প্রীতম বসু
মন্দিরা প্রদীপ হাতে দাওয়ায় বেরিয়ে এল। প্রাণনাথকে দেখে মন্দিরার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই প্রাণনাথের পোশাকের দিকে তাকিয়ে মন্দিরার চোখে উৎকণ্ঠা – ‘প্রাণনাথদা, তুমি এই পোশাকে? তোমার গোঁফ-দাড়ি কাটা! চল চল, ভিতরে চল।’
প্রাণনাথ জানে মন্দিরা বুদ্ধিমতী। ও বুঝে গেছে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। প্রাণনাথ তাই প্রথমেই বলে দিল, ‘আমার পিছনে টিকটিকি লেগেছে। আমার একটা লুকোবার জায়গা চাই।”
‘দাদা কোথায়?”
‘দাদা,’ প্রাণনাথ ভাবল কী বলবে। সারাটা পথ সে এই মুহূর্তের জন্য তৈরি হয়েও কিছু স্থির করে উঠতে পারে নি। ‘ওর সঙ্গে আমার তিন দিন ধরে যোগাযোগ নেই।”
মন্দিরা এক দণ্ড থমকাল। তারপর ছিদামকে বলল, ‘ছিদাম, তুই বাড়ি যা। প্রাণনাথদা এখানে আছে সেটা কেউ যেন জানতে না পারে। কাল খুব সকালে আসিস, তোর আগড়ের জোগাড় করব।’
ঘরের মধ্য থেকে এক বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর, ‘কার সঙ্গে কথা বলছিস রে মন্দিরা?” মন্দিরা দ্রুত প্রাণনাথের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘বাবাকে কিছু বলার দরকার নেই এখন।’
মৃদঙ্গমের বাবা বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন বেরিয়ে এলেন। বৃদ্ধ ক্ষীণকায়, গৌরবর্ণ, মুখে পাকা দাড়ি, মাথার সব চুল পাকা, গায়ে পিরানের ওপর একটা গেরুয়া আলোয়ান, লুঙ্গির মত করে পরা বহির্বাস। প্রাণনাথ যতবার এঁকে দেখে ওর মনে হয় মানুষটা ত্যাগ, তপস্যা, শুচিতার প্রতিমূর্তি। মৃদঙ্গম অত্যন্ত চাপা স্বভাবের মানুষ, নিজের পরিবারের সম্পর্কে কিছুই মুখ ফুটে বলে নি, কিন্তু ধুলটে এসে প্রাণনাথ লোকমুখে যতটা শুনেছে তাতে ওর শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেছে। এই মানুষটাই করতালতলীর ধুলটের কাণ্ডারী - যেখানে পণ্ডিত-মূর্খ, ধনী-দরিদ্র, অধম, পতিত, অস্পৃশ্য, গুরু-শিষ্য, ভক্ত, গায়ক, সাধক সমবেত হয়ে পাশাপাশি বসে ভগবানের নামকীর্তন গায় আর উৎসবের ভোগ খায়। অথচ মানুষটা কী বিনয়ী। প্রথমবার এঁর অগাধ ঈশ্বরভক্তি দেখে প্রাণনাথ বলেছিল, ‘আপনি পরম বৈষ্ণব।’ কুমুদরঞ্জন হেসেছিলেন ‘তা আর হতে পারলাম কই। তিলকং তুলসীমাল্যং শিখা কোপিন বহির্বাস, হরেনাম সদামুখে বৈষ্ণব-পঞ্চ লক্ষণম্। বৈষ্ণবের পঞ্চ লক্ষণের কোনটাই আমার নেই। আমার কপালে না আছে তিলক, না গলায় তুলসীমালা, না মাথায় টিকি, কৌপীনও পরি না, তবে হ্যাঁ যেটুকু করি তা হল সুযোগ পেলেই নীলমাধবের নাম করি।
প্রাণনাথকে দেখে বৃদ্ধ অবাক চোখে প্রশ্ন করলেন, ‘আরে প্রাণনাথ তুমি? এ পোশাকে কেন? মৃদঙ্গম আসেনি?”
প্রাণনাথ থতমত খেয়ে গেল। গত দু‘বছরে এ বাড়িতে প্রাণনাথ ধুলটে সবসময় মৃদঙ্গমের সঙ্গেই এসেছে। প্রাণনাথ বলল, ‘আজ্ঞে না আমি একাই-’
প্রাণনাথের পোশাকের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার এ রকম পোশাক কেন বাবা?”
‘ইংরেজ আমায় খুঁজছে। তাই ‘
‘কেন তুমি কী করেছ?”
- বৃদ্ধের প্রখর তেজস্বী দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বলতে গেলে জিভ পাথরের মত শক্ত হয়ে যায় – আমাদের সঙ্গে ইংরেজদের তো একদম বনে না। দিনরাত কিছু না কিছু মারামারি লেগেই আছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মাঝে মধ্যে জেলে না ঢোকালে ওদের স্বস্তি হয় না,’ প্রাণনাথ কথা ঘুরিয়ে বলল।
- বৃদ্ধের মুখে বাইরের আঁধারের রঙ লেপে গেল – ‘তোমাদের এই খুনোখুনি মারামারি আমি একদম সমর্থন করতে পারি না, বাবা। দেশের স্বাধীনতার জন্য এত ভাবো অথচ নিজের বাপ-মা‘র কথা এতটুকু ভাবো না। তোমাদের কিছু হয়ে গেলে মা-বাপের কী অবস্থা হবে সেটা কি তোমরা কখনো চিন্তা করেছ?”
‘প্রাণনাথদাকে একলা কেন দোষ দিচ্ছ বাবা? দাদাকে তুমি বোঝাতে পারলে? এবার দাদা তো রাগ করে অন্ন-ব্যঞ্জন সব সরিয়ে রেখে বেরিয়ে গেল।’
যদি “আচ্ছা আমার কী দোষ? কিছু বলতে গেলেই তর্ক করতে আসবে? আমি বলেছি স্বদেশী কর আমার কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু সেই আন্দোলন অহিংস আন্দোলন হতে হবে। আমরা নিজেরা প্রাণী হত্যা করি না, নিরামিষ খাই, শুনি তুই মানুষ খুন করেছিস তবে সে মুহূর্তে আমি নীলমাধবের মন্দিরে গলায় দড়ি দেব।’
ও “মৃদঙ্গম খুব ভাল ছেলে কাকাবাবু। ও কীর্তন, নামগান নিয়েই থাকে, প্রতিবাদী আন্দোলনে যায়, কিন্তু সেটা অহিংস পিকেটিং। ওকে নিয়ে আপনার কোনও চিন্তা নেই।’
‘চিন্তা তো বাবা আমার এই মেয়ে নিয়ে। বয়স হচ্ছে, ঘরে আইবুড়ো মেয়ে, চিন্তা হয় না? তুই বড় দাদা, তোর চিন্তা হয় না বোনের জন্য?”
“বাবা, তুমি প্রাণনাথদাকে কি ভিতরে যেতে দেবে না?” মন্দিরা যেন রাগ চেপে বলল। ‘প্রাণনাথদাকে এখন কটাদিন এ বাড়িতে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে
হবে।’ তারপর ছিদামের দিকে চেয়ে বলল, ‘তুই হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন?” ছিদাম ইতস্তত করে আঙিনা পার হয়ে অন্ধকারে মিশে গেল। মন্দিরা প্রাণনাথকে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। ঘরের ভিতর ঢুকে প্রাণনাথ চমকে গেল। সারা ঘর লণ্ডভণ্ড। ঘরের বইয়ের তাকে প্রত্যেকটা বই এলোমেলো করে রাখা, দেওয়ালে গতবার এসে মন্দিরার আঁকা যে ছবিগুলো টানানো ছিল সেগুলো ভুলুণ্ঠিত। ঘরের কোনে কিছু ছবি এমন কুচি কুচি করে ছেঁড়া হয়েছে যেন ইঁদুর কেটে গেছে। কিছু বই মাটিতে পড়ে আছে। ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে কাপড় জামা টেনে টেনে বার করা। বালিশ তোষক ছিঁড়ে ফুঁড়ে দিয়ে গেছে – মনে হচ্ছে ঘরের ভিতর কিছুক্ষণ আগে একটা ঘূর্ণিঝড় দাপিয়ে গেছে, তার ক্ষয়ক্ষতি এঘরের চতুর্দিকে দৃশ্যমান। -
- “কী হয়েছে?” প্রাণনাথ বলল।
‘পুলিশ এসেছিল, আজ বিকেলে হঠাৎ, মন্দিরা মেঝেতে মাদুর পেতে দিল। ‘সারা বাড়ি তছনছ করে গেল।”
‘কী খুঁজছিল? বোমা-পিস্তল?”
‘বোমা-পিস্তল খুঁজতে কাগজ-পত্রের পাতা উলটে পালটে কেন দেখবে? মনে হচ্ছে দাদার কোনও লেখা খুঁজছিল। একটা লালমুখো ছিল দলের গোদা। দেওয়ালে যে তিনটে দাদার ছবি এঁকে টানিয়ে রেখেছিলাম, কুচি কুচি করে সেগুলোও ছিঁড়ে গেল।
‘তোমরা এসব সত্ত্বেও শান্ত হয়ে বসে এখন কীর্তন গাইছিলে?’ প্রাণনাথ অবাক। এই পরিবারকে সে যত দেখে তত অবাক হয়ে যায়। মন্দিরা ভিতর ঘর থেকে একটা গামছা, আর একটা পিরান, ভাঁজ করা ধুতি দিয়ে বলল, ‘বাবা বলে বিপদ দিয়ে ভগবান ভক্তের পরীক্ষা নেন। তাঁর প্রার্থনা বন্ধ করলে চলবে না। যাই হোক, তুমি এখন কুয়োর জলে হাত-মুখ ধুয়ে এস। আগে অন্ন সেবা কর, খাওয়া হলে তারপর আমি এসব গুছিয়ে রাখব।’
‘বারবার ওকে বারণ করেছি, স্বদেশীদের দলে যোগ দিস না। আমার কথা শোনেনি ও। তার ফল আমরা ভুগছি,’ বৃদ্ধের মুখে-চোখে প্রবল হতাশা।
বাড়ির পিছনে রান্নাঘরের সংলগ্ন পোড়ামাটির বেষ্টনী দেওয়া পাতকুয়া। প্রাণনাথ হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে এল। প্রাণনাথ বুঝল মন্দিরার ভাঁড়ারেও পুলিশের হস্তক্ষেপ হয়েছিল। উগরার মাচায় হাঁড়িকুড়ি, চিঁড়েমুড়ির টিন, গুড়ের নাগরি, ধানের ডুলি, কলাই সরিষার মটকি এলোমেলো হয়ে রয়েছে। চালের কলসীর ভিতর হাত ঢুকিয়েছিল। কিছু চাল মাটিতে ছড়িয়ে রয়েছে। রান্নাঘরের মাঝে পাশাপাশি দুটো কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি পাতা। একটা আসনে বসে মন্দিরার বাবা প্রাণনাথের জন্য অপেক্ষা করছেন। কলাপাতায় মন্দিরা ভাত বাড়ল, পাতার কোনায় লেবুর টুকরো, লবণ, পাশে ডালের বাটি, দু‘রকম তরকারি। প্রাণনাথ চুপচাপ খেতে বসল। মৃদঙ্গমের ওপর যে অত্যাচারের কথা ভুবন জমাদার বলেছিল সেটা আজ মাঝে মাঝেই মাথার ভিতর দপদপ করে উঠছে। যেন মাথার ভিতরে একটা টিউমার নিয়ে ঘুরছে প্রাণনাথ। মৃদঙ্গমকে কেন হত্যা করা হল? এই প্রশ্নের উত্তর কি এ বাড়িতে পাওয়া যাবে? ইংরেজ পুলিশ কি সেই তথ্য লোপাট করতেই এ বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে? মৃদঙ্গমের সমস্ত বইপত্র ঘাঁটতে হবে। পুলিশ আবার এসে হয়তো তল্লাশি করবে। কিন্তু এখন মৃদঙ্গমের কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে গেলেই মন্দিরা সন্দেহ করবে। একজোড়া বুদ্ধিমতী চোখ ওর মনের চিন্তাকে যেন পড়ে ফেলতে চাইছে।
খেতে খেতে প্রাণনাথের মনে অস্বস্তি হচ্ছে - পুলিশ এখানে এসে অনুসন্ধান করেছে? তার মানে পুলিশ আবার আসতে পারে। এই বাড়ি তাহলে তো ওর আত্মগোপন করে থাকার জন্য মোটেই নিরাপদ স্থান না। এখানে দুটো মাত্র ঘর, লুকোবার কোনও জায়গাই নেই, পুলিশ এলেই ধরে ফেলবে ওকে। খুব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে পালাতে হবে। কিন্তু কোথায় পালাবে? তুতিকোরিন, কলম্বো হয়ে ফ্রান্স? আজ রাতে শুয়ে শুয়ে গোটা প্ল্যানটা ছকে ফেলতে হবে। প্রাণনাথ ওর ক্ষুধার্ত পেট যন্ত্রের মত ভরতে লাগল। মনের চাপা উত্তেজনায় ওর জিভ থেকে খাবারের স্বাদ অন্তর্হিত হয়ে গেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন