প্রীতম বসু
বৈষ্ণব পদাবলী রচয়িতারা বলেছেন যে প্রেমের পথে বাধা নেই সে প্রেমে তীব্রতা নেই। তাই স্বকীয়ার প্রেমে নাকি বৈচিত্র নেই, আর পরকীয়া প্রেম প্রখর তীব্র। পরদিন মন্দিরা ভয়াতুর। গভীর রাতে যাবে স্বামী প্রাণনাথের কাছে। প্রথম মিলন হবে। রভসে গোঁয়াইবে দোহেঁ মধু-যামিনী। একান্ত গোপনে। কুমুদরঞ্জন যথারীতি রাতের ভোজনের পর শয্যাগ্রহণ করলেন। মন্দিরা পাশের ঘরে চুপিচুপি আরশি বের করে নিজেকে দেখল। অভিসারিকাদের মত বাঁধল কানড় ছাঁদে খোপা -
ধনি কানড়-ছাঁদে বাঁধে কবরী
নব-মালতি-মাল তহি উপরী
কিন্তু কবরীতে ফুলের মালা জড়াবার সাহস হল না। ফুলের গন্ধে বাবার সন্দেহ হতে পারে, ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। আরশিতে মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে। জীবনের এই পথে প্রথমবার। কী হয় প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনে? এতদিন সে শুধু পড়েছে রাধিকার প্রথম মিলন দৃশ্য – কিন্তু কখনো গভীর ভাবে ভাবেনি
কানু বদন হেরি উছলিত অন্তর
লাজে বসনে মুখ ঝাঁপি।
ঈষদবলোকনে লোচন ছল ছল
কেলি সমাগমে কাঁপি ৷৷
দেখ সখি রাইক ঢঙ্গ।
কানুক অদরশে খনে বিয়াকুল
দরশনে ঐছন রঙ্গ।।
রাই বদন হেরি লুবধল মাধব
কোরে বৈঠায়লি গোরী।
কুচ কর পরশনে চমকি উঠয়ে ধনী
চুম্বনে রহু মুখ মোরি।।
ভুজে ভুজ বন্ধন দৃঢ় পরিরম্ভণ
অধরে অধর রস নেল।
গোবিন্দদাস পহুঁ পুরল মনোরথ
নব নব সঙ্গম ভেল।।
গোবিন্দদাসের বর্ণনাতে মন্দিরার শরীরে কাঁপুনির স্রোত বয়ে গেল। তার শরীরেও রাধার মত ঘটনা ঘটবে? মন্দিরা শিহরিত। এই ক’মাসে কতবার সে প্রাণনাথের কাছে গেছে, কিন্তু আজ মন্দিরার পা আড়ষ্ট।
রাত গভীর হল। কুমুদরঞ্জনের ঘর থেকে নাক ডাকার আওয়াজ আসছে। মন্দিরা পা টিপে টিপে দালান থেকে উঠোনে নামল। বাইরে বাতাসের বেগ খুব বেড়ে গেছে। হরীতকী গাছ আন্দোলিত। এক মুহূর্তের দ্বিধা। তারপর উঠোন ডিঙিয়ে খড়্গটি ঘরের দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকে গেল।
তারপর?
তারপর মন্দিরা যখন নাগর সঙ্গে রঙ্গে যব বিলসই কুঞ্জে শুতলি ভুজপাশে, তখন বাইরের প্রকৃতিও আন্দোলিত হচ্ছে। আকাশে মেঘ খুব দ্রুত উড়ে যাচ্ছে। রাতে মত্ত হাওয়া ক্ষেতে ধানের বুকে সদ্য জমা দুধের ওপর উচ্ছ্বাসের এলোমেলো স্পর্শ করলে চারপাশের অন্ধকার যেমন উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, তেমন উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত এখন জমিদারগোঁসাইয়ের বহির্বাটির অন্ধকার। কবহু ঝাপয়ে অঙ্গে কভু ঊষার। মৃদঙ্গম বলেছিল প্রকৃতি যখন রাতে দামাল হয়ে ওঠে, তখন নাকি নীলমাধবের মন্দিরের দুই বাস্তু পদ্মগোখরোর শঙ্খ লাগে। দামাল আবেগে খড়্গটি ঘরে মদির আবেশে এখন আদিম শঙ্খ লেগেছে দুই মানব-মানবীর।
কাল কিছুক্ষণের জন্য থেমে ফিসফিস করে বলল ধনি ধনি তুয়া নব নেহা ৷
প্রাণনাথই নীরবতা ভাঙল। ‘আদর করার সময় তুমি কপালে আঙুলের টোকা দিয়ে আঙুল বুকে ঠেকালে। কার উদ্দেশ্যে সেই প্ৰণাম?”
“তোমার পায়ে পা লেগে গেছিল তাই।’
“আমার পায়ে পা লাগলে প্রণাম করতে হবে?’ প্রাণনাথ অবাক।
‘বুকের মধ্যে কখনো চন্দ্রাবলী জাগে, তো কখনো রাধা।’ মন্দিরা প্রাণনাথের দিকে তাকিয়ে অন্ধকারে হাসল। আর প্রাণনাথের মনে হল একেই বোধ হয় জয়দেব দন্তরুচিকৌমুদী বলেছেন। কিন্তু প্রাণনাথ মন্দিরার এই রহস্যময় কথার অর্থ বুঝতে পারল না।
‘বুঝলাম না।’
‘চন্দ্রাবলী কৃষ্ণপ্রেমে রাধার একমাত্র প্রতিযোগিনী। চন্দ্রাবলীর সখী একদিন রাধার গুণকীর্তন করে বলছে – সখি, তুমি রাধার ওপর এত রাগ কর কেন? তুমি যাকে সবচেয়ে ভালবাস সেই শ্রীকৃষ্ণ রাধার সঙ্গ লাভ করে পরম প্রীত হন। তাহলে তোমার রাধার প্রতি এই অসূয়া কেন? চন্দ্রাবলী বলল, আমি রাগ করি রাধার ঔদ্ধত্য দেখে। ব্রজের শ্রেষ্ঠপুরুষ রাধার চরণপ্রান্তে পতিত, তবুও রাধা মান করে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকে। এ ঔদ্ধত্য সহ্য করা যায় না। মন্দিরা ওর কপাল থেকে চূর্ণ কুন্তল সরাল। ‘আর রাধাকে ওর সখী যখন একই প্রশ্ন করল তখন রাধা বলল চন্দ্রাবলী প্রেমিকা না দাসী? এত তটস্থ জড়তা যার সে প্রেমের স্বাভাবিক ধর্ম কীভাবে পালন করবে? রাসমণ্ডলে যখন চন্দ্রাবলী নাচছিল তখন পাছে ব্রজনন্দন কৃষ্ণের পায়ে পা ঠেকে যায় সেই ভয়ে চন্দ্রাবলী দূরে দূরে পা ফেলছিল। আমার দুঃখ শ্রীকৃষ্ণের মত একজন বিদগ্ধ প্রেমিক একজন জড়ভাবাপন্ন নায়িকার সঙ্গে কেন সময় কাটায়? তোমার সঙ্গে আমার পায়ে পা ঠেকতেই মনের ভিতর এক চন্দ্রাবলী জেগে উঠল।’
প্রাণনাথ হেসে ফেলল। তারপর বলল, ‘তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও। ধরা পড়ে গেলে কী হবে?”
মন্দিরা হেসে প্রাণনাথের গলা জড়িয়ে ধরে বলল – তোমার লাগিয়া কলঙ্কের হার গলায় পরিতে সুখ। ‘
- ‘তুমি তো কলঙ্কের হার পরে নেবে, কিন্তু আমার অবস্থা খুব নিদারুণ হয়ে উঠবে – শ্বশুরান্নে প্রতিপালিত ঘরজামাইকে অনেকেই সুনজরে দেখে না।”
‘যম, জামাই, ভাগিনা – তিন নয় আপনা,’ মন্দিরা ছড়া কেটে মুচকি হেসে ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
দিন কেটে চলে নিজের ছন্দে, এই ছন্দহীন মানুষগুলির সুখ-দুঃখ ৰহন করে। পরদিন রাতে প্রাণনাথ মন্দিরাকে বলল, “আমাদের মিলন হল স্বকীয়ায় পরকীয়া। নিজের বিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গে এত বাধা অতিক্রম করে তবে আমার মিলন হয়। বাসকসাজ আমার চেয়ে কে ভাল বোঝে? আমি রাধার মত কুঞ্জ সাজিয়ে অপেক্ষা করি কখন আসবে আমার প্রেমাস্পদ।’ এখন মন্দিরা অনেক স্বচ্ছন্দ হয়ে গেছে। সে শীতল বাতাস হয়ে প্রাণনাথের ভূষিত মনকে জড়িয়ে ধরল।
… সেদিন সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি শুরু হল। গভীর রাতের দিকে বাজ পড়তে লাগল। প্রাণনাথের মনে পড়ল গোবিন্দদাসের রাধিকা চলেছে অভিসারে ১
তহি অতি দুরতর বাদর দোল
বারি কি বারই নীল নীচোল।।
আজ মন্দিরার আসতে দেরি হচ্ছে। বোধহয় অপেক্ষা করছে বৃষ্টি যদি একটু ধরে যায়। না হলে কাল সকালে ওর বাবাকে কী বলবে শাড়ি এত চুপচুপে ভেজা কেন?
বৃষ্টি থামল না। মন্দিরা একটা হোগলার পাতা মাথায় দিয়ে দাওয়ায় এক মুহূর্ত দাঁড়াল। তারপর এক ছুটে উঠোন পেরিয়ে খড়ুটি ঘরের দালানে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল মন্দিরা, শরীর শুকনো কিন্তু গোড়ালি ও শাড়ির পাড় ভিজে গেছে। প্রাণনাথ মন্দিরাকে কাছে টেনে নিল। খাটিয়ার বিছানায় মন্দিরাকে বসিয়ে প্রাণনাথ নিজের শুকনো গামছা দিয়ে মন্দিরার ভেজা পা মুছতে গেলে মন্দিরা ছিটকে পা সরিয়ে নিয়ে বলল – ‘ছি ছি! এতে আমার মহাপাপ হবে।’ “কোনও পাপ হবে না,’ প্রাণনাথ হেসে বলল -
আদরে আসরি রাই হৃদয় ধরি
জানু উপড়ে পুনরাখি
নিজকর কমলে চরণ-যুগ মোছই
হেরইতে চির থির আঁখি
গোবিন্দদাসের কৃষ্ণ নিজেই অভিসারিকা রাধিকার সিক্ত পা মুছে দিয়েছিল আমাকে বারণ কোরো না, মন্দিরা। আমার দশা হয়েছে গীতগোবিন্দের কৃষ্ণের মত। রাধা অভিসারে আসবে, সকলেই জানে তার কত অসুবিধা ছিল, কিন্তু তা বলে কৃষ্ণও উদ্বেগ রহিত ছিলেন না।
পততি পতত্রে বিচলিত পত্রে শঙ্কিতভবদুপযানম্।
রচয়তি শয়নং সচকিতনয়নং পশ্যতি তব পন্থানম্।
তোমার আগমনের প্রতীক্ষায় থাকি, উঠোনে তোমার পদশব্দ শোনার জন্য কান উন্মুখ। কখনো তোমার পায়ের আওয়াজ, তোমার শাড়ির খসখস আওয়াজ শুনে আমি জানলার কাছে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি কেউ নেই, ওটা আমার মনের ভুল, হরীতকী পাতা ঝরে পড়ার আওয়াজে বা পাতার মর্মরধ্বনিতে তোমার আসার শব্দ বলে ভ্রম হয়েছে। আবার ফিরে যাই নিজের বিছানায়।’
মন্দিরা হাসল। সে ভেবেই পায় না যে মানুষ এত বড় প্রেমিক সে কীভাবে সাহেবদের অফিসে বোমা ছুঁড়তে পারে?
দিনগুলো দ্রুতলয়ে কেটে চলল, প্রাণনাথের জীবনের প্রতি মুহূর্ত ভরে গেল এক অপূর্ব সৌরভে। সারাদিন মন্দিরার গলার স্বর, চলাফেরার শব্দ, জানলার ফাঁক দিয়ে উঠোনে আসা মন্দিরাকে দেখে সময় কাটে সৌন্দর্য তৃষিত প্রাণনাথের।
আধ আঁচর খসি আধন বদন হাসি
আধাহি নয়ান তরঙ্গ।
আধ উরজ হেরি আধ আঁচর ভরি
তদবধি দগধে অনঙ্গ।।
সেদিন রাতে মন্দিরা প্রাণনাথের দেওয়া নূপুরটা শাড়ির আঁচলের খুঁট থেকে বের করল। ‘এই নূপুর পায়ে পরে না। নূপুর শ্রীরাধার পাদপদ্মের অলঙ্কার, সেই অলঙ্কার কোনও বৈষ্ণব পা দিয়ে স্পর্শ করতে পারে?”
প্রাণনাথ নিরুত্তর, মন্দিরার ভক্তি তার কাছে বোধগম্য নয়। মন্দিরা মৃদু হেসে বলল, “বৈষ্ণবদের ললাটে যে তিলক চিহ্ন থাকে তা ভালভাবে লক্ষ্য করেছ? সকলের তিলক এক রকম হয় না। শ্রীনিবাসাচার্য সম্প্রদায়ের তিলকের আকৃতি বাঁশপাতার মত, নরোত্তম ঠাকুরের সম্প্রদায়ের তিলক যেন চাঁপার কলি, আর শ্যামানন্দ সম্প্রদায়ের তিলক নূপুরাকৃতি।’ প্রাণনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে মন্দিরা বুঝল প্রাণনাথের বোধগম্য হল না কথাটা। মন্দিরা হেসে বলল, ‘কত যে না বলা গল্প বাংলার এই বৈষ্ণবদের জীবনকে জড়িয়ে, সব যেন হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ব্রজে বনবীথিতে শ্যামানন্দ একগাছি মণিময় নূপুর কুড়িয়ে পান। সে নূপুরে জড়িয়ে ছিল এত সুরভি যে ভক্তিতে শ্যামানন্দ কেন জানিনা সেই নূপুর ললাটে স্পর্শ করলেন। আর তারই অজান্তে তার ললাটের লালটিকা নূপুর আকৃতি ধারণ করল। অচিরেই বনমধ্যে এক লাবণ্যয়ময়ী কিশোরী এক আলোকপুঞ্জ থেকে যেন বেরিয়ে এসে শ্যামানন্দের কাছ থেকে সেই নূপুর ফেরত চেয়ে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। শ্যামানন্দ অচৈতন্য হয়ে গেলেন, যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন তাঁর মাথা শ্রীপাদ জীব গোস্বামীর কোলে। শ্রীজীব সব শুনে বললেন - তুমি ভাগ্যবান, শ্যামানন্দ। তুমি শ্রীরাধিকার চরণভূষণ মণিমঞ্জীর তোমার ললাটে স্পর্শ করেছ। রাধার সখী ললিতা তোমার থেকে সেই নূপুর ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। তোমার ললাটের টিকায় সেই নূপুরের প্রতিচ্ছবি চিহ্নিত হয়ে গেছে।’ মন্দিরা প্রাণনাথকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোমার ভালবাসার এই নূপুর আমি চরণের বদলে বুকে জড়িয়ে আমরণ আমার কাছে রাখব।”
***
দেখতে দেখতে বিদায়ের দিন এসে গেল। সঙ্গে নিয়ে এল বিষাদ। মন্দিরা গম্ভীর, বিষণ্ণ। কুসুমিত কুঞ্জে ভ্রমর নাহি গুঞ্জরে, সঘনে রোয়ত শুকসারী। প্রাণনাথও বিষাদমগ্ন, কিন্তু ওর ভিতরের উত্তেজনা ওর বিষাদের মাত্রাকে হ্রাস করছে। তবুও মন্দিরাকে ছেড়ে যেতে হবে ভাবলেই ওর গলার ভিতর যেন বাতাসের দলা আটকে যাচ্ছে। কাল অধিবাস, আজ বিকালবেলা মন্দিরা এল। সঙ্গে এলেন কুমুদরঞ্জন আর এল ছিদাম। কুমুদরঞ্জনের গলায় তাঁর শ্রীখোল। এই সাড়ে তিন মাসে প্রথমবার প্রাণনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন।
প্রাণনাথ উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম করল। কুমুদরঞ্জন বসলেন, কোলে শ্রীখোল রেখে বললেন – ‘গাও। আমি মৃদঙ্গে ঠেকা দিচ্ছি। মন্দিরা, ছিদাম, তোরা বাইরে গিয়ে - নজর রাখ।’
মন্দিরা আর ছিদাম বেরিয়ে গেল। প্রাণনাথ এবার চোখ বুজল। আজ সে এই গান কুমুদরঞ্জনকে শোনাতে গাইবে না। আজ সে এই কীর্তন গাইছে নীলমাধবের জন্য। কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল প্রাণনাথ। চোখের সামনে ভেসে উঠল নীলমাধবের প্রসন্ন বরাভয় মূর্তি। প্রাণনাথ গান শুরু করল, কুমুদরঞ্জন এই প্রথমবার প্রাণনাথের সঙ্গে তাল মেলালেন।
গান শেষ হতে প্রাণনাথ তাকাল। বৃদ্ধের দৃষ্টি শীতের বিকালের সূর্যের মত নরম। ডান হাত তুলে নীরবে আশীর্বাদ করলেন। তারপর বললেন, ‘মন্দিরা বলল তুমি আজ চলে যাবে। আমার পুত্রের মৃত্যু আমার স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে হনন করেছে। আজ জানলাম এই ধুলট যাতে সম্ভব হয় তার জন্য তুমি কী স্বার্থত্যাগ করেছ। নীলমাধবের কাছে আমি প্রার্থনা করি যেখানে থাকবে যেন সুখে থেকো। আমি এক সময়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে সৎসঙ্গ করেছি, তাঁদের অনেকের অনেক উপকার করেছি, অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুও আমার হয়েছিল। আমি তাদের ঠিকানা এখানে লিখে এনেছি। এদের প্রত্যেককে তুমি বিশ্বাস করতে পার। তোমার এক পরিচয় পত্র এখানে লিখে দিয়েছি। প্রয়োজন পড়লে এদের সঙ্গে দেখা কোরো। এদের আশ্রয়ে তুমি নিরাপদে থাকবে। আর কিছু অর্থ তোমায় দিলাম। তোমার অনেক কাজে আসবে।’ কুমুদরঞ্জন চালাঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে ফিরে এলেন, ‘তোমার কীর্তনে ভক্তি না পেলে আমি তোমায় কিছুতেই ধুলটে গাইতে দিতাম না।’ কুমুদরঞ্জন বেরিয়ে গেলেন। প্রাণনাথ কাগজের নাম-ঠিকানাগুলো দেখে তারপর চিঠিতে চোখ বোলাল। সংক্ষিপ্ত পরিচয়পত্র, কিন্তু প্রাণনাথের দু‘চোখ আবেশে বন্ধ হয়ে এল - -
পত্রবাহক প্রাণনাথ বসু আমার কন্যার পতি, আমার পুত্রবৎ। নিজের জীবন সঙ্কটাপন্ন করিয়াও সে শুধুমাত্র আমার তৃপ্তির জন্য ধুলটের আয়োজন করিয়াছে। দূর্ভাগ্যবশতঃ প্রাণনাথেরই আজ আশ্রয়ের একান্ত প্রয়োজন। ইহাকে আশ্রয়দান করিলে আমি আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকিব।।
- বৈষ্ণব দাসানুদাস
কুমুদরঞ্জন দাস, করতালতলী
কুমুদরঞ্জন বেরিয়ে যেতে ছিদাম ভিতরে এল। আমি তোমার সঙ্গে অধিবাসে খোল বাজাব, প্রাণনাথদা, ছিদাম শান্ত গলায় বলল।
‘কক্ষনো না, প্রাণনাথ দৃঢ়কণ্ঠে বলল।
‘আমি তোমার অনুমতি চাইছি না। এটা আমার সিদ্ধান্ত, ছিদাম শান্ত গলায় বলল। ‘কীর্তনে বায়েন না থাকলে পুলিশ গোঁসাইজ্যাঠাকে সন্দেহ করবে। প্রাণনাথের মনে হল যেন তার সমবয়সী একজন বিপ্লবী তার সঙ্গে কথা বলছে।
‘ছিদাম, বোকামি কোরো না। আমাকে ধরতে না পারলে পুলিশ রাগে তোমায় ফাঁসিকাঠে ঝোলাবে।’
“আর তোমায় ধরতে পারলে পুলিশ তোমায় ফাঁসিকাঠে ঝোলাবে,’ ছিদাম বলল। ‘মন্দিরাদিদি সে দৃশ্য সহ্য করতে পারবে না।’
‘ছিদাম, তোমায় যেন আমি মণ্ডপের কাছাকাছি না দেখি। প্রাণনাথের কণ্ঠস্বরে এবার আদেশ। ছিদাম কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে গেল।
***
সন্ধ্যা কেটে রাত্রি নামল করতালতলীতে। ঝিল্লীরব আজ কম, বাইরে কয়েক হাজার মানুষ ইতিমধ্যেই ধুলডাঙায় প্রবেশ করে গেছে, এখনও লোক দলে দলে আসছে। রাতের খাবার নিয়ে মন্দিরা এল। একটু পরেই প্রাণনাথ বেরিয়ে যাবে। ওর মস্তক আবার মুণ্ডিত, সন্ন্যাসীর ভেক তৈরি। ফাঁসির আগের দিন নাকি আসামীকে জন্মের ভাত খাওয়াবার জন্য জিজ্ঞাসা করা হয় সে কী খেতে চায়। ব্যতিক্রম ছিল মৃদঙ্গম। মন্দিরা কাল বুকে পাথর রেখে জিজ্ঞাসা করেছিল কী খেতে ইচ্ছা করছে? প্রাণনাথ বলেছিল - খেসারি। আজ মন্দিরা ওর জন্য রান্না করেছে – নিসিন্দাপাতা দিয়ে খেসারির শুক্তো, নারকোল বাটা দিয়ে খেসারি শাক, খেসারির ডাল, খেসারি ডালের বড়া, তেঁতুল দিয়ে খেসারির অম্বল, আর সঙ্গে বাটিতে ক্ষীর। মন্দিরা ভাতের থালা মেঝেতে নামিয়ে রেখে ভারাক্রান্ত গলায় বলল, “খেয়ে নাও।’ এটুকু শব্দ উচ্চারণ করতেই মন্দিরার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। আজ মন্দিরা চুলে একবেণী বেঁধে এসেছে। প্রোষিতভর্তৃকা একবেণীধরা। তারই প্রস্তুতি। প্রাণনাথ মন্দিরাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল। -
রাধিকার স্কন্ধ বেড়ি হস্ত প্রসারিলা হরি অধরের সুরা করে পান।
রাধার হয় ভাবোদগম দোঁহে অতি মনোরম ক্রীড়াগণের করয়ে নির্মান।।
মন্দিরা নিঃশব্দে সাক্রনেত্র। প্রাণনাথকে মন্দিরাই শিখিয়েছে একে বৈষ্ণব পদাবলীতে প্রেমবৈচিত্ত বলে। ভক্ত এতে আধ্যাত্মিক মাত্রা জুড়লেও প্রাণনাথ জানে মিলনের সুখের মধ্যেও পরাণ প্রিয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদের মন-যন্ত্রণা মন্দিরার দু‘চোখে গলে অশ্রু হয়ে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে। চণ্ডীদাসের পদ মনে ভাসছে। লোকটা কীভাবে এত সঠিকভাবে ভাবী বিরহ প্রকাশ করে গেল –
দুহু করে দুহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।
আধতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।। -
প্রাণনাথ মন্দিরার ভেজা গাল মুছে দিল। মন্দিরা বলল, ‘খেয়ে নাও।’ মন্দিরার মনে গোবিন্দদাসের রাধিকার মাথুরের বিরহ বাজছে
সজনি, রজনী পোহাইলে কালি।
রচহ উপায় যৈছে নহ প্রাতর
মন্দিরে রহু বনমালী।।
যোগিনী-চরণ শরণ করি সাধহ
বান্ধহ যামিনীনাথে
নখতর চাঁদ বেকত রহু অম্বরে
যৈছে নহত পরভাতে।।
সখি, রজনী প্রভাত হলেই কৃষ্ণের বিদায় কাল আসবে। যোগমায়া পূর্ণিমার পায়ে ধরে অনুরোধ কর যেন সে চাঁদকে আটকে রাখে। চাঁদ তারা গগনে থাকলে সকাল হতে পারবে না।
মন্দিরা উঠে দ্রুত হাতে নিজের স্খলিত পোশাক পরে নিল। প্রাণনাথ তার ধড়াচূড়া পরে নিল। সন্ন্যাসীর পোশাক। হাতে বাঁশের দণ্ড, হরিনাম গণনা করার জন্য বামহাতে গ্রন্থীকৃত কটিসূত্র, পরনে কৌপীন, ঊর্ধাঙ্গে অরুণবর্ণের বহির্বাস, শীত নিবারণের জন্য একটা কাঁথা। বাংলার শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব চৈতন্যদেব কেশবভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করে এভাবেই একদিন সন্ন্যাসী হয়ে ঘর ছেড়েছিলেন। দধানঃ কৌপীনং তদুপরি বহির্বস্ত্রমরুণং। প্রাণনাথ মন্দিরার ব্রতকথার নোটবই বের করে সনাতন কীর্তনের পাতার কিছুটা ছিঁড়ে আলাদা করল। তারপর মন্দিরার হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নোটবই তোমার কাছে সাবধানে রেখো। আর এই ছেঁড়া পাতাটা ছিদামের কাছে থাকুক। আমি চাইনা বাইরের কেউ মন্দিরের পাতালে নামুক।’ প্রাণনাথ তারপর নিজের তোষকের ভিতর থেকে দুটো মোহর বের করল ‘সনাতন গোস্বামীর মোহর।’ মন্দিরা প্রাণনাথের সব কথায় যন্ত্রবৎ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে। প্রাণনাথ এবার ধরা গলায় বলল- ‘আসি। তোমার নীলমাধবের কাছে প্রার্থনা কর যে দেশ যেন তাড়াতাড়ি স্বাধীন হয়। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত ইংরেজ আমাকে খুঁজবে। তোমার গতিবিধির ওপর ইংরেজ কড়া নজর রাখবে। তোমার ধারে কাছে আসা হয়তো সম্ভব হবে না। সাবধানে থেকো।”
মন্দিরা মনকে কঠিন করল। মন নরম থাকলে বিদায় দেওয়া অসম্ভব। এখন তার সামনে যে দাঁড়িয়ে সে তার স্বামী নয়, সে হিরণ্যদ্যুতি কঠোরচিত্ত এক সন্ন্যাসী মাত্র। তার স্বামী সন্ন্যাস নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, আর কখনো দেখা হবে না। “এসো। সাবধানে থেকো। নীলমাধব তোমার সঙ্গে থাকুন।
মন্দিরা সন্তর্পণে দরজা খুলল। প্রাণনাথ খড়ুটি ঘরের দালান থেকে উঠোনে নামল। তারপর একবারও পিছনে না তাকিয়ে খিড়কির দরজা খুলে বেরিয়ে অন্ধকারে বনতুলসীর ঝোপে হারিয়ে গেল। মন্দিরার বুকের ভিতরে সাশ্রু নয়নে চণ্ডীদাসের রাধা বিড়বিড় করে বলল -
জীবনে মরণে জনমে জনমে প্রাণনাথ হৈও তুমি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন