প্রীতম বসু
শেষরাতের দিকে ঘুমে চোখ টেনে এসেছিল, ঘুম ভাঙল বাইরের দরজায় টকটক টোকার আওয়াজে। মন্দিরা আজও উঠে এসেছে। মেয়েটা যন্ত্রের মত ওর দায়িত্ব পালন করে চলেছে।
প্রাণনাথ প্রাতঃকৃত্য সেরে ফিরে এল। মন্দিরা বলল, ‘যদি খোলের ভিতরে কিছু পাওয়া যায় তবে ছিদাম বা ভুবনকাকাকে কিছু বোলো না।’ ‘বলব না?”
‘ছিদাম আর ভুবনকাকা দু‘জনের ওপরই আমাদের খুব বিশ্বাস। কিন্তু ওরা এখন দু‘জনেই ভুবনকাকার শরীর নিয়ে খুবই চিন্তিত।’ “আমি কি খোলের চামড়াটা কেটে ফেলতে পারি?”
“খোলটা ভেঙো না। বাঁয়াটা কেটে ফেল। ওটা আবার পালটে লাগিয়ে দেওয়া যাবে।’ মন্দিরা ঘর থেকে একটা ছুরি আনল। এখন সকালের অপেক্ষা।
সকাল হচ্ছে। হালকা আলো যেই খড়ুটি ঘরের ভিতর প্রবেশ করল প্রাণনাথ খোলের বাঁয়ার চাক কেটে আলাতলা সরিয়ে ফেলল। তারপর ভিতরে হাত ঢোকাল প্রাণনাথ। হাত কিছুতে স্পর্শ করল। প্রাণনাথের বুক ধক করে উঠল। একটা কাপড়ের থলে খোলের গায়ে আঁটোসাঁটো ভাবে আটকানো। প্রাণনাথ ভিতর থেকে টেনে বের করল থলেটা। থলের মুখ খুলল।
ভিতরে একতাড়া কাগজ!
আবছায়ায় ঠিকমত পড়া যাচ্ছে না। কাগজগুলো চোখের কাছাকাছি নিয়ে এল প্রাণনাথ। পাতাগুলো এলোমেলো হয়ে রয়েছে। ঘরের ভিতরে এখনো এত আবছা অন্ধকার যে লেখাগুলো ঠিক মত বোঝা যাচ্ছে না।
একটু সময় লাগবে। প্রাণনাথ অপেক্ষা করতে লাগল। ঘরের ভিতরে আলো বাড়তে লাগল। প্রাণনাথ এবার কাগজগুলো বন্ধ জানলার কাছে নিয়ে গিয়ে দেখার চেষ্টা করল। প্রথম পাতায় কিছু মানুষের নাম।
অবনী দত্ত, ঘোড়াডাঙা
সূর্যপ্রকাশ চৌধুরী, শুশুকখাল
বিপুল অধিকারী, বদরীথান
সম্রাট শিকদার, মেছোহাট
রমনীমোহন নাগ, ডুমুরজলা
রজনীকান্ত বোস, কাপাসডাঙা
প্রাণনাথের চোখটা আটকে গেল। রজনীকান্ত বোস, কাপাসডাঙা? এ তো ওর বাবা! তালিকায় আরও বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে। এটা কীসের তালিকা? এই তালিকায় ওর বাবার নাম কেন?
বাইরে ছিদামের নিচু গলা – ‘মন্দিরাদিদি, বাবা এসেছে।’ -
‘আসছি,’ মন্দিরার গলা পাওয়া গেল।
ভুবনকাকা এসেছে। প্রাণনাথ তাড়াতাড়ি তালিকার পৃষ্ঠাটা ভাঁজ করে পিরানের পকেটে ঢোকাল, বাকি কাগজগুলো আবার থলের মধ্যে দ্রুতহাতে ঢুকিয়ে রেখে খোলটা ঘরের কোনায় রেখে একটা কাপড় চাপা দিয়ে দিল।
দরজার তালা খোলার শব্দ। দরজায় মন্দিরা, পিছনে ভুবনকাকা আর ছিদাম। ভুবনকাকাকে ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে আবার তালা লাগিয়ে দিল মন্দিরা। ভুবনকাকার মুখে হতাশার থমথমে ভাব।
‘ভুবনকাকা, প্রাণনাথ উঠে দাঁড়াল। ‘ওদিকের খবর কী?”
*সরকারি চাকরিটা এবার ছাড়তে হবে। আর পারা যাচ্ছে না। রোজ রোজ জেলের ভিতর কচি কচি ছেলেগুলোকে যা অত্যাচার করছে, তা আর দেখা যাচ্ছে না। জেলের ভিতর ফাঁসিকাঠে ঝোলানো ছেলেগুলোর চিতায় আগুন দেওয়ার থেকে আমার পূর্বপুরুষের এই করতালতলীতে চিতার ডোমের কাজ অনেক শান্তির।’
‘ভাবছিলাম একবার চন্দননগর থেকে ঘুরে আসব। অনেক অর্থ আমার জিম্মায় রাখা। সেগুলোর দায়িত্ব কারোর হাতে দিয়ে ফিরে আসব,’ প্রাণনাথ বলল।
‘ভুলেও এখন বাইরে যেও না,’ ভুবনকাকা বলল। ‘কলকাতা আর মফঃস্বলে রোজ কত যে স্বদেশী ধরা পড়ছে তার ইয়ত্তা নেই। পুলিশ কলকাতার মেস বাড়িগুলো থেকে দলে দলে কলেজের ছাত্রদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে দালান্দা হাউজে। তাদের উত্তমমধ্যম পিটিয়ে কথা বের করার চেষ্টা করছে। ওরা জানে এদের অনেকেই নির্দোষ, তবু যদি কিছু ইনফরমেশন পাওয়া যায়। তারপর ওদের মধ্যে যাদের সন্দেহ হয় তাদের নিয়ে যায় কীড স্ট্রীটের সি আই ডি অফিসে। দমদম, ব্যারাকপুর, নৈহাটি যেখানেই যাও রাস্তায় প্রত্যেকদিন দেখতে পাবে কোনও না কোনও বাড়ি লাল-পাগড়িতে ঘেরা। গঙ্গায় পুলিশের কালো লঞ্চ পাহারা দিচ্ছে। একদম ঝুঁকি নিও না। তোমাকে শুধু সাবধান করতেই আমি এলাম। আমার এখানে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। আমি চলে যাচ্ছি। কিছু জানতে পারলে ছোটরাজাবাবুকে কেন ড্যানিয়েল অত অত্যাচার করে মারল?’ -
প্রাণনাথ ঠিক করেছিল যে খোলের ভিতরের কাগজের কথাটা বলবে না। তাই সে প্রসঙ্গে গেল না। কিন্তু তালিকার লোকগুলোকে ভুবনকাকা চিনতে পারে। পকেট থেকে পৃষ্ঠাটা বের করে ভুবনের হাতে দিয়ে বলল, ‘দেখ তো ভুবনকাকা, এদের তুমি চেন কিনা? এই লিস্টটা মৃদঙ্গমের কাগজের মধ্যে পেয়েছি।”
ভুবন জমাদার তালিকাটা দেখল। পনেরটা নাম। ভুবন জমাদার চোখ কুঁচকে একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘সকলকে আমি চিনি না। তবে অন্ততঃ দশ জনকে আমি জানি। এরা প্রত্যেকেই বড় জমিদার। আর আশ্চর্য! সেই দশজনই মৃত।’
‘মৃত?’
‘হ্যাঁ আমি যতদূর মনে করতে পারছি অবনী দত্তের ঘোড়াডাঙার বিশাল ফসলের জমি স্বদেশীরা ফসল কাটার সময় জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অবনী দত্তের কাছে দু‘নলা বন্দুক ছিল। ওর লেঠেলরা কোঁচ, বল্লম, লাঠি নিয়ে স্বদেশীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু-একজন স্বদেশী মারাও গেছিল। অবনী দত্ত স্বদেশীদের গুলিতে প্রাণ হারায়।
‘বাকিরাও কি স্বদেশীদের হাতেই মরেছিল?’
মাথা উপর নিচ নাড়াল ভুবন - ডুমুরজলার রমনীমোহন নাগ রায়সাহেব। এরও জমি জ্বালিয়ে দিয়েছিল স্বদেশীরা। একে স্বদেশীরা ওর বাড়িতে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে, আর ওর বিধবা পুত্রবধূকে উঠিয়ে নিয়ে যায়।’
‘স্বদেশীরা এদের জমির ফসল কেন জ্বালাচ্ছে?’ প্রাণনাথ প্রশ্ন করল। “তা আমি বলতে পারব না। তবে ফসল জ্বালালে আমাদের দেশের লোকেদেরই ক্ষতি। জমি অনাবাদী হয়ে যায়। গাঁয়ে খরা হলে জমিদার মরে না, গরিব চাষিই মরে।’
ভুবন জমাদার তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য উঠল। যাওয়ার সময় আবার বলল, “তুমি কিন্তু একদম এই বাড়ির বাইরে পা রাখবে না। ওরা যেন কিছুতেই টের না পায়। তোমাকে আশ্রয় দেবার জন্য মন্দিরা আর জমিদারগোঁসাইয়ের জীবনও বিপন্ন হয়ে যাবে। জেলের অত্যাচার কী সেটা আমি কাছ থেকে দেখেছি।’ ‘আমি লুকিয়ে
থাকব।’
‘আরেকটা কথা,’ দরজার কাছে এসে ভুবন নিচু গলায় প্রাণনাথকে বলল। ‘এখানকার জমিদার হলেন জমিদারগোঁসাইয়ের ছোটভাই। সে স্বদেশী আন্দোলনের বিরোধী। রায়বাহাদুর খেতাবের জন্য গর্মেন্টের গুপ্তচরের কাজ করে অনেক স্বদেশীকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। লোকটা নিজে মদ্যপ, বেশ্যাসক্ত, প্রজাদের অত্যাচার করে, প্রতারণা করে তাদের অর্থ-জমি-গৃহ আত্মসাৎ করেছে। জমিদারের অনেক গুপ্তচর আছে। আমি এখন করতালতলীর খেয়াঘাটে অনেক অজানা ভিখিরি, মাতাল, সন্ন্যাসী দেখছি। আমার মনে হচ্ছে এরা ইংরেজদের টিকটিকি। ভুলেও নদীর দিকটাতে যেও না। ওখানে শ্মশানের কাছে একটা কৌপীন পরা জটাধারী সাধুকে দেখলাম সামনে মাটিতে সিঁদুর মাখানো ত্রিশূল গেঁথে বসে চেলাদের সঙ্গে গাঁজার কলকেতে টান মারছে। আমার মনে হয় টিকটিকি। আমি চাইনা তুমি ওই গুপ্তচরদের নজরে পড়। তোমাকে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। আর ওরা যেন না জানে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলেছি।’
‘কেউ জানবে না, ভুবনকাকা।’
ভুবন জমাদার ঘরের কোনায় তাকাল, ‘ওই হাঁড়িতে পায়খানা পেচ্ছাপ কর?’ “হ্যাঁ।”
দাও, আমি পরিষ্কার করে ধুয়ে দিচ্ছি।’
“না না, তোমাকে পরিষ্কার করতে হবে না, ভুবনকাকা। আমিই-‘
“পরিষ্কার না করলে ওয়ার্ডার বলবে এত সময় ধরে কী গুজগুজ করছিলি?” “ওয়ার্ডার? কোন ওয়ার্ডার?”
উঠল। I “জেলের ইউরোপীয় ওয়ার্ডার,’ ভুবন জমাদার ফিসফিস করে বলল। শকুনের মত চোখ। খুব সাবধান।’ ভুবনকাকার চোখ বড় বড় হয়ে প্রাণনাথের অস্বস্তি হল। ‘এখানে ওয়ার্ডার কোথা থেকে আসবে?”
‘আসবে না? বলছ? তাহলে ভয়ের কিছু নেই। আমি বাড়ি যাই।’
ভুবন জমাদার খডুটির চালের দিকে চেয়ে বলল, ‘গুরুলের আঁটি আলগা হয়ে গেছে। হিম পড়া শুরু হয়ে গেছে। ঠাণ্ডা লেগে যাবে। ছিদামকে বলব, আটনকাঠির খুঁচি দিয়ে যাবে।’ ভুবন জমাদার দরজায় টোকা দিতেই মন্দিরা দরজা খুলে দিল। ভুবন জমাদার চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। বাইরের দরজা বন্ধ করে দিল মন্দিরা। লোকটার ব্যবহার খুব অস্বাভাবিক লাগল, প্রাণনাথ ভাবল।
মন্দিরা বাইরে থেকে ভুবনকাকার সঙ্গে প্রাণনাথের কথাবার্তা শুনেছে। মন্দিরা খড়ুটি ঘরে ঢুকে বলল, ‘দাদারা চাষের ফসল জ্বালাত? আমার বিশ্বাস হয় না।”
‘আমিও বিশ্বাস করতে পারছি না।’
এবার মন্দিরা নিজেই বলতে লাগল, ‘জান প্রাণনাথদা, আমাদের চাষের জমি অত্যন্ত কম। তবু হেমন্তে আমাদের ক্ষেতে ধান কাটার সময় ঢাক-ঢোলের বাদ্যি বাজিয়ে ধান কাটার উৎসব শুরু হত। ভোরবেলা বাজনাদারেরা এসে সানাই বাজাত আর চাষিরা কোমরে নতুন গামছা বেঁধে, কামারশালা থেকে ধার শানানো কাস্তেতে সিঁদুর মাখিয়ে মাঠে নেমে পড়ত ধান কাটতে। প্রথম আঁটি ধান যখন ঘরে আনা হত তখন আমার মা নাছদুয়ারে সেই ধান্যলক্ষ্মীকে বরণ করত দূর্বা দিয়ে, মঙ্গলঘট থেকে জল ছিটিয়ে আর মঙ্গলপাখা দিয়ে বাতাস করে। আর চাষিদের নতুন কাপড় দেওয়া হত। দাদা এসব ঐতিহ্য দেখে বড় হয়েছে। সেই দাদা কীভাবে জমির ফসল জ্বালাতে পারে? আমার বিশ্বাস হয় না।
‘তুমি যা বললে সেই ছবি আমার বুকেও আঁকা। আমাদের বাড়িতেও এই একই রকম ধান কাটার অনুষ্ঠান হত, প্রাণনাথ বলল। ‘মৃদঙ্গম কি এই জমি জ্বালিয়ে দেওয়া স্বদেশীদের সঙ্গে কাজ করছিল? কিন্তু কেন ওরা জমির ফসল জ্বালাচ্ছিল? আমি বাকিটা পড়লে সব বুঝতে পারব।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন