প্রীতম বসু
গীত বায়েনের দাহকর্ম শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। পাড়ার প্রতিবেশীরাই শ্মশানযাত্রী হয়ে গেছিল। পদাবলী গোটা পথ খৈ ছড়াতে ছড়াতে গেছিল। মৃতদেহের পাশে চলতে চলতে আড়চোখে তাকিয়েছিল পদাবলী। গোবিন্দ কীর্তনীয়ার দু‘চোখের মণি যেন পাথর।
শ্মশান থেকে ফেরার পথেও গোবিন্দ অধিকারীর মুখ থমথমে। গোবিন্দ অধিকারীর সঙ্গে কথা শুরু করার জন্য পদাবলী জিজ্ঞেস করল – মরার আগে গীত বায়েন বিড়বিড় করে আপনাকে কিছু বলেছিলেন, কী বললেন উনি?”
গোবিন্দ অধিকারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘একজন প্রকৃত গুণী মানুষ অন্য গুণী মানুষের সামনে সব সময় মাথা ঝুঁকিয়ে রাখে। এত গঞ্জনা এত দুঃখের পরও আমাকে সম্মান দিয়ে গেল গীত বায়েন।’
“কিন্তু কী বলে গেলেন উনি?”
‘মুঞি কোন্ ক্ষুদ্র যেন খদ্যোত প্রকাশ
‘এর অর্থ?”
‘পুরীর দার্শনিক, খ্যাতনামা কবি ছিলেন রামানন্দ রায়। সে সময় রায়ের জগন্নাথবল্লভ নাটক বিশাল প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। মহাপ্রভু এই নাটক খুব পছন্দ করতেন। সে সময় আরেকজন বিখ্যাত দার্শনিক কবি ছিলেন বৃন্দাবনের রূপ গোস্বামী। রূপ গোস্বামীর সঙ্গে পুরীতে ইষ্টগোষ্ঠীতে মহাপ্রভুর ইচ্ছা হল একজন প্রতিভাবান পুরুষের পরিচয় আরেকজন প্রতিভাবান পুরুষ করান। স্বরূপ দামোদর সভামধ্যে রূপ গোস্বামীর বিখ্যাত নাটক বিদগ্ধমাধব ও অসমাপ্ত ললিতমাধবের পরিচয় করালেন। তারপর রায় রামানন্দ এই নাটকের বিভিন্ন মূখ্য অংশ তুলে ধরে আলোচনা করতে করতে রূপ গোস্বামীকে নানা প্রশ্ন করছেন আর রূপ গোস্বামী বিনয়ের সঙ্গে তার ব্যাখ্যা করে চলেছেন। একজন গুণী কবি অপর কবিকে কতটা সম্মান করেন সেটা কৃষ্ণদাস কবিরাজ সেই সভার কথা লিখেছেন চৈতন্যচরিতামৃতে। রামানন্দ রূপ গোস্বামীকে বলছেন
রায় কহে তোমার কবিত্ব অমৃতের ধার
দ্বিতীয় নাটকের কহ নান্দী ব্যবহার।।
কবিত্বের দিক দিয়ে রূপ গোস্বামী শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব কবিদের মধ্যে আসন লাভের যোগ্য। অসাধারণ পণ্ডিত। কিন্তু তাঁর বিনয়ও দেখার মত। তিনি বললেন -
রূপ কহে কাঁহা তুমি সূৰ্য্যোপম ভাস
মুঞি কোন্ ক্ষুদ্র যেন খদ্যোত প্ৰকাশ ‘
গোবিন্দ অধিকারী নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি গীত বায়েনের প্রতিভাকে মৰ্য্যাদা দিতে পারিনি। তাকে অপমান করেছি। এত অপমান সত্ত্বেও অন্তিমকালেও কিন্তু গীত আমাকে সম্মান জানিয়ে গেল।’
- গীত বায়েনের বাড়িতে ফিরে এল পদাবলী আর গোবিন্দ অধিকারী। দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে গোবিন্দ অধিকারী বলল “নীলমাধব আমায় বোধহয় মুখাগ্নি করে পাপস্খলনের জন্যই এখানে পাঠিয়েছে। আপনার পরিবারের লোকেদের খবর দেওয়া দরকার। হরি কোথায় থাকে জানেন?”
“শুনেছি সোনাগাছিতে তবলা বাজিয়ে ওর ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়। আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই আর।”
“শুনেছিলাম আপনার এক মেয়ে আছে। সে কোথায় থাকে?’
“উনি মেয়েকে ত্যাগ দিয়েছিলেন।’
“মেয়েকে ত্যাগ করেছিলেন?’ গোবিন্দ অধিকারীর দু‘চোখে বিস্ময়। ‘গীত তো খুব ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ ছিল।’
“মেয়েকে নিজের হাতে ধরে কীর্তন শিখিয়েছিলেন উনি। কী যে হল সেই মেয়ের? এক সহজিয়া বাউলকে মন দিল। সে বাউল আমার মেয়েকে স্পষ্টাস্পষ্টি বলল তার সাধনা সঙ্গিনী হয়ে তাকে রাখতে পারে, কিন্তু বিয়ে করবে না। প্রেম এমনি অবুঝ যে মেয়ে তাতেই রাজি। কিন্তু ওর বাবার এ ব্যাপারে তীব্র আপত্তি, মেয়েকে অনেক বোঝাল, বকাবকি করল। কিন্তু মেয়ে কথা শুনল না, ঘর ছেড়ে চলে গেল। শুনেছি সেই বাউল ওকে ছেড়ে চলে গেছে। জানিনা সেই কলঙ্কিনী এখন কোথায় থাকে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন