প্রীতম বসু
১৯৩১ সাল
প্রাণনাথ কীর্তনীয়া যে সনাতন-কীর্তন আত্মস্থ করে ফেলেছিল একথা করতালতলীর ঘোর নাস্তিকও সেদিন মানতে বাধ্য হয়েছিল। আর মধুর রসের ভক্তদের তো কথাই নেই, তারা তো যেন অষ্টসাত্ত্বিকভাবে আচ্ছন্ন। মরমীয়া মনোহরসাই কীর্তনে ধুলডাঙায় উপস্থিত আউল-বাউল-বোষ্টম-বোষ্টমিসহজিয়া-নেড়ানেড়ী সকল আড়ংদের ভাব-বিহ্বল করে চৈতন্য মহাপ্রভুর মত উদ্দণ্ড নর্তনে বিভোর হয়ে নীলমাধবের মন্দিরের পাথরের পইঠা দিয়ে দালানে উঠে গেল প্রাণনাথ। আর তার পিছনে পিছনে মৃদঙ্গখানা হাওয়ায় দুলিয়ে সঙ্গত দিতে দিতে ঊর্ধ্বপুণ্ড্র ললাটে ছোকরা খুলি ছিদাম বায়েন। ভক্তদের মুহুর্মুহু হরিধ্বনির মধ্যে চিরাচরিত প্রথায় একান্তে হরিনামের জন্য মন্দিরে ঢুকে মন্দিরের কবাট ভেজিয়ে দিল প্রাণনাথ, আর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দাসপ্যারীর দ্রুতচলন চঞ্চুপুটে একনাগাড়ে মৃদঙ্গে ঝা-দাঘি-নেদা - গেদা-ঝা-দাঘি-নেতা-খি বাজিয়েই চলল ছিদাম। অল্পক্ষণ পরে মন্দিরের ভিতরে ঘন্টা ঢং ঢং করে বাজল, আর তারপর ঘটল সেই ঐশী ঘটনা। ধুলটের তিন হাজার ভক্ত যার সাক্ষী।
ঘন্টাধ্বনি শুনে ছিদাম বায়েন দ্রুত মূর্ছনের বোলে সমাপ্তি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল এবং তৎক্ষণাৎ ছিটকে বেরিয়ে এল। ছিদামের বিস্ফারিত নেত্র। ছিদাম চেঁচিয়ে বলল, ‘প্রাণনাথ গোঁসাই ভিতরে নেই!”
‘নেই মানে?’ চৈতন্যপুখুরীর পাড়ের বিশিষ্ট মানুষদের সামিয়ানার নিচ থেকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ড্যানিয়েল সাহেব চেঁচিয়ে উঠেছিল। ‘হোয়াট ননসেন্স!’
দু‘হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিদাম আবিষ্ট কণ্ঠে বলল, ‘প্রাণনাথ কীর্তনীয়া নীলমাধবের মূর্তিতে বিলীন হয়ে গেছে।
ড্যানিয়েল সাহেব এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না, হুকুম দিল - মন্দির ঘিরে ফেল। প্রাণনাথ যেন কিছুতেই পালাতে না পারে। ছদ্মবেশে পুলিশ তৈরিই ছিল। হুকুম পাওয়া মাত্রই চারদিকে হুইসল্ বেজে উঠল, সঙিন উঁচিয়ে পেয়াদা, বরকন্দাজরা সবাই ছুটে মন্দির ঘিরে ফেলল। কিছুক্ষণ আগে আচমকা এক পশলা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হয়ে গেছে। নেটিভ ইণ্ডিয়ানদের ঠাকুর-ফাকুরের পরোয়া না করে ড্যানিয়েল সাহেব নিজে ভারী কাদামাখা গামবুট পরেই মন্দিরের ভিতর ছুটে ঢুকল। নিজেই প্রাণনাথকে টেনে হিচড়ে বের করে আনবে।
কিন্তু কাকে বের করবে? ভিতরে কেউ নেই। মন্দির খালি! শুধু বিগ্রহের মাথার ওপর ছাত থেকে ঝুলে নেমে আসা দড়িতে দোদুল্যমান পিতলের ঘন্টা দুটো ঢং ঢং করতে করতে ধীরে ধীরে থেমে গেল।
তাহলে কোথায় গেল প্রাণনাথ?
ড্যানিয়েল সাহেবের পাশে বসেছিলেন জমিদার রায়সাহেব অখিলরঞ্জন সেন। উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠে গুপ্তির কুমীরমুখো রূপো-বাঁধানো হাতলটা জোরে চেপে ধরলেন। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল তাঁর। রায়বাহাদুর উপাধিটা হাতের এত কাছে এসে ফসকে যাবে নাতো? এক হাতে ঢাকাই তাঁতের ফিনফিনে কালাপেড়ে ধুতির কোঁচার অগ্রভাগ ও অন্য হাতে ছড়ি মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে পৃথুল অখিলরঞ্জন ড্যানিয়েল সাহেবকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করলেন। মন্দিরের সিঁড়িতে ছিদামের সামনে এসে ছিদামের গলার খোলের কাঁধ-দোয়ালে হ্যাঁচকা টান মেরে অখিলরঞ্জন রুদ্রমূর্তিতে বললেন, ‘হারামজাদা! প্রাণনাথ কোথায়?”
*প্রাণনাথ কীৰ্তনীয়া নীলমাধবে লীন হয়ে গেছে।’
“গাঁজা খেয়েছিস?”
“নীলমাধবের দিব্যি,” ছিদাম গলার কয়েক লহর কণ্ঠিমালা তুলে চুম্বন করে আবিষ্ট চোখে তাকাল। সব সনাতন-কীর্তনের মহিমা! এতদিন শুধু গল্পই শুনেছিলাম, আজ চাক্ষুষ হল।’
‘খুন করে ফেলব!” জমিদারের হাতের দৃঢ় তালু শক্ত সাঁড়াশি হয়ে এবার ছিদামের কণ্ঠে। তাঁর চুনট করা উড়ানী কাঁধ থেকে খসে গেছে, ধুতি মুক্তকচ্ছ, পায়ের পুরু বকলেস দেওয়া চিনে জুতোয় কাদা মেখে গেছে, সোনার চেনের প্রান্তে সংযুক্ত পকেটঘড়ি স্থানচ্যুত হয়ে হাওয়ায় ঝুলছে। ক্রোধান্ধ মানুষটির সেদিকে ভ্রুক্ষেপই নেই। ‘দেউলের ভিতর কী দেখেছিলি বল হতভাগা?”
“ধূপ-ধুনোর ঘন ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছিল। দেখলাম প্রাণনাথ কীর্তনীয়া যেন সম্মোহনের টানে নীলমাধবের মূর্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারপর ও কবাট বন্ধ করল। ওঁর কীর্তন শোনা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর ভিতরে কীর্তন বন্ধ হয়ে গেল। মন্দিরের ঘন্টা বেজে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে কবাট খুললাম। দেখলাম প্রাণনাথ গোঁসাই ভিতরে নেই। মন্দির খালি।’
সান্ধ্য মদিরার রাঙা আঁখিতে ক্রোধ মিশে সম্ভাব্য রায়বাহাদুরের অক্ষিদ্বয় লাল করঞ্জ - ‘ধাপ্পাবাজ! এ কখনো সম্ভব?”
‘কেন সম্ভব না?” মিনমিন করে ছিদাম বলল, “সকলেই তো জানে যে সনাতন-কীর্তন আত্মার আকুতিতে গাইতে পারলে কীর্তনীয়ার অষ্টাদশ সিদ্ধি হয়। সে তখন এ জগৎ ছেড়ে পরমাত্মায় লীন হয়ে যেতে পারে। সনাতন নিজেই অদৃশ্য -
অধৈর্য অখিলরঞ্জন ঠাঁটিয়ে এক চড় কষালেন ছিদামের গালে- ‘হারামজাদা, আবার সেই সনাতনের আষাঢ়ে গপ্পো শোনাচ্ছিস?”
‘শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও তো জগন্নাথে বিলীন হয়ে গেছিলেন,’ গালে হাত বোলাতে বোলাতে ছিদাম মৃদুস্বরে প্রতিবাদ করল।
অকাট্য যুক্তি। সত্যিই তো, সেটা মানলে এটা মানতে আপত্তি কোথায়? ভাবী রায়বাহাদুর থতমত খেয়ে এক পলকের জন্য বাক্যিহারা হয়ে গেছিলেন, আর তৎক্ষণাৎ প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার জয়ধ্বনি করতে করতে দোহার, শিরবাদক, কোলগায়েন এবং অজস্র ভক্তের ঢেউ পুলিশ-টুলিশের বেষ্টনী ভেঙে নামসংকীর্তনের ঘোরে আছড়ে পড়ল নীলমাধবের মন্দিরে। তারপর হরিনামের উচ্চধ্বনির বেঢ়া কীর্তনে দোহার-বায়েনদের পিছনে পিছনে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে মন্দির ঘিরে পাক খেতে লাগল ধুলটে আসা কয়েক হাজার ভক্ত। ভক্তিবিহ্বল হয়ে লোকের জটার বন্ধন, বসন, উত্তরীয় খসে পড়ছে। কেউ পুন্যি অর্জনের অভিলাষে মন্দিরের সিঁড়িতে দণ্ডবৎ হয়ে প্রাণনাথের চরণস্পর্শে পবিত্র ধূলি গায়ে মেখে চলেছে। কেউ সনাতন-কীর্তনের মহিমা অবলোকন করে প্রেমবিহ্বল হয়ে অশ্রুহাস্য করছে। ঘনঘন শঙ্খ-উলুধ্বনির মাতনে চতুর্দিক থেকে মহিলারা ভক্তিতে পুষ্প ও বাতাসা হাওয়ায় ছুঁড়ে হরির লুট দিচ্ছে। মাঘী সপ্তমীর সন্ধ্যায় সে এক অপূর্ব উন্মাদনা!
ড্যানিয়েল সাহেব বিলেত থেকে আসা দুদে পুলিশের অফিসার। সনাতনকীর্তনের প্রবাদ সে শোনে নি, শুনে সময় নষ্টও করতে চায় না। অধৈর্য হয়ে আদেশ দিল – মন্দিরের মেঝে ভেঙে ফেল, কোনও গুপ্ত সুড়ঙ্গ-টুড়ঙ্গ নিশ্চয়ই আছে। প্রাণনাথকে আমার চাই-ই চাই। কিন্তু জমিদার অখিলরঞ্জন ইংরেজ প্রভুদের তোয়াজ করে চললেও তিনি গ্রামের কুসংস্কারাচ্ছন্ন চাষা-ভুষোদের হাড়ে-হাড়ে চেনেন। ভক্তিতে আঘাত দিলেই এরা বেঁকে বসবে। তাহলে কয়েকশ’ একর জমির আফিম চাষ থেকে যে একটা কানাকড়িও আসবে না সে বিষয়বুদ্ধি তাঁর ভালই আছে। ড্যানিয়েল সাহেবকে তিনি বোঝালেন এ কাজটা ঠিক হবে না। ধর্মের ওপর হাত পড়াতে লর্ড ডালহৌসির সময় এদেশে সিপাহি বিদ্রোহ দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল।
তবু ড্যানিয়েল সাহেবের পেয়াদারা দস্তুরমত অনুসন্ধান করল, কিন্তু মন্দিরের পাথরের মেঝেতে কোনও ফাঁকফোকর পেল না। জমিদার নিজে লেঠেলদের নিয়ে ধুলডাঙায় হোগলা-দরমা দিয়ে বানানো প্রতিটি বোষ্টম-আখড়ায় আটন পেতে কম্বল জড়িয়ে বসে থাকা সাধক-সাধিকাদের মধ্যে তন্নতন্ন করে প্রাণনাথকে খুঁজলেন। কিন্তু প্রাণনাথ কীর্তনীয়াকে পাওয়া গেল না।
জমিদার তাজ্জব হয়ে গেছিলেন। জলজ্যান্ত প্রাণনাথ এভাবে ভোজবাজির মত হাওয়ায় উবে গেল? সনাতন-কীর্তন তবে গপ্পোকথা নয়? সত্যিই অলৌকিক শক্তিবলে মানুষকে অদৃশ্য করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন