতে পেরে আমার এখানে ওঁকে রেখেছি। উনি রাজি থাকলে আমার কোনও আপত্তি নেই। আপনাদের গ্রামের নাম কী?”
পিছনে গলা খাঁকারির শব্দ। রতি বলল, ‘ওই তো ওস্তাদজী এসে গেছেন।’
পদাবলী পিছন ফিরে তাকাল, একজন বয়স্ক মানুষ, মাথায় ধবধবে সাদা চুল, পরনে ঘিয়ে রঙা কুর্তা, পায়জামা, হাতে লাঠি। ওস্তাদজীকে দেখে গোবিন্দ অধিকারীর মুখ থমথমে।
ওস্তাদজীর মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল ‘গোবিন্দ গোঁসাই!’
পরের মুহূর্তে হরি বায়েনের দু‘চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এল “হারামজাদা, এখানে কী মতলবে? বেরিয়ে যাও। আর কক্ষনো দেখলে তোমার ঠ্যাং ভেঙে দেব। আর কক্ষনো কীর্তনের আসরে দাঁড়িয়ে গাইতে পারবে না।’
‘হরিকাকা, শান্ত হোন,’ রতি বাঈ উঠে দাঁড়িয়ে হরি বায়েনকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ‘আপনি এদের চেনেন?”
‘এই ছোঁড়াটাকে চিনি না। কিন্তু এই লোকটাই সেই বদমাশ গোবিন্দ অধিকারী। এই তোর বাবাকে মিথ্যা চুরির অপবাদে কীর্তনের দল থেকে দূর করে দিয়েছিল। অত বড় একজন কীর্তনীয়াকে শেষ করে দিয়েছিল এই লোকটা।’ হরি বায়েন লাঠি তুলে গোবিন্দ কীর্তনীয়াকে মারতে তেড়ে গেল।
পদাবলী কোনও রকমে হরি বায়েনকে শান্ত করল। ‘তোর বাবা’ কথাটা মাথার ভিতর লাট্টুর মত পাক খাচ্ছে – রতিবাঈ তার মানে গীত বায়েনের ত্যাগ করা মেয়ে? -
‘করতালতলী!’ রতির দু‘চোখে হঠাৎ তীব্র রাগ, ঘৃণা ঝলক দিয়ে উঠল।
গোবিন্দ অধিকারী অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে। পদাবলী বুঝল অবস্থা বেগতিক। এই হরি বায়েন কীর্তনের দলে যোগ তো দেবেই না, বরং এখানে থাকলে হেনস্থার একশেষ হতে হবে। “আপনি চলে আসুন,’ পদাবলী গোবিন্দ অধিকারীকে দরজার দিকে টানল।
‘দাঁড়াও,’ গোবিন্দ অধিকারী এবার শান্ত গলায় বলল। ‘আমি জানি আমি দোষী, আমি পাপী। তবে গীত বায়েন আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর তাই আমি সদ্য সেদিন গীতের মুখাগ্নি করেছি।’
“তার মানে? দাদা?” হরি বায়েনের দৃষ্টিতে অনেক প্রশ্ন।
‘বাবা নেই?” রতি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ধপ করে গালিচায় বসে পড়ল। রতি কাঁদছে। এবার পদাবলী রতির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমিও গেছিলাম শ্মশানযাত্রী হয়ে। আপনার মা‘র মুখে শুনেছি যে আপনার বাবা আপনাকে ত্যাগ করেছিলেন। আপনার মা এখন একা। আমার মনে হয় আপনি যদি বাড়ি ফিরে আপনার মায়ের সঙ্গে একবার দেখা করেন সেটা ভাল হবে।’
এবার গোবিন্দ অধিকারী আর পদাবলী দরজার দিকে এগোল।
‘দাঁড়ান।’
পদাবলী পিছন ফিরে তাকাল। রতির দৃষ্টি আর্দ্র। … ‘আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়ার পালার গান। পালাটা বাবারই লেখা। বাবার বহুদিনের সাধ ছিল করতালতলীর নীলমাধবের মন্দিরে বিষ্ণুপ্রিয়ার পালাকীর্তন গাই। বাবার সে সাধ পূর্ণ হয় নি, করতালতলী থেকে বাবাকে চলে আসতে হয়েছিল। বাবা আমাকে বলত – মা বড় বাসনা ছিল নীলমাধবের মন্দিরে এই পালাগান হোক। আমি পারলাম না। তুই বড় হয়ে একবার করতালতলীর মন্দিরে এই বিষ্ণুপ্রিয়ার গভীর আর্তি, আকুলতার পদগুলো গাস। তাহলে আমার জীবন সার্থক হবে। আমি বাবাকে কথা দিয়েছিলাম আমি একদিন গাইব। কিন্তু সে সুযোগ আর কখনো হয় নি। কিন্তু বাবাকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা আমি আমার চোখের সামনে রেখেছি। বাড়ি থেকে পালাবার সময় বাবার এই খোল-করতালের ছবিটা একমাত্র সঙ্গে নিয়েছিলাম। ওটাই আমাকে রোজ সকালে মনে করিয়ে দেয় এই প্রতিজ্ঞার কথা। আপনার মত আমিও বাবাকে চরম দুঃখ দিয়েছি। আপনি প্রায়শ্চিত্ত করলেন, আমিও একটা প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমি রতি থেকে অন্ততঃ একদিনের জন্য আবার আরতি হতে চাই।’
‘আমি পঞ্চাশ বছরের ওপর কীর্তন করছি। সত্যি বলতে কি কারোর গলায় আমি তোমার মত এত অপরূপ বিষ্ণুপ্রিয়ার আকুতি পাই নি, মা। তোমার বাবা একজন রত্ন ছিলেন। আজ বাংলার মাটি থেকে দ্রুত কীর্তন হারিয়ে যাচ্ছে, মা। আমরা সকলে মিলে একটা চেষ্টা করছি কীর্তনকে বাঁচাবার। বোধহয় পারব না। তবে আমি একটা শেষ চেষ্টা করছি। আমি একটা কীর্তনের দল গড়তে চাই। তুমি আমাদের সঙ্গ দেবে, মা? তোমাকে ঘিরে আমরা গড়ে তুলব আমাদের কীর্তনের দল। আমি কথা দিচ্ছি তোমায় আমি নীলমাধবের মন্দিরে অন্ততঃ একবার লীলাকীর্তন গাইবার সুযোগ করে দেব।’
রতি কপালে দুই হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করল – ‘আমার মত মেয়েদের ঠাকুর বাড়িতে ঢুকতে দেবে?’
‘সে আমি দেখে নেব,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘তুমি রাজি হলে তাতে আমারও পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে। ‘
রতি বলল, ‘বেশ, তাই হবে। তবে আমার পক্ষে করতালতলীতে যাওয়া আসা সম্ভব হবে না। কলকাতায় কারোর বাড়িতে আমরা তালিম নেব। তারপর যেদিন পালাগান হবে, সেদিন মণ্ডপে গিয়ে গাইব আপনাদের সঙ্গে।’
- ‘তাই হবে,’ গোবিন্দ অধিকারী খুশি হয়ে হরি বায়েনের দু‘হাত ধরতে গেল “আমায় ক্ষমা করে দাও হরি ভাই।’
আমাকে স্পর্শ করবে না তুমি,’ হরি বায়েন গর্জন করে উঠল। ‘তোমার ওই ঘৃণ্য অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয় না। আমি তোমাকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারব না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি। তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে এক আসরে খোল বাজাতে পারব না আমি। ঘুমের মধ্যেও আমার দাদার অপমানিত মুখটা মনে পড়ে। স্বপ্ন দেখি আমার হাত এত কাঁপছে যে আমি খোল বাজাতে পারছি না। তাল-লয় সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। ভয়ের চোটে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি। তুমি বিদেয় হও, আমি তোমার মুখদর্শন করতে চাই না।’ উত্তেজিত হরি বায়েনের কানের ওপরের শিরা ফুলে উঠেছে, লোকটা এত চেঁচাচ্ছে যে পদাবলী গোবিন্দ অধিকারীকে তাড়াতাড়ি সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন