প্রীতম বসু
মঙ্গল আরাত্রিক শেষ করে প্রায় একঘন্টা পর বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন দেউল থেকে ফিরলেন, সঙ্গে এল মন্দিরা আর ছিদাম। মন্দিরার হাতে প্রসাদের পিতলের রেকাব।
মন্দিরা হেঁসেলে ঢুকে গেল, কিন্তু কুমুদরঞ্জন গৃহের অভ্যন্তরে ঢুকলেন না। তিনি চলে গেলেন বাড়ির পিছনে, তাকে অনুসরণ করে গেল ছিদাম। প্রাণনাথও বাড়ির পিছনে এল।
বাড়ির পিছনের পালান জমিতে অনেক রকম তরি-তরকারির গাছ। কলাই, সর্ষে, শশা, কুমড়ো, লাউয়ের মাচা, বেগুন, আলতাপাতি শিম। চাষের জমির ওপাশে বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা শনের ছাউনির দোচালা তাতে দরমার আগড়, ওটাই ছিদামদের বাড়ি।
কুমুদরঞ্জন খুব যত্ন করে এক একটা গাছের সামনে গিয়ে তাদের দেখভাল করতে লাগলেন। কখনো কুমড়ো লতার ভিতর থেকে আগাছা তুলে তুলে বাইরে ফেললেন, লাউএর লতানে গাছ মাচা থেকে নিচে পড়ে গেছে তাকে যত্ন করে মাচায় তুলে দিলেন। বিরক্ত সোনাপোকাটা লাউমাচা থেকে কুমড়ো ফুলের দিকে উড়ে গেল। প্রাণনাথ পাশে এসে বলল, “বাঃ! খুব সুন্দর বাগান করেছেন তো।’ ‘হ্যাঁ, কিছু শাক-সব্জি লাগিয়েছি ছিদাম আর আমি মিলে ‘ কুমুদরঞ্জন বাগানের তদারকি করতে করতে বললেন।
‘নিজে জমিদার বংশের ছেলে হয়ে গোঁসাইজ্যাঠা নিজের জমি নিজে চাষ করেন,’ ছিদাম খুব গর্বের সঙ্গে কথাটা বলল। ছেলেটার উদ্যম দেখে প্রাণনাথের খুব ভাল লাগল, কিন্তু কথাটা শুনে কুমুদরঞ্জন দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর ছিদামের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ শক্ত গলায় বললেন, ‘তোকে কতবার বলেছি ছিদাম আমার সামনে আমড়াগাছি করবি নে। নিজের জমি চাষ করায় গর্বের কী হল? আমি নীলমাধবের অন্নভোগের জন্যই এই সব তরকারির চাষ করি। আর জমিদারীর কথা যখন তুললি, তখন বলি যে জনক রাজা রাজর্ষি ছিলেন। তিনি যদি নিজের হাতে জমিতে হলকর্ষণ করতে পারেন তবে আমি এই গণ্ডগ্রামের জমিদারপুত্র হয়ে নিজের ক্ষেত চাষ করতে পারব না? তাও এই শরীরে তো লাঙল চালাতে পারি না, নিড়ানি দিয়ে ক্ষেতের আগাছা তুলি, ফসল তুলি।’ তারপর কুমুদরঞ্জন প্রাণনাথের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভারী কাজ সব ছিদামই করে।’ কুমুদরঞ্জন আইরি ক্ষেতের দিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘আঁকশিটা নিয়ে চল তো ছিদাম, ওদিকের পগারে পাতা পড়ে আছে কিনা একবার দেখে আসি।’
ছিদাম বলল, ‘তোমার হাঁটলে বুকের ব্যথা বাড়ে। তুমি ঘরে ফিরে যাও গোঁসাইজ্যাঠা, আমি দেখে আসছি।’
‘না না, আমি ঠিক আছি। কিছু হবে না আমার।’
‘কক্ষনো না!’ ছিদাম চোখে-মুখে বিরক্তি জাগিয়ে রাগতঃ কণ্ঠে বলল ৷ ‘মন্দিরাদিদি বলেছে তোমার রাতে বুকের ব্যথা বেড়েছিল। তুমি বাড়ি যাও।’ ছিদাম কুমুদরঞ্জনের হাত ধরে কুমুদরঞ্জনের মুখ বাড়ির দিকে ফিরিয়ে দিল।
‘ছিদাম আমার জগদানন্দ!’ কুমুদরঞ্জন স্বগোতক্তি করলেন। “চল বাবা
প্রাণনাথ, আমরা বাড়ি ফিরে যাই। আজ প্রাণনাথ, তোমার কীর্তন শুনব।’ দু‘জনে ঘরের দাওয়ায় ফিরে এল। ঘরে ফিরে এসে প্রাণনাথ বলল, ‘ছিদামের ভাল নাম জগদানন্দ বুঝি?”
কুমুদরঞ্জন হাসলেন। মন্দিরা নিকানো দাওয়ায় খেজুর পাতার পাটি পেতে দিতে দিতে হেসে বলল, ‘ওর আসল নাম শ্রীদাম। ও বাবার শরীরের যত্ন করার জন্য বাবার ওপর এমন খবরদারি করে যে বাবা ওকে ভালবেসে নাম দিয়েছে জগদানন্দ।’
‘ঠিক বুঝলাম না, প্রাণনাথ বলল।
‘পুরীতে জগদানন্দ ছিল মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের ভক্ত,’ মন্দিরা বলল। ‘উনি সব সময় মহাপ্রভুর শরীরের দিকে খেয়াল রাখতেন। মহাপ্রভু খাওয়া দাওয়াতে অনিয়ম করলে উনি অভিমান করে নিজে না খেয়ে থাকতেন। একবার একজন ভক্ত চৈতন্যমহাপ্রভুকে সুগন্ধী তেল দিয়েছিল মাথায় মাখার জন্য। মহাপ্রভু বললেন তিনি সুগন্ধী তেল মাখবেন না, তাই মহাপ্রভু একজন ভক্তকে আদেশ দিলেন ওই তেল দিয়ে পুরীর মন্দিরে প্রদীপ জ্বালিয়ে দাও। জগদানন্দ এতে এত রেগে গেলেন যে আঙিনায় ওই তেলের ভাঁড়টি ছুঁড়ে ভেঙে ফেললেন। মহাপ্রভু জগদানন্দকে ভয় পেতেন আর খুব ভালবাসতেন। চৈতন্যচরিতামৃতে মহাপ্রভু বলছেন জগদানন্দ চাহে আমায় বিষয় ভুঞ্জাইতে। পুরী গমনের পর মহাপ্রভু শচীমাতাকে আশ্বাস দেবার জন্য এই জগদানন্দকে নবদ্বীপে পাঠিয়েছিলেন।’
‘আমার জগদানন্দ অবশ্য এত মিষ্টি মৃদঙ্গ বাজায় যে ওই হাতে আমি পাঁচনির বাড়ি খেতেও প্রস্তুত, কুমুদরঞ্জন বললেন। ‘ছিদাম ফিরলে দু‘কলি কীর্তন হোক তাহলে? ছিদামের মৃদঙ্গের বাজনায় আমার মন ভাল হয়ে যায়। সারাটা দিন আনন্দে কাটে।’
ছিদাম ফিরে এল। মন্দিরা তিনজনের জন্য আসন পেতে কলাপাতায় ঠাকুরের লুচি, সুজির হালুয়া আর প্রসাদের কলা আর গেলাসে দুধ পরিবেশন করল। পিতলের থালার লুচিগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রাণনাথের মনে পড়ল মৃদঙ্গম রসিকতা করে বলত আমাদের বাড়িতে কখনো ফুলকো লুচি দিয়ে প্রাতরাশ হল না। প্রসাদের চুপসানো লুচি টেনে ছিঁড়ে খেতে কার ভাল লাগে বল। মন্দিরা নিজেও খেল। খাওয়ার পর্ব শেষ হলে ছিদাম খোলটা টেনে নিল। খোল হাঁটুর সামনে রেখে ছিদাম তাতে চাপড় মেরে চটাং চটাং করে আওয়াজ তুলে বলল, ‘আজ কে গাইবে? মন্দিরা দিদি তুমি?”
‘না আজ তোমার গান শুনি, প্রাণনাথ, কুমুদরঞ্জন তক্তপোষের পাশে জানলার গায়ে রাখা ইজিচেয়ারে বসলেন। ‘মৃদঙ্গম বলে তোমার গলা খুব মিষ্টি।’ “না না, আমি একদম কীর্তন গাইতে পারি না। মৃদঙ্গম অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমার দ্বারা কীর্তন হয় না।’
“ঠিক আছে, দেখি না কেমন হয় কীর্তন তোমার গলায়। এতো বাড়িতেই গাইছ, লজ্জা কীসের। নাও একটা ধর। বল তুমি কী গাইবে?”
প্রাণনাথের কীর্তনের সঞ্চয় খুবই সামান্য। মৃদঙ্গম বলত সকালে যে গানটা
বেশি প্রযোজ্য তা হল রাধিকার খণ্ডিতা। ‘রাধিকার খণ্ডিতা গাই?” “খণ্ডিতা!”
“কেন ঠিক না?”
“খণ্ডিতা তো কীর্তনীয়ারা আসরে গায় না, খণ্ডিতা বোঝার মত ভক্ত খুব কম দেখা যায়। ভগবানের চরণে মন না রাখতে জানলে অনেক সময় অশ্লীল মনে হয়। ঠিক আছে তুমি গাও, বাবা,’ বৃদ্ধ দু‘হাত কোলের
কাছে নিয়ে এল।
প্রাণনাথ চোখ বুজল। মৃদঙ্গমের মুখটা মনে হল। খুব ভক্তিভরে গাইতো মৃদঙ্গম। ছেলেটার মৃত্যু এখনও ওর কাছে একটা রহস্য। কেন ওকে ইংরেজরা মেরে ফেলল? ইংরেজ পুলিশ তো দেখেছে বোমা মৃদঙ্গম ছোঁড়ে নি। মৃদঙ্গম শান্তিপূর্ণ পিকেটিঙই করছিল। তবু কেন ওকে অত মারছিল পুলিশ?
প্রাণনাথ শ্বাস নিয়ে গান ধরল - -
নয়নের কাজর, বয়ানে লেগেছে,
কালোর উপরে কালো ৷
প্রভাতে উঠিয়া, ও মুখ দেখিলু,
দিন যাবে আজি ভালো।
অধরের তাম্বুল, নয়নে লেগেছে,
ঘুমে ঢুলু ঢুলু আঁখি;
আমা পানে চাও, ফিরিয়া দাঁড়াও,
নয়ন ভরিয়া দেখি।
চাঁচর কেশের চিকুর বেণী
সে কেন বুকের মাঝে।
সিন্দুরের দাগ, আছে সৰ্ব্ব গায়
মোরা হৈলে মরি লাজে।
ছিদামের আঙুল মৃদঙ্গে যেন শব্দের আলপনা আঁকতে লাগল। কিন্তু প্রাণনাথ গাইতে গাইতে বুঝতে পারছে যে আজ ঠিকমত হচ্ছে না। মৃদঙ্গমের মৃত্যু ওকে বারবার অন্যমনস্ক করে গানের বাইরে টেনে নিয়ে আসছে।
একসময় গান শেষ হল।
‘হুম,’ গম্ভীর হয়ে বৃদ্ধ বললেন।
“আমি প্রাণনাথ জানে কীর্তন বৃদ্ধের পছন্দ হয় নি। ও অপরাধীর মত বলল, বললাম যে আমার গলায় কীর্তন হয় না।’
“না না, তোমার খণ্ডিতা অশ্লীল মনে হয় নি, কিন্তু ভাবের ঘরে চুরি করলে তুমি।’
কথাটার মানে ঠিক জানা নেই। প্রাণনাথ বলল
‘আজ্ঞে?”
‘রাগিনী বজায় রেখে গান গেয়েছ তুমি, কিন্তু কীর্তন হল না। তোমার গান শ্রুতিমধুর হয়েও মর্মস্পর্শী হল না। মনে হচ্ছে যেন তুমি দুর্গা প্রতিমার বিগ্রহ নানা অলঙ্কারে সাজালে, কিন্তু বিগ্রহে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে পারলে না, তাই মনের মধ্যে সেই বিগ্রহের পুজো হল না। হাবভাব কথাটার হাব কাকে বলে জানো?”
এটাও প্রাণনাথের জানা নেই। ওর ধারণা ছিল ভাবের সঙ্গে মিলিয়ে হাব বলা হয়। প্রাণনাথ বুঝল এখানে আন্দাজে ঢিল না ছোঁড়াই ঠিক হবে। ও চুপ করে রইল।
‘ভাব প্রথমে আসে মনে। মাটির নিচে অঙ্কুরের মত তখন সেই ভাবের বাহ্যপ্রকাশ হয় না। কিন্তু সেই ভাব মনের মধ্যে গর্ভস্থিত শিশুর মত বেড়ে উঠতে থাকলে মন ক্রমশঃ সেই ভাবে বিভোর হয়ে যায়। তখন গর্ভধারিনীর চোখমুখের মত ভাবুকের চোখের দৃষ্টিতে, মুখের হাসিতে বা কান্নায়, চলাফেরায় সেই ভাব বিকশিত হতে থাকে। এই বিকশিত ভাবকে বলে হাব। তোমার গানে হাব ছিল না। তোমার সুরে, কথার ভঙ্গীতে প্রকাশিত রাধিকার দুঃখে ছিল কৃত্রিমতা। আর এই কৃত্রিমতা তোমার অভিনয়ের ভাব নষ্ট করে দিয়েছে। মনে হচ্ছিল তুমি ভাবের ঘরের চোর।’
কীর্তনের যে এত থিওরি আছে সেটা প্রাণনাথ জন্মেও জানতো না। প্রাণনাথ আমতা আমতা করে বলল, ‘আরও দরদ দিয়ে গাওয়া উচিত ছিল?”
‘আসলে পদাবলীর কবিরা যেমন বিরহের চিত্র এঁকেছেন, সেরকম কীর্তনীয়ারা সেই পদে মর্মস্পর্শী সুর ঢেলেছেন। কীর্তন সম্রাট রসিক দাসের সম্বন্ধে একটা গল্প আছে যে রসিক দাস দক্ষিণখণ্ডে থাকাকালীন একদিন প্রাতে প্রাতঃকৃত্য করতে বাইরে যাচ্ছিলেন। মাঠে হঠাৎ তিনি শোনেন এক সদ্য পুত্রহারা বিধবা রোদন করছেন। সেই মর্মস্পর্শী করুণ শব্দ রসিক দাসকে স্তব্ধ করে দিল। প্রভাতের বাতাসে ভেসে আসা সেই রোদন সুর উনি মাঠের ভিতর দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ শুনলেন তারপর বাড়ি ফিরে এসে সেই সুরে ঢেলে গাইলেন রাধার বিরহের গান দুটি “কদম্বের বন হইতে কিবা শব্দ আচম্বিতে আসিয়া পশিল মোর কানে” আর “হরি করচিহ্ন পদম্বুজে যাবক।” এভাবে জীবন থেকে উঠে আসে কীর্তনের আবেগ। সোনার তরীর “বৈষ্ণব কবিতা”য় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন -
এত প্রেম কথা,
রাধিকার চিত্তদীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা
চুরি করি লইয়াছ কার মুখ, কার
আঁখি হতে?
সেই গভীরতায় পৌঁছে কীর্তন গাইতে হয়। আর কীর্তন গাইতে গেলে বৈষ্ণবতত্ত্ব সম্বন্ধে গভীর ধারণা থাকা আবশ্যক। আচ্ছা তুমি খণ্ডিতা গাইলে। এই খণ্ডিতার অর্থ জান?”
‘না,’ প্রাণনাথ বলল। ওর কখনো মনে এ প্রশ্ন জাগেনি।
‘কয়েকটা শব্দ বলছি, এর অর্থ বলতো?” বৃদ্ধ মুখে স্মিত হাসি বজায় রেখে বললেন। ‘বাসকসজ্জা, বিপ্রলব্ধা, কলহান্তরিতা।’
প্রাণনাথ এর একটা শব্দও কখনো শোনেনি। ও চুপ করে বসে রইল। বৃদ্ধ কুমুদরঞ্জন মন্দিরার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি জানি ও পারবে না। ওর কীর্তন শুনেই আমি সেটা বুঝেছি। মা, তুই বল রাধিকার মানভঞ্জনে এই শব্দগুলোর ব্যবহার কোথায় আছে - -
মন্দিরা শাড়ির আঁচলটা তর্জনীতে জড়াল, তারপর আবার খুলে ফেলল। তারপর বলল, ‘রাধিকা একরাতে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মিলনের জন্য অভিসারিকা হয়ে বনের মধ্যে এক নিকুঞ্জে এসে বাসকসজ্জায় ছিল। কৃষ্ণ সেই নিকুঞ্জে আসছিল কিন্তু পথে চন্দ্রাবলী কৃষ্ণকে নিজের কুঞ্জে নিয়ে গেল। চন্দ্রাবলীর মধুর মিলনে বিভোর হয়ে রাত কীভাবে কেটে গেল তা কৃষ্ণ টেরই পেল না। এদিকে কৃষ্ণ কেন আসছে না ভেবে ভেবে রাধিকা উৎকণ্ঠিতা ও বিপ্রলব্ধা। পরদিন প্রভাতে অরুণনেত্র কৃষ্ণ আলুথালু বেশে রাধিকার কুঞ্জে উপস্থিত হলে রাধিকা সব বুঝতে পারল। তখন রাধিকা প্রথমে অধীরা ও পরে খণ্ডিতা হয়ে দুর্জয় মান করে বসল। কৃষ্ণ রাধিকার মানভঞ্জনের সকল রকম প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হল এবং তখন রাধিকার কুঞ্জ থেকে প্রস্থান করল। কৃষ্ণ চলে যেতেই রাধার মনে কৃষ্ণ বিরহ শুরু হল। কলহন্তারিতা রাধা তৎক্ষণাৎ যোগীবেশ ধারণ করে আর্তনাদ, বিলাপ শুরু করল। পরে শ্রীকৃষ্ণ কৌশলে ও ছলে রাধিকার মান ভিক্ষা চাইল।’
‘ঠিক,’ কুমুদরঞ্জনের মুখে তৃপ্তির হাসি। ‘মানিনী রাধা কৃষ্ণের বহুবল্লভতা হেতু এত আঘাত পেয়েছেন যে কৃষ্ণবর্ণ কোনও কিছুর সঙ্গে সংস্পর্শ রাখবেন না। নীল চুড়ি খুলে ফেলে গজদন্তের চুড়ি পরলেন, নীলবসন ছুঁড়ে ফেলে যোগিনীদের মত রক্তবসনে দেহ আচ্ছাদন করলেন, ঘাসের মাথায় চন্দন দিয়ে স্পর্শ করিয়ে রাধা চিবুকের ওপর কালো তিল চিহ্নকে ঢাকলেন, তমাল তরুর গায়ে চূর্ণ লেপে দিলেন, আরশিতে কালো চুল দেখা যায় বলে আরশি ভেঙে ফেললেন, পোষা শুকপাখী কৃষ্ণনাম করত বলে তাকে পিঞ্জর খুলে উড়িয়ে দিলেন। এই বর্ণনা মনের মধ্যে ধরে রাখবে যখন রাধার মান গাইবে। তুমি যদি না জান বিপ্রলব্ধার অর্থ কী, তাহলে তুমি বিপ্রলব্ধার আকুতি কীভাবে তোমার কীর্তনে ফুটিয়ে তুলবে?” বলতে বলতে কুমুদরঞ্জনের দৃষ্টি পড়ল ছিদামের দিকে, ছিদাম খোলটা বাঁধার চেষ্টা করছে। ‘ছিদাম আজ তোর হলটা কী? আজকাল তোর আওয়াজে মিষ্টত্ব মনে হচ্ছে কমে গেছে। মন দিয়ে বাজাচ্ছিস না কেন?”
‘কাল থেকে আমার খোলটা নিয়ে আসব। মৃদঙ্গমদাদার খোলের আলাতলাচুনাতলা পাল্টাতে হবে, গোঁসাইজ্যাঠা, ছিদাম বলল। ‘ক’দিন হল এই খোলটা বাজিয়ে ঠিক সুখ পাচ্ছি না। একবার আমি দেখি বাড়ি নিয়ে গিয়ে।’
‘নিয়ে যা তুই, ঠিক না হলে -‘ বলতে বলতে কুমুদরঞ্জনের দু‘চোখের দৃষ্টিতে বিস্ময় জেগে উঠল। প্রাণনাথ তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরে তাকাল। জানলা দিয়ে অনেক দূরের উঁচু মেঠো পথ দেখা যায়। সেই পথে একটা কালো পুলিশ ভ্যান দুলতে দুলতে এদিকে আসছে। প্রাণনাথের বুক ধক করে উঠল তবে কি পুলিশ টের পেয়ে গেছে সে এখানে লুকিয়ে? ও তাহলে এখন কী করবে? কোথায় লুকোবে? -
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন