প্রীতম বসু
পরদিন বেলা একটু বাড়তেই অখিলরঞ্জন রওনা দিলেন দাদার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
মন্দিরা আর প্রাণনাথ চালাঘরের ভিতরে কথা বলছিল। মন্দিরা মাঝে মাঝেই বাইরের জানলার ফাঁকে চোখ রাখছিল। হঠাৎ মন্দিরার কপালে ভাঁজ – কাকার পালকি! এদিকে আসছে!’ মন্দিরা শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। প্রাণনাথ জানলার ফাঁক দিয়ে তাকাল। চারজন উর্দি পরা বেহারা একটা পালকি বহন করে নিয়ে আসছে। পালকির সামনে ও পিছনে বল্লম হাতে বরকন্দাজ।
মন্দিরা দ্রুতপায়ে খডুটি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা দিল। তারপর বাড়ির ভিতরের হেঁসেলে ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যে পালকি এসে থামল। জরির পর্দা সরিয়ে মখমলের জাজিম থেকে কষ্টেসৃষ্টে মাটিতে পা রাখলেন রায়সাহেব অখিলরঞ্জন।
জমিদারের গমগমে গলার আওয়াজ, কথাবার্তা খড়ুটি ঘরের মাটির দেওয়ালের ভিতর দিয়ে বেশ ভালই শোনা যাচ্ছে। প্রাণনাথ জানলার পাল্লার ফাঁক দিয়ে দেখল পালকির হাতল রূপো দিয়ে বাঁধানো। পাইকদের হাতের বল্লমের হাতলও রূপো বাঁধানো। প্রাণনাথ কান পাতল। জমিদার বলছে -
‘দাদা, আমাদের নিজেদের মধ্যে যতই ভুল বোঝাবুঝি বিভেদ থাক না কেন, সেটা আমাদের পারিবারিক ব্যাপার। কিন্তু মৃদঙ্গম আমাদের সেন বংশের জ্যেষ্ঠ বংশধর ছিল। মৃদঙ্গমের মৃত্যুসংবাদ আমার পরিবারের মাথার ওপর এক শোকের কালো মেঘ ছেয়ে দিয়েছে। আমি কিন্তু এখানে সহানুভূতি দেখাতে আসিনি, আমি চাই এই অন্যায়ের বিচার। আমি উপরমহলে এ নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব হল মৃদঙ্গমের শ্রাদ্ধশান্তি করা। আমি নিজে মৃদঙ্গমের শ্রাদ্ধশান্তি করব।’
‘মৃদঙ্গমের পারলৌকিক ক্রিয়া কর্ম সম্পাদন করা হয়ে গেছে,’ কুমুদরঞ্জন বললেন।
‘হয়ে গেছে? আমরা টের পেলাম না -
‘বৈষ্ণবদের রীতি অনুযায়ী তিনদিন অশৌচ পালন করে, চতুর্থ দিনে মহাপ্রভুর ভোগ আর কীর্তন হয়েছে।’
‘শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান, ব্রাহ্মণকে দান-দক্ষিণা-ভুজ্জি-উৎসর্গ কিছু হল না -
*অখিল, আমার মনের অবস্থা ভাল না। আমি তোমার সঙ্গে এবিষয়ে কথা বলতে চাই না।’
‘ঠিক আছে, দাদা,’ অখিলরঞ্জন আর তর্কে গেলেন না। ‘কিন্তু আমাদের মাথায় এখন এক বড় দায়িত্ব। প্রতি বৎসর মৃদঙ্গম এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিত। তার অবর্তমানে সকল শোক ভুলে এ বছর আমাদের সেই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
‘তুমি কীসের কথা বলছ অখিল?’ কুমুদরঞ্জন ভগ্নস্বরে বললেন। “ধুলট। মাঘী সপ্তমী এগিয়ে আসছে। আমাদের এখনই তোড়জোড় শুরু করতে হবে।’
‘এবছর নীলমাধবের মন্দিরে ধুলট হবে না।’
না তা হয় না। ধুলট হবেই। এটা আমাদের বংশ-পরাম্পরায়-‘
“তুমি তো সেদিন কোতোয়ালিতে ছিলে অখিল! তুমি তো শুনলেই যে ইংরেজ
সরকার আমাদের অনুমতি দেয় নি। সরকারের আদেশ আছে কোনও জনসমাবেশ করা চলবে না। জনসমাবেশ হলেই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে জেলে পুরবে। তুমি তো তাতে সমর্থন জানালে।”
—এটা অন্যায় আদেশ ইংরেজদের,’ অখিলরঞ্জনের রুষ্ট কণ্ঠস্বর।
“মৃদঙ্গমকে হত্যাটাও অন্যায় ছিল,’ কুমুদরঞ্জন বললেন। ‘ও কিছুতেই বোমাটা ছোঁড়ে নি।
অখিলরঞ্জন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বলল, ‘দাদা, যত দিন যাচ্ছে, তত আমার মোহভঙ্গ হচ্ছে। করতালতলীর ধুলট আমাদের বাংলার ঐতিহ্য। এটা ইংরেজ সরকার বন্ধ করতে পারবে না। আমি বলছি করতালতলীতে ধুলট হবেই।’
*তুমি ইংরেজদের আদেশ অমান্য করবে?”
‘না আমি পিটিশন দেব। কলকাতায় উপরমহলে আমার খুবই পরিচিতি। একজন জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আমি এবিষয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েও রেখেছি। আমি কলকাতা থেকে অনুমতি জোগাড় করে আনবই ধুলটের। এ আমার প্রতিজ্ঞা। তুমি সকলকে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠাও।’
‘মৃদঙ্গম সমস্ত খরচাপত্রের জোগাড় করত। আমি কখনো মাথা ঘামাই নি এ ব্যাপারে ‘
“দাদা, তুমি খরচা নিয়ে চিন্তা কোর না। মৃদঙ্গম স্বর্গলাভ করেছে, কিন্তু আমি তো আছি। এবছরের ধুলটের সমস্ত ব্যয়ভার আমি বহন করব। তুমি শুধু অনুমতি দাও।’
‘আমি অনুমতি দেবার কে? সবই নীলমাধবের ইচ্ছা। তুমি ধুলট করতে চাইছ, বেশ তবে তাই হোক,’ কুমুদরঞ্জন বললেন।
অখিলরঞ্জন সোনার চেনের সঙ্গে সংলগ্ন পকেটঘড়ি বের করে সময় দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘আমাকে আজ শহরে কোর্টে যেতে হবে। আমি চলি, ‘ জমিদার দরজার দিকে এগোলেন। ‘ইংরেজদের অনুমতি পত্র নায়েব মশাইয়ের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব। কয়েকদিন অপেক্ষা কোরো। উঠোনে নেমে সদরের দিকে যেতে যেতে ফিরে দাঁড়ালেন অখিলরঞ্জন মৃদঙ্গম কী সুন্দর সনাতন কীর্তন গাইত অধিবাসের শুরুতে। এবছর কে গাইবে বলতো ওই কীর্তন? তোমার চেনাজানা কেউ আছে নাকি?’ -
কুমুদরঞ্জনের অধরে স্মিত হাসি কারুকে দিয়ে গাইয়ে নেবেন।’ - ‘প্রভু নীলমাধব তাঁর কীর্তন নিজেই
অখিলরঞ্জন চলে যেতেই মন্দিরা উত্তেজিত হয়ে কুমুদরঞ্জনের কাছে গেল, ‘এ যে মৌলবী এসে গীতাপাঠ করে গেল! কাকার নিশ্চয়ই কোন দুরভিসন্ধি আছে বাবা।’
‘আমারও অবাক লাগছে জানিস, কুমুদরঞ্জন বললেন। হঠাৎ এমন কী হল যে অখিলের মত ছেলে, যে কিনা কীর্তনকে দু‘চক্ষে দেখতে পারেনা, সে অপ্রত্যাশিতভাবে ধুলটের জন্য উদ্যোগী হয়ে উঠল?”
‘আমার ভাল ঠেকছে না বাবা,’ মন্দিরা চিন্তিত মুখে বলল। ‘আমি প্রাণনাথদার সঙ্গে একটু শলা করে আসি।’
খড়ুটি ঘরের দরজা খুলে মন্দিরা ভিতরে ঢুকল ‘শুনলাম,’ প্রাণনাথ নির্লিপ্ত স্বরে বলল। - “সব শুনলে তো?”
“উনি নিজে ধুলটের ব্যবস্থা করবেন? অবিশ্বাস্য!’
যেন কিছুই হয় নি সেরকম নির্বিকার মুখে প্রাণনাথ বলল, ‘নীলমাধব চাইলে সব সম্ভব।’
মন্দিরা ভুরু কুঁচকে প্রাণনাথের মুখের দিকে ভালভাবে তাকিয়ে যেন প্রাণনাথের মন পড়তে লাগল, তারপর প্রাণনাথকে বলল, “তুমি কি কিছু লুকোচ্ছ, প্রাণনাথদা?’
‘আমি আবার কী লুকোবো?”
হঠাৎ বাইরের কাঠের দরজা ঠেলে ছিদাম ঢুকল হাঁফাতে হাঁফাতে ‘মন্দিরাদিদি, বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘মানে? কোথায় গেল ভুবনকাকা?” মন্দিরা দ্রুতপদে খড়ুটি ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল।
“বাবা রাতের বেলা ঘুমোতে পারে না। চুপচাপ বাড়ির দাওয়ায় বসে থাকে। কখনো বাইরে বেরিয়ে হাঁটাহাঁটি করে। আমি কত বারণ করেছি, সাপ-টাপ আলে শুয়ে থাকে একটা ছোবল দিলেই শেষ। কিন্তু বাবা কথা শোনে না।’ “আগে বলিস নি কেন?”
“পরশু রাতে ঘুম ভেঙে গেল, দেখি ঘরের দরজা খোলা, বাবা বিছানায় নেই। আমি তাড়াতাড়ি কুপি জ্বেলে বাইরে এলাম কিন্তু বাবাকে দেখতে না পেয়ে আমি চৈতন্যপুখুরীর দিকে খুঁজতে গেলাম। জলের ধারে খেজুর গাছের গুঁড়ির সিঁড়িতে বাবা বসে ছিল।’
*ঘুমের মধ্যে অনেকে হাঁটে শুনেছি।’
- “বাবা জলের ধারে জেগে বসে ছিল, আমি বাবাকে ডাকলাম বাবা। বাবা ঠোঁটের কাছে আঙুল এনে ফিসফিস করে জলের ধারের হরকোচ, বনঝামার জঙ্গলের অঙ্গকারের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, চুপ! কথা বললে জ্বলবে না। আমি বললাম কী জ্বলবে না। বাবা বলল – গোরা-দানো। ওকে ধরে গলার টুটি টিপে মারতে হবে।
“গোরা-দানো, গোরা-দানো শুনছি। গোরা-দানোটা ঠিক কী বলত?”
‘ইংরেজ ভূত। বাবার ধারণা হয়ে গেছে যেসব স্বদেশীদের ফাঁসি দেওয়া হয়, তাদের মৃতদেহ নাকি গোরা-দানো চাটে। অনেক কষ্টে বাবাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। আজ খুব ভোরে শীত শীত করতে লাগল, ঘুমটা ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি বাবা বিছানায় নেই। ভাবলাম পায়খানা করতে পগারে গেছে। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেল, বাবা আসেই না। খুঁজতে বেরোলাম। কিন্তু বাবা আজ চৈতন্যপুখুরীর পাড়ে নেই।’
‘আশপাশ সব খুঁজেছিস ? নদীর পাড় - -
‘সব সব। খেয়াঘাট, বাজার, এমন কি চিত্রাখালের শ্মশান পর্যন্ত খুঁজে এলাম। বাবা কোথাও নেই।’
‘এতক্ষণ বলিস নি কেন?’
‘বলতে আসছিলাম। কিন্তু জমিদারের পালকি দেখে আর আসতে পারি নি। বাবার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। আলেয়া যে কত মানুষকে জলার পাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন দেখি বাবাকে পাই কোথায়। ছিদাম হনহন করে আবার দরজার দিকে হাঁটা লাগাল।
আমি আসছি তোর সঙ্গে, মন্দিরা ছিদামের সঙ্গে বেরিয়ে গেল।
***
সন্ধ্যাবেলা মন্দিরা প্রাণনাথের খাবার নিয়ে যখন খড়ুটি ঘরে ঢুকল তখন মন্দিরার মুখ থমথমে। প্রাণনাথের মনে হল মন্দিরা অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে। ‘মন্দিরা, কী হয়েছে?”
মন্দিরা কোনও উত্তর দিল না, ভাতের থালা নামিয়ে রেখে ফিরে যাচ্ছিল প্রাণনাথ বলল, ‘বুঝেছি, ছিদাম তোমার কাছে কিছুই গোপন করতে পারে না।” ‘
‘আমি ছিদামকে এক চড় মেরেছি,’ মন্দিরা বলল। ‘ওকে বলেছি আমাদের বাড়িতে পা দিবি না। ও এটা কীভাবে করল? আমাকে বললে আমি কিছুতেই ওকে একাজ করতে দিতাম না।’ মন্দিরা অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রাণনাথকে বলল, ‘তুমি এত বড় ঝুঁকি নিতে পারলে? শুধু যাতে করতালতলীতে ধুলট হয় তুমি তার জন্য -?’
‘এছাড়া ধুলট করাবার অন্য কোনও উপায় ছিল না, মন্দিরা। কাকাবাবু ‘এতো আত্মহত্যার সামিল। নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করা। অসম্ভব!’ মন্দিরা দৃঢ়স্বরে বলল। ‘তুমি ধুলটে যাবে না। তোমায় আমি কিছুতেই মরতে দেব না।’
‘তুমি আমার ওপর ভরসা রাখ -
‘দোহাই তোমার প্রাণনাথদা,’ মন্দিরা প্রাণনাথের সামনে হাতজোড় করল। ‘দাদাকে হারাবার পর একদম ভেঙে পড়ছিলাম। তোমায় অবলম্বন করে আমি কোনওরকমে বাঁচবার জন্য প্রতিদিন লড়াই করে চলেছি। তোমায় আমি এমনভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছি যেমনভাবে পরগাছা গাছকে জড়িয়ে থাকে। তোমার কিছু হয়ে গেলে -
প্রাণনাথ মন্দিরার দু‘হাত ধরল, ‘ইংরেজ আমার টিকিও ছুঁতে পারবে না, মন্দিরা। আমি তোমায় কথা দিলাম।’
“অসম্ভব। এ ধুলট আমি হতে দেব না। আমি এন্তাজ আর গ্যাদাকে খবর পাঠাচ্ছি। ওরা গভীর রাতে তোমায় আঘাটায় ওদের পানসিতে তুলে তুমি যেখানে বলবে ঠিক সেখানে ছেড়ে আসবে। তুমি চলে যাও।’
না।’ ‘মন্দিরা, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, আমাকে ইংরেজরা কিছুতেই ছুঁতে পারবে
‘কিন্তু কীভাবে?”
‘আমাকে একটু ভাবতে দাও, মন্দিরা। আমি এর থেকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। একটা উপায় আমি ঠিক বের করে নেবই।’
‘আমি কিচ্ছু ভাবতে পারছি না। এদিকে ভুবনকাকাকে নিয়ে এত চিন্তা তার ওপর তুমি এক বিরাট পাহাড় মাথায় চাপিয়ে দিলে।’
‘ভুবনকাকার কোনও সন্ধান পাওয়া গেল?’
‘হ্যাঁ, কলার মান্দাসের ভেলায় জলার ভিতরে গিয়ে দানো খুঁজছিল। সে আরেক চিন্তা। কে জানে মানুষটার কী যে হল?”
প্রাণনাথ আর কথা বাড়াল না। মৃদঙ্গমের অত্যাচারের ধাক্কা সহ্য করতে পারেনি ভুবনকাকার মনন। লোকটার মস্তিষ্ক - বিকৃতি ঘটেছে। সারাদিন গোরাদানো খুঁজে বেড়ায় প্রতিহিংসার তাড়নায়।
মন্দিরা প্রাণনাথের হাত নিজের মাথায় তুলে নিয়ে বলল, “আমার দিব্যি দাও।’
“তোমার দিব্যি। আমি কিছু একটা উপায় খুঁজে বের করবই।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন