প্রীতম বসু
সনাতন চোর কীভাবে মন্দির থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছিল? মন্দির থেকে বেরোবার গোপন পথের সাংকেতিক হদিশই কি সনাতন কীর্তন?
সনাতন কীর্তনটা আজ প্রাণনাথ সকাল থেকে বারবার পড়ছে। কিন্তু কিছুতেই মানে উদ্ধার করতে পারছে না। -
সনাতন কীর্তন
(অষ্টতাল)
কর্পূর তাম্বুল চৈতন্যলীলা
নীল বিমানে ধন্য বরিখ পণ্ডিতে জাদু ছুইলা
বধু হিয়ার গগনে মনের চিহ্নে তারকা
গোপ গান পালা তাল লয় দ্বারকা।।
(মদনদোলা)
হৃদে গাহি পদসি
পল্লব শ্যাম গো উদার কমল শিরসি।
“এই কীর্তন আত্মস্থ করতে পারলে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে?” প্রাণনাথ মন্দিরাকে দুপুরে জিজ্ঞাসা করল।
‘নিমাই পণ্ডিতের জাদু-ছোঁয়ায় নীল আকাশেও বর্ষণ হত। তার মানে অসম্ভবও সম্ভব হয়, তাই তো লেখা আছে।’
‘তুমি ঠিক জানো যে মৃদঙ্গম সত্যিই এটা বিশ্বাস করত?”
‘হ্যাঁ, দাদা বিশ্বাস করত। সেজন্য দাদা প্রত্যেক বছর ধুলট উৎসবের অধিবাসে মন্দিরের গর্ভগৃহে এই কীর্তন গাইত। তবে বাবার মতে সনাতন কীর্তন মোটেই পদাবলী কীর্তন না।’
“কেন?”
‘পদাবলীগুলো রচিত হয়েছিল ছন্দে। সনাতন কীর্তনে দুটো পদের মধ্যে ছন্দের কোনও সামঞ্জস্য নেই। বাবা বলে পদাবলীতে অনুপ্রাস, যমক, উপমা, অলঙ্কারের মাপজোখ করা সুষ্ঠু প্রয়োগ আমাদের কান মধুর রসে যেন সিক্ত করে দেয়, কিন্তু এই সনাতন কীর্তন শুনে পদাবলীর মাধুর্য অনুভূত হয় না।
চণ্ডীদাসের কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো আকুল করিল মোর প্রাণ সে রকম আকুল করে না মনকে।’
‘এটা “হামচুপামুহাফ” এর মত সাংকেতিক ভাষা নয়তো?’ প্রাণনাথের মন শিকারী বিড়ালের মত চনমন করে উঠল।
‘হামচুপা - সেটা আবার কী?’
‘আমাদের বিপ্লবীরা নানা গুপ্ত ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা আদানপ্রদান করে যাতে গোপন সমিতির কার্যকলাপ বাইরের কেউ বুঝতে না পারে। আমরা একে হামচুপামুহাফ বলি।’
‘হামচুপামুহাফ মানে কী?”
‘সঞ্জীবনী সভা,’ প্রাণনাথের চোখ সনাতন কীর্তনে। তারপর মন্দিরার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রবীন্দ্রনাথের বড়ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গোপন ভাষার সৃষ্টি করেছিলেন।’
‘তুমি কীভাবে জানলে?”
‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন-স্মৃতিতে এই সভার সম্বন্ধে বিস্তারিত লেখা আছে। রবীন্দ্রনাথের জ্যোতিদাদার নেতৃত্বে একটি গোপন সমিতি তৈরি হয় ১৮৭৬ সালে। কলকাতার ঠনঠনের এক পোড়ো বাড়িতে সেই সভা বসত। সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মাস্টারমহাশয় বৃদ্ধ রাজনারায়ণ বসু। সভার প্রধান নিয়ম ছিল মন্ত্রগুপ্তি। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকত সদস্যরা।’
‘আচ্ছা তাই নাকি!” মন্দিরা অবাক। ‘কী হত এই সভায়?’
‘একটা মড়ার মাথা থাকত, সেটা মৃত অর্থাৎ পরাধীন ভারতের সাংকেতিক চিহ্ন। খুলির চোখের দুই কোটরে দুটি মোমবাতি জ্বালানো। তার সাংকেতিক অর্থ মৃত ভারতের জ্ঞানচক্ষু ফুটিয়ে তুলতে হবে। তারপর আর কী কী হত তা কেউ প্রকাশ করেনি। সভাটিও ছয়মাস মাত্র টিঁকেছিল। সভাটি গুরুত্বপূর্ণ না, গুরুত্বপূর্ণ হল এই সভার কার্য্যবিবরণীর পদ্ধতি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ভাবিত এক গুপ্ত ভাষায় তা লেখা হত। এই গুপ্ত ভাষাটি পরে অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা ব্যবহার করত। সেই ভাষাটিই হল হামচুপামুহাফ।’
‘কীভাবে লেখা হত এ ভাষায়?”
‘এটা কেউ প্রকাশ করেনি। শুধু এইটুকু জানা যায় যে এই গুপ্ত ভাষায় “সঞ্জীবনী সভা” কে হামচুপামুহাফ বলা হত। আমার মনে হয় সনাতন কীর্তনে সেরকম সাংকেতিক ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংকেত দেওয়া আছে।’ ‘কীর্তনের মাধ্যমে সংকেত? তা আবার হয় নাকি?”
‘খুব হয়,’ প্রাণনাথের ওষ্ঠে হাসির রেখা। ‘মেদিনীপুরের জেল থেকে একবার সদাশীল দাস নামে একজন বিপজ্জনক স্বদেশী বিপ্লবী পালিয়ে গেছিল। কীভাবে পালাল সেটা রহস্য। ওকে একটা নির্জন সেলে রাখা হয়েছিল। কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে পারত না। ঝাড়ু আর বালতি নিয়ে ঢুকে বাঁশের ঝুড়িতে রাখা শৌচগামলা পরিষ্কার করতে দিনে একবার শুধু মেথর ভিতরে যেত। ‘কীভাবে পালাল?”
‘মেথর বিপ্লবীর সেল পরিষ্কার করতে এসে নাকি রোজ তুলসীদাসের দোঁহা গাইত -
শিব খিদেতে না খায় পাচনী
রহিবা বিচারক আদি খঞ্জনি
রাম কা রথমে রোদন অনাথা
তেরি বার্তা এ কানু কোথা
খোলে না কাঠি বিলাপা তেরা
রায় মন লে সদা নারায়ণ হেরা
সদা সলা কৈছে পীর দোহেঁ খাস
অজ কহোই তুলসীদাস।।
সদাশীলেরও ঠাকুর-দেবতায় খুব বিশ্বাস। চোখ বন্ধ করে হাত জোড় করে ভক্তিভরে মন দিয়ে শুনত সেই ভক্তিগীতি। সেই জমাদার এমন সুন্দর সুর , খঞ্জনি, রাম, রথ, কানু, নারায়ণ, পীর, দোঁহা, তুলসীদাস – সব ভক্তিমার্গের জোর দিয়ে গাইত যে সন্দেহ করার মত কিছুই নেই। কিন্তু যার বোঝার ঠিক বুঝে গেল। একদিন সকালে দেখা গেল সদাশীলের সেল খালি। পালিয়েছে।’
করে শিবকথায় সে ও
‘কিন্তু, কীভাবে পালাল?” মন্দিরা আবার প্রশ্ন করল।
‘তুলসীদাসের ওই দোঁহাতে পালাবার পথ বলা ছিল।’
‘পালাবার পথ?” মন্দিরা অবাক।
‘কী বলছ কী?”
‘মেথর শৌচ-গামলার পায়খানার ভিতর সেলের চাবি গুঁজে রেখে গেছিল। সদাশীল শৌচ-গামলার পায়খানা নখ দিয়ে চিরে, তার ভিতর থেকে সেই চাবি টেনে বের করে আনল। তারপর সুযোগ বুঝে তালা খুলে সে শৌচ-গামলা মাথায় নিয়ে ঝাঁটা হাতে বেরিয়ে গিয়ে জেল ক্যাম্পাসেই মেথরের বাড়িতে সারাটা দিন লুকিয়ে রইল, তারপর রাতের মালগাড়িতে পালাল কলকাতা। ফর্সিহুঁকো হাতে, বগলে মাদুর, কাঁধে গামছা দিয়ে মৌলবী সেজে কলকাতায় এসে দেখা করল নয় নম্বর রাণাদাস লেনের ময়রার দোকানে। ময়রা নিয়ে গেল হেঁদোর পিছনে তার বন্ধু কৈলাস দাসের বাড়িতে। কৈলাস দাস খিদিরপুর ডকে চাকরি করে। কৈলাস দাসের বাড়িতে ক’দিন লুকিয়ে থেকে তারপর মাথায় ফেজ টুপি, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি লাগিয়ে চোস্ত ফরাসি বলতে বলতে জাহাজ ধরে পণ্ডিচেরী।’
কিন্তু জানল কীভাবে সেই বিপ্লবী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না।’
‘তুলসীদাসের দোঁহাটা উলটো করে পড়লে তুমিও আন্দাজ পাবে
শিব খিদেতে না খায় পাচনী - নীচ পায়খানাতে দেখি বসি
রহিবা বিচারক আদি খঞ্জনি - নিজ নখ দিয়া কর চাবি বাহির
রাম কা রথমে রোদন অনাথা - থানা অন্দরো মেথর কামরা
তেরি বারতা এ কানু কোথা - থাকো নুকায়ে তার বাড়িতে
খোলে না কাঠি বিলাপা তেরা - রাতে পালাবি ঠিকানা লেখো
রায় মন লে সদা নারায়ণ হেরা - রাহে নয় রানাদাস লেন ময়রা
সদা সলা কৈছে পীর দোহেঁ খাস - সখা হেঁদোর পিছে কৈলাস দাস
অজ কহোই তুলসীদাস - সদাশীল তুই – হোক জয়
এরকম সব।’
মন্দিরার চোখ বড়বড় হয়ে গেল। “ভাবাই যায় না, বাপরে! এই সনাতন কীর্তন উল্টোদিক দিয়ে পড়লে এরকম কোনও অর্থ বের হয়?’
“না। সে চেষ্টা আমি আগেই করেছি। “কর্পূর তাম্বুল চৈতন্যলীলা” – এটা উলটো করে পড়তে গেলেই মাড়ি থেকে দুটো দাঁত খুলে আসবে। এর নিশ্চয়ই অন্য কোনও গোপন মন্ত্র আছে। ছিদামকে একবার আমার কাছে পাঠাতে পারো? ওর কাছে হয়তো কোনও সূত্র থাকতে পারে। সঙ্গে খোল আনতে বোলো।’
‘হ্যাঁ সন্ধ্যাবেলা পাঠিয়ে দেব তোমার এখানে। তবে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিও ওকে। ভুবনকাকার শরীর খুবই খারাপ যাচ্ছে। গুণিন দিয়ে ঝাড়ফুঁক করিয়েও কোনও ফল হয় নি। ভুবনকাকাকে মনে হচ্ছে শহরের ভাল ডাক্তার দেখাতে হবে।’
মন্দিরা চলে গেলে প্রাণনাথ সনাতন কীর্তনের পাতাটা খুলে প্রত্যেক অক্ষর জরিপ করতে লাগল। কীভাবে এই সনাতন কীর্তন আত্মস্থ করা যায়?
ছিদাম সন্ধ্যাবেলা এল খোল নিয়ে। প্রাণনাথকে বলল, ‘বাবাকে জিজ্ঞাসা
করেছিলাম। বাবা বলল বাবা ওরকম কোনও গোপন পথ জানে না।’
প্রাণনাথ হতাশ হয়ে বলল, “জানে না?’
‘না। তবে ‘
“তবে?”
“বাবা বলল এটা অসম্ভব না। কেননা সনাতন চোর এই মন্দিরটা যখন বানিয়েছিল তখন শ্মশানের ডোম তার সঙ্গে হাত লাগিয়েছিল। সনাতনের শর্তই নাকি ছিল যে মন্দির পুরোপুরি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আর কেউ দরজা খুলে ভিতরে আসতে পারবে না। সনাতন নিজের বানানো তালা আটকে রাখত মন্দিরের দরজায়, যাতে আর কেউ ভিতরে আসতে না পারে। দরজা বন্ধ করে কাজ হত, আর একবছর লেগেছিল দু‘জনের ওই মন্দিরের ভিতরটা বানাতে।’ ‘কিন্তু সনাতন এত লোক থাকতে শ্মশানের ডোমকে সঙ্গে নিয়ে কেন মন্দির বানাতে গেল?’
“বাবার সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলা গেল না। বাবা শান্ত গলায় বলল যদি ওই গোপন পথ থেকেও থাকে তবু ওই পথের ধারেকাছে যাওয়া উচিত হবে না। কেননা ওখানে গোরা-দানো বাসা বানিয়ে লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা খুব। বাবা বলেছে খুঁজে দেখবে যদি ওই পথ খুঁজে পায়। আমি বুঝলাম বাবার সঙ্গে এ বিষয়ে আর কথা বলার কোনও মানে হয় না। বাবার মাথায় আবার গোরাদানো ভর করেছে।
প্রাণনাথ বলল, ‘মৃদঙ্গম গত বছর এই সনাতন কীর্তন ধুলটে গেয়েছিল তখন তুমি ওর সঙ্গে খোল বাজিয়েছিলে না?”
‘হ্যাঁ,’
‘আমাকে একটু এই কীর্তনের সুরটা তুলে দেবে?”
‘তুমি গাইবে?”
‘শিখে রাখি, কখন কীভাবে কাজে লেগে যায়।’
‘ঠিক আছে, আমি বাজাচ্ছি,’ ছিদাম খোলে চাঁটি মেরে বলল, ‘প্রথম পদের পঙক্তি অষ্টতালে গাওয়া। যেমন ভাবে “বদসি যদি” গাওয়া হয় ঠিক সেরকম।’ ‘অষ্টতাল?”
- ‘আটটা তালের গুচ্ছতাল। শ্রীনবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী বলেছিলেন যে অষ্টতালের অংশ তালগুলি হল আড়, দোজ, ধরণ, জ্যোতি, গজল, রূপক, শশীশেখর, সমতাল,’ ছিদাম বলল। ‘কিন্তু মৃদঙ্গমদাদা অষ্টতাল বলতে বলতেন আড়, দোজ, যতি, শশীশেখর, গঞ্জন, পঞ্চম, রূপক আর সম। আমি মৃদঙ্গমদাদারটা বাজিয়ে শোনাচ্ছি।’ ছিদাম বাজিয়ে দেখাল। তারপর বলল, ‘তারপর মৃদঙ্গমদাদা মন্দিরের ভিতরে নীরবে কীর্তন গাইবে - হৃদে গাহি পদসি - পল্লব শ্যাম গো উদার কমল শিরসি। এটার তাল মদনদোলা – বাইশ মাত্রার তাল কিন্তু মাত্র সাতটি তালাঘাত। এটাও বাজাচ্ছি শোন।’ - -
“আমাকে এই তালগুলো শিখিয়ে দিতে পারবে?”
‘কেন পারব না। এতো শুধু তাল আর কোশীর খেলা। আজ তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি এক ছুটে বাড়িতে ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বেলে ফিরে আসছি। এই ঘরে বসে বাজানো উচিত হবে না। বাইরে থেকে শুনলে সন্দেহ হবে। আমি ফিরে এসে বাইরের দাওয়ায় বসে বাজাব। তুমি মন দিয়ে শুনো, একটু শুনলেই তাল ধরতে পারবে।’
ছিদাম ছুটে বাড়ির পথ ধরল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছিদাম ফিরে এসে চেঁচিয়ে বলল, “মন্দিরাদিদি, বাবা ঘরে নেই।’
“সে কি! চল চল, দেখি আবার কোথায় গেল ভুবনকাকা,’ মন্দিরা আর ছিদাম ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল।
প্রায় এক ঘন্টা পর মন্দিরার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। প্রাণনাথের জানলার সামনে এসে বলল - ভুবনকাকাকে পাওয়া গেল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন