প্রীতম বসু
পদাবলীর মুখে ধুলটের প্ল্যান শুনে নাইট্রোজেন কিছুক্ষণ মৌন রইলেন। ‘কী ভাবছেন, স্যার?”
*আমার নাম তুমি ধুলটের বিজ্ঞাপনে লেখ তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু কীর্তনকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে শুধু আমার নামে কাজ হবে না, পৃষ্ঠপোষক চাই। স্পনসর। ধুলটমেলার জন্য অনেক ফাণ্ডের দরকার।’
‘এই কীর্তনেও পৃষ্ঠপোষক?”
অনুষ্ঠানের জন্য স্পনসর চিরকাল দরকার হয়। বুদ্ধ, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণ সকলের অনুষ্ঠানে অর্থবান রাজা, রানী, জমিদার বা ব্যবসায়ীরা সাহায্য করেছে।’ “চৈতন্যদেব?”
‘জানো কিনা জানিনা, ভক্তি-ধর্ম প্রচারের আগে চৈতন্যদেব কিন্তু নবদ্বীপের বিজনেস ক্লাসের সঙ্গে বেশ ভালই মেলামেশা করতেন। উনি জানতেন যে ভক্তিধর্ম সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রসারের জন্য অর্থ দরকার। ফাণ্ড। আর একটু ভালভাবে দেখলে দেখতে পাবে যে চৈতন্যানুরাগীদের মধ্যে যেমন জ্ঞানীগুণী, কবি, সাধক ছিলেন, তেমনি রসিক-চিত্তের অজস্র ব্যবসায়ী ছিলেন তাঁর অনুরাগী।’
*বিজনেসম্যানরা কীর্তনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন?’
‘সপ্তগ্রাম তখন বাংলাদেশের প্রধান বন্দর। চৈতন্যদেব পুরীতে বসে তাঁর মুখ্য সহযোগী নিত্যানন্দকে পাঠালেন বাংলায় ভক্তিধর্ম প্রচার করার জন্য। নিত্যানন্দ সপ্তগ্রামে গিয়ে সেখানকার বণিক সমাজকে প্রভাবিত করলেন। সপ্তগ্রামের সুবর্ণবণিক প্রধান উদ্ধারণ দত্তকে বৈষ্ণবমন্ত্রে দীক্ষা দিলেন। তার ফলে সপ্তগ্রামের অধিকাংশ বণিক যখন দীক্ষিত হয়ে উঠল তখন তারাই ভক্তিধৰ্ম প্রসারের মূল পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠল। চৈতন্যভাগবতে বৃন্দাবন দাস লিখেছেন
বণিক তারিতে নিত্যানন্দ অবতার।
বণিকেরে দিলা প্রেমভক্তি অধিকার।
সপ্তগ্রামে সব বণিকের ঘরে ঘরে।
আপনে নিতাইচাঁদ কীৰ্ত্তনে বিহরে।।
সপ্তগ্রামে যত হৈল কীৰ্ত্তন বিহার।
শত বৎসরেও তাহা নারি বর্ণিবার।।’
‘চৈতন্যদেব এটা জানতেন?”
‘কেন জানবেন না? নিত্যানন্দ নিজে ব্রাহ্মণ হয়ে জল-অচল সুবর্ণবণিকের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন এটা রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের কাছে ঘোর অনাচার মনে হল। তখন শ্রীচৈতন্যের নবদ্বীপের একজন ব্রাহ্মণ সহপাঠী পুরীতে ছুটে গিয়ে তাঁকে নালিশ জানালেন। কিন্তু শ্রীচৈতন্য শান্তভাবে তাকে জানালেন যে নিত্যানন্দ একজন সিদ্ধপুরুষ, তাঁর কোনও কাজ অনাচার নয়। সপ্তগ্রামে নিত্যানন্দের সাফল্যের জন্য তিনি তাকে সমাদর করেছিলেন।
যে ভক্তি দিয়াছ তুমি বণিকসভারে।
তাহা বাঞ্ছে সুর সিদ্ধ মুনি যোগেশ্বরে।।
১৫০৭ সালে হুগলীতে বিরাট দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। তখন উদ্ধারণ দত্ত সপ্তগ্রামে অনেক অন্নসত্র খুলেছিলেন। সেখানে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষ রোজ অন্নগ্রহণ করত। উদ্ধারণ দত্ত তাদের বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা দিইয়েছিলেন। চাপে পড়ে গরিবের ধর্মান্তর হওয়া আমাদের বাংলায় বহুবার হয়ে এসেছে। আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে। কিন্তু আমাদের ইনভেস্টমেন্ট দরকার হবে।’ ‘
কিন্তু আমরা পৃষ্ঠপোষক কোথা থেকে পাব?”
‘রতি,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘ও যদি পরাশরকে অনুরোধ করে তবে কাজ হবে। পরাশরের ক্ষমতা খুব। ও কয়েকজন ফাইনান্সার খুব সহজেই জোগাড় করে দেবে। পরাশর কলঙ্কিনী রাই বেচে অনেক অর্থ-নাম-যশ করেছে। এবার কীর্তনীয়াদের মরণাপন্ন অবস্থা থেকে বাঁচাতে ওকে এগিয়ে আসতে হবে। কাল সকালে একবার পরাশরের সঙ্গে দেখা করতে হবে।’
নাইট্রোজেন রতিকে ফোন করার জন্য টেলিফোনের দিকে এগোল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন