প্রীতম বসু
ছিদাম বায়েন বলল পদাবলীকে রাত্তিরটা থেকে যেতে - “আমি আজ আছি, কাল হয়তো নেই। তোকে একটা গোপন কথা বলে যেতে চাই,’ বৃদ্ধের চোখের দৃষ্টিতে কাতর আবেদন।
পদাবলী রাজি হল। বাড়ি পৌঁছে গোবিন্দ অধিকারী হেঁসেলে চলে গেল চালেডালে দু‘মুঠো ফুটিয়ে নিতে। গোবিন্দ অধিকারী ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেতে ছিদাম বায়েন এবার তাক থেকে একটা পুরোনো বই বের করল। পদাবলী দেখল – উজ্জ্বলনীলমণি। মৃদঙ্গমদাদা এতে অনেক কিছু লিখে রেখেছে। পড়িস। তোর কীর্তনে যে ভক্তি কম, সেটা এই বই পড়লে ঠিক হয়ে যাবে। তোর দাদুর ভক্তি ঠিক করতে তোর ঠাকুমা এই বইটা তোর দাদুকে পড়তে দিয়েছিল।’ এবার ছিদাম বায়েন বইয়ের ভিতর থেকে একটা ছেঁড়া পুরোনো কাগজ বের করে পদাবলীর হাতে দিল – ‘এটা প্রাণনাথদাদা নোটবই থেকে ছিঁড়ে আমায় রাখতে দিয়েছিল। এত বছর ধরে এটা আগলে রেখেছি। কারুকে দিই নি। এমন কি গোবিন্দকেও না। এটা ধর।’ -
কাগজটা দেখে পদাবলী তড়িৎস্পৃষ্ট হল। ঠাম্মার নোটবইয়ের সনাতন কীর্তনের ছেঁড়া পৃষ্ঠার বাকি অংশ। পদাবলী কাগজটার দিকে অনিমেষভাবে তাকিয়ে রইল।
‘ ‘কাছে আয়, তোর কানে একটা বীজমন্ত্র দিয়ে যাই, ছিদাম বায়েন ডাকল। পদাবলী ছিদাম বায়েনের কাছে এগিয়ে গেল। ছিদাম বায়েন বলল, ‘দেহিপদপল্লবমুদারম।’
পদাবলী বলল, ‘গীতগোবিন্দম, আমি জানি।’
ছিদাম বায়েন পদাবলীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘মন্দিরে রাধার চরণ যদি নীলমাধবের মস্তকে স্থাপনা করিস তবে নিচে পাতাল পথের দরজা খুলে যাবে। ওখানে রাখা আছে সনাতন গোস্বামীর মোহর। ওগুলো সৎকাজে ব্যবহার করিস। আমায় আর যখ হয়ে পাহারা দিতে হবে না। আমি মুক্ত।’ ছিদাম বায়েন দু‘হাত জোড় করে কপালে ঠেকাল।
‘কিন্তু ছিদাম দাদু, প্রাণনাথ কীর্তনীয়া কীভাবে বুঝতে পেরেছিল এই সনাতন কীর্তনের অর্থ?’
‘প্রাণনাথদাদা প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ছিল। তাছাড়া স্বদেশীরা সেসময় প্রচুর সাংকেতিক ভাষায় পত্র চালাচালি করত। প্রাণনাথদাদার তাই বদসি যদির অষ্টতাল শুনে বেশি সময় লাগেনি এই সনাতন কীর্তন আত্মস্থ করতে। প্রাণনাথদাদা বলেছিল কোশীগুলো নিঃশব্দ। তাই সনাতন কীর্তন থেকে কোশীগুলো সরালেই পাওয়া যাবে এর অর্থ। আর শেষ পদ নিঃশব্দে গাওয়ার কথা, তাই শেষ পদের তালে মদনদোলায় শুধু কোশীগুলিই ধরতে হবে।’
‘মন্দির থেকে সুড়ঙ্গে পৌঁছানো পর্যন্ত বুঝতে পারলাম। তারপর কীভাবে দাদু পালালেন?’
“প্রাণনাথদার অসামান্য সাহস ছিল, তেমনি বুদ্ধি। নতুবা, ড্যানিয়েলের চোখে ধুলো দিয়ে পালানো একপ্রকার অসম্ভবই ছিল। ধুলটের অধিবাসের সন্ধ্যায় সকলে কীর্তন শুনতে মন্দিরের সামনে ভিড় করেছিল, কিন্তু আমার বাবা মানে প্রাণনাথদাদার ভুবনকাকা ধুলটে যায় নি।’
“কেন?”
“প্রাণনাথদাদার নির্দেশ অনুযায়ী বাবা তখন শ্মশানে চিতা জ্বালাচ্ছিল।’ ‘চিতা? কার চিতা?”
‘নদীতে ভেসে আসা একটা মড়াকে চিতায় তুলে সেই চিতায় আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল বাবা, চিতাটা ঠিক সুড়ঙ্গের ওপর সাজিয়েছিল যাতে সুড়ঙ্গটা ঢাকা পড়ে যায়। নে, এখন খোঁজ শালা ! ইংরেজ পুলিশ চারপাশ তন্নতন্ন করে খানাতল্লাশি করেছিল – নদীর ঘাট, নদীর প্রতিটি নৌকা, করতালতলীর প্রতিটি খলপার আখড়া, মাঠ, জঙ্গল – কিন্তু প্রাণনাথদাদাকে খুঁজে পেল না। ড্যানিয়েল সাহেব চলে যাওয়ার পর বাবা ওই সুড়ঙ্গের মুখ চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল।’
*আপনি দেখা করেছিলেন?’
“ধুলটের পরই আমাকে গ্রেফতার করে জেলে নিয়ে গেছিল। ফিরে এসে শুনলাম প্রাণনাথদাদা চলে গেছে।’
‘কোথায় গেল প্রাণনাথ কীর্তনীয়া?”
“জানিনা,’ ছিদাম বায়েন বলল। ‘আমি শুনেছিলাম পণ্ডিচেরীতে পালিয়ে আসা কিছু বিপ্লবীকে ঋষি অরবিন্দ নাকি তাঁর আশ্রমে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কে জানে হয়তো তাদের মধ্যেই একজন ছিল প্রাণনাথ কীর্তনীয়া। আবার কেউ কেউ বলে যে উনি নাকি পণ্ডিচেরী থেকে তুতিকোরিন গিয়ে সেখানে থেকে জাহাজে কলম্বো চলে যান। তারপর কলম্বো থেকে জাহাজে ফ্রান্সের মার্সাই যান।’
‘ফ্রান্সে?”
“ওখান থেকে নাকি ভারতের বিপ্লবীদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র পাঠাতেন প্রাণনাথদাদা।’
‘প্রাণনাথ কীর্তনীয়া তারপর আর কতদিন জীবিত ছিলেন?”
*আমি জানি না। আমার সঙ্গে সেদিনের পর আর দেখা হয় নি।”
“প্ৰাণনাথ কীৰ্তনীয়া তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন?”
সে মন্দিরাদিদিই বলতে পারত। সে উত্তর আমি কীভাবে দেব, ছিদাম বায়েন ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। তবে আমার মনে হয় প্রাণনাথদাদা একবার অস্ত্রত্যাগ করার পর আর অস্ত্র হাতে নেবে না। ও সত্যিই সন্ন্যাসী হয়ে গেছিল।’
‘প্রাণনাথ কীর্তনীয়া তাঁর মন্দিরাকে ছেড়ে সন্ন্যাস নিতে পারল?”
“সন্ন্যাসের টান দুর্বার। একে প্রতিরোধ করা যায় না। নিমাইয়ের মত পণ্ডিত মানুষও তো বিষ্ণুপ্রিয়াকে ছেড়ে চলে গেছিল।”
***
পরদিন ভোরের ট্রেনে পদাবলী করতালতলী থেকে কলকাতা এল। পদাবলীর হাতে আজ সময় অত্যন্ত অল্প। শিয়ালদার টেলিফোন বুথ থেকে মুক্তাকে ফোন করল পদাবলী। মুক্তা সব শুনে বলল, ‘আজ তো কালীপুজো। বড়মামাদের ল’ ফার্ম তো বন্ধ। ঠিক আছে তুমি আমাকে কিছুটা সময় দাও। বড়মামা আমার সব আবদার রাখে। তুমি তোমার স্যারের সঙ্গে কাজ হয়ে গেলে আমার বাড়ি এস। দরকার পড়লে তোমায় মামার বাড়িতে নিয়ে যাব।’ তারপর
পদাবলী গেল নাইট্রোজেনের বাড়ি। ‘স্যার, এই নিন আপনার
সনাতন কীর্তনের বাকি অংশ যা আপনি এত বছর ধরে খুঁজছিলেন। প্রফেসর কাগজটা দেখে বিস্ময়ে এমনভাবে তাকালেন যেন পদাবলী তাঁকে গোপন সোনার খনির সন্ধানের নকশা দিল। ‘ছিদাম বায়েনের কাছেই ছিল?”
‘হ্যাঁ, প্রাণনাথ কীর্তনীয়া চায়নি এটা বাইরের কারোর হাতে পড়ুক। আপনাকে গোবিন্দ অধিকারী ফোনে ভয় দেখিয়ে আপনার করতালতলী যাওয়া বন্ধ করেছিল। ও খুব অনুতপ্ত। ও আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে। আপনার আর করতালতলী যাওয়ার কোনও বাধা রইল না।’
“কিন্তু “বদসি যদি”র তাল -? ‘
আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, স্যার, পদাবলী বলল। ছিদাম বায়েন বলল কোশীগুলো নিঃশব্দ। তাই সনাতন কীর্তন থেকে কোশীগুলো সরালেই পাওয়া যাবে এর অর্থ। আর শেষ পদ নিঃশব্দে গাওয়ার কথা, তাই শেষ পদের তাল মদনদোলায় শুধু কোশীই ধরতে হবে।”
নাইট্রোজেন ঝুঁকে পড়লেন কাগজ নিয়ে। ওঁর দু‘মিনিটও লাগল না শিখিয়ে দেওয়া সমাধান বের করতে। নাইট্রোজেন বললেন, ‘করতালতলী। নীলমাধব খণ্ডিতে দুই। বহির্গমনে চিতার গোপন পাতাল দ্বার। তারপর মদনদোলার কোশীতে - দেহি পদপল্লবমউদারম শিরসি। শেষ লাইনের মানে?’
রাধিকার পায়ের পাতা যদি শ্রীকৃষ্ণের মস্তকে স্থাপন করে যায় তবে পাতালে যাওয়ার দ্বার খুলে যায়।’
নাইট্রোজেনের মুখে হাসি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমার স্বীকার করতে বাধা নেই যে প্রাণনাথ কীৰ্তনীয়া নমস্য। সত্যি আমি পারতাম না। আর এই শিক্ষা আমি পেলাম প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার নাতির থেকে। কী অপূর্ব যোগাযোগ! এরপরেও তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করবে না, পদাবলী?’ নাইট্রোজেনের দু‘চোখ জলে ভরে গেছে।
কিন্তু স্যার, প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কী হল শেষ পর্যন্ত?”
“১৯৩০-৩৪ সালে বাংলার বিপ্লবীরা ইংরেজদের উত্যক্ত করে তুলেছিল। বিপ্লবীরা চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুঠ করছে, কলকাতায় রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ করে ইংরেজ কর্মীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, ঢাকায় লোম্যাক হডসনের ওপর আক্রমণ, মেদিনীপুরে একাধিক ম্যাজিস্ট্রেটকে গুলি, চারদিকে লুঠতরাজ এসব দেখে শুধু ইংরেজ সরকার না, গোটা ইংরেজ জাতি এই স্বদেশীদের ওপর ক্ষেপে উঠেছিল। স্টেটসম্যানে ইংরেজরা চিঠি প্রকাশ করছে যে যারা ধরা পড়বে কালবিলম্ব না করে তাদের জেলের দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা উচিত। তার উত্তরে কেউ লিখছে যে অত দেরি কেন, হাতের কাছে ল্যাম্প পোস্ট নেই? এসময় ইংরেজদের শত্রু প্রাণনাথ যে গা ঢাকা দিয়ে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর যদি ধরা পড়ে গিয়ে থাকে তবে হয়তো সে বেঁচে নেই।’ “ড্যানিয়েলের কী হল?”
“আমি ড্যানিয়েলের সম্বন্ধে রিসার্চ করেছিলাম,’ নাইট্রোজেন বললেন। “ড্যানিয়েল ব্রিটিশ ভারতে মোটামুটি উন্নতি করেছিল। পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট থেকে পাঁচ বছরে ডেপুটি কমিশনার হয়ে রিটায়ার করে ওর দেশ আয়ারল্যাণ্ডে ফিরে গেছিল। তারপর ড্যানিয়েলের বিশেষ সেবার জন্য ব্রিটিশ সরকার ওকে নাইটহুডের জন্য বিবেচনা করেছিল। কিন্তু ওর ডাবলিনের বাড়িতে একদিন সকালে ওকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশের ময়না তদন্তে জানা যায় যে ওর বুকের পাঁজরে কেউ এত জোরে আঘাত করেছিল যে ওর পাঁজর ভেঙে হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসে চোট লাগে এবং তাতে ওর মৃত্যু হয়। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও আততায়ীকে ধরতে পারেনি।’
“মৃদঙ্গমদের আফিম-বিরোধী আন্দোলন কী শেষ হয়ে গেল?”
‘না। মৃদঙ্গমের খবরটা চারদিকে চাউর হয়ে গেল। তারপর দলে দলে স্বেচ্ছাসেবক গাঁজা, আফিম, মদের দোকানের সামনে পিকেটিং শুরু করল। পুলিশ এসে ওদের গ্রেফতার করে ভ্যানে ঢোকাত, আর ওরা বন্দেমাতরম, গান্ধীজীর জয়, এসব ধ্বনি দিতে দিতে জেলে যেত। অবস্থা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না ইংরেজদের পক্ষে। এদিকে গ্রামের পটুয়ারাও নাকি এই সর্বনাশা আফিম চাষের কাহিনী নিয়ে গান বেঁধে শহরে গ্রামে প্রচার করত যাতে কৃষকেরা আফিম চাষে সহযোগিতা না করে। ওরা গোপনে লোকশিক্ষা দিয়ে বোঝাত যে ইংরেজ নিজের দেশে আফিম বিক্রি বন্ধ করে আমাদের দেশে এই বিষের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক কাজ দিয়েছিল। আমি পড়েছি যে কিছু অতি উৎসাহী লোক তখন তাড়ি খাওয়া বন্ধ করার জন্য তালগাছ কাটতে লেগে গেছিল।’
” ‘ছিদাম বায়েন কাল আমাকে আরও কিছু কাগজ দিয়েছে, স্যার, পদাবলী ফাইলটা বের করল।
“এটা কী?”
‘আপনি দেখুন, পদাবলী দলিলের ফাইলটা এগিয়ে দিল।
স্ট্যাম্প পেপারের পৃষ্ঠা উল্টে উল্টে দেখতে দেখতে নাইট্রোজেনের দু-চোখ ঝকমক করে উঠল। ‘আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।
*আরেকটু আছে, স্যার,’ পদাবলী বলল। এই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী আপনিও। তাই আমি এই সম্পত্তিতে আপনাকেও অংশীদার করতে আপনার অনুমতি চাই।’
‘আমার কোনও সম্পত্তি চাই না,’ নাইট্রোজেন স্মিত হেসে বললেন। ‘ধন, খ্যাতি, ক্ষমতা এসব হল বিষ্ণুর পাতা ফাঁদ। সারাটা জীবন ধরে কলুর ঘানির বলদের মত ঘুরিয়েই যাবে। এসব হল অসার বৈষ্ণবী মায়া। শিব হতে হবে। বিষ্ণু কৈলাসের রত্নের ভাণ্ডার শিবকে দিলেন আর শিব সেসব কুবেরের হাতে গচ্ছিত করে নিজে চললেন শ্মশানে। চন্দন প্রলেপের বদলে শরীরে ভস্ম মেখে বিষ্ণুমায়া কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাবা ভোলানাথ। আমি এই সম্পত্তি নিয়ে কী করব?’
‘আপনার সম্পত্তি চাই না। কিন্তু আপনার মা যে মৃদঙ্গম দাসের স্ত্রী ছিলেন, এই সম্পত্তি আপনার মাকে সেই স্বীকৃতি দেবে।’
নাইট্রোজেন ফ্যালফ্যাল করে পদাবলীর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তুমি আমার সঙ্গে এস, প্রফেসর পদাবলীর হাত ধরে ভিতরের ঘরে মায়ের ফটোর সামনে নিয়ে গেলেন। প্রফেসর মায়ের ছবির সামনে পদাবলীকে জড়িয়ে ধরে বললেন – মা, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ ? জমিদার কুমুদরঞ্জনের বংশধর স্বীকৃতি জানাচ্ছে যে জমিদার কুমুদরঞ্জনের পুত্র তোমার স্বামী মৃদঙ্গম দাসের ছেলে আমি।’ প্রফেসরের চোখে জল। প্রফেসর চোখ মুছে বললেন, ‘তুমি তোমার ঠাম্মার একটা ঋণ শোধ করলে।’ -
‘ঠাম্মার ঋণ?’
*ধুলটের পর একটা সময় ছিল যখন ছিদাম বায়েনকে পুলিশ অখিলরঞ্জনের হত্যার সন্দেহে আবার জেলে ঢুকিয়েছিল, পুলিশ তখন কুমুদরঞ্জনকে গ্রেফতার করল প্রাণনাথকে আশ্রয়ের অভিযোগে। কিছুদিনের মধ্যেই তোমার ঠাম্মা মন্দিরা বুঝতে পারল প্রাণনাথের প্রেম তার গর্ভে জেগে উঠেছে। মন্দিরা তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কোথায় যাবে সে? তখন তাকে আশ্রয় দিয়েছিল আমার মা তাদের চন্দননগরের বলরাম গোঁসাইয়ের আখড়ায়। সে সময় এইসব বোষ্টমদের আখড়াগুলোতে অনেক হিন্দু পরিবারের বিধবা মেয়ে গোপনে তাদের অবৈধ সন্তানের জন্ম দিয়ে সমাজের চোখে হেয় হওয়া থেকে মুক্তি পেত। সেই আখড়ায় লোকচক্ষুর আড়ালে মন্দিরা জন্ম দেয় তার পুত্র সন্তানকে। তারপর মন্দিরার দাদু মণিপুর না ত্রিপুরা থেকে এসে মন্দিরা আর তার শিশুপুত্রকে নিয়ে যায়। আমার মনে হয় আমার মা মন্দিরার নোটবই থেকেই সনাতন কীর্তনের দুটো লাইন জেনেছিলেন, আর আমি সেই দুটো লাইনই আমার প্রবন্ধে লিখেছিলাম।’
ঠাম্মা আপনার মায়ের আশ্রয়ে ছিলেন?’ পদাবলী অবাক।
নাইট্রোজেন মায়ের ফটোটা দেওয়াল থেকে নামিয়ে আনলেন। পদাবলী চুপচাপ দেখতে লাগল। নাইট্রোজেন ফ্রেমের পিছনের পিচবোর্ড খুলে ছবিটা বের করে আনলেন। তারপর ছবির পিছনের দিকটা ঘোরালেন। পদাবলী অবাক একজন সুন্দরকান্তি পুরুষ মানুষের ছবি। ‘ইনি কে বলতে পার?’
‘মৃদঙ্গম দাস?’
“হ্যাঁ। ইনিই প্রতিমা দেবীকে বিবাহ করেছিলেন। শিল্পী এদের ছবি একই কাগজের দু‘দিকে বেঁধে রেখেছিলেন।’
‘কিন্তু শিল্পী জানলেন কীভাবে মৃদঙ্গম দাসকে কেমন দেখতে? ওঁর তো সমস্ত ছবিই ইংরেজদের পুলিশ নষ্ট করে দিয়ে গেছিল?’
‘যে ছবি শিল্পীর মনে গাঁথা তা নষ্ট করবে কীভাবে?” ‘কে এঁকেছিল এই ছবি? আপনার মা?’
‘ছবির কোনায় নিচে শিল্পীর নাম লেখা, পড়লে নিজেই বুঝতে পারবে, ‘ নাইট্রোজেন মৃদু হেসে বললেন।
পদাবলী ছবির কোনায় দেখল। আর অস্ফুট উচ্চারণ করল- ‘ম-ন-দি-রা! ঠাম্মা এঁকেছে এই ছবি!’
পদাবলীর কাছে রহস্যের জট খুলে গেছে। নাইট্রোজেন বললেন, আমি প্রাণনাথকে মনে মনে প্রণাম করি। আমি আন্দাজ করতে পারি ড্যানিয়েলকে কে মেরেছিল। আমার বাবার নৃশংস হত্যার একটা বিচার হওয়ার দরকার ছিল।
***
পদাবলী তারপর গেল মুক্তার বাড়ি।
‘আমি বড়মামাকে বলে রেখেছি। তুমি চিন্তা কোরো না, আমার ওপর ছেড়ে দাও। তোমার প্রফেসর কো-ওউনার হয়ে যাবেন এই প্রপার্টিতে। বড়মামা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চান। চল, উনি অফিসে থাকবেন।’
দু‘জনে মিলে গেল ডালহৌসীতে খৈতান অ্যাণ্ড চ্যাটার্জী অ্যাসোসিয়েটস অ্যাট ল’ ফার্মে। আজ এমনিতেই রবিবার, তার ওপর কালীপুজো, ডালহৌসীর অফিস পাড়া একদম খালি। তাও মুক্তার বড়মামা মুক্তার জন্য একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেটকে অফিসে আসতে বলেছিলেন। অ্যাডভোকেট জমিদার কুমুদরঞ্জনের কোর্টপেপার আর ছিদাম বায়েনের কাগজ-পত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বলল, ‘একদম ক্লিন। স্যার, এটা আমাদের ল’ ফার্মই হ্যাণ্ডেল করেছে।’ মুক্তার বড়মামা বললেন, ‘গুড।’ তারপর পদাবলীকে বললেন, “ওই সমস্ত
প্রপার্টির মালিক তুমি। কিন্তু এই প্রপার্টির মালিকানায় ডঃ নীতিশ নাগকে কেন যোগ করতে চাও?’
‘উনিও আমার মতই এই জমির উত্তরাধিকারী, স্যার।’
‘এই প্রপার্টির ভ্যালু অনেক। আর ইউ সিওর?’
‘ইয়েস স্যার। উনিও এই প্রপার্টির উত্তরাধিকারী।’
‘ওকে, অ্যাজ ইউ উইশ।’ মুক্তার বড়মামা মুক্তাকে বলল, ‘কিছু সইসাবুদ করাতে হবে। তুই চিন্তা করিস না। আমরা ডঃ নাগের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করব। আমার কাছে সব পেপারস রাখছি। রেজিস্ট্রি করতে সময় লাগবে।’
অ্যাডভোকেট কয়েকটা ফর্মে পদাবলীকে দিয়ে সই করাল। মুক্তা ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘আমাদের জন্য আজ কালীপুজোর দিন আপনাদের অফিসে আসতে হল। আমরা সরি। কিন্তু অনেক ধন্যবাদ।’
অ্যাডভোকেট না-না ঠিক আছে’ গোছের কিছু বলছিল, কিন্তু মুক্তার বড়মামা হেসে বললেন, ‘মা কালী তাঁর পুজোর দিনে এত ভাল একটা কাজ আমাদের হাত দিয়ে করাচ্ছেন। এতে আমাদেরই পুণ্য হবে। যা এখন বাড়ি যা। আমরাও উঠব।’
সই-সবুদ করে পদাবলী উকিলের অফিস থেকে বেরিয়ে মুক্তাকে বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা নেই।’
আমাকে তোমার প্রপার্টিতে ঢুকতে দেবে তো?’ মুক্তা চোখ ছোট ছোট করে বলল। ‘কালাগলা মানিকজোড়ের কয়েকটা ফটো তুলে আনব, ব্যাস। ‘
মুক্তার রসিকতায় হাসল পদাবলী - তুমি সেদিন ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী খোঁজার কথা বলছিলে। আমি ব্যাঙ্গমা খুঁজলাম। ডিক্সনারীতে। হয়তো বিহঙ্গম থেকে ব্যাঙ্গমা শব্দটা এসেছে। বিহঙ্গম মানে তো পাখি –
“অসাম,’ মুক্তা বলল। “থ্যাঙ্ক ইয়ু। এটা আমি কখনো ভাবিনি। নাউ হোয়াট?” পদাবলী বলল, “আমাকে আজ আবার করতালতলী ফিরে যেতে হবে। কাল বিকেলে অধিবাস, হাতে একদম সময় নেই। তুমি পাখি দেখতে কবে আসছ?”
“কবে মানে? পারলে আজই যেতাম। কাল খুব সকালে আমি যাচ্ছি। সমরকাকা বাবার গাড়ি চালিয়ে আমাকে নিয়ে যাবে। তোমাকে কোথায় পাব?”
“তুমি গোবিন্দ অধিকারীর বাড়ি চলে এস। মন্দিরের কাছেই ওঁর একমাত্র বাড়ি। ওঁকে তোমার দরকার হবে পাখির বাসার লোকেশনটা দেখাতে। ডিঙিতে যেতে হবে। আমরা একসঙ্গে বরং যাব। আমি রাতে গোবিন্দ অধিকারীর বাড়িতেই থাকব। মিউজিয়ামের কাজ এগোচ্ছে, সেটাও দেখতে হবে।’
‘ঠিক আছে। কাল দেখা হবে,’ মুক্তা টা-টা করে দিল। পদাবলী নীলমাধবের কাছে মনে মনে চাইল, ঠাকুর পাখিদুটো যেন না পালায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন