পঁয়ত্রিশ

প্রীতম বসু

সোনাগাছির রতি বাঈয়ের কোঠা থেকে বেরিয়ে পদাবলী গোবিন্দ অধিকারীর সঙ্গে গলি ধরে বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগল। গোবিন্দ অধিকারীর মুখ থমথমে। ওকে যাচ্ছেতাই ভাবে গালাগালি দিয়েছে হরি বায়েন। অনেক দিনের জমা বিদ্বেষ বের করতে গিয়ে এমন চিৎকার আরম্ভ করল যে বেগতিক দেখে পদাবলী তাড়াতাড়ি গোবিন্দ অধিকারীকে বের করে নিয়ে এসেছে। পদাবলীর ভয় হচ্ছিল এই প্রৌঢ় মানুষটার হার্ট অ্যাটাক না হয়ে যায়।

গলির মধ্যেই ওদের গা ঘেঁসে একটা টাটা সুমো এসে দাঁড়াল। গাড়িতে ঝমঝম করে হিন্দি গান বাজছে। গাড়ির মধ্যে চারজন যুবক – সকলের হাতেই বিয়ারের বোতল, সিগারেট, হৈ হৈ করছে, আর গাড়ি থেকে খিলখিল করে হাসতে হাসতে নামল দু‘জন লাস্যময়ী কিশোরী। পদাবলীর মনে হল বড়লোকের বখে যাওয়া কিছু ছেলে ফুর্তি করতে মেয়েগুলোকে ভাড়া করে নিয়ে গেছিল, এখন ফিরিয়ে দিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিল পদাবলী, কিন্তু হঠাৎ গাড়ির ভিতরে চোখ গেল।

করতালতলীর জমিদারবাড়ীর ছোটকর্তা মনু সেন!

- মনু সেনের চোখেও বিস্ময়। সিগারেটটা দু-আঙুলের ভাঁজে আটকে রেখে ছোটকর্তা গাড়ি থেকে নেমে এল। তারপর গোবিন্দ অধিকারীর কাছে এসে বলল, “আরে! এটা আমাদের করতালতলীর অধিকারী না!’ নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ছোটকর্তা। নেশাগ্রস্ত দু‘চোখ কচলাল মনু সেন ‘আচ্ছা! সিংকিং সিংকিং ড্রিঙ্কিং ওয়াটার? সকল পক্ষী মৎসভক্ষী, মৎস্যরঙ্গী কলঙ্কিনী। আমরা এলেই দোষ। ইউ নটি বয়!’ গোবিন্দ অধিকারীর থুতনি ধরে নাড়িয়ে দিল ছোটকর্তা। ‘তুমিও মধু খেতে রেড লাইট এরিয়ায়? সঙ্গে তোমার এই চেলাটাও আছে দেখছি - পদাবলী। শালা, দু‘দিন আগে বাপের সামনে কী ড্রামাই না করলে গুরু। এখন তোমার আসল রূপটা দেখতে পেলাম। শালা, তুলসীবনের মানুষখেকো বাঘ!”

‘তোমার লজ্জা করে না?’ গোবিন্দ অধিকারী ধমক লাগাল।

‘যাবাব্বা, শালা এখানে ঢুকুঢুকু করবে তুমি, আর লজ্জা

ছোটকর্তা টলছে। ‘এবার তোমার মুখোশ আমি খুলব।’

করবে আমার?”

ছোটকর্তা এবার গোবিন্দ অধিকারীর পাঞ্জাবীর গলাটা মুঠো করে ধরল। গোবিন্দ অধিকারীর মুখে ভক করে মদের গন্ধ লাগতেই অধিকারী ঘেন্নায় ছোটকর্তাকে এক ধাক্কা মারল। কিন্তু ছোটকর্তাকে একচুলও নড়াতে পারল না। এবার ছোটকর্তা জোরে পালটা ধাক্কা দিল গোবিন্দ অধিকারীকে। প্রৌঢ় মানুষটা টাল সামলাতে না পেরে দেওয়ালের গায়ের নর্দমায় গিয়ে পড়ল। নর্দমার পাঁকে প্রায় হাঁটু অবধি ডুবে গেল। এবার মনু সেন তার শিকারকে নর্দমা থেকে হ্যাঁচকা টানে তুলে আনল, গোবিন্দ অধিকারীর হাঁটু পর্যন্ত কাদা, ডান পায়ের হাওয়াই চপ্পল খুলে নর্দমায় রয়ে গেছে। ছোটকর্তার চোখ রাগে এবং নেশায় স্ফীত, রক্তিম। গোবিন্দ অধিকারীর চোখে ভয়। ‘এই ছাড় ওকে,’ বলে গোবিন্দ অধিকারীকে বাঁচাতে পদাবলী দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু মনু সেনের দলের দু‘জন ষণ্ডা ছেলে পদাবলীকে হ্যাঁচকা টান মারল আর সুমোর অন্যদিকে নিয়ে পদাবলীর মুখটা গাড়ির কাচে ঠেসে ধরল। ধস্তাধস্তি করতে করতে পদাবলী কাচের মধ্য দিয়ে দেখল মনু সেন গোবিন্দ অধিকারীর গালে এক থাপ্পড় মারল। গোবিন্দ অধিকারীর চশমা খুলে ফুটপাথে। ছোটকর্তা দু‘হাতে গোবিন্দ অধিকারীর গলা চিপে বলল – ‘বল, ওই চৈতন্যপুখুরীর জমি বেচবি কিনা?” -

“অসম্ভব!” গোবিন্দ অধিকারীর মুখ থেকে গোঙানি বেরিয়ে এল।

ছোটকর্তা দু-হাতের চাপ বাড়াল - ‘বল, চৈতন্যপুখুরী বেচবি কিনা?” গোবিন্দ অধিকারীর দম বন্ধ হয়ে আসছে, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, তাও গোঁ গোঁ করে বলল-মরে গেলেও না!’

“তবে মর,” মনু সেন পিছনের পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে হাতলে চাপ দিতেই ছুরির ঝকঝকে ধারালো ইস্পাত আত্মপ্রকাশ করল। গোবিন্দ অধিকারী দু-চোখ বন্ধ করে ফেলল।

‘শেষবারের মত বলছি - মনু সেন চাকুটা গোবিন্দ অধিকারীর কণ্ঠনালীতে ধরল। পদাবলীর মনে হল নেশার বশে এ গোবিন্দ অধিকারীকে খুন করে ফেলবে। পদাবলী আর্তনাদ করে উঠল। পদাবলী চেষ্টা করল ছেলেদুটোকে ধাক্কা মারার, কিন্তু ওদের গায়ে অমানুষিক জোর। পদাবলী অসহায়। কিন্তু হঠাৎ একজন ছুটে এসে ছোটকর্তাকে ধাক্কা মারল। ছোটকর্তার হাত থেকে চাকু ছিটকে পড়ল। ধাক্কার চোটে ছোটকর্তাও ফুটপাথে ধরাশায়ী।

গোবিন্দ অধিকারীকে আগলে দাঁড়িয়ে ভজন ডোম।

ছোটকর্তা স্প্রিঙয়ের মত উঠে দাঁড়াল, কিন্তু ডোমের হাতে ততক্ষণে ছোটকর্তার চাকু উঠে এসেছে। ছোটকর্তা চেঁচিয়ে বলল, ‘সরে যা। না হলে তোর লাশ ফেলে দেব।’

‘লাশ!’ ভজন ডোম হাসল। ‘লাশ জ্বালিয়ে আমার পেট চলে। আমাকে লাশের ভয় দেখাচ্ছিস? এখন ফোট, নয়তো সবকটাকে তুলোধোনা করব।’

২১৬।প্ৰাণনাথ হৈও তুমি

রাস্তার দু‘পাশে ভিড় জমে গেছে, অধিকাংশই দুপুরের ভগ্ননিদ্র রাতের মোহিনীরা। একজন শিথিল শরীরের মধ্যবয়স্কা পৃথুলা স্তনভারে অসংলগ্ন কাপড় টানতে টানতে চেঁচিয়ে ধমক লাগাল - তোরা এখান থেকে না গেলে পুলিশ ডাকব। আমাদের কাস্টমার তাড়াতে চাস নাকি?

মনু সেনের দলবল বুঝল এখন এখানে সুবিধা হবে না। মনু সেনকে টাটা সুমোতে তুলে তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট করে গলি থেকে বেরিয়ে গেল।

ভজন ডোম গোবিন্দ অধিকারীকে ফুটপাথের টিউকলে নিয়ে গিয়ে পাম্প করতে করতে বলল, ‘এরা কীসের জমি বিক্রি করতে বলছিল?”

‘চৈতন্যপুখুরী। মন্দির ভেঙে ওরা হোটেল বানাতে চায়। ওটা দেবোত্তর সম্পত্তি। আমরা বংশপরম্পরায় ওটা রক্ষা করে আসছি।’

‘এরা খতরনাক লোক। তোমাকে মেরেই ফেলত। আজ না হয় আমি তোমায় বাঁচালাম। ওরা কাল আবার আসবে। ওদের সঙ্গে জিততে পারবে না। ঝামেলা না বাড়িয়ে ওদের ওই জলা-পুকুর বেচে দাও।’

‘আমার মা টিবিতে কেশে রক্ত উগরে মরে গেল, কিন্তু মা কিছুতেই আমাকে

ওই জমি বিক্রি করতে দেয় নি। আমি কীভাবে ওই জমি বিক্রি করব?” ভজন ডোমের চোখে বিস্ময়। ওই এঁদো জলার জলের নিচে এত ঝামেলা লুকিয়ে আছে সে বোধহয় কখনো ভাবতে পারেনি - ‘কিন্তু কী করতে চাও তুমি ওই জলাজমি দিয়ে?”

‘আমি করার কে? প্রভুর যা ইচ্ছা তাই করবে।’

‘এ’পাড়ায় এসেছিলে কেন?”

‘জমিদারবাবু করতালতলীর কীর্তন শেষ করে দিয়ে ওই জমি প্রমোটারকে বেচতে চায়। আমার দলে আর কেউ নেই কীর্তন গাইবার। তুমিও রাজি হলে না। একজন বায়েনের খোঁজে এখানে এসেছিলাম।’

‘পেলে তাকে?” ভজন পকেট থেকে রুমাল বের করে ভেজা হাত মুছল।

‘সে রাজি হল না – ‘ গোবিন্দ অধিকারী আর কথা বাড়াল না। ‘না আছে গায়েন, না আছে বায়েন। করতালতলী থেকে কীর্তন শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ - “ঠিক আছে, আমায় যদি শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে পার - তবে মাছ, মাংস, মদ, মেয়েমানুষ কোনওটাই কিন্তু ছাড়তে পারব না -

‘গাইবে?’ গোবিন্দ অধিকারীর চোখমুখ উজ্জ্বল। ‘আমরা বিষ্ণুপ্রিয়ালীলা করব নীলমাধবের মন্দিরে করতালতলীতে। তুমি তাহলে এসো নীলমাধবের মন্দিরের দালানে কাল সকাল দশটা নাগাদ। ওখানে কথা হবে।’ সব ব্যথা যন্ত্রণা ভুলে গোবিন্দ অধিকারীর চোখ দিয়ে আশার বারিধারা নেমে এল তোবড়ানো গালে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%