প্রীতম বসু
‘পুলিশ!” প্রাণনাথ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল।
‘কাল এত তল্লাশি করে, ঘরদোর সব ওলট-পালট করেও ওদের তৃপ্তি হয় নি,’ বৃদ্ধ রাগত কণ্ঠে বললেন। ‘মন্দিরা প্রাণনাথকে তাড়াতাড়ি খডুটি ঘরে ঢুকিয়ে দে। আমি ওদের সামলাই।’
মন্দিরা দ্রুতপায়ে একচালার দিকে ছুটল - তাড়াতাড়ি এসো, প্রাণনাথদা!” বাড়ির উঠোনের ওপাশে মাটির একচালা ঘর। শরকাঠির পাকানো গোছা গুরুলের ওপর খড়ের ছাউনি দেওয়া একচালার ছাত, মাটির দেওয়ালে বালিমাটি দিয়ে মেজে খড়ুটি করা। আগচালার দাওয়ায় ঘুঁটের বস্তা, ধামায় কাঁচা সুপারির ছড়া, স্তূপীকৃত কাঠের গাঁটরির মধ্য দিয়ে পা ফেলে দরজায় পৌঁছাল মন্দিরা। দরজার পাল্লা ঠেলে খুলে মন্দিরা বলল, ‘তাড়াতাড়ি!’
প্রাণনাথ ক্ষিপ্রগতিতে ঘুঁটের বস্তা, কাঠের গাঁটরি ডিঙিয়ে ছোট্ট খড়টি ঘরে ঢুকতেই মন্দিরা আবার দরজা বন্ধ করে তালা আটকে দিল। প্রাণনাথ ভিতরে ঢুকে কান খাড়া করে রইল, হৃদপিণ্ড দ্রুত ধকধক করছে। রিভলভারটা মৃদঙ্গমের ঘরে খোলের ভিতর রাখা। ওটা সঙ্গে রাখা উচিত ছিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর বাইরে পুলিশের ভ্যান এসে থামল। ভারী জুতোর শব্দ। সদর দরজায় ধাক্কা। প্রাণনাথ শ্বাস বন্ধ করে ফেলল। কেউ সদরের হুড়কো খুলে দরজার কবাট খুলল।
‘কী ব্যাপার আপনারা আবার?’ কুমুদরঞ্জনের গলা।
প্রাণনাথের শরীরের ভিতরটা কুলকুল করে ঘামছে। পালাবার কোনও পথ নেই। ওরা এই চালাঘরে ঢুকলেই ওকে দেখতে পেয়ে যাবে।
- ভাঙা ভাঙা বাংলা শুনে বোঝা যাচ্ছে একজন ইংরেজ পুলিশ আছে। সেই কথা বলছে – ‘আমি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আপনার পুত্র মৃদঙ্গম দাস বোমা ছুঁড়ে একজন ব্রিটিশকে খুন করেছেন এবং আরও আটজনকে আহত করেছেন। তারপর সে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে পলায়ন করে। পুলিশ মৃদঙ্গম দাস ও তাহার বন্ধু প্রাণনাথ বোসকে খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। হুকুম হইয়াছে ওদের ধরে আনতে ডেড অর অ্যালাইভ।’
‘অসম্ভব!’ বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন দৃঢ়তার সঙ্গে বলল। ‘আমার ছেলে পরম বৈষ্ণব। ও কিছুতেই বোমা মেরে কারুকে হত্যা করতে পারে না। আপনারা অসত্য বলছেন।’
*ও গোপন সমিতি করে। এরা ভাবে যে বুয়ররা যেরকম গোপন সমিতি করে গেরিলা অ্যাটাকে ফ্রেঞ্চদের তাড়িয়েছিল, এরাও আমাদের সেভাবে তাড়াবে।’
‘না। ও গান্ধীর মত অহিংসার পথে স্বদেশী করে। ও সশস্ত্র বিপ্লব করে না। আপনাদের ভুল হচ্ছে।’
“ভুল আপনার হচ্ছে,’ ইংরেজ পুলিশ বলল। ‘আপনার ছেলে কি আপনার বাড়িতে বোমা বানাতো?”
“তাহলে আমি ওকে ত্যাজ্যপুত্র করতাম।’
সাহেব কিছুক্ষণ মৌন রইল। প্রতি দণ্ডে প্রাণনাথের মনে হচ্ছে সাহেব ভিতরটা দেখতে চাইলেই সে শেষ। প্রাণনাথ আধো আবছায়ায় হাতের কাছে কাঠের আগলটা পেয়ে সেটাকে আঁকড়ে ধরল। এবার বাইরে সাহেবের গলা শোনা গেল – “আমরা আপনার গৃহ তল্লাশি করিয়াছি কাল। আনফরচুনেটলি কিছু পাই নাই। আপনার ছোটভাই রায়সাহেব অখিলরঞ্জন সেন আমাদের খুবই কাছের মানুষ, তাই আমরা আপনাকে থানায় ধরে নিয়ে যাচ্ছি না। আপনাকে একটা সুযোগ দিতে চাই। মৃদঙ্গম দাস ও প্রাণনাথ বোসকে করতালতলীতে - দেখতে পেলে আমাদের খবর দেবেন।”
পুলিশ গটগট করে ভ্যানে গিয়ে উঠল।
বাইরে গাড়ির ইঞ্জিন চালু হওয়ার আওয়াজ। তারপর গাড়ির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। বন্ধ জানলার ফাঁক দিয়ে প্রাণনাথ উঁকি মেরে দেখল পুলিশের ভ্যান দূরে অপসৃয়মান। প্রাণনাথের শরীরে প্রাণ ফিরে এল। সজোরে সদর দরজা বন্ধ হল। দরজায় হুড়কো লাগান হল। কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর মন্দিরা খড়ুটি ঘরের দরজার তালা খুলে দিল। বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন মাথায় হাত দিয়ে দাওয়ায় বসে আছেন। বৃদ্ধকে ধরে ধরে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল মন্দিরা। বৃদ্ধের মুখচোখ যেন প্রস্তরীভূত। মন্দিরা বাবাকে তক্তপোষে এনে বসাল।
প্রাণনাথ কুণ্ঠিত পদক্ষেপে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বৃদ্ধের কাছে। ‘পুলিশটা যা বলে গেল তা কি সত্যি?” বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন প্রাণনাথকে শক্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।
‘আংশিক সত্যি,’ প্রাণনাথ বলল। ‘বোমা মারা হয়েছে। তবে মৃদঙ্গম বোমা মারেনি। বোমা মেরেছি আমি।’
“সেই বোমায় একজন নিহত
হয়েছে?’
প্রাণনাথ নীরবে মাথা নাড়াল।
‘তুমি মানুষ মারলে?” বৃদ্ধের দু‘চোখে তীব্র ধিক্কার।
প্রাণনাথ নীরবে উত্তর খুঁজতে লাগল।
‘কেন মারলে?’
‘মৃদঙ্গমকে বাঁচাতে।’
‘মৃদঙ্গমকে বাঁচাতে! তার মানে?”
‘গত সপ্তাহে মৃদঙ্গম দলবল নিয়ে পার্ক স্ট্রীটের ম্যাকেঞ্জি লিয়াল অ্যাণ্ড কোং অকশন হাউসের সামনে পিকেটিং করে। খুবই অহিংস আন্দোলন। কিন্তু তবু পুলিশ নির্দয়ভাবে বন্দুকের বাঁট, লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র মৃদঙ্গমের ওপর। আমি দূর থেকে দেখি মৃদঙ্গমকে মাটিতে ফেলে একজন লাল পাগড়ি পুলিশ বন্দুকের বাঁট দিয়ে ওর পায়ে আর তলপেটে আঘাত করে চলেছে-‘
‘হে ভগবান,’ কুমুদরঞ্জন এই হিংসার বর্ণনা সহ্য করতে না পেরে দু‘হাতের তালু দিয়ে চোখ-মুখ ঢাকলেন।
‘মৃদঙ্গম ওখানেই মরে যেত, যদি না -, প্রাণনাথ চুপ করল
‘তুমি কি জানো দাদা এখন কোথায়?” মন্দিরা বলল।
প্রাণনাথ অবনত মস্তক ধীরে ধীরে নাড়ল - ‘হ্যাঁ জানি।’
‘কোথায় দাদা?’
‘মৃদঙ্গম ওর এসব পিকেটিঙয়ে আমাকে সঙ্গে নিত না। কিন্তু আমি বিপদের গন্ধ পেয়েছিলাম। তাই মুলেন স্ট্রীটের গ্যারাজ থেকে চুরি করে আনা ট্যাক্সিটা রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলাম। শিখ ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে রেখেছিল। আমার কাছে একটা পাঁচ চেম্বারের রিভলভার আর হাতবোমা ছিল। একজন লাল পাগড়ি বিহারী পুলিশ এবার মৃদঙ্গমের গলায় পা দিয়ে পায়ের চাপ বাড়াচ্ছিল, আরেকজন মৃদঙ্গমের ডান পা থেঁতলে যাচ্ছিল। আমি ট্যাক্সি থেকে নেমে রিভলভার বের করে এগোতেই মৃদঙ্গম যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে চেঁচিয়ে বলেছিল - প্রাণনাথ আসিস না।’
‘তারপর?’
‘মৃদঙ্গমের কথা অগ্রাহ্য করে আমি রিভলভার উঁচিয়ে ধরতেই পাশের লাল পাগড়ি বেয়নেট বের করে মৃদঙ্গমের গলায় ধরে বলল আর এক পা এগোলেই এর গলার নলি কেটে দেব, তারপর যা হওয়ার হোক।’ প্রাণনাথ চুপ করল। ‘মৃদঙ্গম চেঁচিয়ে বলল, প্রাণনাথ, আমার দিব্যি তুই পালা।’ আমি লক্ষ করলাম আমার দিকে একদল পুলিশ ছুটে আসছে। আমি তখন অকশন হাউসের দেওয়াল লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়ি। পুলিশ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, কিন্তু এতে পুলিশ সুপার ড্যানিয়েলের ভাইয়ের মৃত্যু হয়। আমি কোনওরকমে পালাতে পেরেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে মৃদঙ্গমের বিচার হবে। খুব বেশি হলে কয়েক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড, আর আমার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা। পরের দিন আমরা উকিল পাঠালাম মৃদঙ্গমের জামিনের দরখাস্ত নিয়ে। কিন্তু পুলিশ বলল মৃদঙ্গম নাকি ফেরার। ওকে ইংরেজরাও খুঁজছে। বুঝলাম ব্যাপার গুরুতর। ওরা কাগজপত্রে মৃদঙ্গমের গ্রেপ্তারের কোনও উল্লেখই রাখেনি। ওকে কোথাও অন্তরীণ করে রেখে ওর ওপর অত্যাচার চালাবে।’ প্রাণনাথ চুপ করে রইল। তারপর ভারাক্রান্ত গলায় বলল, পরে জানলাম মৃদঙ্গমকে ইংরেজ পুলিশ প্রেসিডেন্সি জেলে ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য অত্যাচার করে। আর ‘
‘আর?” মন্দিরা ও কুমুদরঞ্জন একসঙ্গে বলে উঠল।
*ওকে ওরা জেলে খুন করেছে।”
প্রাণনাথ যেন ঘরের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটাল। তার ধাক্কায় মন্দিরা ও বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন থরথর করে কেঁপে উঠল। বৃদ্ধের চোখের দৃষ্টিতে আতঙ্ক, অবিশ্বাস। মন্দিরার মুখ ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য। মন্দিরা তার হালকা দেহভার সামলাতে অসমর্থ হয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। ‘ঈশ্বর!’ এক গোঙানি কুমুদরঞ্জনের কণ্ঠনালী থেকে বেরিয়ে এল। তারপর পুত্রহারা বৃদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ছিদাম দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে সজোরে মাথা নাড়াতে লাগল। প্রাণনাথ দ্রুতপায়ে পাশের ঘরে গেল। ফিরে এল হাতে মাটির ছোট
অস্থিকলস নিয়ে। ‘মৃদঙ্গম চেয়েছিল ওর অস্থি যেন ওর মা‘র সমাধির পাশে সমাধি দেওয়া হয়।’ প্রাণনাথ কুমুদরঞ্জনের হাতে কলসটা দিল।
কলস হাতে নিয়ে বৃদ্ধ হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বারবার ওকে বারণ করেছিলাম, তুই এসব স্বদেশী করতে যাস না। ইংরেজদের সঙ্গে তোরা পারবি না। কিন্তু আমার কথা ও শুনল না। হে নীলমাধব, এ কেমন বিচার তোমার?”
“দাদা কার কী এমন ক্ষতি করেছিল যে ওকে ওরা মেরেই ফেলল?” মন্দিরা কাঁদতে কাঁদতে বলল।
‘সেই প্রশ্নের উত্তরই তো আমি খুঁজে চলেছি। অহিংস পিকেটিং করতে গেছিল মৃদঙ্গম। তাহলে অমন নিষ্ঠুর ভাবে ওরা কেন মৃদঙ্গমকে মারছিল? কেন ওরা মৃদঙ্গমের বিচার করল না? ওকে কেন গোপনে জেলের মধ্যে হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলা হল?”
মন্দিরা বাবার কাছে এসে দাদার অস্থিকলস বুকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। প্রাণনাথের মনে প্রশ্ন ঘুরতে লাগল মৃদঙ্গম কী জানত? সে কি ব্রিটিশদের কোনও গোপন কলঙ্কিত অধ্যায় জানতে পেরেছিল? তাহলে মৃদঙ্গম কেন প্রাণনাথের কাছে তা প্রকাশ করে নি?”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন