প্রীতম বসু
পরদিন সকালে করতালতলী পৌঁছে পদাবলী দেখল নীলমাধবের মন্দিরের সামনের আগাছা কেটে সাফ করা হয়েছে। মন্দিরের চাতালে তিন-চারজন মানুষ হাত-পা নাড়িয়ে তুমুল বচসা করছে। গোবিন্দ অধিকারী, শিবু দোহার, শিশির গায়েন, গোপাল ঠাকুর। দূর থেকেই এদের চিনল পদাবলী।
কী হল এদের? এত ঝগড়া কী নিয়ে? পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল পদাবলী। পদাবলী মন্দিরের চাতালে পৌঁছোতেই সবাই চুপ মেরে গেল। পদাবলী হাসি হাসি মুখে সুখবরের গৌরচন্দ্রিকা করল, ‘একটা খুশির খবর আছে।
কেউ কোনও উৎসাহ বা ঔৎসুক্য দেখাল না। তাই পদাবলী নিজেই বলল, ‘আমি কীর্তনের একটা বায়না নিয়ে এসেছি। কলকাতার নিউ আলিপুরে। সামনের রবিবার। একজনের শ্রাদ্ধে কীর্তন গাইতে হবে। পার্টি ভালই পেমেন্ট করবে।’
‘গাইবে-বাজাবে কে? এই হারামজাদারা দল ছেড়ে দিয়েছে, গোবিন্দ অধিকারী রোষের সঙ্গে বলল।
‘গালি দেবেন না, কত্তামশাই, শিশির গায়েন বলল। ‘আপনেই তো দল ভেঙে দিলেন সেদিন। এই এনার সামনেই তো বললেন, মড়া আগলে রাখতে নেই। এখন আমাদের দোষ দিচ্ছেন?”
‘আরে, ওগুলো তো রাগের কথা, পদাবলী মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে গেল। ‘কীর্তনের দল ভাঙলে তোমরা খাবে কী?
‘সে বন্দোবস্ত পাকা করেই না তবে বাবুরা দল ছাড়ছেন!’ গোবিন্দ অধিকারীর গলায় উষ্মা। ‘দু‘দিন আগের এত অপমানের পরও জমিদারের পা চাটছে।’
‘আমার জায়গায় হলে আপনি কী করতেন বলুন?’ শিশির গায়েন বলল। “আমার বাড়ির দলিল বোনের বিয়ের সময় সেই যে জমিদারবাবুর কাছে বন্ধক দিয়েছিলাম, আজও ছাড়াতে পারি নি। আমাকে বলেছে টাকা না দিলে ভিটেমাটি ছাড়া করবে। আমার শক্তি কোথায় তেনার সঙ্গে লড়াই করার। আপনার কেত্তন কোম্পানী ধারে গলা পর্যন্ত ডুবে রয়েছে। কদাচিৎ একটা আধটা কাজ আসে, কিন্তু ক্ষুধার্ত বাছুর যেমন মা গরুর দুধ চোঁ চোঁ করে টানে সেভাবে সেই টাকা আপনার পাওনাদার টেনে নেয়। আর আমরা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। এভাবে কাঁহাতক চালানো যায়?”
“যা যা বাজে কথা বলিস না। শহরে প্রেসের চাকরির লোভ সামলাতে পারিস নি সেটা বল। সিনেমা দেখবি, রেস্টুরেন্টে খাবি, ওসব ফুটানি মারা তো কীর্তনের পয়সায় সম্ভব না।’
‘এটা আপনি অন্যায় বলছেন কত্তামশাই,’ এবার শিবু দোহার বলল। জমিদারবাবু আমাদের গাঁয়ের লোকেদের জন্য ভাবেন বলেই আমাদের কলুটোলার প্রেসে চাকরি করে দিয়েছেন। আর কীর্তন করে আমরা কী পাচ্ছি? মেয়েটার খাতা-কলম পর্যন্ত কিনে দিতে পারছি না। ইস্কুলে রোজ গালাগালি খাচ্ছে।”
*ওদের যেতে দাও গোবিন্দ,’ এবার গোপাল ঠাকুর বলল। ‘তবে জমিদার যে তোমার কীর্তনের দলকে শেষ করে দেবে এ’কথা একশ ভাগ সত্যি। তা না হলে আমার মত ঘাটের মড়াকে দল ছাড়ার জন্য টাকার লোভ দেখায়? আমি ছিদাম গোঁসাইয়ের নুন খেয়েছি। আমি তোমার সঙ্গে আছি। অবশ্য গায়েন হওয়ার মত জোর আমার গলায় আর নেই।’
‘জমিদার আমাদের শেষ করে ছাড়বে। কিন্তু আমিও ছিদাম বায়েনের ছেলে গোবিন্দ অধিকারী, এ জমি আমি কিছুতেই বেচব না, আর এও দেখব করতালতলী থেকে কীভাবে কীর্তন মুছে দেয়।’
“আপনি থাকেন আপনার কীর্তন কোম্পানি আর ধুলডাঙা নিয়ে, আমরা চললাম,’ শিশির গায়েন বলল। ‘চল শিবু।’ দু‘জনে মন্দিরের চাতালের থেকে নেমে নদীর দিকে চলে গেল।
“তাহলে?” পদাবলী বলল। ‘কীর্তনের বায়নাটা ক্যানসেল করে দিই?” কেন? এরা ছাড়া কি গোটা বাংলায় গায়েন-বায়েন নেই? আমি গাইব কীর্তন,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল।
*কক্ষনো না, গোপাল ঠাকুর বলল। ‘এক আধটা গান গাওয়া আর শ্রাদ্ধের আসরে ঘন্টার পর ঘন্টা গাওয়া এক জিনিস না গোবিন্দ। তোমাকে ডাক্তার ‘পইপই করে মানা করেছে। এরপর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোবে না। আমরা একজন শিরগায়েন আর শিরবাদক জোগাড় করে ফেলব। আজকাল কীর্তনের অর্ডার সকলেরই কম। খেপ গান করার লোক পেয়েই যাব।’ তারপর পদাবলীর দিকে তাকিয়ে গোপাল ঠাকুর বলল, ‘আমরা কীর্তন গাইব। তুমি ভাই বায়নাটা পাকা করে ফেল।’ তারপর বিশে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বিশে, জলের ধারে ভাল কলমী শাক দেখলাম, আমারে একটু উপড়ে এনে দিবি রে? কোষ্ঠকাঠিন্যে বড্ড ভোগাচ্ছে।’
‘আমার কপালটাই খারাপ!’ গোবিন্দ অধিকারী উঠে দাঁড়াল। বিলে বাদাড়ে জোঁক ছাড়িয়ে জল থেকে শাপলা তুলে তুলে আঙুলের ফাঁকে হাজা হয়ে গেল। স্বপ্ন দেখি আবার কীর্তন গাইছি। প্রচুর লোক, হ্যাজাক, খোল করতাল বাজছে। দেখি কাকে পাই আশেপাশের গাঁয়ে।
গোবিন্দ অধিকারীর মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হল পদাবলীর। এক মরণাপন্ন সঙ্গীতকলাকে বাঁচাবার জন্য এই বৃদ্ধ এক অসম লড়াই লড়ছে। পদাবলী বলল, ‘চলুন আমিও যাব।’
‘ঠিক আছে, চল। তারাদাস কীর্তনীয়া বাবার আখড়ায় ছিল। তারপর নিজেই কীর্তনের দল চালিয়েছিল কিছুদিন। এখন এদিক ওদিক থেকে ডাক এলে কীর্তন গেয়ে আসে। ওর বাড়ি স্টেশনের কাছেই। ওর কাছে যাওয়া যাক।’
গোপাল ঠাকুর বলল, “তারাদাস তো আমার গুরুভাই হে। আমিও যাই তোমাদের সঙ্গে। আমি বললে ও নিশ্চয়ই আসবে।’
স্টেশন পেরিয়ে তারাদাসের টালির আটচালা বাড়ি। দেখলেই বোঝা যায় বেশ অবস্থাপন্ন গেরস্থের আবাস। দরজায় কড়া নাড়তে তারাদাস বেরিয়ে এল। গোবিন্দ অধিকারীকে আমল না দিয়ে তারাদাস গোপাল ঠাকুরকে বলল, ‘জয় গুরু। কী মনে করে?’
“জয় গুরু, গোপাল ঠাকুর বলল। ‘তারাদাস তোমায় আমাদের দলে ক’দিন কীর্তনের শিরগায়েনের দায়িত্ব সামলাতে হবে।’
তারাদাস হাত জোড় করে বলল, ‘গোপাল ঠাকুর, তুমি আমার গুরুভাই। তোমায় মিথ্যে বলব না। আমায় তোমার জমি চাষ করে দিতে বল, আমি তাও করে দেব। কিন্তু তোমাদের দলে কীর্তন গাইতে পারব না। আমায় মাফ কর।’
‘কেন পারবে না?” গোপাল ঠাকুরের সম্মানে লাগল।
‘সে প্রশ্ন কোরো না।’ তারাদাস মিনতি করল। শুধু এটুকু বলে দিচ্ছি উদয়নপল্লীর কোনও কীর্তনীয়াই তোমাদের দলে গাইবে না বা বাজাবে না।’
‘বুঝেছি,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। তিনজনে রাস্তায় ফিরে এল। গোবিন্দ অধিকারী পদাবলীকে বলল, ‘বাবা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। তুমি বাবার কাছে যাও। বাবাকে বোলো আমি পাশের গ্রামের সিধু গায়েনের দল থেকে দুচারজনকে রাজি করিয়ে বাড়ি আসছি।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন