প্রীতম বসু
আজ খোলমঙ্গল।
পদাবলী মনে মনে উত্তেজিত। কীর্তনের দল গড়া হচ্ছে এবং সে দলে রতি গাইবে। ভাবাই যায় না!
প্রফেসর অপেক্ষা করছিলেন পদাবলীর জন্য। প্রফেসর আজ আনকোরা সাদা পাঞ্জাবী-ধুতি পরেছেন, গলায় উত্তরীয়। উনি পদাবলীকে বৈঠকখানা থেকে ভিতরের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরের দু‘দিকের দেওয়ালে ছাত পর্যন্ত উঁচু বইয়ের তাকে বই ঠাসা। একদিকের জানলা দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখা যাচ্ছে, আরেক দেওয়ালের গা ঘেঁসে রাখা পিতলের রাধা মাধব, পাশে গৌর-নিতাইয়ের ফটো, অনেকটা ঠাম্মার ঠাকুরঘরের মত। ঘরের মাঝে একটা সাদা চাদর পাতা হয়েছে। তার ওপর রাখা একটা খোল, হারমোনিয়াম, আর করতাল, পাশে একটা পিতলের থালায় কয়েকটা গাঁদা ফুলের মালা, চন্দনবাটা, বেলপাতা, ধূপ, ঘি, মধু, দই আর কিছু গুড়ের বাতাসা। পদাবলী বুঝল স্যার পুজো-টুজো করে কীর্তন আরম্ভ করতে চান। দেওয়ালে সারি সারি ফটো টানানো, অধিকাংশ ছবিই বিবর্ণ, কোনোটা আবার হাতে আঁকা ছবি, ফ্রেমে বাঁধানো হয়েছে। ছবিগুলোর একজনকেও পদাবলী চিনতে পারল না। বাঙালির দেওয়ালে সাধারণতঃ রবিঠাকুর, নজরুল, সুভাষ বোস, বিবেকানন্দ এদের ছবি থাকে, নতুবা ঠাকুর-দেবতার, কিন্তু এরা কারা?
‘স্যার, এঁরা কারা? একজনকেও চিনতে পারলাম না?”
- স্যারের ঠোঁটে একটা করুণ হাসি জেগে মিলিয়ে গেল ‘তোমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত এদের নাম আমরা পৌঁছে দিতে পারিনি। এঁরা সকলে হলেন প্রসিদ্ধ কীর্তনীয়া। ইনি বৃন্দাবনের প্রভুপাদ গৌরগোপাল ভাগবতভূষণ, ইনি শ্রীখণ্ডের শ্রীল গৌরগুণানন্দ ঠাকুর, ইনি মুর্শিদাবাদ কান্দীর দামোদর কুণ্ডু, ইনি পাঁচথুপির কৃষ্ণদয়াল চন্দ। বৃন্দাবনের সঙ্গীতাচার্য্য অদ্বৈত দাস পণ্ডিতের সঙ্গীতগুরু ছিলেন ইনি। ইনি হারাধন সূত্রধর, বাড়ি কাটোয়ার কাছে মেরেলাতে। এই ফ্রেমের এঁরা চারজন হলেন বীরভূম ইলামবাজারের নিমাই চক্রবর্তী, দীনদয়াল, মনোহর চক্রবর্তী, আর কেশব চক্রবর্তী। এঁরা হলেন ময়নাডালের রসিকানন্দ মিত্র ঠাকুর ও বৈকুণ্ঠ মিত্র ঠাকুর, ইনি তাঁতিপাড়ার নন্দদাস, ইনি কান্দরার শ্যামানন্দ ঠাকুর। ইনি দক্ষিণখণ্ডের রসিক দাস, সুযোগ হলে আমি এর গল্প একদিন তোমায় করব। ইনি চাকটা আনখোনার অবধূত বন্দ্যোপাধ্যায়, ইনি হাসনপুরের ফটিক চৌধুরী, শ্রীবৃন্দাবনের গদাধর দাস, ইনি অখিল মিস্ত্রী, দক্ষিণখণ্ডের বনোয়ারীদাস, রাধাশ্যামদাস, উপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু, ইনি পায়র গ্রামের অক্ষয়দাস, ইনি মাণিক্যহারের শচীনন্দন দাস। শচীনন্দন বাংলার অন্যতম বিখ্যাত কীৰ্তনীয়া রসিক দাসের পরই এর স্থান। আর এই যে ইনি হলেন বারুপাড়ার বিখ্যাত কীর্তনীয়া গনেশ দাস। প্রভুপাদের তিরোভাব উৎসবে গণেশের কীর্তন শুনে মনীষী বিপিনচন্দ্র পাল আর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে চিত্তরঞ্জন দাস তাঁর রসা রোডের বাড়িতে গণেশকে এক মাস অতিথি হিসাবে রেখে তাঁর কীর্তন শুনেছিলেন। তাতে অনেক বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার ও শিক্ষিত বাঙালি কীর্তন গান ও পদাবলী সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। আগে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশতঃ ভাবত যে বৈষ্ণবধর্ম হল চাষাভুষোদের ধর্ম। আর ইনি মাদারবাটীর বিপিনদাস, ইনি মালিহাটির প্রেমদাস এবং ইনি ময়নাডালের রাসবিহারী মিত্র ঠাকুর। আর ইনি হলেন ডাকসাইটে কীর্তনীয়া পান্নাময়ী দাসী, যিনি পুঠিয়ার রাজবাড়ীতে নাকি কীর্তন গাইতে গাইতে রাজাকে সিগারেট ধরাতে দেখে খোদ রাজাকে বলেছিলেন আমি যখন কীর্তন গাই তখন কেউ সিগারেট খায় না। বেরিয়ে যাও। ইনি শতাধিক গ্রামোফোন রেকর্ড করেছিলেন। এছাড়া এঁরা হলেন হরিমতি ব্ল্যাকি, রাধারাণী, অনড়বালা, বরদাসুন্দরী, ডালিম মনি দাসী এরা সকলে প্রণম্য কীর্তনীয়া।’
‘আশ্চর্য, আমি এদের নামই শুনিনি,’ পদাবলী লজ্জিত স্বরে বলল।
“এঁদের একেক জন একসময়কার দিকপাল কীর্তনীয়া। এঁরা আমাদের বঙ্গদেশ মাতিয়ে গেছেন। এঁরা একসময় ভক্তি, প্রেম ও কাব্যের ত্রিবেণীতে আমাদেরই পূর্বপুরুষদের অশ্রুজলে আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন। অথচ আজকের বাঙালি এদের চেনেই না। আমি দস্তুরমত অনুসন্ধান এবং অর্থব্যয় করে এঁদের ছবি জোগাড় করেছি। এই ফটিক চৌধুরীর গান শুনতে একবার শ্রীখণ্ডের বড়ডাঙায় গেছেন ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আর ডঃ হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। সুনীতিবাবু আসরের দিকে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, এখানে কোনও ফটোগ্রাফার নেই? এই কীর্তন দলের একটা ছবি তোলা উচিত। সুনীতিকুমার বুঝেছিলেন যে এই কীর্তনীয়ারা বাংলার অমূল্য সম্পদ, এদের কালের গহবরে হারিয়ে যেতে দেওয়া কিছুতেই উচিত হবে না। আমার যদি কখনও সুযোগ হয় তবে আমি করতালতলীতে কীর্তনের একটা মিউজিয়াম বানিয়ে যাব। আমার মনে হয় প্রাণনাথ কীর্তনীয়াও হয়ত এই খ্যাতনামাদের পঙক্তিতে স্থান পাওয়ার যোগ্য।”
কীর্তনীয়াদের ফটোর মাঝে একজন বৃদ্ধা বিধবা বৈষ্ণবীর ছবি। সাদা-কালো পেন্সিল স্কেচ। বড় ফ্রেমে বাঁধানো। পদাবলী বলল, ‘স্যার, ইনি কে?’
‘ইনি আমার মা। আমি আমার কীর্তনের তালিম মা‘র থেকেই পেয়েছি। অপূর্ব কীর্তন গাইতেন। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে গেছিলেন।’
‘খুব সুন্দর এঁকেছেন ছবিটা। একদম জীবন্ত! আপনার বাবার ছবি নেই?’
প্রশ্নটা যেন নাইট্রোজেনের বুকে ধাক্কা মারল। নাইট্রোজেনের চোখেমুখে অস্বস্তি দেখতে পেল পদাবলী। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রফেসর বললেন, ‘এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গে আমার একটা মিল আছে পদাবলী। আমরা দু‘জনেই বাবাকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছি।’
আপনার তো তাও মা ছিলেন। আপনার বাবাও কীর্তন গাইতেন?’
“মা‘র কাছে শুনেছি উনি খুব সুন্দর কীর্তন গাইতেন। তবে ওসব কথা এখন থাক।’
বাইরের দরজায় কলিং বেল বাজল। প্রফেসর বললেন, ‘তুমি বসো, ওঁদের ভিতরে নিয়ে আসছি।’ আমি
ফটোগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পদাবলী ভাবল যে স্যার কীর্তনের মিউজিয়াম করতে চান এটা খুবই ভাল কথা। কিন্তু করতালতলীতে কেন? আর স্যার মনে হল বাবার কথা আলোচনা করতে চাইলেন না। কেন?
প্রফেসরের সঙ্গে ভিতরে ঢুকল রতি আর হরি বায়েন।
হরি বায়েনকে দেখে পদাবলী গুটিয়ে গেল। সেদিন সোনাগাছিতে এই লোকটার যা রুদ্রমূর্তি সে দেখেছে তা সহজে ভোলার না। আজ কিন্তু লোকটার মুখে রাগের বিন্দুমাত্র ছিটে লেগে নেই।
‘এই তাহলে আপনার আখড়া, মাস্টারমশাই?” রতি হাসিমুখে বলল।
‘হ্যাঁ, এটাই আপাততঃ করতালতলীর কীর্তনকে বাঁচাবার হরি বায়েন ঝুঁকে খোলে হাত দিয়ে প্রণাম করল। তারপর দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে ফটোগুলোর নিচে নাম পড়তে পড়তে প্রণাম করতে লাগল।
আঁতুড়ঘর।’
“তাহলে খোলমঙ্গল শুরু করা যাক?’ নাইট্রোজেন বললেন।
‘হ্যাঁ, মাস্টারমশাই,’ রতি বলল। ‘আজ আমায় তাড়াতাড়ি যেতে হবে। শুরুটা হোক আজ।’
নাইট্রোজেন খোলের ওপর মালা পরালেন যেমনভাবে ঠাকুরকে মালা পরায়, খোলের গায়ে চন্দনের টিপ দিলেন, আর মন্ত্র পড়তে লাগলেন -
‘মৃদঙ্গ ব্রহ্মরূপায় লাবণ্যম রসমাধুরী
সহস্রগুণ সংযুক্তম্ মৃদঙ্গায়ৈ নমো নমঃ।”
হরি বায়েনও প্রণাম মুদ্রায় প্রফেসরের সঙ্গে একই মন্ত্র পড়ে খোলকে ভক্তিভরে প্রণাম করল। তারপর একই রকমভাবে হারমোনিয়াম ও করতালকে মালা চন্দন পরানো হল। তারপর প্রফেসর খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে হরি বায়েন আর রতিকে গাঁদা ফুলের মালা পরালেন, কপালে চন্দনের রসকলি এঁকে দিলেন I
‘আমাকে দিন, রতি প্রফেসরের হাত থেকে চন্দনপাটাটা নিল। তারপর পদাবলীর নাকে-কপালে রসকলি আঁকতে লাগল রতি। রতির শরীর পদাবলীর শরীরের খুব কাছে। এক ফুটেরও কম দূরত্ব। কোনও কোনও নারীর সৌন্দর্য পুরুষকে তার দাস বানিয়ে দেয়, রতির সৌন্দর্য ঠিক সেরকম। এ সৌন্দর্যে উগ্রতা নেই, স্নিগ্ধ অপরূপ শান্তিদায়ক এক সৌন্দর্য। দৃষ্টি অবনত করলেই রতির বক্ষদ্বয়ের লহর দৃশ্যমান, কিন্তু দৃষ্টি অবনত করতে যে শক্তি লাগে পদাবলীর দু‘চোখে যেন সে শক্তি নেই। পদাবলী চোখ বন্ধ করল। রতির শ্বাস পদাবলীর মুখে এসে পড়ল, গ্রীষ্মের দাবদাহের পর মৃত্তিকা প্রথম বর্ষার প্রতিটি জলকণাকে যেমন শোষণ করে, পদাবলীর মনে হল তার শরীরে সেরকম শোষণ-শক্তি জেগে উঠেছে।
‘হয়ে গেছে,’ রতি পদাবলীর কপালের দিকে তাকিয়ে বলল। ‘সুন্দর লাগছে। একদম নদের নিমাই।’ রতি হাসল। হাসি থেকে অদৃশ্য কিছু মুক্তো নিচের শতরঞ্চিতে গড়িয়ে পড়ল। পদাবলীর মনে হল এই হাসি রতির মুখে যাতে সারা জীবন থাকে তার জন্য সে সব কিছু করতে প্রস্তুত।
- এবার রতি প্রফেসরকে ফুলের মালা পরাল। প্রফেসর চশমা খুললেন। রতি প্রফেসরের কপালে রসকলি আঁকল। তারপর প্রফেসরকে প্রণাম করল। দেখাদেখি পদাবলীও প্রণাম করল। প্রফেসর বললেন “রাধা-মাধব-গৌরনিতাইকে সাক্ষী রেখে আমরা এই কীর্তনের শিক্ষা শুরু করছি। রতি, তুমি গৌরচন্দ্রিকা ধর। হরি গোঁসাই আপনার জন্য আমার মায়ের খোলটা বের করলাম। পাঁচথুপি।’
‘দেখেই বুঝেছি,’ হরি বায়েন বলল। ‘বিশ আঙুল পেট।’
প্রফেসর পদাবলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সব খোলের মাটিতে মিষ্টি আওয়াজ হয় না। দেউলটি, জয়নগর, মাদ্দার, নবদ্বীপের মাটি ভাল, তবে মুর্শিদাবাদের পাঁচথুপিতে তৈরি খোলের মাটি সবচেয়ে ভাল।’
হরি বায়েন বলল, ‘পূর্ব বাংলার মাটিগুলোর বাঁয়া আর পেট ছোট হয়, একটু লম্বাটে ধরণের হয়, ডাইনার খোলা কম হয়, বাজাতে বেশি জোর দিতে হয়। নামকীর্তন, বাউল কীর্তনে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায় কিন্তু জাত কীর্তনের জন্য ভাল না।’
পদাবলী অবাক। ও জানতো খোল মানে চ্যাটাং চ্যাটাং করে তবলার মত বাজানো, এই সামান্য খোলের মধ্যেও এত কিছু আছে জানবার! পদাবলীর মনের ভাব বোধহয় হরি বায়েন ধরতে পারল। ও মৃদু হেসে বলল, ‘এক সময় এই শ্রীখোলই পরীক্ষা নিত যে কে সেরা কীর্তনীয়া। মাস্টারমশাই। আপনার তো জানা আছে জটে কুঞ্জর বাজনার সেই বিখ্যাত কাহিনী।’
- নাইট্রোজেন কীর্তনের ওয়াকিং এনসাইক্লোপিডিয়া, ওঁর তো অজানা কিছুই “কে জটে নেই। কিন্তু পদাবলী উৎসুক হয়ে তাকাল হরি বায়েনের দিকে কুঞ্জ?’ এই রকম অর্বাচীন প্রশ্ন ওর মুখ থেকে না বেরোলেও ওর দৃষ্টিতে সেই প্রশ্নের জলছবি। হরি বায়েন বলল, ‘বীরভূম ইলামবাজারের কাছে পায়র গ্রামের কুঞ্জ দাস ছিলেন দেশবিখ্যাত মৃদঙ্গবাদক। মাথায় পেল্লায় জটা ছিল বলে ওঁর পরিচিতি ছিল জটে কুঞ্জ নামে। উনি কীর্তনও চমৎকার গাইতেন কিন্তু আসরে কীর্তন না পেয়ে মৃদঙ্গ বাজাতেন। তখন কাটোয়ার কাছে বিরাহিমপুরে লীলাকীর্তনের নবরাত্র উৎসব। বিখ্যাত অনেক কীর্তনীয়া এসেছেন। সকলে লীলাকীর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ের গান গেয়ে গেছেন। নবরাত্র শেষ হলে মূল গায়কেরা একে একে এসে মহান্ত বিদায়ের গান গাইছেন। এমন সময় মনোহর চক্রবর্তী মহাশয়ের অনুরোধে জটে কুঞ্জ আসরে লহর আরম্ভ করলেন। জটে কুঞ্জর সঙ্গতের সমতালে সঙ্গীতে লয় দিতে গিয়ে প্রায় সকল কীর্তনীয়া ব্যর্থ হয়ে গেলেন। এমন সময় রসিক দাস উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বেশ কিছুক্ষণ জটে কুঞ্জর সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে কীর্তন গাইলেন। বাজনার শেষে জটে কুঞ্জ রসিককে আশীর্বাদ করে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে একসময় তুমি বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তন গায়ক হবে। তাঁর ভবিষ্যৎবাণী সফল হয়েছিল। সেকালে রসিক দাসের গানের দক্ষিণা ছিল প্রতি পালায় একশ’ টাকা। তখন এক টাকায় দশ বার কিলো চাল পাওয়া যেত। এখন তো মৃদঙ্গ বাদককে তবলা বাজিয়ে খেতে হয়।’ হরি বায়েন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
পদাবলীর খারাপ লাগল হরি বায়েনের দুর্দশার কথা ভেবে, ও প্রসঙ্গ পালটাতে বলল, ‘বাংলার সেরা মৃদঙ্গবাদকরা কে কে?”
“ময়নাডালের নিকুঞ্জ মিত্রঠাকুর, ইলামবাজারের জটে কুঞ্জ, বৈষ্ণব বাইতি, নিকুঞ্জ বাইতি, উমেশ বাইতি, রামশরণ বাইতি, তারপর এলেন অবধূত বন্দ্যোপাধ্যায়, তারপর নবদ্বীপ ব্রজবাসী এরা সব একেকজন দিকপাল - মৃদঙ্গবাদক। অবধূত মৃদঙ্গের নতুন কিছু “বোল” সৃষ্টি করেছিলেন।’
‘সব বিখ্যাত খোল বায়েনরা বুঝি বীরভূমেরই ছিল?’ পদাবলী বলল।
হরি বায়েন হাসল - ‘কথাটা ভুল কিছু বলো নি। আমাদের কীর্তনের জগতে একটা কথা আছে বরেন্দের গায়েন আর রাঢ়ের বায়েন’
দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে রতি উসখুস করছিল। রতি এবার অনুমতি চাইল গৌরচন্দ্রিকা শুরু করার। পদাবলী জানে কীর্তন গৌরচন্দ্রিকা দিয়ে শুরু করা হয়। কিন্তু কখনো গৌরচন্দ্রিকা শোনেনি। ও বলল, ‘স্যার, গৌরাঙ্গের সম্বন্ধে লেখা পদই তো গৌরচন্দ্রিকা, তাই তো?”
প্রফেসর বললেন, “বৈষ্ণব পদাবলী কবিরা চৈতন্যদেবকে নিয়ে অনেক পদ রচনা করেছেন, তাদের সব পদ গৌরচন্দ্রিকা না। মূল পালাকীর্তন শুরু হওয়ার আগে ভূমিকা হিসাবে যে গৌরাঙ্গবিষয়ক কীর্তন গাওয়া হয় তা হল গৌরচন্দ্রিকা।’
পদাবলী বুঝতে পারল না, কিন্তু নিজের অজ্ঞতার জন্য এতগুলো লোকের সময় নষ্ট করতে চাইল না। পদাবলীর চোখের ভাষা বোধহয় রতি পড়তে পারল। রতি বলল, গৌরচন্দ্রিকা শুনে দর্শক বুঝে যায় আজ কী পালা গাওয়া হবে। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি -, রতি গেয়ে শোনাল -
‘হেদেরে নদীয়াবাসী কার মুখ চাও।
বাহু পসারিয়া গোরা চাঁদেরে ফেরাও।।’
রতির অপূর্ব গলা। আজ যেন সেদিনের চেয়েও মিষ্টি। পদাবলীর খারাপ লাগছিল, গোবিন্দ অধিকারী আজ এখানে থাকলে কী খুশিই না হত! রতি গান থামিয়ে বোঝাতে লাগল ‘এটা গৌরচন্দ্রিকা। চৈতন্যদেব নদীয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তাঁকে ফেরাবার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই গৌরচন্দ্রিকা শুনলেই দর্শক বুঝে যাবে আজকের মূল কীর্তনের পালা হবে মাথুর। শ্রীকৃষ্ণ কংস বধের জন্য বৃন্দাবন ত্যাগ করে মথুরায় চলে গেলে বৃন্দাবনবাসীদের ও একই অবস্থা হয়েছিল।’ এবার রতি প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে বলল – ‘মাস্টারমশাই, আমি তাহলে শুরু করি?” -
‘হ্যাঁ,’ নাইট্রোজেন সম্মতি দিলেন। রতি গাইতে লাগল –
গোরা অনুরাগে মোর পরাণ কাতরে
নিরবধি ছল ছল আঁখি জল ঝরে।।
প্রথম গোরা অনুরাগে মোর এটা অনেক টেনে টেনে বিলম্বিতে গাইল রতি। রতির গৌরচন্দ্রিকা গান বদ্ধ ঘরের বাতাসের প্রতিটি রেণুকে মধুর করে তুলছিল। পরে পদাবলীকে প্রফেসর বলেছিলেন গৌরচন্দ্রিকা গানের প্রথম চরণের প্রথমার্ধ বিলম্বিতে গাইতে হয়, না হলে নাকি গৌরাঙ্গকে অপমান করা হয় - এটাই কীর্তনীয়াদের বিশ্বাস। নবদ্বীপে শ্রীবাস অঙ্গনে যখন গৌরচন্দ্রিকা -
হত তখন ওই “গোরা” কথাটা এত টেনে গাইত যে মেয়েরা কলসী কাঁখে জল আনতে যাওয়ার সময় নাকি ‘গো’ শুনত আর জল নিয়ে ফেরার সময় ‘রা’ শুনত। হেসে ফেলেছিল পদাবলী।
তারপর প্রফেসর প্রসাদ হিসাবে সকলকে গুড়ের বাতাসা দিলেন। পদাবলী ভাবল লোকটা হাড়-কঞ্জুষ! এত সুন্দর খোলমঙ্গলের জন্য একটু সন্দেশ-টন্দেশ কিনে আনতে পারেনি? বাতাসা! গুজিয়া হলেও ঠিক ছিল।
রতি উঠে দাঁড়াল - ‘হরিকাকা, আমি চলি, আপনাকে আজ আর কষ্ট করে দুপুরে আসতে হবে না। আপনার শরীর ভাল না। কাল সকালে এখানে দেখা হবে।’
- রতি বেরিয়ে যাওয়ার পর হরি বায়েন বলল, ‘দাদার মেয়ে সাৰ্বভৌম কীর্তন গায়িকা। মনোহরসাই, গড়াণহাটি, রেনেটি সব রকম ঢঙে অবলীলাক্রমে কীর্তন গেয়ে যাতে পারে। আমাদের বাংলার সেরা কীর্তনওয়ালী হওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সবই কপাল -
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন